X
শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪
৬ বৈশাখ ১৪৩১
পাঠ ও বিবেচনা

পশ্চিমবঙ্গের একের দশকের কবিতা

অংশুমান কর
০৩ এপ্রিল ২০২৪, ১৫:০১আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ১৫:০১

একের দশক সবে অতিক্রান্ত হয়েছে। এক্ষুনি এই দশকে বাংলা কবিতা লেখা শুরু করেছেন যে সমস্ত কবিরা তাঁদের মূল্যায়ন করা হয়তো সমুচিত নয়৷ এর কারণ এঁদের অনেকের লেখাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যাবে, অনেকে হয়তো বা আর কবিতাই লিখবেন না কোনোদিন। প্রতিটি দশকেই এমন ঘটনা ঘটেই থাকে। কিন্তু তবুও অনুরুদ্ধ হয়ে যে এই দশকের কবিতা নিয়ে দুকথা লিখতে উদ্যোগী হলাম তার একটি কারণ এই যে, এই দশকের একাধিক কবি ইতোমধ্যেই পাঠক হিসেবে আমার সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছেন।

যে লক্ষণটির কারণে একের দশক ইতোমধ্যেই চিহ্নিত হয়ে গেছে তা হলো বড় পত্রিকা, বড় হাউস এবং বড় বাণিজ্যকে অস্বীকার করার স্পর্ধা। বিগত দুটি দশকের সঙ্গে তুলনা করলেই এই তফাতটুকু বোঝা যাবে। নয়ের দশকের কবিরা প্রায় সকলেই প্রথম থেকেই ছিলেন বড় বাণিজ্যিক পত্রিকা ও প্রকাশনার আনুকূল্যপ্রাপ্ত। শূন্য দশক সূচনায় সেভাবে বড় পত্রিকা এবং বড় প্রকাশনার ওপর নির্ভরশীল না হলেও, ধীরে ধীরে শূন্য দশকের প্রধান কবি হিসেবে ইতোমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছেন যাঁরা তাঁরাও প্রায় প্রত্যেকেই বড় বাণিজ্যিক কাগজ বা প্রকাশনার আনুকূল্য পেয়েছেন। এদিক থেকে প্রথম দশক এখনও পর্যন্ত ব্যতিক্রমী তো বটেই। এই দশকের একাধিক কবি ইতোমধ্যেই একাধিক পুরস্কারে পুরস্কৃত কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, এই পুরস্কৃত গ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়েছে প্রধানত ছোট ছোট প্রকাশনা সংস্থা থেকে। এখানে একটি কথা বলার আছে। প্রথম দশকের যে স্পর্ধাটিকে আমি চিহ্নিত করতে চাইছি সেই স্পর্ধা এই দশক দেখাতে পেরেছে মূলত দুটি কারণে। প্রথম কারণ ফেসবুক। দ্বিতীয় কারণ এই সময়কালে বাংলা প্রকাশনার জগতে একাধিক ছোট প্রকাশনার আবির্ভাব। এ কথা ঠিক যে, ফেসবুক যাত্রা শুরু করেছিল শূন্য দশকে। আমাদের দেশে কিন্তু ফেসবুকের রমরমা শুরু হয় প্রথম দশকেই। প্রথম কিছু বছর আসলে বাঙালি কবিরাও এই মাধ্যমটির প্রবল শক্তি সম্বন্ধে ততখানি সচেতন ছিলেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল যে, ফেসবুক আসলে বড় ম্যাগাজিনের মনোপলিকে আক্রমণ করতেই এসেছে। পুঁজি এবং বাণিজ্যের এ এক অদ্ভুত চরিত্র। পুঁজির নিয়ন্ত্রণহীন এবং মুনাফাবর্জিত কোনো মাধ্যম নিশ্চয়ই ফেসবুক নয়; কিন্তু, পুঁজির চরিত্র বদলের ফলেই এই মাধ্যমটি একেবারে ক্ষমতাহীন মানুষের হাতেও কিছু ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। এর অপব্যবহার যেমন হয়েছে, তেমন সদ্ব্যবহারও হয়েছে। প্রথম দশকের কবিরা এই মাধ্যমটির শক্তির দ্বারা ক্ষমতায়িত হয়েই বড় কাগজের আধিপত্যর কাছে শির নোয়াননি। একের দশকেই বইপাড়াতেও একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়। আবির্ভাব ঘটে একাধিক ছোট প্রকাশনা সংস্থার। আবির্ভাব ঘটে ‘প্রিন্ট অন ডিমান্ড’ টেকনোলজির। পিওডি না থাকলে এই ছোট প্রকাশনা সংস্থাগুলো হয়তো বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারত না। আজ সম্ভব একটি বই মাত্র ২৫ কপি কিংবা ৫০ কপি ছাপা। অপেক্ষাকৃত তরুণ, অপরিচিত কবিদের বই করতে ছোট প্রকাশনা সংস্থাগুলো উৎসাহী যে হয়েছে তার একটি বড় কারণ এই প্রযুক্তি। একটি বই আজ প্রথমেই ৩০০ কপি না ছাপলেও চলে। ৫০ কপি ছেপে দেখে নেওয়া যেতে পারে যে, বইটি বাজারে কাটছে কি না। সন্দেহ নেই যে, কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় ছোট প্রকাশনা সংস্থাগুলোর আবির্ভাব একের দশকের কবিদের স্বাধীন ও উন্নত-শির অস্তিত্বর পবিত্রতা রক্ষা করতে অনেকখানি সহায়তা করেছে। এই সময়কালে দেখা গেছে যে, এমনকি বড় কাগজে কবিতা প্রকাশ পাচ্ছে একের দশকের যে তরুণ কবির তিনিও কিন্তু তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করছেন একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থা থেকেই। প্রথম দশকের অনেক তরুণ কবিরাই নিজেরাই হয়ে গিয়েছেন প্রকাশনা সংস্থার মালিকও। বইপাড়াও আর কেবল কলেজ স্ট্রিটে আটকে নেই। ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলার মফস্বল শহরগুলোতে। বইয়ের অনলাইন বিপননও জেলা শহরের এই প্রকাশনা সংস্থাগুলোর স্বাধীন কাজকর্মকে অনেকখানি সহায়তা করেছে। মফস্বলের প্রকাশনা সংস্থাগুলোকে আঁকড়ে ধরেও মাথা উঁচু করে কবিতা লিখে চলেছেন একের দশকের একাধিক কবি। বাংলা কবিতার জন্য এটি অবশ্যই একটি উল্লেখজনক ঘটনা, এমন একটি বাঁকবদল যা আগামী অনেক বছর ধরে বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

