X
বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪
৪ বৈশাখ ১৪৩১
বিশ শতকের ইতালির গল্প

দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা।। লিওনার্দো সাশা

অনুবাদ : বিপাশা মন্ডল
০৩ এপ্রিল ২০২৪, ১৫:৫৫আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৮

এ রাত ছিল সমুদ্রযাত্রার জন্যই, এমন আঁধার রাত যে একটু নড়াচড়া করলেই সেই অন্ধকারের ভার টের পাওয়া যাচ্ছিল। সমুদ্রের গর্জন যেন পৃথিবীর কোনো ভয়ংকর পশুর শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রচণ্ড ভীতিকর : এমন এক ফোঁসফোঁসানি যেটা তাদের পায়ের কাছেই জেগে উঠছে এবং মিলিয়ে যাচ্ছে।

তারা তাদের কার্ডবোর্ডের স্যুটকেস এবং পোঁটলাপুঁটলিসহ সমুদ্রতীরে একটা চ্যাপটা পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল, জেলা এবং লিকাটার মাঝে পাহাড়ের আড়ালে নিরাপদ : কাকভোরে তারা গ্রাম থেকে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় এসে পৌঁছেছে; ভিতরের গ্রামগুলো সমুদ্রতীর থেকে অনেক দূরে, ঈশ্বরপ্রদত্তভাবেই অনুর্বর বিস্তৃত সামন্ততান্ত্রিক জমির মধ্যে এগুলো অবস্থিত। কিছু লোক তো এই প্রথমবারে মতো সমুদ্র দেখছে : সিসিলিতে নির্জন সৈকত থেকে পুরোটা পার হয়ে যাবার মতলব, রাত্রিবেলা, আমেরিকার আরেকটা নির্জন সমুদ্রসৈকতে উঠে পড়ার চিন্তা, রাত্রিতেও এটা ভীষণ ভয়ের বিষয় ছিল। কারণ চুক্তিটা ছিল এরকম : ‘আমি তোমাদের রাতে নিয়ে যাব,’ এক ধরনের মানবপাচারকারী দালাল লোকটা এমন করে বলেছিল, তার স্বভাব বকবক করা, যদিও তার চেহারা ছিল নিষ্পাপ আর গম্ভীর, ‘আর আমি তোমাদের নামিয়ে দেব রাত্রিবেলাতেই : তোমরা নুগিরোসির সমুদ্রসৈকতে নামবে। আমি তোমাদের ন্যুভাইয়র্কে থেকে হাঁটার দূরত্বে সৈকতে নামিয়ে দেব...যাদের যাদের আমেরিকায় আত্মীয়স্বজন আছে তারা তাদের আত্মীয়দের চিঠি লিখে ট্রেনটন স্টেশনে অপেক্ষা করতে বলতে পারো, আমরা জাহাজে রওনা দেবার বারো দিন পরে...তোমরা হিসাব রেখো...আমি অবশ্য তোমাদের সঠিক সময়ে ওখানে পৌঁছানোর গ্যারান্টি দিতে পারছি না : ধরো যদি সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল, আবার ধরো যে উপকূলরক্ষীবাহিনী বেশি বেশি টহল দিচ্ছে...এখানে একদিন বেশি খরচ হলো বা ওখানে যেতে একদিন বেশি সময় লাগল তাতে তো তোমাদের খুব একটা ইতরবিশেষ হবে না তাই না। আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমেরিকায় পৌঁছানো।’

