‘জরুরি ব্যবস্থায় তৈরি ইউনাইটেডের বিশেষ করোনা ইউনিট নিয়ে প্রশ্ন’

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১৭:০০, মে ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫০, মে ২৯, ২০২০

ইউনাইটেড হাসপাতালের আগুন (ছবি সংগৃহীত )ইউনাইটেড হাসপাতাল তাদের করোনা ইউনিটের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে কোনও অনুমতি নেয়নি। এমনকি তারা যে বেডের সংখ্যা বাড়িয়েছে, সে বিষয়েও কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। যেকোনও হাসপাতালের বেডের সংখ্যা বাড়াতে হলে অনুমতি নিতে হয় বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এমনকি যত্রতত্র দাহ্য পদার্থ দিয়ে লাইফ সাপোর্ট ও আইসিইউ কক্ষ তৈরি করা নিয়েও সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।  লাইফ সাপোর্ট কক্ষ নির্মাণের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল।

শুক্রবার (২৯) বিকালে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের আইসিইউ বিশেষজ্ঞরা বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানান।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউনাইটেড হাসপাতাল বর্ধিত অংশে করোনা ইউনিট বা ওয়ার্ড করার বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে কোনও অনুমতি নেয়নি।’

আরেক  প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনও  হাসপাতালে বেড সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হলে অবশ্যই আমাদের অনুমতি নিতে হবে। হাসপাতালের বর্ধিত কোনও অংশে লাইফ সাপোর্ট  কক্ষ,আইসিইউ কক্ষ করতে কোনও অনুমতি লাগবে না। পূর্বের অনুমতিতেই হবে। তবে এসব কক্ষ তৈরির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ইউনাইটেড আমাদের কাছ থেকে কোনও অনুমতি নেয়নি।’

প্রসঙ্গত, বুধবার (২৭ মে) রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে আগুন লাগে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এই আগুনে পাঁচ জন রোগী মারা গেছেন। তারা হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আইসোলেশনে ছিলেন। পাঁচ জনের মধ্যে চার জন পুরুষ ও একজন নারী।

নিহতরা হলেন— মোহাম্মদ মাহবুব (৫০), মনির হোসেন (৭৫), ভেরন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৫০)। তাদের মধ্যে প্রথম তিন জন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকি দুজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল, তারা রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিলেন। তারা সবাই প্রফেসর ড. মো. ওমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে করোনা ইউনিটে ভর্তি ছিলেন।

অগ্নিকাণ্ডের পরদিন বিকালে ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার সংবাদ সম্মেলনে জানান, রোগীরা সবাই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তার এই দাবি প্রত্যাখান করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

নিহত খোদেজা বেগমের ছেলে আলমগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে বুধবার দিনের বেলা ইউনাইটেড থেকে জানানো হয়, মা সুস্থ হয়েছেন, তাকে পরদিন বেডে দেওয়া হবে। তাকে কখন লাইফ সাপোর্টে রাখা হলো? এগুলো সব মিথ্যাচার।’

ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে লাইফ সাপোর্ট ও আইসিইউ কক্ষ নির্মাণে যেসব জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তারও সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।  কারণ, পারটেক্স বোর্ড, লোহার অ্যাঙ্গেল এবং কাপড়ের সামিয়ানা দিয়ে নির্মাণ করা হয় ইউনাইটেডের করোনা ইউনিট। এসব সামগ্রী দিয়ে কোনোভাবেই আইসিইউ অথবা লাইফ সাপোর্টের কক্ষ করা স্বাস্থ্যসম্মত না। আইসিইউ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এমন সামগ্রী দিয়ে এসব কক্ষ তৈরি করতে হবে, যেন কোনও ময়লা না আটকে থাকে। কোনও  প্রকার কাঠ বা কাপড় দিয়ে এসব কক্ষ করা যাবে না।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রধান ডা. শাহজাদ হোসেন মানসম্মত  লাইফ সাপোর্ট কক্ষের বর্ণনা দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই কক্ষে সবচেয়ে দুর্বল রোগীরা থাকেন। তাদের যেকোন জীবাণু ও ভাইরাস দ্রুত আক্রমণ করে। তাই এই কক্ষ হতে হবে সবচেয়ে নিরাপদ। এগুলোর ভেতরে একটি বেড থেকে আরেকটি বেডের যথেষ্ট দূরত্ব থাকতে হবে। কক্ষগুলো কংক্রিটের হবে বা এমন জিনিস দিয়ে তৈরি হবে, যেন কোনোভাবেই ময়লা আটকে না থাকে।  বাইরের বাতাস প্রবেশ করতে পারবে না। সেন্ট্রাল এয়ার কুলারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ বাতাস প্রবেশ করবে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকবে। ভেতরের বাতাস একইভাবে যন্ত্রের মাধ্যমে বাইরে বের করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

অপরদিকে ইউনাইটেডের করোনা ইউনিটে ছিল না  অগ্নিনির্বাপণের কোনও  ব্যবস্থা। এছাড়া, ফায়ার সার্ভিস থেকেও এই বর্ধিত অংশের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।  হাসপাতালের ভেতরে মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল। তবে সেগুলো কেউ ব্যবহার করেনি। অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান  ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ঢাকা বিভাগ) দেবাশীষ বর্ধন বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানান।

ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার আমাদের বলার পরই আমরা দ্রুত করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগী থাকলে সেখানে আইসিইউ বেড রাখতে হয়। আমরা সেটা রেখেছি। সবকিছুই করা হয়েছে রোগীদের ভালোর জন্য।’ তিনি বলেন,  ‘একটি দুর্ঘটনা। এখন এসব প্রশ্ন আসছে।’

আরও পড়ুন:

ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুন, ৫ রোগীর মৃত্যু

ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনের ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা

ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