প্রযুক্তির উন্নতির ফলে একের দশকের কবিরা অনেকখানি লাভবান হয়েছেন এ কথা সত্য, কিন্তু প্রযুক্তি তাঁদের কবিতায় তেমনভাবে ছাপ ফেলেনি। এ প্রসঙ্গে আবারও একটু নয়ের দশকের কবিদের সঙ্গে এই দশকের কবিদের তুলনা করতে ইচ্ছে করছে। বিশ্বায়ন এবং উদার অর্থনীতির ফলে নয়ের দশকের কবিদের সামনে হঠাৎ করেই খুলে গিয়েছিল বহুদিন বন্ধ থাকা একটি দুয়ার। হঠাৎ করেই জীবন হয়ে উঠেছিল অনেকখানি প্রযুক্তিনির্ভর। এ কারণেই নয়ের দশকের কবিরা এমন একাধিক কবিতা লিখেছিলেন যেখানে বিভিন্ন গ্যাজেটস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ব্যক্তিজীবন বহুলাংশে প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে¾এই সত্য হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতোই উন্মুক্ত হয়েছিল নয়ের দশকের কবিদের সামনে। একের দশকের কবিরা প্রযুক্তির সুফলকে সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করার পরেও তাঁদের কবিতায় যে প্রযুক্তিকে খুব বেশি ঠাঁই দিলেন না তার একটি কারণ হলো এই যে, প্রযুক্তির ক্রম-উন্নতির জন্য তাঁরা প্রস্তুতই ছিলেন। অরকুট থেকে ফেসবুক হয়ে হোয়াটসঅ্যাপে তাঁদের ক্রম-উন্নয়ন ঘটেছে, ধীরে ধীরে তাঁরা প্রবেশ করেছেন এই নতুন বাস্তবতায়। হঠাৎ একদিন একটি নতুন দিগন্ত তাঁদের সামনে উন্মুক্ত হয়নি। মনে রাখতে হবে যে, প্রথম দশকের প্রায় সমস্ত কবিরই জন্ম হয়েছে বিশ্বায়িত পৃথিবীতে, উদার-অর্থনীতির ভারতে, যে ভারত প্রযুক্তি উপাসনায় কার্পণ্য করেনি। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন হওয়া সত্ত্বেও, একের দশকের কবিরা প্রযুক্তিকে স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করার ফলেই তাঁদের কবিতায় প্রযুক্তি তেমনভাবে ছায়া ফেলেনি।

