X
রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪
৯ আষাঢ় ১৪৩১
জলবায়ু শরণার্থী

যাদের কাছে নাম আছে ধাম নাই

উদিসা ইসলাম
২১ মে ২০২৪, ১০:১২আপডেট : ২১ মে ২০২৪, ১৫:২০

রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকায় রিকশা চালান মজনু মিয়া (৩৭)। জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন গতবছর। তার চার বছরের এক সন্তান আছে। সেই সন্তান মিশু মিয়া— আর জানবে না কোথায় ছিল তার বাড়ি। মজনু মিয়া এখনও বলেন— বাড়ি দশানি নদী পাড়ে। কিন্তু ভাঙনে বসতি বিলীন হওয়ায় সেখানে আর ফেরা হবেন না, জানেন তিনি। যদি কখনও ফেরেনও তবে সন্তানকে নদীর ভেতরে আঙুল নির্দেশ করে বলতে হবে— ওই যে ওখানে ছিল একসময় আমাদের বাড়ি।

কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ মোছেন মজনু। পাশে থাকা মিশুকে ‘বাড়ি কই’ জিজ্ঞেস করলে বলে, বসিলা।

রাজধানীজুড়ে জলবায়ু শরণার্থী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। নদী ভাঙনে, তীব্র খরায় এলাকা ছেড়েছেন। এদের মধ্যে নদী ভাঙনের শিকার মানুষের মনোকষ্ট বেশি। কেননা, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে কোনও আদি বাড়ির অস্তিত্ব নেই। এই শিশুরা গ্রামের নামটা জানবেন, কিন্তু সেখানে তার ঠিকানা নেই।

গতবছর জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ৯টি গ্রামে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনে ফসলি জমি, রাস্তা ও শতাধিক বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

রাজধানীতে এমন টিনশেড ঘরেই থাকেন নদী ভাঙনের শিকার অনেকে। ছবি সাজ্জাদ হোসেন

ফার্মগেটে ভাসমান হকার হিসেবে আছেন রমিসুর। ৯ বছরের ছেলে মিলন শেখকে নিয়ে থাকেন তেজতুরিবাজারের ভেতরে, প্রায় ছাপড়া একটা ঘরে। স্ত্রী রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে পানি দেন। তাদের একসময় জমি ও বাড়ি সবই ছিল। এখন একটা ঘরে কেবল একটা খাট আর কয়েকটি বাসন-কোসন ছাড়া কিছু নেই। আশেপাশের ঘরগুলোতে একই গ্রামের আরও কয়েকজন আছেন। কেউ রিকশা চালান, কেউবা নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন। তাদের সন্তানেরা মুখে মুখে জানে গ্রাম ছিল রাজবাড়ি। কোথায় বাড়ি জানতে চাইলে রমিসুর বলেন, নদীর পেটে। তারপর থেমে বলেন, সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নে বাড়ি ছিল। কয়দিন পর নাম ভুলে যাবো। সন্তানরা সেই জায়গা চেনে না। এদের স্থান হয়েছে এই পলিথিন টিনের ঘরে। এই যে গ্রামের সাসঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে— এ আর জোড়া লাগবে না।

কত মানুষ ঘর ছাড়ছে

কেবল রাজবাড়ী বা জামালপুরই নয়, দেশের সব কটি নদী এলাকায় একে একে বিলীন হচ্ছে বা হয়েছে হাজারো বসতভিটা। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নতুন নাম পাচ্ছে ‘ছিন্নমূল’।  মানুষ বাধ্য হয়েছে ঢাকার দিকে রওনা দিতে। এই ঢাকা শহরে শিশুরা জলবায়ু শরণার্থী পরিচয়ে বড় হচ্ছে। কখনও যদি ফিরে যায় গ্রামে, সেখানে তার পরিচয় হবে উদ্বাস্তু।

ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের (আইএমডিসি) তথ্যমতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় সাত লাখ মানুষ ঘর হারিয়ে এলাকা ছেড়েছে। সাম্প্রতিককালে সিডর, আইলা ও মহাসেনের মতো ঘূর্ণিঝড় এই সংখ্যা বাড়িয়েছে। আইডিএমসি আরও জানিয়েছে, ২০১৯ সালে যে পাঁচটি দেশে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ২০৫০ সালে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হতে পারে আনুমানিক ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ঠাঁই নিচ্ছে শহরে। ছবি সাজ্জাদ হোসেন

উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ঠাঁই নিচ্ছে শহরে, বিশেষ করে ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরের বস্তি এলাকায়। এই মজনু মিয়া ও রমিসুর তাদেরই প্রতিনিধি। অন্ন সংস্থানের কাজের বাইরের সময়টুকু সন্তানদের ছিন্নমূল পরিচয় কীভাবে ঘোচাবেন সেই চিন্তা করেন তারা।

প্রতিবছর ঢাকায় জলবায়ু শরণঅর্থী বাড়ছে। এভাবে চললে ঢাকার পরিবেশ কী হবে এবং করণীয় কী প্রশ্নে ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, ‘প্রথমত কত সংখ্যক মানুষ জলবায়ু শরণার্থী হয়ে ঢাকা আসছে, তার একটি সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। আমরা অনেক বছর ধরে শুনে আসছি— প্রতি বছর মোট প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, যার প্রায় চার লাখ ঢাকায় আসে। আমি মনে করি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ঢাকার নাগরিক সুবিধাদির ওপরে। এমন অব্যবস্থাপনায় চললে ঢাকায় নদী থেকে ফুটপাথ কিছুই থাকবে না।’

এর মোকাবিলায় সমস্যাকে খোলা মনে স্বীকার করে জলবায়ু বিপন্ন এলাকা থেকে নগর পর্যন্ত বিষয়টিকে জনসম্পৃক্ত এবং যথাযথ তথ্য ও গবেষণার আলোকে সমন্বিত পরিকল্পনার নির্মোহ বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জলবায়ু অভিযোজনের পাশাপাশি প্রশমন এবং ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যাপারেও জোর দিতে হবে, বলেন তিনি।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ঈদের আনন্দ নেই যমুনা নদীর ভাঙনে ঘরহারা শতাধিক পরিবারের মাঝে। চোখের সামনেই নদী গর্ভে বিলীন হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। ছবি: টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

নদীভাঙনের চক্রে কীভাবে শরণার্থী মানুষ

নদীভাঙনের শিকার মানুষ প্রথমেই এলাকা ছেড়ে চলে আসে এমন নয়। বসিলা, পাইকপাড়া, তেজতুরিবাজারে  ছিন্নমূল মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রত্যেকে গত ১০ বছর ধরে চেষ্টা করেছেন নানাভাবে গ্রামেই টিকে থাকতে। একটু করে ভাঙনের মুখ থেকে সরে সরে বিভিন্ন জায়গায় ঘর সরিয়েছেন। কিন্তু সব হারিয়ে গেছে যখন, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে ঢাকামুখে রওনা হয়েছে। শুরুতে ভিটে ডুবে গেলে কৃষিজমি কিনে বাড়িঘর তৈরি করেছেন। সেটাও নদীর পেটে গেলে নদীকেন্দ্রিক জীবিকাটা ধরে রাখতে চেয়েছেন। বছরের বেশিরভাগ সময় নদী শুকিয়ে থাকায় জীবিকা নেই সেই পথে।

অভ্যন্তরীণ জলবায়ু শরণার্থীদের শহরমুখী হওয়া ফেরাতে না পারলে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের বসবাসযোগ্যতার সূচক আরও নিচে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা শরিফ জামিল বলেন,‘ মানবসৃষ্ট ও প্রকৃতিসৃষ্ট কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে পলি জমে নদী নিজ থেকেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আবাদি জমি বালু পড়ে অনাবাদি হয়ে পড়ছে। একটার সঙ্গে আরেকটা নির্ভরশীল। ফলে কোনও একটি যদি আপনি ঠিক করেন, তাহলেই কাজ হবে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। গোড়া থেকে ঠিক করতে হবে।’

