নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে পিছিয়ে বিএনপি

সালমান তারেক শাকিল
০৮ মার্চ ২০২৪, ১০:০০ আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ১৫:১৪

দলীয় প্রধান নারী। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ-জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নারী সদস্য দুজন। তাদের একজন অসুস্থ হয়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। বর্তমানে দলের নীতি নির্ধারণে অবদান রাখছেন মাত্র একজন নারী। বাকি সবাই পুরুষ সদস্য।

বিএনপির নারী নেতারা বলছেন, বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নে বিএনপির জিয়াউর রহমানের সরকার, খালেদা জিয়ার তিনবারের সরকারের অনেক অবদান রয়েছে। মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, পুলিশে নারী সদস্য নিয়োগ, প্রাথমিক শিক্ষা ও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের পড়াশোনা অবৈতনিক করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত উল্লেখযোগ্য। তবে দলের নীতিনির্ধারণে এসব উদ্যোগের প্রভাব পড়েছে কম।

বর্তমানে চার শতাধিক সদস্যের বেশি কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তত ৭০ জনের মতো নারী সদস্য রয়েছে বলে জানান দলের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।

দলের জেলা সভাপতি হিসেবে আছেন কয়েকজন নারী। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি আফরোজা খানম রিতা, সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি রুমানা মাহমুদ, হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক শাম্মি আক্তার উল্লেখযোগ্য। ঢাকা জেলা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি আফরোজা খানম রিতা বলছেন, ‘বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের অনেক অনুচ্ছেদ, বিশেষ করে ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমভাবে অংশগ্রহণের কথাও আমাদের সংবিধানে বলা আছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। স্বাধীনতার পর জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করার মতো ছিল না।’

মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির এই চেয়ারম্যান মনে করেন,  বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়নের পেছনে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিশেষ অবদান রয়েছে। আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার জিয়াউর রহমান তার উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী সমাজকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন অনুভব করেন। দলের ১৯ দফার ১১ নম্বর দফায় নারীদের যথাযোগ্য মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং সমাজে তাদের যোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।

‘১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীনে একটি নারী বিষয়ক দফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৭৮ সালে ‘মহিলাবিষয়ক’ একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে জিয়া সরকার, বলে জানান আফরোজা খানম রিতা। তিনি যোগ করেন, ১৯৯৪ সালে জিয়ার সহধর্মিণী ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বর্ধিত করে ‘মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে’ রূপান্তরিত করেন।

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-স্বনির্ভর সম্পাদক আসমা আজিজের ভাষ্য, ‘আজ সারা দেশে যে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। বিএনপি দলীয় কর্মসূচি নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণের পক্ষে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিএনপির বিভিন্ন কমিটিতে আরও বেশি সংখ্যক নারী নেত্রী অন্তর্ভুক্ত হবেন আশা করি।’

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির নারী নেতাদের কেউ কেউ বলেন, নারীর অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া দলে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নীতি নির্ধারণে নারীদের ভূমিকা গৌণ। দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বডি— স্থায়ী কমিটিতে মাত্র দুজন নারী এবং একজন সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে। এক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে আরও নারী সদস্য নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন নেতারা।

নির্বাহী কমিটির একজন নারী নেতা বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতিতে নারীরা বরাবরই এগিয়ে ছিল। নীতিনির্ধারণে বেগম জিয়া সব সময় পুরুষ সদস্যের সঙ্গে নারী সদস্য রেখেছেন। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব সেই অবস্থা থেকে এগিয়ে যেতে পারেনি। এখন মাত্র একজন সদস্য সক্রিয়।’

‘এক্ষেত্রে সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, সিনিয়র নেতা আছেন নারী, তাদেরকে যুক্ত করা গেলে বৃহত্তর রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে আর্থসামাজিক জায়গায় নারীর অবস্থান এখনও নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতো হয়নি।’ বলেন নির্বাহী কমিটি ও দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ের এই সদস্য।

রাজনীতির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘এটাই বাস্তব। কেবল নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেই এই অংশগ্রহণের হার কম, তা নয়। রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণে ৩০ শতাংশের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে— সেখানেও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।’

এজন্য ‍দুটি কারণ রয়েছে বলে জানান দলের মিডিয়া সেলের এই সদস্য। ফারজানা শারমিনের ব্যাখ্যা— নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের সুযোগ যেমন কম, অপরদিকে নারীদের ভেতরে সেই পর্যায়ে নিজেদের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং  কনফিডেন্সের অভাব। এই দুটো বিষয় একে অন্যের পরিপূরক। তবে সব থেকে মৌলিক বিষয়  হলো— একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারা, রাজনৈতিক প্রতিভার উন্মেষ ঘটাতে পারে, যেটা বর্তমান বাংলাদেশে অনুপস্থিত।’

‘রাজনীতিকে কল্পনাতীতভাবে নিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন রাজনীতি করার ইচ্ছে, যোগ্যতা এবং সুযোগ থাকলেও তাদের বেশির ভাগই রাজনীতি বিমুখ। নারীদের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় কিছু চিন্তা করা যায় না, বলেন ফারজানা শারমিন।

জানতে চাইলে  বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান অসুস্থতার কারণে মন্তব্য করতে পারেননি। তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মন্তব্য করার মতো অবস্থায় নেই।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সব পর্যায়েই ‘নারীকে অবহিত’ করার জায়গায় রাখার সংস্কৃতি বিদ্যমান। যে কারণে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে নারীকে যুক্ত করা হয় কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘এখানে কয়েকটি বিষয় রয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীকে খুব কম রাখা হয়। আর নারীকে রাখলেই যে, তারা নিজেদের মতো কথা বলতে পারছে বিষয়টা এমন না। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নারীকে শুধু জানানো হয়। তাকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রাখা হলেও তার মতামত নেওয়া হয় না।’

কীভাবে উত্তরণ করা যেতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে জোবাইদা নাসরিনের মন্তব্য, ‘আসলে এটা অনুশীলনের বিষয়। কোন নীতি নির্ধারণ করে দিয়ে এগুলো বাস্তবায়ন হবে— এটা একটা মানসিক চিন্তার বিষয়। যতদিন মানসিক চিন্তা ওই পর্যায়ে যাবে না, আপনি ওভাবে চিন্তা করে কাজে পরিণত করবেন না। ততদিন এগুলো থেকে উত্তরণ সম্ভব না।’

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বাংলা ট্রিবিউনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আবিদ হাসান রাসেল

/এপিএইচ/
টাইমলাইন: নারী দিবস
০৮ মার্চ ২০২৪, ১২:০০
০৮ মার্চ ২০২৪, ১০:০০
নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে পিছিয়ে বিএনপি
সম্পর্কিত
দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, নজরদারিতে ৪০০ ক্যামেরা
পদ দেওয়ার কথা বলে টাকা-খাসি নেওয়ার অভিযোগ, বিএনপি নেতার অডিও ফাঁস
পদ্মা ব্যারাজ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা রাজশাহীবাসীর
সর্বশেষ খবর
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন