X
বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২
৩ ভাদ্র ১৪২৯
পর্ব—চার

কুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন

মুহম্মদ মুহসিন
৩০ জুন ২০২২, ১৪:৪৮আপডেট : ০১ জুলাই ২০২২, ২০:২০

পূর্ব প্রকাশের পর

বিশ্বাসী খ্রিষ্টানরা তখন সবাই আশ্রয় নিয়েছিল আয়া সোফিয়া বা হাগিয়া সোফিয়া নামক বিখ্যাত গির্জায়। তাদের বিশ্বাস ছিল মুসলমানরা এই পবিত্র গির্জা কখনো দখল করতে পারবে না। ঐতিহাসিক গীবনের ভাষ্য অনুযায়ী, জনৈক খ্রিষ্টান সেইন্ট এই মর্মে সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, তুর্কিরা রোমানদের তাড়া করে হাগিয়া সোফিয়া গির্জা পর্যন্ত উপনীত হবে, যেখানে রয়েছে সম্রাট কনস্টানটাইন কর্তৃক নির্মিত পবিত্র স্তম্ভ। খ্রিষ্টীয় উক্ত সেইন্টের ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক উক্ত স্তম্ভ পর্যন্ত আসার পর মুসলমান বাহিনীর শুরু হয় বিপর্যয়। ভবিষ্যদ্বাণীমতে তখন আকাশ থেকে এক স্বর্গীয় দূত তরবারি হাতে অবতীর্ণ হবেন এবং এক সেইন্টের হাতে তা তুলে দেবেন যে সেইন্ট উক্ত স্তম্ভের নিচে আগে থেকে অবস্থান করে থাকবেন। উক্ত সেইন্টের নেতৃত্বে রোমানবাহিনী মুসলমানদের তুরস্কের বৃহত্তর অঞ্চল আনাতোলিয়া থেকে উৎখাত করে দেবেন। এই বিশ্বাসে খ্রিষ্টান বাহিনীর অনেকেই তখন হাগিয়া সোফিয়ায় বসে স্বর্গীয় দূতের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দূত নামলেন না। হাগিয়া সোফিয়ায় অস্ত্র হাতে হাজির হলেন সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ নিজে। তিনি অবশ্য হাগিয়া সোফিয়ায় আশ্রয় নেওয়া কোনো খ্রিষ্টানকে হত্যা করেননি বলে অনেক ইতিহাসবিদ দাবি করেছেন। তাদের নিরাপদে চলে যেতে দিয়ে তাঁর ফজরের নামাজের পরে প্রদত্ত ঘোষণা মোতাবেক জোহরের নামাজ হাগিয়া সোফিয়ায়ই তিনি আদায় করলেন।

এভাবেই ১৪৫৩ সালের ২৯ মে তারিখের অর্ধদিবসের যুদ্ধে শেষ হলো হাজার হাজার বছরের পুরোনো বায়জান্টাইন বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য যার অধীনে এক সময় ছিল পুরো এশিয়া মাইনর ও আফ্রিকার উত্তরাংশের সকল দেশ। যে যুদ্ধে রোমান সাম্রাজ্যের এই উপসংহার রচিত হয়েছিল সেই যুদ্ধকে প্যানোরামা মিউজিয়াম ১৪৫৩ থেকে ধরে এনে ২০২২ সালের ৪ মার্চ জীবন্ত হাজির করেছিল আমাদের মতো দুই নিরীহ বরিশাইল্যা বাঙালের সামনে। পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে যুদ্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে সেই যুদ্ধ অবলোকনের সুযোগ দেওয়ায় আমাদের মুখে তখন অশেষ শুকরিয়া ছিল ইস্তাম্বুলের প্যানোরামা মিউজিয়ামের কর্তৃপক্ষের প্রতি।

এই শুকরিয়ার সাথে খুশি চিত্তে বের হয়ে এলাম প্যানোরামা মিউজিয়াম থেকে। এবার আমাদের যাত্রা সুলতান আহমেদের দিকে। সুলতান আহমেদ শুনতে মানুষের নাম হলেও এটি এখন একটি বড় এলাকার নাম। মূলত অটোম্যান সাম্রাজ্যের ১৪তম সম্রাট সুলতান আহমেদের পারিবারিক কবরস্থানের পাশের ট্রাম স্টেশনটির নাম রাখা হয়েছে সুলতান আহমেদ। ট্রামস্টেশনের এই নামের বরাতে পুরো এলাকাটির নাম হয়ে গেছে এখন সুলতান আহমেদ। এই এলাকায় শুধু সুলতান আহমেদের পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে তা নয়। প্যানোরামা মিউজিয়ামে দেখে আসা ইস্তাম্বুল বিজয়ের যুদ্ধের বর্ণনায় যে তোপকাপি ও হাগিয়া সোফিয়ার কথা বলা হয়েছে সেই তোপকাপি ও হাগিয়া সোফিয়া এখানেই অবস্থিত। এছাড়াও সুলতান আহমেদের নির্মিত বিখ্যাত ব্লু মস্ক ও সুলতান আহমেদের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিখ্যাত মাদ্রাসাহও এই চত্বরেই অবস্থিত। সুতরাং, সুলতান আহমেদ ট্রামস্টেশন নামার পরে এই কমপ্লেক্সে যা যা দেখার আছে তা একদিনে দেখে কোনোভাবেই শেষ করার নয়। আমরাও ঠিক করেছি একদিনে সব দেখার চেষ্টা করব না। তাছাড়া দিনটি ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজেও কিছুটা সময় ব্যয় হয়ে যাবে। এসব ভেবে ঠিক করলাম তোপকাপি ছাড়া বাকিটুকুই শুধু আজ দেখা শেষ করব।

ট্রাম স্টেশন থেকে প্রথমেই আসলাম সুলতান আহমেদের মাজার বা কবরস্থানে। ১৬১৭ সালে সুলতান আহমেদ টাইফয়েডে মারা যান। তাঁর কবরকে ঘিরে এই সমাধিসৌধ স্থাপন করেন তাঁর ভাই সুলতান মুস্তফা। ভাইয়ের কাছ থেকে এই শ্রদ্ধার উপহার তাঁর প্রাপ্য ছিল। কারণ, এর পূর্বে অটোম্যান রাজপরিবারের রীতিই ছিল যিনি সুলতান হতেন খুব কায়দা করে তিনি পরে সিংহাসনের দাবিদার হতে পারে এমন ভাইদের হত্যা করে ফেলতেন। সুলতান আহমেদই প্রথম আটোম্যান সুলতান যিনি আটোম্যান রাজপরিবারকে এই ঘৃণিত চর্চা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি কোনো ভাইয়ের রক্তে নিজের হাত রঞ্জিত করেননি। ফলে তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে এই শ্রদ্ধা তাঁর প্রাপ্য ছিল। এই সমাধিসৌধের স্থপতি ছিলেন সাদাফকার মোহাম্মদ আগা, যিনি বিখ্যাত ব্লু মস্কেরও স্থপতি ছিলেন। সমাধিসৌধটি দেখতে একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের মতো। প্রধান ফটকটি খিলানযুক্ত। এখানে সুলতান আহমেদের পাশেই শায়িত রয়েছে তাঁর স্ত্রী কুসেম যিনি অটোম্যান সাম্রাজ্যে হুররেম সুলতানের চেয়েও বিখ্যাত এক রানি ছিলেন। এাড়াও রয়েছে সুলতান ২য় ওসমান (রাজত্বকাল ১৬১৮-১৬২২), সুলতান ৪র্থ মুরাদ (রাজত্বকাল ১৬২৩-১৬৪০)সহ ওসমানীয় রাজপরিবারের ৩৬ জন ব্যক্তির কবর। সমাধিসৌধের মূল গম্বুজটিতে সৌকর্যপূর্ণ ফুলের নকশা রয়েছে। সুলতান আহমেদ স্কয়ারের মূল প্রবেশদ্বার থেকে ঢুকতে প্রথমেই এই সমাধিসৌধটি দর্শকের চোখে পড়ে। স্কয়ারের প্রবেশদ্বারে সমাধিসৌধ স্থাপন করে সুলতানরা হয়তো বলতে চেয়েছেন—‘হে দর্শককুল, তোমরা আমাদের র্কীর্তিসমূহ দেখার আগে, দেখো, আমরা আজ কোন মাটিতে মিশে আছি’। সমাধিসৌধে ঢুকে এই নসিহতই গ্রহণ করছিলাম। সাথে আরেকটি নতুন অভিজ্ঞতা হলো। এযাবৎ কোনো গোরস্থানে পুরুষ ও নারীর কবর আলাদাভাবে চিহ্নায়িত দেখিনি। এই প্রথম ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদের সমাধিসৌধে দেখলাম সকল পুরুষের কবরের উপরে শিয়রের দিকে একটি করে সাদা পাগড়ি পরানো রয়েছে, এবং নারীদের কবর পাগড়িহীন। বের হয়ে লুসিকে বললাম—‘দেখো, মরার পরেও কিন্তু ঐ পাগড়ির সুবাদে আমি তোমার থেকে এক বিঘত উঁচুতে থাকব’। লুসি অবশ্য পাল্টা উত্তরে মারাত্মক দমিয়ে দিয়ে বলল—‘তাজমহল কিন্তু মানুষ মমতাজের কবরের উপরে রচিতই বলে। শাহজাহানের কবরের উপর কেউ বলে না’।

সুলতান আহমেদের কবর দেখে এবার রওয়ানা হলাম স্কয়ারের এক প্রান্তে অবস্থিত তাঁর সর্বোচ্চ কীর্তি ব্লু মস্ক নীল মসজিদ দেখার জন্য। স্কয়ারের উন্মুক্ত চত্বরে হরেক রকম হকারি দোকান বসেছে। এর মধ্যে অনেকগুলোতে রয়েছে মাঝখানে ফাঁকা গোল বেড়ির মতো এক ধরনের রুটি, নাম সিমিট। ভিতরে চকলেট দেওয়া হলে দাম পাঁচ লিরা, আর চকলেট ছাড়া তিন লিরা। একটা কিনে মুখে দিয়ে দেখলাম যেমন নাম তেমন কাম। আমরা বরিশাইল্যারা সিমেন্টকে ‘সিমিট’ বলি। আমরা সিমিট দিয়া ইট গাঁথি, গাঁথুনি খুব শক্ত হয়। তুরস্কে দেখলাম সিমিট দিয়া রুটি বানায়, আর সে রুটি একেবারে ইটের মতো শক্ত হয়। সেই সিমেন্টের রুটি ‘সিমিট’ দুই কামড়ের পরে আমি আর খেলাম না, লুসি তো মুখেই দিলো না। অবশ্য শক্ত মাড়িওয়ালা তুর্কি বীর ও বীরাঙ্গনারা দেখলাম উহা খেয়েই যাচ্ছে।

এক সিমিটে ধরা খেয়ে হকারি দোকানের কোনো কিছুর দিকেই আর নজর দিচ্ছিলাম না। তবে জয়নাল একটি কয়লার চুলাওয়ালা দোকানের দিকে তাকিয়ে বলল—‘এই জিনিসটা চেখে দেখতে পারেন’। জিনিসটা বাংলাদেশের ভেরেণ্ডার মতো কাঁটাওয়ালা একটা ফলের মধ্যের আঁটি বা বীজ। বীজটা কয়লার আগুনে পোড়াতে হয়, তারপর পোড়া বীজের ওপরের খোসাটা ছাড়িয়ে খেতে হয়। নাম খেস্তান। ১০০ গ্রাম ১৫ লিরা। সিমিটে ধরা খেয়ে মাত্র ১০০ গ্রামই কিনলাম। খেয়ে দেখি একেবারে আমাদের দেশি কাঠালের বিচি। লুসিকে বললাম—‘দেখ, আল্লাহর কী কুদরত। আমাদের দেশি কাঠালের বিচি এই দেশে এসে ভেরেন্ডার মধ্যে ঢুকে বসে আছে’। লুসি চোখ বুজে বলল—‘আরো একশো গ্রাম লও’। এরপর যতদিন তুরস্ক ছিলাম পাশে পেলে এই ভেরেন্ডার বিচি, মানে খেস্তান, খাইনি এমন দিন কম আছে।

খেস্তান খুঁটতে খুঁটতে হেঁটে এসে হাজির হলাম ব্লু মস্কের গেটে। শুনলাম দর্শনার্থীদের দেখার সময় শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু জুমার নামাজের মুসল্লিরা ঢুকতে পারবে। আমাদের জুমা পড়ার প্লান আয়া সোফিয়া বা হাগিয়া সোফিয়ায়। আয়া সোফিয়াও এই চত্বরেই অবস্থিত। আমরা এবার হাঁটা শুরু করলাম আয়া সোফিয়ার দিকে। আয়া সোফিয়ার গেটে এসে দেখি জুমার নামাজের জন্য এখনো গেট খোলা হয়নি। মুসল্লিরা দীর্ঘ লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের মুসল্লি। চেহারাসুরতে অন্তত অ্যারাবিয়ান, আফ্রিকান, আর ইন্দোনেশিয়ানদের তো সহজেই চিনতে পারছিলাম। বাকিদের মধ্যে ইউরোপসহ মধ্যএশিয়ার অধিকাংশ দেশের মুসল্লিই লাইনে ছিল বলে মনে হলো। মিনিট দশ-পনেরো দাঁড়াতেই খুলে দিলো গেট। আয়া সোফিয়ার গেট অবশ্য বেশ কয়েকটি। আমরা দাঁড়িয়েছিলাম যে গেটটি সুলতান আহমেদের মাজারের দিকে মুখকরা সেটির সামনে। ঢুকলাম আয়া সোফিয়ায়। যাকে নিয়ে সারা দুনিয়ায় অনেক গল্প, অনেক ইতিহাস সেই আয়া সোফিয়ায় পা রাখলাম আমরা দুই বরিশাইল্যা বাঙাল—মুহম্মদ মুহসিন ও নাসিমা জাহান লুসি।

সুলতান মুহাম্মাদের ইস্তাম্বুল বিজয়ের সূত্রে ইতোমধ্যেই আমরা আয়া সোফিয়া বা হাগিয়া সোফিয়ার নাম উল্লেখ করেছি। এটি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ গির্জা ছিল এবং মুহাম্মাদ আল ফাতিহর বাহিনীর নিকট পরাজিত হয়ে খ্রিষ্টানরা এই গির্জায় আশ্রয় নিয়েছিল এই আশায় যে, আসমান থেকে দেবদূত নামবে ঐশী সাহায্য নিয়ে। যদিও দেবদূত না নেমে, সেখানে নেমেছিল সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ নিজে। এই গল্পের মতোই হাগিয়া সোফিয়া নিয়ে রয়েছে আরো হাজারো গল্প ও কথা।

‘হাগিয়া সোফিয়া’ নামটি রোমানদের দেওয়া। ইংরেজিতে লিখলে Hagia Sophia। তুর্কি বর্ণমালার নিয়মে উচ্চারণ করলে এর উচ্চারণ দাঁড়ায় ‘আয়া সোফিয়া’। ফলে যাহা আয়া সোফিয়া তাহাই হাগিয়া সোফিয়া। এমনকি রোমানদের বানানে লিখিত Hagia Sophia গ্রিকদের উচ্চারণ রীতিতেও উচ্চারিত হতো আয়া সোফিয়া নামে। রোমান বর্ণের অনুসরণে এর ইংরেজি উচ্চারণ হাগিয়া সোফিয়া। তবে তুর্কিরা তাদের উচ্চারণ অনুযায়ী বলেও আয়াসোফিয়া এবং লেখেও Ayasofya। মূল রোমান শব্দ Hagia অর্থ পবিত্র, ইংরেজিতে holy। এবং Sophia অর্থ জ্ঞান বা Wisdom। এ হিসেবে হাগিয়া সোফিয়া অর্থ হলো পবিত্র জ্ঞান বা Holy Wisdom। মূলত খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী Holy Wisdom দ্বারা যিশু বা God the Son বোঝায়। তাই বলা যায় এটি যিশুর নামে প্রতিষ্ঠিত গির্জা। বিষয়টি না জেনে আমার মতো মূর্খ কিসিমের অনেকে এটিকে সেইন্ট সোফিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত গির্জা বলে অভিহিত করে থাকে, যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

রোমান সম্রাট দ্বিতীয় কনস্টানটাইনের সময় ৩৬০ খ্রিষ্টাব্দে এন্টিওকের বিশপ ইউডোক্সিয়াস হাগিয়া সোফিয়া গির্জা প্রথম নির্মাণ করেন। সেই প্রথম নির্মাণের সময়ও এটি কোনো খালি জায়গায় নির্মিত হয়নি। এখানে তখন একটি গ্রিক পৌত্তলিকতার মন্দির ছিল এবং তাতে ৪২৭টি মূর্তি স্থাপিত ছিল। বিশপ ইউডোক্সিয়াসের নির্মিত এই গির্জার ছাদ ছিল কাঠের এবং এর আকার ছিল অনেকটা রোমান সার্কাসের মতো ট-আকৃতির। এর অভ্যন্তরে রোমান সম্রাট প্রথম কনস্টানটাইনের মেয়ে কনস্টানটানিয়া এবং মা হেলেনার কবর ছিল। খ্রিষ্টীয় ৫ম শতাব্দীর শুরুতে একটি দাঙ্গায় লাগানো আগুনে বিশপ ইউডোক্সিয়াসের নির্মিত গির্জাটি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর সম্রাট দ্বিতীয় থিয়োডসিয়াস এর পুনর্নির্মাণের আদেশ দেন এবং ৪১৫ সালে এর পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে আরেক দাঙ্গায় থিওডসিয়াসের নির্মিত হাগিয়া সোফিয়াও পুড়ে শেষ হয়ে যায়। পুড়ে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেই ৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে রোম সম্রাট জাস্টিনিয়ান হাগিয়া সোফিয়া পুনর্নির্মাণের আদেশ দেন। এবার পুনর্নির্মাণের জন্য দুজন বিশ্ববিখ্যাত আর্কিটেক্ট নিয়োগ করা হয়। একজন গণিতবিদ অ্যানথেনিয়াস (Anthenius) ও অপরজন জ্যামিতিবিদ ইসিদোর (Isidore)। তাঁদের নেতৃত্বে দশ হাজার শ্রমিক ৫ বছর ১০ মাস কাজ করে ৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে হাগিয়া সোফিয়ার পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করে। নির্মাণ শেষ হলে এর বিশালতা ও নান্দনিকতায় বিমুগ্ধ সম্রাট চিৎকার করে বলে ওঠেন—‘হে নবী সোলায়মান, আমি তোমাকে অতিক্রম করে গিয়েছি’। অর্থাৎ সোলায়মান (আঃ) এর নির্মিত উপাসানালয়ও এত বিশাল ও নান্দনিক ছিল না বলে সম্রাট জাস্টিনিয়ান দাবি করেন। তুরস্কের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ স্থপতি মিমার সিনানও আক্ষেপ করে বলতেন—‘আমি সারা জীবন শুধু একটি নির্মাণকেই অতিক্রম করতে চেয়েছি। সেটি আয়া সোফিয়া। কিন্তু পারিনি’।

১৪৫৩ সালের ২৯ মে সুলতান মুহাম্মাদ কনস্টান্টিনোপাল জয় করে হাগিয়া সোফিয়ায় জোহরের নামাজ পড়েছিলেন। ইস্তাম্বুল জয়ের পরে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত আয়া সোফিয়ার বিভিন্ন অংশ মেরামতের জন্য সুলতান নির্দেশ দিলেন এবং কিবলার দিকে মেহরাব নির্মাণের আদেশ দিয়ে তিনি ১১২৩ বছরের এই গির্জাকে মসজিদে রূপান্তরের নির্দেশ দিলেন। ১ জুন ১৪৫৩ তারিখে সুলতান এখানে জুমার নামাজ আদায় করলেন এবং নিজেই জুমার খুতবা বা বক্তৃতা প্রদান করলেন। আয়া সোফিয়া হয়ে গেল ‘আয়া সোফিয়া-ই কাবির জামে শরিফ’ অর্থাৎ আয়াসোফিয়া গ্রান্ড মসজিদ। আয়া সোফিয়ার সন্নিহিত অঞ্চলের সকল ঘরবাড়ি ও বাজারএলাকা তিনি এই মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দিলেন। প্রায় আড়াই হাজার দোকান ও ১৩০০ ঘরবাড়ির ভাড়া বা খাজনার অর্থ মসজিদের তহবিলে জমা হতে লাগল। পরে গ্রান্ড বাজারের আয়ও এই মসজিদের তহবিলে যুক্ত করা হয়েছিল।

সুলতান মুহাম্মাদ আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরকর্মের অংশ হিসেবে এর দক্ষিণপূর্ব কোণে একটি মিনারও নির্মাণ করেছিলেন। পরে তাঁর উত্তরসূরি দ্বিতীয় বায়জিদ উত্তরপূর্ব কোণে আরেকটি মিনার নির্মাণ করেন। পরে এ দুটো ভেঙে তদস্থলে ষোড়শ শতকে বড় দুটি মিনার নির্মিত হয়। আয়া সোফিয়ার গায়ে যে বাইবেলের বিভিন্ন ঘটনা চিত্রের মাধ্যমে প্রদর্শিত ছিল, যিশু ও তাঁর মাতার যেসকল চিত্র ছিল এবং বায়জান্টাইন সম্রাটদের যেসকল চিত্র ছিল সেসকল চিত্র আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের পরেও অবিকল রেখে দেওয়া হলো। পরে সুলতান সোলায়মান তাঁর রাজত্বকালে (১৫২০-১৫৬৬) সকল চিত্র চুন লেপনের মাধ্যমে ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ইতোমধ্যে আয়া সোফিয়া গ্রান্ড মসজিদের কাঠামোতে বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার আলামত গোচর হতে শুরু করে এবং সুলতান দ্বিতীয় সেলিম কিংবদন্তি স্থপতি মিমার সিনানকে দায়িত্ব দেন এর কাঠামোগত শক্তি বৃদ্ধির জন্য। তিনি এর কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করলেন এবং সাথে সাথে পূর্বের দুটির সাথে অন্য দুই কোণে আরো দুটি মিনার নির্মাণ করলেন। সুলতান সেলিমের সমাধির জন্য একটি সমাধিসৌধ তিনি আয়া সোফিয়ার পাশে নির্মাণ করলেন। এভাবেই পূর্ণ হলো আয়া সোফিয়ার মসজিদে রূপান্তর এবং সেই থেকে আজ অবধি আয়া সোফিয়া কাঠামোগতভাবে একই রূপে আছে। একই চেহারায় এবং একই রূপের ওপরে ১৮৪৭ সালে সুলতান আবদুল মজিদ আয়া সোফিয়ার কাঠামোগত শক্তিবৃদ্ধির এক পুনরুদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এজন্য সুইস—ইতালিয়ান স্থপতি দুই ভাই গাসপারে ফোসাতি (Gaspare Fossati) এবং গিউসেপে ফোসাতিকে (Giusepe Fossati) দায়িত্ব নিলেন। আটশো শ্রমিক ২ বছর কাজ করে এই শক্তিশালীকরণ সম্পন্ন করল। তাঁর সময়ই আল্লাহ, মুহাম্মদ ও খোলাফায়ে রাশেদিনের নাম মসজিদের গাত্রে অভিনব নকশায় সংযুক্ত করা হলো। এই একই সাথে মিনারগুলোকে সংস্কার করে সমান উচ্চতা প্রদান করা হলো এবং একটি নতুন মাদ্রাসা পাশে স্থাপিত হলো।