প্রযুক্তির একটি অন্য প্রভাব অবশ্য একের দশকের কবিদের কবিতার ওপর পড়েছে। এই কবিদের অধিকাংশই যেহেতু নিয়মিত ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করে থাকেন এবং যে পাঠকরা ফেসবুকের মাধ্যমে কবিতা পড়েন তাঁরা যেহেতু কবিতা পড়েন মূলত স্মার্টফোনের মাধ্যমেই তাই দেখা গেছে যে, প্রথম দশকের কবিরা সেইভাবে দীর্ঘ কবিতা লেখেননি। সত্যি বলতে কী, তিরিশ লাইনের বেশি দীর্ঘ কবিতা লিখতেও তাঁদেরকে খুব বেশি দেখা যায়নি। সম্ভবত স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দৈর্ঘ্য কবিতার দৈর্ঘ্যকে এই দশকে অনেকখানিই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। আগামীতেও করবে বলেই মনে হয়। দীর্ঘ কবিতা কেউ কেউ লিখবেন কখনো কখনো।

ভারতচন্দ্র যখন লিখেছিলেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ সেই তখন থেকেই বাংলা কবিতার অন্যতম একটি অক্ষ পরিবার এবং পারিবারিক সম্পর্ক। পরিবার বিষয় হয়ে উঠেছে একের দশকের কবিদের কবিতারও। তবে এক্ষেত্রে সামাজিক বাস্তবতা ও সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস এঁদের কবিতায় ছায়া ফেলেছে। মূলত ছোট পরিবার বিষয় হয়ে উঠেছে এঁদের কবিতায়। বাবা কিংবা মাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন একের দশকের একাধিক কবি। পরিবার এবং পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে আগে যে কবিতা লেখা হতো সেগুলো কেমন ছিল? অতি সরলীকরণ না করেও বলা যায় যে, নতুন শতাব্দীতে প্রবেশ করার আগে পর্যন্ত বাংলা কবিতায় যখন বিষয় হয়েছে পারিবারিক সম্পর্ক, তখন তা হামেশাই যৌথ পরিবারের চিত্র অংকন করেছে। কেবল একটি যৌথ পরিবারের একাধিক চরিত্রই যে এইরকম কিছু কবিতায় উপস্থিত থেকেছে তা নয়, অনেক সময়ই পাড়া-প্রতিবেশীরাও হয়ে উঠেছে এই কবিতাগুলোর চরিত্র¾এক বর্ধিত পরিবারের অঙ্গ। একের দশকের পরিবারকেন্দ্রিক  কবিতাগুলো কিন্তু মূলত বাবা বা মাকে নিয়েই রচিত। আসলে এই সময়কালের মধ্যে যৌথ পরিবার বাঙালি সমাজ থেকে প্রায় অন্তর্হিত হয়ে গেছে। নয়ের দশক থেকেই এই প্রবণতা শুরু হয়। একের দশকের কবিদের অনেকেরই জন্ম হয়েছে ছোট পরিবারে। তাঁরা যৌথ পরিবারের কথা লিখবেন কেমন করে?

পাঠক হিসেবে যে বিষয়টির কারণে একের দশকের কবিতা আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছেন তা হলো এই যে, এই দশকের প্রায় কোনো কবিই সস্তা হাততালির পেছনে এখনও অবধি ছোটেননি। এঁরা সেই ধরনের কবিতাই লিখে চলেছেন যে কবিতা গাঢ়, যুগপৎ মস্তিষ্ক ও হৃদয় দিয়ে পাঠ করতে হয়, যে কবিতা পুনঃপাঠ দাবি করে। এঁরা সামগ্রিকভাবেই শেকড়-সন্ধানী। যে দক্ষতা নিয়ে এই কবিদের অনেকেই লেখা শুরু করেছেন তাও অবিশ্বাস্য। একের দশকের একাধিক কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থগুলো ইতোমধ্যেই বিপুল সমাদৃত। এঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছন্দে নিখুঁত, ভারতীয় পুরাণ এবং স্থানীয় ইতিহাসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ, ভারহীনভাবে এই জ্ঞানকে কবিতায় ব্যবহারে দক্ষ। শাশ্বতী সান্যাল, কস্তুরী সেন, তন্ময় ভট্টাচার্য, অভিরূপ মুখোপাধ্যায়, প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী, নীলাঞ্জন দরিপা, শুভম চক্রবর্তী, তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায় তেমনই কয়েকজন। এই তালিকা অনায়াসেই দীর্ঘ করা সম্ভব।