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ফের নদীপারে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ছবি: রাজবাড়ী প্রতিনিধি

নদীর কোনও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এদেশে নদী বেশি ভাঙে কিনা— প্রশ্নে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) উপদেষ্টা ড. মমিনুল হক সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের নদীগুলো হিমালয় থেকে নেমে আসার সময় বিপুল পরিমাণ পলি নিয়ে আসছে। ফলে একদিকে নতুন চরভূমি তৈরি হয়, আরেকদিকে ভাঙন সৃষ্টি হয়। ভাঙনরোধে ভাঙনপ্রবণ নদীগুলোতে নিয়মিত প্রকল্প চলছে। সেগুলো কার্যকর করা গেলে ভাঙনরোধ সম্ভব।’ একদিকে শোনা যায়, নদীতে পানি নেই— আরেকদিকে ভাঙনের বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘মে-জুন মাসে ভাঙনটা বেশি থাকে। কারণ সেটা বর্ষা মৌসুম, নদী ভরে যায়। মাটির বৈশিষ্ট্যের ওপর নদী নভেম্বর-ডিসেম্বরেও ভাঙে।’

এই উদ্বাস্তু শিশুদের মানসিক ভারসাম্য পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এরা যেখানে জন্মেছে সেখানে কিছুদিন বেড়ে উঠেছে। সেই জায়গা কেন ছেড়ে আসলো, এসে এই নতুন পরিবেশে যে স্ট্রাগলের মধ্যে তারা পড়ে, সেটার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারা খুব কঠিন। এদের বাবা-মায়ের তেমন আর্থিক সচ্ছলতা না থাকার কারণে তাদের প্রয়োজন মেটানোও সম্ভব হয় না। নিজ বাড়িতে তাদের এই দৈনন্দিন না পাওয়ার বিষয়টি নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। ফলে বৈষম্য সে ছোটবেলায় দেখতে শেখে এবং যেকোনেও মূল্যে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকে।’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
খেলার মাঠে অসুস্থ হয়ে তরুণের মৃত্যু
আ.লীগের প্লাটিনাম জয়ন্তী: যেসব সড়কে সীমিত থাকবে যানবাহন চলাচল
রায়ের বাজারে চুরি, স্বর্ণালংকারসহ নিয়ে গেলো নগদ টাকা
সর্বশেষ খবর
বিয়েতে যাওয়ার পথে মাইক্রোবাস খালে, সেতু নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
বিয়েতে যাওয়ার পথে মাইক্রোবাস খালে, সেতু নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
ইসরায়েলি বন্দরে চারটি জাহাজে হামলার দাবি হুথিদের
ইসরায়েলি বন্দরে চারটি জাহাজে হামলার দাবি হুথিদের
টানা দুই হ্যাটট্রিকে ইতিহাসের পাতায় কামিন্স
টানা দুই হ্যাটট্রিকে ইতিহাসের পাতায় কামিন্স
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ
সর্বাধিক পঠিত
দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেমিফাইনালে ওঠার সমীকরণ
দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেমিফাইনালে ওঠার সমীকরণ
নায়িকার বিয়ে মাদ্রাসায়, দেনমোহর ৯ টাকা
নায়িকার বিয়ে মাদ্রাসায়, দেনমোহর ৯ টাকা
তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা ভারতের
তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা ভারতের
দীর্ঘায়ু পেতে চাইলে এই ৭ সুপার ফুড রাখুন পাতে
দীর্ঘায়ু পেতে চাইলে এই ৭ সুপার ফুড রাখুন পাতে
ইন্দো-প্যাসিফিক ওশেনস ইনিশিয়েটিভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের
ইন্দো-প্যাসিফিক ওশেনস ইনিশিয়েটিভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের