সরকারের ওপর ইসিকে প্রভাব বিস্তারের পরামর্শ বিএনপির

Send
এমরান হোসাইন শেখ ও সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২২:১১, অক্টোবর ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫১, অক্টোবর ১৫, ২০১৭

 

ইসির সঙ্গে বিএনপির সংলাপএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতেও ইসিকে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন সংস্কারে পর্যবেক্ষণ ও আপিল করতে ইসিকে পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি দলটির পক্ষ থেকে ইসির কর্মপরিধি বাড়িয়ে প্রয়োজনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা নেওয়ার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। রবিবার সকালে ইসির সংলাপে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

রবিবার সকাল ১১ টায় নির্বাচন কমিশনের সম্মেলন কক্ষে সংলাপ শুরু হয়। বৈঠকে ২০ দফা সংবলিত প্রস্তাব পড়ে শোনান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।

বৈঠকসূত্র জানায়, বিএনপির সিনিয়র নেতারা ইসিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এই প্রস্তাব শুধু দলের প্রস্তাব নয়, আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতেই একটি সামগ্রিক প্রস্তাব। এক্ষেত্রে ইসিকে সব ধরনের বাধা উপেক্ষা করে কাজ করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ইসিকে বলেছি, শুধু আইন-কানুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সরকারের সঙ্গে স্বাধীন চিন্তা নিয়ে কথা বলতে হবে। যদি এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে চলে, তাহলে কিছুই হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব জায়গায় ইসির বিচরণ থাকতে হবে। স্বাধীনভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেখানে আইনের প্রয়োজন হবে, সেটা করাতে হবে। বদলাতে হলে সেটিও করতে হবে। কর্মপরিধি বিশাল হতে হবে। না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।’

বিএনপির এই নেতা যোগ করেন, ‘যদি আইনে কাভার না করে, তাহলে ইসি পর্যবেক্ষণ দিতে পারে, আপিল করতে পারে। এই কথাগুলো বলে এসেছি।’

আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে করণীয় নেই, সীমাবদ্ধতা আছে, আইনি সীমাবদ্ধতা আছে। ইসির প্রতিনিধিরা বিএনপির প্রতিনিধি দলকে জানান, তারা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারবেন না। কারণ, এ ক্ষেত্রে অনেক বিষয়ই রয়েছে সংসদের হাতে, যেসব বিষয়ে তারা চাইলেও কিছু করতে পারবেন না।

জবাবে বিএনপি নেতারা বলেন, আমরাও জানি অনেক কিছু সরকারের বিষয়। তবে স্বাধীন কমিশন হিসেবে ইসির মোটেও ক্ষমতা নেই, তা মনে করি না। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে আপনারা অনেক কিছুই করতে পারেন। সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ আছে আপনাদের।

ইসির উদ্দেশে বিএনপি নেতারা বলেন, আপনারা চেষ্টা করুন, সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা না পেলে, দেশবাসীকে জানান। গণমাধ্যমে জানান যে, আমরা পারছি না। তাহলে নিজেদের বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকবেন। দেশবাসীকে বলতে পারবেন, আমরা চেষ্টা করেছি।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির প্রস্তাব নিয়ে সরকারকে কনভিন্স করতে তাদের (ইসি) উদ্যোগ থাকা উচিত। তাদের একেবারে নীরব থাকা উচিত নয়। তারা যদি বলে থাকে যে, ‘‘আমাদের কিছুই করার নেই, আমরা নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছি। রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচনের শিডিউল হবে’, তাহলে তো হবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার বিষয়টি শিডিউলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না। তাদের কার্যক্রম সংবিধানের অধীনে। এটা তো চলমান একটা প্রক্রিয়া। ফলে, তাদের করার আছে। তারা যদি দেখে, যে সরকারের কোনও মন্ত্রী সমাবেশ করলেন, জনসভা করলেন, নৌকায় ভোট চাইলেন। অথচ আমাদের ঘরোয়া বৈঠক করতে দেয় না সরকার। এতে তো নির্বাচনের পরিবেশ আসবে না।’’

মওদুদ আহমদ আরও বলেন, ‘আর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না হলে তো হবে না। পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এখন থেকেই স্বচ্ছ-পরিষ্কার ধারণা পেতে চাই যে,  আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কি হবে না, তা সরকারের সিদ্ধান্ত। ইসি চেষ্টা করবে। কিন্তু দলীয় সরকার থাকলে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না।’

‘কিন্তু নির্বাচন কমিশন উদ্যোগ গ্রহণ করছে, এ জন্য আমরা প্রশংসা করেছি’—এমনটা জানিয়ে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘তার মানে এই নয় যে, সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এমনটা ভাবা উচিত হবে না। তবে এটি ভালো একটি সূচনা বলা যায়। বৈঠকে তারা ইতিবাচক ছিল, আমরাও ইতিবাচক ছিলাম।’

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা বলেছে উদ্যোগ গ্রহণের কথা। কিন্তু যেটা তাদের হাতে নেই, যেমন আর্মি মোতোয়েন। এটা স্ট্রংলি সরকারকে বলার কথা তারা জানিয়েছেন। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের যে বিষয়টি, এটাও তারা বলেছে, এটা তো তাদের হাতে নেই। কিন্তু এটা সরকারকে তারা রিকোয়েস্ট করবে।’

বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন নেতার ভাষ্য, বর্তমান কমিশনও চায়, তারা সম্মান নিয়ে বিদায় নিক। এক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তাদের যা করণীয়, তা করতে সচেষ্ট থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি ২০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবগুলো আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন। প্রস্তাবের মধ্যে যেগুলোয় ইসির করণীয় রয়েছে, সেগুলো বিষয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ভারপ্রাপ্ত সচিব আরও বলেন, ‘বিএনপির কিছু প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে যেগুলো সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেগুলোর বিষয়ে হয়তো সরকারকে চিঠি বলব, আমরা এ ধরনের প্রস্তাব পেয়েছি। আপনাদের করণীয় থাকলে করুন। আমার এই বক্তব্য বিএনপির মতো সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে সংলাপ করছি, তাতে আলোচনার প্ল্যাটফরম তৈরি হয়েছে।  আগামীতে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।’

রবিবার দুপুরে বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসির পক্ষ থেকে তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। তার ভাষ্য, আলোচনার শেষ দিকে এসে তারা বিএনপির প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন, তারা চেষ্টা করবেন। নিজেদের মধ্যে বসবেন, বসে দেখবেন, তারা কী করতে পারেন।’

বিএনপির প্রস্তাবটি প্রশংসিত

সূত্র জানায়, বিএনপির ১৩ পৃষ্ঠার ২০ দফা প্রস্তাবটির প্রশংসা করেছে ইসি। বিএনপির পক্ষ থেকে পুরো প্রস্তাবটি পড়ার পর ইসির প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাবটিকে একটি ‘গোছানো ও চিন্তাশীল’ টেক্সট বলে উল্লেখ করেন। 

রবিবার সকাল ১১ টায় বৈঠক শুরু হয় আন্তরিক পরিবেশে। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক বিএনপির নেতা জানান, সংলাপের পুরো সময়টিতে ইসির প্রতিনিধিরা আন্তরিক ছিলেন। দলটির উচ্চ-পর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তারা নিজেরা আন্তরিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কোনও কমতি রাখেননি।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি সূত্র জানায়, ‘ইসি বিএনপির প্রস্তাবের প্রশংসা করেছে। এই প্রস্তাব খুবই গোছালো।’ এ বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তারা আমাদের প্রস্তাবটির প্রশংসা করেছে। আমাদের টেক্সট অত্যন্ত গোছালো, সে বিষয়টিও তারা জানিয়েছেন।’

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘তাদের আচরণ অনেক আন্তরিক ছিল।’

 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