আমেরিকায় পৌঁছানো সত্যি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় : শেষ পর্যন্ত আমেরিকায় পৌঁছানোই আসল কথা, কখন বা কীভাবে সেটা কোনো বিচার্য বিষয় নয়। যদি তাদের চিঠিগুলো আত্মীয়দের কাছে পৌঁছাতে পারে, খামের ওপর যেভাবে দ্রুতহাতে হিজিবিজি করে ঠিকানা লেখা হয়েছে, যদি তারা পাঠোদ্ধার করতে পারে, তবেই। প্রবাদটা ঠিকই ছিল, যার জিহ্বা আছে সে সাগর পাড়ি দেবে। এবং তারাও সাগর পাড়ি দেবে, ওই বিশাল অন্ধকার সমুদ্র; তারা আমেরিকার দোকানপাট আর কৃষিক্ষেত্রে পৌঁছাবে, তাদের স্বাগত জানাবে ভাই চাচা ভাতিজা চাচাতো মামাতো ভাইবোনের উষ্ণ আথিতেয়তা, গরম আরামদায়ক বড়সড় ঘরবাড়ি, আর তাদের বাড়ির মতো বিশাল গাড়ি।

বিদেশগামীরা এটা ভেবেই খুশি হয়ে উঠল, যখন ওইসব সুদখোর মহাজন জানবে যে তারা চিরকালের মতো চলে গেছে তখন তাদের মুখের চেহারাটা কী মারাত্মক হবে। আসো আর আমাকে আমেরিকা গিয়ে খুঁজে বের করো, শালা রক্তচোষার দল। যদি তোমরা আমাদের ভাগ্যক্রমে খুঁজে বের করেই ফেলো, তোমাদের আসল টাকাটাই ফেরত পাবে, কিন্তু একপয়সা সুদ পাবে না।’

তাদের আমেরিকার স্বপ্ন ডলারে ভাসছে। জীর্ণ মানিব্যাগের মধ্যে অথবা তাদের শার্টের নিচে থলিতে টাকাগুলো লুকানো থাকবে না বরং সে ডলার তাদের ট্রাউজারের পকেটে ঠাসা থাকবে এবং সে টাকাগুলো তারা যেনতেনভাবে মুঠোভরে টেনে বের করে খরচ করবে যেভাবে তাদের আত্মীয়দের খরচ করত দেখেছে¾তাদের সেসব আত্মীয়রা আধাদিন না খেয়ে থাকত, তাদের শরীর র‌্যাঁদা দিয়ে চেঁছে তোলার মতোই শীর্ণ ছিল, তার চামড়া ছিল কড়া রোদে পোড়া, এরপর বিশ-ত্রিশ বছর পরে তারা ফিরে এসেছিল, একেবারে সংক্ষিপ্ত ছুটিতে, ততদিনে তাদের গোলগাল স্বাস্থ্যবান চেহারা বদলে যাবার সঙ্গ চুলও পেকে সাদা হয়ে গেছে।

সকাল এগারোটা বেজে গেছে এর মধ্যেই বিদেশগামীদের একজন হারিকেন ধরাল : এই আলোর সংকেতের অর্থ হলো এর মধ্যেই দলের সকলে স্টিমারে চড়ে বিদেশ যাবার জন্য জড়ো হয়েছে। যখন লোকটা হারিকেন নিভিয়ে ফেলল, অন্ধকার যেন আরও ভারী আর ভীতিকর হয়ে তাদের ওপরে চেপে বসল। কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই সাগর থেকে উঠে আসা নিরলস ফোঁসফোঁসানি আরও বেশি মানবিক হয়ে উঠল, পানি থেকে বের হতে লাগল পরিচিত আওয়াজ, মনে হচ্ছিল যেন অগুনতি বাক্স ছন্দময়ভাবে ভরে উঠছে আর খালি হচ্ছে। এর পরেই চাপা কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া গেল। তারা বুঝে ওঠার অনেক আগেই নৌকা মাটি ছুঁয়েছে, সিগনর মেলফা এসে গেছে, যাত্রার আয়োজকদের কাছ থেকে তারা এই লোকের নাম শুনেছিল।

‘সবাই কি এখানে আছেন?’ লোকটা জিজ্ঞাসা করল। মেলফা একটা চর্ট জ্বালাল আর উপস্থিত লোকদের মাথা গুনল। দুজন লোক কম আছে। ‘ওই দুজন যাবে না বোধহয়। আবার এরা পরেও আসতে পারে...অথবা কোনো দুর্ঘটনায়ও পড়তে পারে। আমাদের পালিয়ে বেড়ানোর ঝামেলার মধ্যে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আর লাভ কী?’ প্রত্যেকে সায় দিল যে তাদের জন্য আর অপেক্ষা করে লাভ নেই।

‘তোমাদের মধ্যে যদি কারও টাকা জোগাড় না হয়ে থাকে, মেলফা হুমকি দিল, ‘তারা এখন আবার ফিরতি পথে বাড়ির দিকে রওনা দিতে পারো, কারণ যদি তোমরা কেউ ভেবে থাকো যে, আমরা যখন এখানে উঠেই পড়েছি, আর আশীর্বাদ পেয়ে গেছি, খুব ভুল করেছ। যদি এমনটা কেউ করো, আমি তোমাদের আবার দলসুদ্ধ আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিয়ে আসব। এরপর সবাই ভুগবে, সেটা নিশ্চয়ই ভালো হবে না, আর ওই লোকটা কিন্তু আমার কাছে ইচ্ছামতো পিটানি খাবে, ওর বন্ধুবান্ধবও ওকে পেটাবে, এমন পিটান পিটাব যে, ও যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন মনে রাখবে, যদি এত পিটানি খাবার পরও সে আদৌ বেঁচে থাকে তারপরই...’

প্রত্যেকে শপথ করে বলল যে তারা ঠিকমতোই টাকাপয়সা নিয়ে এসেছে, আর সব পাই-পয়সার হিসাব চুকিয়ে দিল।

‘চলো, জাহাজে উঠি তাহলে,’ বলল মেলফা, সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক অভিযাত্রী নিজেদের এমন কাচুমাঁচু করে ফেলল যেন তারা নিজেরাও পোঁটলাপুঁটলির একটা দ্বিধান্বিত মালপত্র।

‘হা, ইশ্বর! তোমরা বাড়ি থেকে থালাবাসন ধোয়ার গামলাটাও নিয়ে এসেছ?’

মেলফা মনের সুখ মিটিয়ে গালাগালি দিতে শুরু করল, যখন পুরো কার্গোর মানুষ, ব্যাগ আর বোঁচকাগুলো নৌকায় ঠেসেঠুসে ভরা হলো, শুধু তখনই তার গালাগালি করা থামল। এদিকে নৌকা ভরে গিয়ে টইটম্বুর। মেলফার কাছে একজন মানুষ আর একটা বস্তার মধ্যে পার্থক্য হলো, একটা বস্তার মধ্যে কোনো টাকাপয়সা নেই, আর একজন বিদেশগামীর কোটের মধ্যে দুইশ পঞ্চাশ লিরা সেলাই করা আছে, অথবা ওই টাকা ওরা ওদের চামড়া আর শার্টের কাপড়ের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। মেলফা এদের ভালোভাবেই চেনে; খুব ভালোভাবে : সেই একই নোংরা গাঁইয়া জাউরাগুলা।

যতটা দীর্ঘ ভ্রমণ হবে ভেবেছিল, ততটা দেরি হয়নি : যে রাতে তারা ইতালি উপকূল ছেড়েছে, সেই রাতসহ মোট এগারো রাত। রাতগুলোকেই তারা দিনগুলোর চেয়ে বেশি বেশি গুনেছে, কারণ রাতগুলো ছিল দমবন্ধ করা, জঘন্যরকম গাদাগাদি করে থাকা। তাদের মনে হচ্ছিল যেন তারা মাছ ডিজেল আর বমির গন্ধে ডুবে গেছে¾যেন কোনো গরম কালো পেট্রোলের ক্লেদে তারা সাঁতরাচ্ছে। আলো আর বাতাসের খোঁজে নৌকার খোলের ওপরে উঠে গেছে। তাদের কল্পনার সমুদ্র ছিল ঢেউখেলানো, আর বাতাসের ধাক্কায় ছন্দময় দুলুনির শ্যামল সবুজ, এদিকে আসল সমুদ্র তাদের ভয় দেখিয়ে পাগল করে তুলেছে : তাদের পেটের মধ্যে যেন কেউ খামচে ধরে গিঁট দিয়ে ফেলেছে, তারা যখন একদৃষ্টিতে সামনের দিগন্ত রেখার দিকে তাকিয়ে থাকতে চেষ্টা করেছে তাদের চোখ যেন বেদনায় অন্ধ হয়ে আসছিল।

কিন্তু এগারোতম রাতে মেলফা ডেকে দাঁড়িয়ে আদেশ দিল, প্রথমে তারা ভাবল তারা নিরবচ্ছিন্ন নক্ষত্রপুঞ্জ দেখতে পাচ্ছে, যেটা ঝাঁকে ঝাঁকে সমুদ্রে নেমে এসেছে, কিন্তু এই দৃশ্য শহরের দৃশ্যে বদলে গেল; ধনী আমেরিকার শহরগুলো রাতের বেলা ঠিক রত্নের মতো ঝলমল করছে। আর রাতটাও আজ মনোমুগ্ধকর : শান্ত ও নীরব, রাশি রাশি স্বচ্ছ মেঘের ভেলার ভিতরে একটা অর্ধেক চাঁদ ভেসে আছে, ফুসফুস ভরে দেওয়া খাঁটি বিশুদ্ধ বাতাস।

‘আমেরিকা,’ সিগনোর মেলফা বলল।

‘এটা যদি আমেরিকা না হয়ে অন্য কোথাও হয়?’

একজন জিজ্ঞাসা করে ফেলল, পুরো যাত্রাপথে লোকটা শুধু এটা ভেবে চলেছে যে, সমুদ্রের মধ্যে তো কোনো রাস্তা অথবা দিকনির্দেশনা নেই, এমন পরিস্থিতিতে কোনো ভুল না করে আকাশ আর পানির মাঝে সঠিক রাস্তা খুঁজে বের করা তো ঈশ্বরের মতোই দক্ষতার কাজ। মেলফা তার দিকে করুণার চোখে তাকাল, প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করল : ‘কখনো তোমাদের জীবনে এরকম কোনো দিকচক্রবাল দেখেছ? তোমরা তো এটাও অনুভব করতে পারছ যে বাতাসটাও এখানে কত আলাদা? দেখছ এখানে কীভাবে শহর ঝলমল করছে?’

প্রত্যেক অভিযাত্রী তার কথা মেনে নিল, তীব্র বিরক্তি এবং করুণার সঙ্গে ওই বোকা সঙ্গীর দিকে তাকাল, যে এ ধরনের নির্বোধ প্রশ্ন করার দুঃসাহস করেছে।

‘বাকি টাকাটা দিয়ে দাও,’ মেলফা বলল। তারা কুজো হয়ে শার্টের ভিতরে ঢুকে গেল এবং টাকা টেনে বের করল।

‘তোমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলো,’ মেলফা বলল, হাতে পাওয়া টাকাগুলো ভালোভাবে নিজের শরীরে লুকিয়ে রেখে। যাত্রীদের মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগল : পুরো যাত্রাপথে যে সামান্য খাবার তারা খেয়েছে তাতে তারা পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তারা আমেরিকাবাসী আত্মীয়দের জন্য কম দামি লিনেন এবং অন্যান্য উপহার যা নিয়েছে তা হলো : এক টুকরো পিকোরিনো, পুরনো একবোতল ওয়াইন মদ, সোফার সেন্টার টেবিলের ওপর বিছানোর জন্য টেবিল ক্লথ, অথবা সোফার পিছনের গদিতে সাজানোর জন্য এমব্রয়ডারি করা কুশন কাভার।

তারা যেন বাতাসে ভেসে জাহাজ থেকে নিচে নেমে এলো, মালপত্র নামাল, হালকা পায়ে ভাসতে থাকল আনন্দে, উচ্চৈঃস্বরে হাসছে আর মনের সুখে গান গাইছে¾একজন আবার খোলা গলায় চেঁচিয়ে গান গেয়ে উঠল, এর মধ্যে মেলফার নৌকা চলতে শুরু করেছে।

‘তো তোমরা কিছুই বুঝতে পারছ না,’ মেলফা হিসহিস করে বলল। ‘তোমরা কি এর মধ্যে আমাকে ঝামেলায় ফেলতে চাও?...আমি যেই তোমাদের তীরে নামিয়ে দেব প্রথমেই যে পুলিশটা দেখবে ঘাড় ধরে পরের নৌকায় তুলে ফেরত পাঠিয়ে দেবে : তোমাদের আমার কিছু বলার নেই, যেভাবে ইচ্ছা তোমরা মরো গিয়ে...আমার দিক থেকে একটাই কথা : এই হলো আমেরিকা, আর তোমাদের এখানে নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছি...এখন যিশুর দোহাই আমাকে ফেরত যাবার সুযোগ দাও।’

ভাগ্যানুসন্ধানী কৃষকরা যতটা সময় দরকার তার চেয়েও বেশি সময় তাকে দিল চলে যাবার জন্য : পরিষ্কার বালুতে তারা অনিশ্চিতভাবে বসে থাকল, বুঝে উঠতে পারছে না এর পরে কী করতে হবে, সমুদ্রতীরে তারা যতক্ষণ বসে ছিল রাতকে একই সঙ্গে আশীর্বাদ করল আর অভিশাপ দিল। কিন্তু যদি তারা এই সমুদ্রতীর ছেড়ে যায় তারা নিশ্চিত আমেরিকান মিলিটারির কবলে পড়বে, সিগনর মেলফা তাদের উপদেশ দিয়েছে ‘আলাদা আলাদাভাবে থাকতে’ কিন্তু কেউই আলাদা হবার কথা ভাবতেও পারছে না, কে জানে নিউজার্সির ট্রেনটন কতদূরে, আর কে-ই বা জানে ওখানে গিয়ে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে?

এরপর ওরা দূর থেকে অবাস্তব একটা শব্দ যেন শুনতে পেল, ‘একটা’। ‘এ গান শুনতে তো আমাদের নিজেদের কোনো গাড়িয়ালের গানের মতোই মনে হচ্ছে,’ ভাবল ওরা¾এ জন্যই সারা পৃথিবীর সর্বত্রই একই রকম : সব জায়গায়ই মানুষ একই রকম : সব জায়গায়ই মানুষ একই দুঃখবোধকে প্রকাশ করে। কিন্তু এখন তো তারা আমেরিকায় : যে শহরগুলো দিগন্তরেখার নিচে বালু ও গাছের ওপর ঝলমল করছে সে শহরগুলো আমেরিকার শহর।

এদের মধ্যে দুজন সিদ্ধান্ত নিল তারা সামনে এগিয়ে একটু দেখে আসবে। কাছের আলোজ্বলা আকাশের দিকে হেঁটে গেল। বেশ তাড়াতাড়ি একটা রাস্তা খুঁজে পেল : এখানকার বাড়িগুলো আমাদের বাড়ি থেকে কত আলাদা!’ কিন্তু তারা এটা প্রত্যাশা করছিল যে বাড়িগুলো আরও প্রশস্ত এবং মজবুত হবে। তারা কারও সঙ্গে দেখা হবার ভয়ে রাস্তাটা এড়িয়ে গেল : গাছপালার ভিতর দিয়ে ফুটপাতের নিচে থেকে হেঁটে গেল। একটা গাড়ি পার হলো। ‘এটা দেখতে কিন্তু অনেকটা ফিয়াট ৬০০-র মতো।’ এরপর আরেকটা গাড়ি গেল, সেটাও তো ফিয়াট ১১০০-র মতো, এরপর আরও একটা। ‘এরা গাড়ি রাখে তো দেখছি আমাদের বিনোদন দেবার জন্যই, আমরা যেমন বাচ্চাদের জন্য বাইসাইকেল কিনে বাড়ি ফিরি তারাও তাদের বাচ্চাদের জন্য সেভাবে গাড়ি কিনে বাড়ি ফেরে।’ দুটো মোটরসাইকেল প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে একে অন্যকে ধাওয়া করে তাদের পেরিয়ে চলে গেল। ওরা নিশ্চিত যে অবশ্যই এরা পুলিশ ছিল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তারা রাস্তায় ছিল না।

