রোগীদের লাইফ সাপোর্ট নিয়ে মিথ্যা বলছে ইউনাইটেড, দাবি স্বজনদের

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২২:৪১, মে ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৫, মে ২৮, ২০২০

ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুন (ছবি সংগৃহীত)করোনা ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া পাঁচ রোগীই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন, বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালের এমন দাবির বিরোধিতা করেছেন পাঁচ রোগীর মধ্যে তিন জনের পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, ইউনাইটেড হাসপাতাল নিজেদের বাঁচাতে মিথ্যা দাবি তুলেছে। লাইফ সাপোর্টে নিতে হলে রোগীর পরিবারকে জানাতে হবে, তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। পরিবারগুলোর দাবি, লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার জন্য তারা ইউনাইটেড হাসপাতালকে কোনও কাগজে স্বাক্ষর দেননি বা মৌখিক অনুমতিও দেননি। তারা যদি সত্যিই রোগীদের লাইফ সাপোর্টে নিয়ে থাকে তাহলে এ বিষয়ে সব কাগজপত্র পরিবারগুলোকে দিতে হবে। তিনটি পরিবারই ইউনাইটেড হাসপাতালের কাছে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাবি করেছেন।

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া পাঁচ রোগীর অবস্থাই ক্রিটিক্যাল এবং তারা আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্টের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন।

তবে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া রিয়াজুল করিম লিটন বুধবার (২৭ মে) বিকালেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং তার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ ছিল বলে জানালে সংবাদ সম্মেলনে ডা. সাগুফা আনোয়ার দাবি করেন, “নেগেটিভ হলেও তার শারীরিক অবস্থা খারাপ ছিল। রোগীর ক্লিনিক্যাল অবস্থা দেখেই আমাদের চিকিৎসকরা তাকে… তিনি ‘হাইলি সাসপিসিয়াস’ ছিলেন।” ‘ক্রিটিক্যাল অবস্থা না হলে কেন তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হবে’, যোগ করেন তিনি।

তবে তার এমন দাবির বিরোধিতা করেছেন রিয়াজুল করিম লিটনের স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার জেনি। তিনি বলেন, ‘এটা ডাহা মিথ্যা কথা। সন্ধ্যার সময়ে যে মানুষটা ভাত খেয়েছে, আমাকে জানানো হলো তিনি ভালো আছেন, সেই মানুষটা কী করে হাইলি সাসপিসিয়াস হন?’ তাকে কখন লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে প্রশ্ন তোলে ফৌজিয়া বলেন, ‘যদি ওদের কথা সত্যিই ধরে নিই, তাহলে কার অনুমতি নিয়ে তারা তাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়েছেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘ও একদম ভালো ছিল, কেবল অল্প জ্বর আর হালকা শ্বাসকষ্ট নিয়ে হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে ঢুকলো। কেবল অক্সিজেনের জন্য হাসপাতালে নিলাম। বাচ্চা ছোট থাকায় এক আত্মীয় আর গাড়িচালককে রেখে বাচ্চাকে নিয়ে চলে আসি। সন্ধ্যার দিকে কল করলাম, আমাকে বলা হলো আপনার রোগী ভালো আছে, সে ডিনার করেছে। তাহলে পৌনে ১০টার দিকে তাকে কী করে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, তার অবস্থা কী এত খারাপ ছিল? আর খারাপ হলে, কার অনুমতি নিয়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে, আমাকে তা জানাতে হবে।’

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রিয়াজুল করিমহাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের বাঁচাতে মিথ্যা দাবি করছে, এমন অভিযোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘ও লাইফ সাপোর্টে ছিল না, ফালতু কথা বলছে ইউনাইটেড। ইউনাইটেড আমাদের লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার পেপার্স দেখাক, আমি ওদের কাছে পেপার্স চাই।’

অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া খোদেজা বেগমের ছেলে আলমগীর হোসেনেরও একই কথা। ঈদের আগের দিন মাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় আসি, পরে টেলিভিশনে হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাই।’

খোদেজা বেগম লাইফ সাপোর্টে ছিল কিনা জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘উনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন না। মূলত শ্বাসকষ্ট হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার আশায় মাকে ভর্তি করিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে নিয়ে মাকে মেরেই ফেললাম।’

পাঁচ রোগীই লাইফ সাপোর্টে ছিল, ইউনাইটেড হাসপাতালের এমন দাবির বিপরীতে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ওরা পুরোটাই মিথ্যা বলেছে। বাকি চার জনের কথা জানি না, কিন্তু আমার মাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়নি। লাইফ সাপোর্টে নিতে হলেতো আমাদের অনুমতি লাগবে। আমাদের বলতে হবে, সেগুলোতো তারা কিছুই করেনি। ইউনাইটেড লাইফ সাপোর্টের কথা মিথ্যা বলতেছে। সেখানে লাইফ সাপোর্টের কোনও ব্যবস্থাই ছিল না, অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল। কিন্তু লাইফ সাপোর্ট আর অক্সিজেন পার্থক্য রয়েছে।’

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আপনারা তদন্ত করে দেখেন সেখানে লাইফ সাপোর্টের কোনও মেশিন ছিল কিনা, তারপর তো রোগীকে নেওয়ার কথা আসবে।’

বাবাকে লাইফ সাপোর্টে দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ভেরুন এন্থনি পলের ছেলে এন্দ্রে ডোমিনিক পল বলেন, ‘ওখানে তো কোনও লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থাই ছিল না, কেবল অক্সিজেন ছিল। লাইফ সাপোর্ট দেবে কীভাবে। বাবাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। আমার কাছে বিল আছে, সেখানে লাইফ সাপোর্টের কিছু উল্লেখ নেই, ওরা এত মিথ্যা কথা বলছে কেন। ইউনাইটেডকে দেখাতে হবে, তাদের বিলের মধ্যে কোথায় লাইফ সাপোর্টের কথা মেনশন করা রয়েছে।’

অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া করোনা আইসোলেশন ইউনিটগত ২৫ মে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমার বাবাকে যদি লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, তাহলে পরিবারকে জানাতে হবে, অনুমতি নিতে হবে। ইউনাইটেড কার অনুমতি নিয়েছে, সেটা তারা বলুক। আমার বাবা ভালো হচ্ছিলো, সেদিনও তাকে মুখে তুলে খাওয়ানো হয়েছে, তাহলে লাইফ সাপোর্টের কথা বলে কী করে, প্রশ্ন এন্দ্রে ডোমিনিক পলের।

প্রসঙ্গত, বুধবার (২৭ মে) রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ করে রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরের ডিউটি অফিসার কামরুল ইসলাম জানান, বুধবার রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে আগুন লাগার পর বারিধারা ফায়ার স্টেশনের তিনটি ইউনিট তা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। করোনা ইউনিটে থাকা পাঁচ জন রোগী মারা যান। অগ্নিকাণ্ডে নিহতরা হলেন মোহাম্মদ মাহবুব (৫০), মনির হোসেন (৭৫), ভেরন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৫০)। এদের মধ্যে প্রথম তিন জন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকি দু’জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল। তারা রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিলেন। মারা যাওয়া রোগীরা প্রফেসর ড. মো. ওমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে করোনা ইউনিটে ভর্তি ছিলেন।

/টিটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