কবিতায় শব্দ ব্যবহারের দিক থেকেও প্রথম দশকের কবিরা খুবই উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করেছেন। নয়ের দশক থেকেই বাংলা কবিতায় আকছার হিন্দি ও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার হতে শুরু করে। এই প্রবণতাটিকে একের দশকের কোনো কোনো কবি সম্প্রসারিত করেছেন। এঁরা এমন একাধিক কবিতা লিখেছেন যেগুলোর শিরোনাম ইংরেজি ভাষার শব্দ বা যে কবিতার একটি সম্পূর্ণ লাইনই ইংরেজি ভাষায় লেখা। শব্দ ব্যবহারের প্রসঙ্গে একজন কবির নাম বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়। তিনি মহিউদ্দিন সাইফ। মহিউদ্দিন এমন কিছু আরবি বা ফারসি শব্দ তাঁর কবিতায় হামেশাই ব্যবহার করেন যেগুলো ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন প্রথা বা বিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজী নজরুল ইসলামের পরে এই কাজটি ধারাবাহিকভাবে বাংলা কবিতায় আর কোনো কবি করেছেন বলে তো মনে হয় না। নজরুল যা করেছিলেন তার সঙ্গে মহিউদ্দিন যা করছেন তার তফাতও আছে। নজরুল মূলত সেই শব্দগুলোকেই বেশি ব্যবহার করতেন যে শব্দগুলোর সঙ্গে সাধারণ বাঙালি পাঠক কমবেশি পরিচিত ছিল। তেমন শব্দ নজরুলে অপ্রতুল যার অর্থসন্ধানে পাঠককে শব্দকোষের আশ্রয় নিতে হবে। মহিউদ্দিন সাইফ কিন্তু সচেতনভাবেই এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। শব্দকোষ ঘেঁটে ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ না বুঝে তাঁর কবিতাগুলোর রস গ্রহণ করা যাবে না। এটি বাংলা কবিতার পরিধিকে বিস্তার দিচ্ছে সন্দেহ নেই, কিন্তু কারও কারও কাছে এই প্রবণতা কবিতার রসগ্রহণের জন্য অন্তরায় হয়ে উঠতেও পারে। একটি কবিতা পাঠ করতে গিয়ে একজন পাঠক একাধিকবার শব্দকোষের আশ্রয় নাও চাইতে পারেন। আরও বড় কথা হলো এই যে, ভাষার একটি স্বাভাবিক গতি আছে, প্রবাহ আছে; অতি-অপরিচিত শব্দের ব্যবহার সেই প্রবাহের মুখে বাঁধ সৃষ্টি করতে পারে।

ধর্মের প্রসঙ্গ যখন এলোই তখন আরও একটি প্রবণতার কথাও চিহ্নিত করা জরুরি। এই দশকেই একাধিক মহিলা কবিতা লিখতে শুরু করেছেন ধর্মপরিচয়ে যাঁরা মুসলিম। তিনজন কবির কথা এ প্রসঙ্গে বলতেই হয় : ওয়াহিদা খন্দকার, মোনালিসা রেহমান ও ফারহানা সুলতানা। একসঙ্গে তিনজন অতি সম্ভাবনাময় মুসলিম মহিলা কবি কবিতা লিখতে শুরু করছেন¾ঠিক এমনটি এর আগে আর কখনো দেখা যায়নি। এ বঙ্গের মুসলিম সমাজের মহিলাদের মধ্যেও শিক্ষার বিস্তারের এ এক প্রমাণ বটে বইকি। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম মহিলারা যত বেশি করে কবিতা রচনার কাজে আগ্রহী হবেন ততই তা হবে যুগপৎ মুসলিম সমাজ ও বাংলা কবিতার পক্ষে মঙ্গলদায়ক।

