প্রধানমন্ত্রী অনুদান নয়, ঋণের প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন: মির্জা ফখরুল

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৯:১২, এপ্রিল ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৫, এপ্রিল ০৫, ২০২০

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ফাইল ফটো)করোনাভাইরাসের কারণে আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার মাধ্যমে ‘জনমতকে কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে’ বলে মনে করছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা কিছুটা হলেও আশস্ত হলাম যে তারা জনমতকে কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘আসলে এটা পুরোটা দিয়েছে ঋণ। এখানে অনুদান বলতে কিছুই নেই।’

রবিবার(৫ এপ্রিল) বিকালে উত্তরায় নিজ বাসায় সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, ‘এটাকে আমরা তখনই পজিটিভ বলতে পারতাম, যদি দেখতাম যে আসল সমস্যা সমাধান করার জন্য তিনি উদ্যোগী হয়েছেন। অর্থাৎ, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষকদের জন্য কোনও কথা প্রধানমন্ত্রীর প্যাকেজে নেই।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে—প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা… জনগণের মধ্যে পরে বলবে যে ৭৭ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। আসলে এটা পুরোটা তো দিয়েছে ঋণ। এখানে অনুদান বলতে কিছুই নেই। সব ঋণের প্যাকেজ। আমরা বলেছি যে সাধারণ মানুষকে ১৫ হাজার কোটি টাকা অনুদান দিতে হবে। কিন্তু সেই বিষয়ে এখানে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই।’

সরকারের মধ্যে সামগ্রিকভাবে সমন্বয়নহীনতা রয়েছে বলে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সবক্ষেত্রে সমন্বয়নহীনতা, দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা রয়েছে। তারা মনে করে না যে দেশে বড় রকমের কোনও সমস্যা হচ্ছে। তাদের চেহারার মধ্যে সেটা বোঝা যায়। আমরা সবাই দায়িত্ব পালন করছি। অথচ তারা বলছেন আমরা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলছি। তারা সেটা কোথায় পেয়েছে। আসলে দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে তারা করোনা মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় যে মানসিকতা দরকার সেটা তৈরি করতেও ব্যর্থ হয়েছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর এই প্যাকেজ ঘোষণায় আমরা কিছুটা হলেও আশস্ত হলাম যে তারা জনমতকে কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, আমরা যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছিলাম এবং যা করা অত্যন্ত জরুরি, সেই বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায় সেভাবে আসেনি। বিশেষ করে ‘দিন আনে দিন খায়’ এই সংখ্যাটা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তাদের নিয়ে কোনও কথা আমরা দেখতে পাইনি। এই খাতে বিএনপি ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী এই নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও কথা বলেননি। তিনি বলেছেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা বলয়টা আরও বড় করা হবে’। তবে কত বড় হবে বা তার জন্য কত টাকা বরাদ্দ করা হবে, এই নিয়ে কিছু বলা হয়নি।’’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আজকে যে ৭২ হাজার কোটি টাকা এবং আগে যে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন, তার বেশিরভাগই শিল্প, গার্মেন্ট শিল্পের জন্য ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ। এটা কিন্তু ঋণের প্রণোদনা।’

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য খাত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উপেক্ষিত হয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তাদের প্রয়োজনীয় সামর্থ্য বৃদ্ধি করা, যেমন—ভেন্টিলেটর, পরীক্ষা করার কিট, এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কোনও কথা বলেননি। তিনি স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কোনও অর্থও বরাদ্দ করেননি। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় বিমা করার কথা বলেছি। সবাই যেখানে পরীক্ষা, পরীক্ষা বলছে, সেখানে এখনও পরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ একমাত্র উৎপাদন খাত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে যাবে বলে দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে। বড় শিল্প খাতে যে ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে, তার মধ্যে সুদের হার সাড়ে ৪ শতাংশ সরকার ভর্তুকি দেবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে— বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই খাত থেকে যে হারে টাকা লুটপাট হয়েছে এবং বিদেশে প্রাচার হয়েছে, তার কিন্তু কোনও জবাবদিহি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিকদের বেতন-ভাতার জন্য যে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে, তা কি সরাসরি শ্রমিকদের কাছে যাবে, নাকি মালিকদের কাছে যাবে তা সুস্পষ্ট নয়।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন মূল সমস্যা হচ্ছে যারা দিন আনে দিন খায়, তারা। ইতোমধ্যে তারা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। আজও আমি দেখেছি, যারা বাসাবাড়িতে কাজ করতো, যারা হকারি ও চা দোকান করতো, তারা এখন রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে। তাদের আয়ের কোনও পথ নেই। এ বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একেবারেই অবহেলা করা হয়েছে।’

বাজেটে যে বরাদ্দ করা হচ্ছে, তা নিয়ে কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা করা হচ্ছে না উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘এই দুর্যোগময় মুহূর্তে যে বাজেট হবে সেটা কোথা থেকে আসবে, সেই সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনও আলোচনা হয়নি। সবচেয়ে বড় যে দুর্বলতা আমার কাছে মনে হয়েছে, সমন্বয়ের কোনও বিষয়ই নেই। স্বাস্থ্য খাতের যে সমন্বয় থাকার কথা সেটাও নেই। ডিজি হেল্থ এক কথা বলছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরেক কথা বলছেন। তার কথা শুনলে মনে হবে দেশে কোনও ভাইরাসের বালাই নেই। সারা পৃথিবী একটা ক্রাইসিসের মধ্যে পড়েছে। সেই বিষয়ে যদি সরকারের কাণ্ডজ্ঞান না থাকে, তাহলে কীভাবে একটা রাষ্ট্র টিকে থাকবে তা আমার বোধগম্য নয়।’

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘গার্মেন্টগুলো যখন ছুটি দিলো তখন দুই দিন পরিবহন খোলা ছিল। তখন গণহারে সবাই ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে। ভাইরাসের সব উপকরণ নিয়ে তারা গ্রামে গেছে। এখন আপনারা দেখছেন ঢাকার বাইরে মৃত ও সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে সেখানে পরীক্ষার কোনও ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে অনেকে মারা গেছেন। সেটা কিন্তু উঠে এসেছে। পরে বলা হলো ছুটি শেষ, ফিরে আসো। তারা তখন গণহারে পায়ে হেঁটে আসতে শুরু করলো। রাতে আবার বলা হলো ছুটি দেওয়া হয়েছে। আসলে কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে এগুলো করতে পারে। ভারতে একসঙ্গে ২১ দিন লকডাউন করা হলো। প্রধানমন্ত্রী নিজে মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘দেশে এখন পুরোপুরি লকডাউন করা উচিত। যে ভয়াবহতা আসছে সরকার তা এখনও অনুধাবন করতে পারছে না। অলরেডি গতকালের (শনিবার) চেয়ে আজকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। এটা বাড়তেই থাকবে। এটা উপলব্ধি করতে হবে। আর যদি মনে করি, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, ওভাবেই পরাজিত করবো। আমরা অবশ্যই পরাজিত করবো, তবে সেই অস্ত্র কোথায়। চিকিৎসা সামগ্রী কোথায়।’

/এএইচআর/এপিএইচ/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