ইতিহাসের কী লীলাখেলা! যেটি ছিল ৪২৭টি গ্রিক মূর্তির মন্দির সেটি ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে হয়ে গেল যিশুর গির্জা। ১৪৫৩ সালে সেটিই হয়ে গেল তুরস্কের সর্বোচ্চ শাহী মসজিদ। সবই ছিল বাদশাহের ক্ষমতার তীব্র প্রকাশ। তেমন ক্ষমতার প্রকাশেই ১৯৩৫ সালে এক আদেশে সেটি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক বানিয়ে দিলেন জাদুঘর। সুলতান সোলায়মানের চুনা ঘষে তিনি উন্মুক্ত করে দিলেন গির্জার গায়ের সকল চিত্র। আমেরিকার অধ্যাপক হইটমোরের তত্ত্বাবধানে চুনা ঘষে ফেলে দিয়ে সকল চিত্রগুলো জীবন্ত উদ্ধার শেষ হলে হইটমোর অবশ্য বলেছিলেন যে, চুনার প্রলেপ ছিল বলেই ছবিগুলো দারুণভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। এরপর তুর্কি মুসলমানদের বেশিরভাগের দাবিতে ২০২০ সালের ১০ জুন তারিখে তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে আবার জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তর করেন। ১৬৯২ বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ-করা এমন স্থাপনায় পা রেখে শিহরিত না হয়ে উপায় থাকে না।

লুসির সে শিহরন আমার চেয়েও এক ধাপ বেশি ছিল। কারণ, সেজীবনের প্রথম জুমার নামাজ আদায় করতে যাচ্ছে ১৬৯২ বছরের ইতিহাস ধারণকারী পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গির্জায় তথা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মসজিদে। এমন আনন্দ-শিহরনে যখন আমরা উদ্বেল তখন একই সাথে আমাদের তাড়া ওজু করে মসজিদে জায়গা পেতে হবে। তাই তাড়াহুড়ায় শুধু লুসিকে একটি জায়গা দেখিয়ে বললাম নামাজ শেষে ঐ জায়গায় এসে দাঁড়াতে যাতে এক অপরকে হারিয়ে না ফেলি। এরপর লুসি যেতে থাকল যেদিকে মহিলাদের নামাজের জায়গা সেদিকে। আমি খুঁজতে গেলাম ওজুখানা।

বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি যা জানি তার কোনোটা দিয়েই কাউকে কিছু বোঝাতে পারি না। জয়নালও কাছে নেই। শুধু ‘উজু’ ‘উজু’ বলে যাকে প্রথম বোঝাতে পারলাম যে আমি ওজুখানা খুঁজছি তিনি ছিলেন আজারবাইজানের একজন মাওলানা। টুপি-পাগড়িতে একেবারে আমাদের দেশের হাটহাজারি থেকে দাওরা ফারেগ এক মাওলানার জায়াগায় বসিয়ে নেওয়া যায়। তিনি দেখলাম ভালো ইংরেজিও জানেন। বললেন ‘ফলো মি’। তাঁর পিছনে হেঁটে হেঁটে ওজুখানা খুঁজে পেলাম। কিন্তু ঢোকার জন্য গেট খুলতে হলে নির্দিষ্ট ছিদ্রে এক লিরার একটি কয়েন ঢোকাতে হবে। আমার পকেটে খোঁজাখুঁজি দেখে মাওলানা সাহেব বুঝলেন আমি বিপদে আছি, কয়েন পকেটে নেই। মাওলানা সাহেব পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন—‘ডোন্ট ওয়ারি মাই ব্রাদার’, আই অ্যাম গিভিং ইউ ওয়ান’। চিরকালীন ঋণ হিসেবে মাওলানা সাহেবের সেই কয়েন কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করলাম এবং কয়েন ব্যবহার করে জাদুর দরজা খুলে ঢুকলাম ওজুখানায়। ওজুর জন্য গায়ের কয়েক স্তরের শীতের পোশাকাদি খুলছি আর ভাবছি—‘হায় আল্লাহ, তুমিই দেখো, যে-মসজিদের জন্য সুলতান মুহাম্মাদ ২৩৬০টি দোকান এবং ১৩০০টি বাড়ি ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন, সেই মসজিদের আজ এই হাল যে, তার ওজুখানায় ওজু করার জন্য প্রত্যেক মুসল্লির কাছ থেকে এক টাকা করে চাদা আদায় করা হচ্ছে। সেই টাকায় ওজুখানা চালাতে হচ্ছে। হাগিয়া সোফিয়ার এই দুরবস্থা আরো প্রকট মনে হলো যখন দেখলাম হাগিয়া সোফিয়ার ওজুখানায় একসাথে ৫০ জন মানুষও ওজুতে বসতে বা এস্তেঞ্জায় যেতে পারে না, এত ছোট এক ওজুখানার মালিক আজকের হাগিয়া সোফিয়া। অথচ আড়াই থেকে তিন লাখ মুসল্লি এখানে প্রতি জুমার দিনে নামাজ পড়তে দাঁড়ায়। তিন লাখ মানুষ যে মসজিদে নামাজে দাঁড়ায় সেখানে ৫০ জন মানুষ যদি একসাথে ওজুতে বসতে না পারে তা হলে যে দুরবস্থা তৈরি হওয়ার কথা এতটা দুরবস্থা অবশ্য দেখলাম না। হয়তো মুসল্লিরা বাইর থেকে ওজু করেই আসে।