এবং শেষ পর্যন্ত ওখানে তারা দিকনির্দেশক চিহ্ন খুঁজে পেল। রাস্তার দুধারের নির্দেশনা ভালো করে তাকিয়ে দেখল, রাস্তার ওপর বেয়ে উঠল এবং পড়ার জন্য কাছে এগিয়ে গেল : শান্তা ক্রস ক্যামারিনা, স্কোগলিত্তি।

‘শান্তা ক্রস ক্যামারিনা : আমি তো এই জায়গাটার নাম আগে শুনেছি।’

‘এ এলাকাটার নাম আমি আগেও শুনেছি; এমনকি স্কোগলিত্তি ও যেন মাথার মধ্যে ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।’

‘মনে হয় আমার কোনো আত্মীয় ওখানে থাকে¾সম্ভবত আমার চাচা ফিলাডেলফিয়ায় চলে যাবার আগে ওখানে থাকত। আমার যদি ভুল না হয় তিনি ফিলাডেলফিয়ায় স্থায়ীভাবে চলে আসার আগে অন্য একটা শহরে বসবাস করতেন।’

‘আমার ভাইও ব্রুচিলিনে চলে আসার আগে অন্য কোথাও বসবাস করত...কিন্তু আমি মনেও করতে পারছি না ওটার নাম কী ছিল। যা হোক, বলছি, ‘শান্তা ক্রস,’ আমরা বলছি ‘স্কোগলিত্তি’, আমাদের কিন্তু কোনো ধারণাই নেই যে তারা এখানে এই শব্দগুলোকে আসলে কীভাবে উচ্চারণ করে। আমেরিকানরা কিন্তু শব্দ যেভাবে লেখা থাকে সেভাবে উচ্চারণ করে না।’

‘ঠিক বলেছ, আমাদের ইতালিয়ানদের সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো : যেভাবে লেখা থাকে ঠিক সেভাবে উচ্চারণ করতে পারে...কিন্তু আমরা তো এখানে অপেক্ষা করে সারা রাত্রি পার করে দিতে পারি না, আমাদের একটা ঝুঁকি নিতেই হবে। পরের যে গাড়িটা যাবে, আমি দাঁড় করাব। আমি শুধু বলব, ‘ট্রেনটন?’...এখানের লোকজন অনেক বেশি ভদ্র...তারা কী বলছে তা যদি আমরা না-ও বুঝতে পারি তারা কিন্তু ঠিকই বুঝে ফেলবে, কী বলছি, কোনো একটা সংকেত দেবে, এভাবেই আমরা খুঁজে বের করে ফেলব কোথায় এই মুখপোড়া ট্রেনটন।’

বিশ মিটার দূরে, রাস্তার একটা বাঁকের কাছে, একটা ফিয়াট ৫০০ গাড়ি দেখা গেল : ড্রাইভার হঠাৎ দুজনকে দেখতে পেল যে হাত উঁচিয়ে তাকে দাঁড় করানোর জন্য হাত নাড়াচ্ছে, ড্রাইভার আচমকা হার্ডব্রেক কষল, অভিশাপ দিতে লাগল : ভাবতেও পারেনি যে এমন নির্জন জায়গায় কেউ তাকে থামতে বলতে পারে, ড্রাইভার ভাবল হয়তো তাদের লিফট দরকার, তাই সে গাড়ি থামানোর সঙ্গে সঙ্গে দরজাও খুলে দিল।

‘ট্রেনটন?’ দুজনের একজন জিজ্ঞাসা করল।

‘কী?’

‘ট্রেনটন।’

‘কোন কচুর ট্রেনটন শহরে তোমরা এখান থেকে যেতে চাচ্ছ বলো তো!’

ড্রাইভার বিস্ময় প্রকাশ করে আবার গালাগালি করল।

‘আরে! লোকটা তো খাঁটি ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলছে,’ তারা উভয়ে বলল, পরে কী করবে এটা ভেবে একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে : এখন বোধহয় তাদের নিরুপায় অবস্থার কথা একজন দেশি ভাইকে বলে দেবার সময় চলে এসেছে।

ড্রাইভার দরজা লাগাল, এরপর আবার ইঞ্জিন চালিয়ে দিল। গাড়িটা ঝাঁকি খেয়ে খেয়ে সামনে এগোল : রাস্তার পাশে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা লোক দুটোর উদ্দেশ্যে সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মাতালের দল, মাতাল...কুত্তার বাচ্চা...।’

ড্রাইভারের বাকি গালাগালি গাড়ির এক্সেলেটরের শব্দে চাপা পড়ে গেল।

ওখানে নেমে এলো এক প্রলম্বিত নীরবতা।

‘এখন আমার মনে পড়েছে,’ একমুহূর্ত পরে একজন বলেই ফেলল, যে সঙ্গী ভাবছিল যে শান্তা শব্দটা এত চেনা চেনা লাগছে কেন, ‘আমার বাবা এক বছর আগে শান্তা ক্রস ক্যামারিনায় গিয়েছিল, আমাদের এলাকায় তখন মানুষ না খেয়ে মরছিল। সে তো ওখানে গিয়েছিল ফসল তুলতে।’

এরপর তারা এমনভাবে ধপ করে বসে পড়ল যেন তাদেরকে কেউ ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশের গভীর খাদে ফেলে দিয়েছে। তাদের আর তাড়াহুড়োর দরকার নেই, সর্বোপরি এই খবরটা দেবার জন্য যে, তারা সিসিলিতে নেমেছে।


লিওনার্দো শাসা (১৯২১-৮৯)

সাশা তাঁর জীবনের শেষ দশকে তেরটি ছোটোগল্পের একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এ সংকলনের নাম দেন ‘মদরঙা সমুদ্রের দিকে’ যেটা তাঁকে হোমারিক লেখক উপাধি দিয়েছে। সিসিলির একজন অন্যতম সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী সাশা এগ্রিজেল্টো প্রদেশে জন্মগ্রহন করেন, ওখানে এখনো চমৎকারসব গ্রীক মন্দিরগুলো দাঁড়িয়ে আছে, এবং এই জন্মদ্বীপটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর গল্পের বিষয়। তিনি এই দ্বীপের মানুষ, রাজনীতি, সৌন্দর্য এবং এর দুনীর্তি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছেন, এ দ্বীপের মাফিয়া সন্ত্রাসভীতি, ধনী সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ঐন্দ্রজালিক প্রভাব নিয়েও লিখেছেন। তিনি দ্বীপগুলোর মধ্যেকার সম্পর্ক, বাকী ইতালির দিকে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ মনোভাব, এবং তিনি ন্যায়বিচারের মহৎ বিষয়কে মোকাবেলা করেছেন সহানুভূতি এবং ইস্পাতখাঁটি প্রমাণের সঙ্গে।