একের দশকের কবিদের আরও একটি প্রবণতাকে চিহ্নিত করা সম্ভব। রাজনৈতিক কবিতা রচনার দায়িত্ব এই দশকের কবিরা নিজেদের কাঁধে তুলে নেননি। একটি দুটি ব্যতিক্রম আছে বটে, তবে তা নিছক ব্যতিক্রমই। রাজনীতি যখন বিষয় হয়েছে এই দশকের কবিদের কবিতায়, তখন তা সাধারণত খুবই প্রচ্ছন্নভাবে কবিতার শরীরে প্রবেশ করেছে, কখনোই প্রকট হয়ে ওঠেনি। আশ্চর্যের এই যে, এই দশকের কবিরা কিন্তু হামেশাই সমাজমাধ্যমে সামাজিক এবং রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে থাকেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলোর প্রকট ছায়া কিন্তু এঁদের কবিতায় সেভাবে পড়েনি। সামগ্রিকভাবে আজ পশ্চিমবঙ্গের তরুণ সমাজ নানা ধরনের হতাশায় নিমজ্জিত। সরকারি চাকরির অপ্রতুলতা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি¾এই দশকে যাঁরা কবিতা লেখা শুরু করলেন, তাঁদের প্রত্যেককেই কমবেশি আক্রান্ত করেছে। এঁদের কবিতায় কিন্তু এই বিষয়গুলো তেমনভাবে ছায়া ফেলল না। এই প্রবণতাটি আবারও এটাই বোঝায় যে, কবিতার গূঢ় রহস্যময়তাতেই এই কবিদের প্রতীতি, এঁরা কখনোই চান না কবিতা হয়ে উঠুক প্রোপাগাণ্ডা, সংবাদ হয়ে উঠুক কাব্য।

বলা বাহুল্য, এই দশকে কবিতা লেখা শুরু করলেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই হয়তো আগামীতে লেখা একেবারে বন্ধ করে দেবেন, কেউ কেউ শীতঘুম থেকে জেগে উঠে মাঝেসাঝে কবিতা লিখবেন, কেউ কেউ অনেকদিন কবিতা লেখার থেকে দূরে থাকার পরে আবার লিখতে শুরু করবেন, আর কেউ কেউ ধারাবাহিকভাবে কবিতা রচনায় নিমগ্ন রাখবেন নিজেদের। তাঁদের লেখাও, পূর্বেই বলেছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটে পালটে যাবে। বিষয় এবং প্রকরণের দিক থেকে দেখা পাওয়া যাবে নতুন বাঁক ও ভঙ্গির। তবে, স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গের বাংলা কবিতার বিবর্তনের দিকে তাকিয়ে এ কথা বলাই যায় যে, একটি দশকের কবিতার সামগ্রিক মূলগত চরিত্র সেই দশকটি সমাপনের সময়ে যেমনটি ছিল, তার থেকে খুব বেশি চ্যুত হয়নি। সে দিক থেকে দেখতে গেলে এমন কথা বলাই যায় যে, যে লক্ষণগুলোকে এই ছোট্ট রচনাটি একের দশকের কবিতার বৈশিষ্ট্য  হিসেবে চিহ্নিত করল, সেই লক্ষণগুলোর অধিকাংশই এই দশকে যাঁরা কবিতা লেখা শুরু করলেন তাঁদের কবিতায় আগামীতেও পরিস্ফুট হবে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাজশাহীতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো বিভাগীয় সর্বজনীন পেনশন মেলা
রাজশাহীতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো বিভাগীয় সর্বজনীন পেনশন মেলা
রুবেলকে শোকজ দিলো উপজেলা আ’লীগ, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশ পলকের
নাটোরে উপজেলা নির্বাচনরুবেলকে শোকজ দিলো উপজেলা আ’লীগ, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশ পলকের
এমপি দোলনের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপ, সাংবাদিক আহত
এমপি দোলনের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপ, সাংবাদিক আহত
চরের জমি নিয়ে সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী নিহত, একজনের কব্জি বিচ্ছিন্ন
চরের জমি নিয়ে সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী নিহত, একজনের কব্জি বিচ্ছিন্ন
সর্বাধিক পঠিত
বাড়ছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি, নতুন যোগ হচ্ছে স্বাধীনতা দিবসের ভাতা
বাড়ছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি, নতুন যোগ হচ্ছে স্বাধীনতা দিবসের ভাতা
ইরান ও ইসরায়েলের বক্তব্য অযৌক্তিক: এরদোয়ান
ইস্পাহানে হামলাইরান ও ইসরায়েলের বক্তব্য অযৌক্তিক: এরদোয়ান
উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীকে অপহরণের ঘটনায় ক্ষমা চাইলেন প্রতিমন্ত্রী
উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীকে অপহরণের ঘটনায় ক্ষমা চাইলেন প্রতিমন্ত্রী
ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল!
ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল!
সংঘাত বাড়াতে চায় না ইরান, ইসরায়েলকে জানিয়েছে রাশিয়া
সংঘাত বাড়াতে চায় না ইরান, ইসরায়েলকে জানিয়েছে রাশিয়া