যাই হোক ওজু করে বের হলাম। এবার মসজিদের সম্মুখভাগ থেকে ঢোকার পালা। সম্মুখভাগে কয়েকটি স্তম্ভ দেখলাম যার উচ্চতা ও প্রসশস্ততা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এগুলো অবশ্য মসজিদের মূল চত্বরের অংশ নয়। মসজিদের সাথে সংযুক্ত স্তম্ভগুলোর পাথরের গাত্র বেশ ক্ষয়ে গেছে। সামনের দেয়ালের পাথরও এখন অনেক ক্ষয়ে অভ্যন্তরে গর্তের মতো হয়ে গেছে। পায়ের নিচের বিশাল পাথরগুলোও একই রকম ক্ষয়ে ক্ষয়ে ঢেউয়ের মতো হয়ে আছে। সেগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় এর বয়স আজ দেড় হাজার বছর। এবার পুলিশি প্রহরায় ঢুকলাম ভিতরে। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে জুতা হাতে নিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখলাম বিশাল গম্বুজের নিচে দামি গালিচা বিছানো সুবিস্তৃত মেঝে। পাশে জুতার র‌্যাকে হাজার হাজার প্রকোষ্ঠ। প্রতিটির নম্বর আছে যাতে নম্বর মনে রেখে সঠিক প্রকোষ্ঠ থেকে নিজের জুতা জোড়া নিয়ে যাওয়া যায়। চার্চের ব্যাসিলিকা হিসেবে স্তম্ভের সারি দ্বারা যে আইল রচিত ছিল মসজিদ হওয়ার পরেও তেমনই রয়েছে। তুরস্কের মসজিদের স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী মিহরাবে মিম্বর নির্মিত হয়নি। মিম্বর মিহরাব থেকে ডান দিকে এবং তা তুর্কি রীতি অনুযায়ী অনেকগুলো ধাপসংবলিত দুই তলা পরিমাণ উঁচু এক সিঁড়ি রূপে স্থাপিত। মুয়াজ্জিনের জন্য জায়গাটি ইমামের পেছনে অন্তত দশ কাতার পরিমাণ জায়গার পরে। একটি আয়তাকার ছোট গৃহের মতো অংশের ছাদের ওপরে মুয়াজ্জিন এবং তাঁর সাথে আরো কিছু বিশেষ মুসল্লি সেখানে দাঁড়ায়।

আমি যখন ভিতরে ঢুকেছি তখনো বসার মতো জায়গা ভিতরে রয়েছে। ফলে বড় গম্বুজের একেবারে মাঝ বরাবর মেঝেতে সুবিধামতোভাবে বসে গেলাম। তখন লাউড স্পিকারে কোরআন তিলাওয়াত শুরু হয়েছে। কোরআন তিলাওয়াত চলতে থাকল। এর মধ্যেই আজান হলো। আজানের সাথে সাথে মুসল্লিরা দাঁড়িয়ে পড়ায় আমি ভাবলাম ঐ কোরআন তিলাওয়াতই হয়তো ইমামের খুতবা ছিল। এবার এটি আজান নয় বরং একামত হয়েছে সুতরাং ফরজ নামাজ শুরু হবে। আমি ফরজ নামাজের নিয়ত করে দাঁড়িয়ে গেলাম। কিছুক্ষণেই খেয়াল করলাম রুকু সেজদা যে যার মতো করছে। বুঝলাম এটি ফরজ নামাজ না, ফলে নামাজ ছেড়ে দিয়ে আবার চার রাকাত সুন্নতের নিয়ত করলাম। নামাজ শেষ হতে ৫-১০ মিনিটের মধ্যে দ্বিতীয় আজান হলো। এবার ইমাম সাহেব খুতবা শুরু করলেন। খুতবা মানে বক্তৃতা, আমাদের দেশের মতো দেখে পাঠ নয়। ইমাম সাহেব খুতবা দিলেন তুর্কি ও আরবি ভাষায়। খুতবা শেষ হলো। নামাজ শেষ হলো। নামাজ শেষে খুব সংক্ষিপ্ত মোনাজাত হলো। তবে মুসল্লিরা মোনাজাতের আগেই বেশিরভাগ উঠে গেল। কিছু রইল ঘুরে ঘুরে মসজিদ দেখার জন্য। আর ফরজ নামাজ শেষ হতেই মিম্বরের দিকের ৭-৮ কাতার পরিমাণ জায়গা নামাজের জন্য রেখে বাকিটা টুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। ফলে আমি বাঙাল না বুঝেই সুন্নত নামাজে দাঁড়িয়েছি আর আমার সামনে পিছনে প্যান্ট শার্ট কিংবা স্কার্ট পরা হরেক জাতির নারীরা হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিয়েছে। সেলফি তুলছে, ব্যাক ক্যামেরার ছবি তুলছে, ভিডিয়ো করছে। এই তেলেসমাতির মধ্যেই সুন্নত চার রাকাত নামাজ শেষ করে আমিও মুসল্লি থেকে টুরিস্ট হয়ে গেলাম।