সাশা তাঁর সময়ে বড় বড় বিতর্ক এবং বিপর্যয়মূলক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছে ইতালিয়ান সন্ত্রাস, অকাট্য প্রমাণ দিয়ে লিখেছেন ইতালির একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আলদো মোরো (১৯৭০)-র অপহরণ এবং হত্যা বিষয়ে। সংবাদপত্রের চাকরীকালীন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিষয়ে রিপোর্ট, রাজনৈতি রিপোর্ট এবং নিবন্ধও তিনি লিখেছেন। এছাড়াও তিনি শ্রমসাধ্য কিন্তু সংক্ষিপ্ত একগুচ্ছ উপন্যাস লিখেছেন যা ক্রাইম ফিকশনকে অনন্য সাহিত্যিক উচ্চতায়  নিয়ে গেছে। ‘পেঁচার দিনগুলো এবং ‘যার যার তার তার’ তার তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংক্ষিপ্ত রূপের দুটো অনন্য উদাহরণ। লেখাকে সার্বক্ষণিক পেশা হিসেবে গ্রহন করার আগে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭৬ সালে সমাজতান্ত্রিক দলের সমর্থনে তিনি পালেরমো সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ‘মদরঙা সমুদ্রের দিকে’ গল্পসংকলনে অর্ন্তভূক্ত গল্পগুলো ১৯৫৯ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লেখককের দেওয়া তথ্য অনুসারে এই গল্পসংকলনটি গল্পগুলো প্রকাশের কালক্রম অনুসারে সাজানো হয়েছে বলে জানা যায়। ‘সাধারণ এবং ধারাবাহিক অসন্তোষে’র বদলে এই গ্রন্থে তিনি সন্তুষ্টিকে জড়ো করেছেন। যে সমুদ্রকে সাশা আহŸান করেছেন সাশার বাক্যগঠন সেই সমুদ্রের মতোই সমৃদ্ধ এবং অন্ধকারের ইঙ্গিতপূর্ণ। তাঁর রূপক ভাষা ব্যবহার সুনির্দিষ্ট এবং আত্মবিশ্বাসী। এই গল্পে পৌরাণিক লাবন্য জড়িয়ে আছে এবং গল্পটা আমাদের সেই জায়গায় নিয়ে যায় ন্যূনতম আমরা যে জায়গাটা প্রত্যাশা করি।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সৈকতে জনসমুদ্র!
চিড়িয়াখানায় মানুষের ঢল
জঞ্জালের নগরে প্রাণ ভরানো সবুজের খোঁজে...
সর্বশেষ খবর
টাইব্রেকারে ম্যানসিটির শিরোপা স্বপ্ন ভাঙলো রিয়াল
টাইব্রেকারে ম্যানসিটির শিরোপা স্বপ্ন ভাঙলো রিয়াল
গলায় কই মাছ আটকে কৃষকের মৃত্যু
গলায় কই মাছ আটকে কৃষকের মৃত্যু
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন: কোন পদে লড়ছেন কে
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন: কোন পদে লড়ছেন কে
মেট্রোরেল চলাচলে আসতে পারে নতুন সূচি
মেট্রোরেল চলাচলে আসতে পারে নতুন সূচি
সর্বাধিক পঠিত
‘ভুয়া ৮ হাজার জনকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে’
‘ভুয়া ৮ হাজার জনকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে’
হজ নিয়ে শঙ্কা, ধর্ম মন্ত্রণালয়কে ‍দুষছে হাব
হজ নিয়ে শঙ্কা, ধর্ম মন্ত্রণালয়কে ‍দুষছে হাব
এএসপি বললেন ‌‘মদ নয়, রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলাম’
রেস্তোরাঁয় ‘মদ না পেয়ে’ হামলার অভিযোগএএসপি বললেন ‌‘মদ নয়, রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলাম’
এবার নায়িকার দেশে ‘রাজকুমার’ 
এবার নায়িকার দেশে ‘রাজকুমার’ 
‘আমি এএসপির বউ, মদ না দিলে রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেবো’ বলে হামলা, আহত ৫
‘আমি এএসপির বউ, মদ না দিলে রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেবো’ বলে হামলা, আহত ৫