টুরিস্ট হিসেবে মসজিদ দেখতে গিয়ে গম্বুজের উপরের দিকটায় তাকিয়ে একটু ধাক্কা খেলাম। বড় গম্বুজের উপরে চারদিকে চারটি মনুষ্যরূপ চিত্র এবং ছোট গম্বুজেও অমন সংখ্যক চিত্র দেখতে পেলাম। বড় গম্বুজের চিত্রগুলো অনেকটা নারীমূর্তি রূপে জিব্রাইল, মিকাইল, ইস্রাফিল ও আজরাইলের পাখাওয়ালা চিত্র। একেবারে মিম্বর বরাবর উপরে গম্বুজে মা মেরি ও শিশু যিশুর ছবি। এরপরে চতুর্দিকে আরো এমন ছবি দেখতে পেলাম যার মধ্যে বাইবেলের অনেক ঘটনার চিত্রায়ন রয়েছে। মসজিদে এমন মানুষের ছবি দেখে ধাক্কা তো একটু লাগারই কথা। দুয়েকটি ছবিতে মাথার দিকটা ঢেকে রাখা আছে। তবে বেশিরভাগই সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। মনে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের আদিনা মসজিদের কথা। সেখানেও মসজিদ গাত্রের পাথরে অনেক দেবদেবীর মূর্তি খোদাইকৃত দেখেছিলাম বছর দশেক আগে। আদিনা মসজিদে অবশ্য নামাজ হয় না বলে বিষয়টি মাথার মধ্যে খুব নড়েচড়ে নাই। কিন্তু এবারের এ দৃশ্য মাথায় অনেক নড়াচড়ার পরে জানলাম এগুলো উন্মুক্ত রাখার পেছনে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান কর্তৃক আন্তর্জাতিক মহলকে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতির অবদান রয়েছে। অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের একসময়ের দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ এই চার্চকে মসজিদ থেকে জাদুঘরে রূপান্তর করায় বিশেষ করে খ্রিষ্টান দুনিয়া খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালে এরদোয়ান এটিকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিলে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক মহলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, এটি মসজিদে রূপান্তর করা হলেও এর গাত্রে সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সময়ে মোজাইকে অঙ্কিত চিত্রগুলোকে আর ঢেকে দেওয়া হবে না এবং দুনিয়ার সকল টুরিস্টের জন্য এই মসজিদ খোলা থাকবে। বুঝলাম এই প্রতিশ্রুতির কারণেই আমাদের চতুর্দিকে মানুষের ছবি নিয়ে নামাজ পড়তে হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে গোড়ার গলদটা মুহাম্মআদ আল ফাতিহ্র হাতেই হয়েছে। অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ মর্যাদার দুনিয়াবিখ্যাত এই চার্চকে মসজিদ বানিয়ে তাঁর মুসলমানি ক্ষমতা দেখানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। ইস্তাম্বুলে মসজিদ বানানোর জায়গার অভাব ছিল না। এই কাজ করে তাঁর সময়ে তিনি মুসলমানদের অনেক প্রশংসা কুড়ালেও সামগ্রিকভাবে মুসলিম জাতিকে আগ্রাসী হিসেবে অভিহিত করার একটি ঐতিহাসিক উপকরণ অন্য ধর্মাবলম্বীদের হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন। তাঁর এই কাজটি যে ইসলামি সুন্নাহবিরোধী ছিল তা হজরত উমরের এসংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত থেকেই জানা যায়।চলবে

পর্ব—তিন

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর: প্রধানমন্ত্রী
দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর: প্রধানমন্ত্রী
জন্মাষ্টমী আজ
জন্মাষ্টমী আজ
কাবুলে নামাজের সময় মসজিদে হামলা, ইমামসহ একাধিক নিহত
কাবুলে নামাজের সময় মসজিদে হামলা, ইমামসহ একাধিক নিহত
মামলাজট কমাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির
মামলাজট কমাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির
এ বিভাগের সর্বশেষ
সেলিম আল দীনের নাটক
সেলিম আল দীনের নাটক
প্রান্তরে জীবনের বীজ
শামসুর রাহমানপ্রান্তরে জীবনের বীজ
দুলে ওঠে ঘর না কারবালা
দুলে ওঠে ঘর না কারবালা
কফিনের পোস্টার
কফিনের পোস্টার
লেফট রাইট লেফট
লেফট রাইট লেফট