সেকশনস

৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি ও পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২৮ মে ২০১৯, ১৪:৫৬

আরিফ জেবতিক প্রতিবছর রমজানে বেশ কয়েকটি ঘটনা অবধারিত। এর মধ্যে রয়েছে—চাঁদ দেখা কমিটি কনফিউশনে পড়ে যায়, জাকাত বিতরণের সময় পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মানুষ মারা যায়, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি হতে থাকে, আর বিজিএমইএ এই সময়ে সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের কাছে ভর্তুকি, নগদ সহায়তা, প্রণোদনা এসব চেয়ে থাকে। আশা করেছিলাম অন্তত রুবানা হক একটু ব্যতিক্রম হবেন, কিন্তু সেই আশার গুড়ে এক কাপ বালি ঢেলে তিনিও আগামী ৫ বছরের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দাবি করেছেন। বিজিএমইএ’র ভাষ্য মতে, এই ভর্তুকি না পেলে দেশের পোশাক শিল্প চরম সংকটে পড়ে যাবে।
আমি বলি কী, আশির দশকে শুরু হওয়া একটা ব্যবসা আজ ৪০ বছর পরেও যদি ভর্তুকি দিয়ে চালাতে হয়, তাহলে সেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়াই ভালো। একেবারেই স্বাভাবিক বাণিজ্য বুদ্ধিতে বলে, চল্লিশ বছরে যে ব্যবসা ভর্তুকি ছাড়া চলতে পারে না, সেই ব্যবসা আর কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

কিন্তু আশপাশে তাকিয়ে আমাদের মনে হয়, সত্যিই এই দেশের গার্মেন্ট খাত ভর্তুকি ছাড়া চলবে না? গরিব শ্রমিকদের কথা বলে বলে এই দেশ দীর্ঘদিন এই খাতে সুবিধা দিয়ে চলছে। নগদ প্রণোদনা কোনও না কোনও রূপে সেই শুরু থেকেই আছে। এই একটা খাতে তেমন কোনও কর নেই। যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন তারা জানেন, ভ্যাট অফিসারের ভয়ে তটস্থ থাকতে থাকতে পাড়ার একটা মুদি দোকান মালিকের মাথার চুলও পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে রমরমা গার্মেন্ট ব্যবসার ওপর ভর করে সংসদের এক-তৃতীয়াংশ আসন কিংবা সিটি করপোরেশনের চেয়ার গার্মেন্ট মালিকরা পেয়ে যাচ্ছেন, এজন্য তাদের জীবনেও ভ্যাট দিতে হয় না। ছোটখাটো ট্যাক্স আরোপের চেষ্টা করলেই যে পরিমাণ চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়, কোনও সরকারই এই খাতকে ঘাঁটাতে চায়নি কোনোদিন।

তাহলে এই ভর্তুকির টাকাটা কোন খাত থেকে আসবে? আমার গরিব কৃষক, যে সাড়ে ৯শ’ টাকায় ধান উৎপাদন করে সাড়ে ৫শ’ টাকায় বিক্রি করছে, তার পুঁজি থেকেই তো এই ভর্তুকি, তাই না? যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গুটিকতক পণ্য বাজারজাত করে, তার গলা টিপে ধরা ভ্যাটের টাকাতেই তো এই ভর্তুকি, তাই না?

আপনারা গার্মেন্ট মালিকরা বুকে হাত দিয়ে বলুন—এই কৃষকের টাকা, এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টাকায় আপনাদের ভর্তুকি দেওয়াটা কি ন্যায্য হয়?

আজ যদি সত্যি সত্যিই এই দেশের গার্মেন্ট শিল্প সংকটের মধ্যে পড়ে থাকে, তাহলে তার দায়ভার কারা নেবে, সেটা দেখার জন্য আয়নায় মুখ দেখুন। গত চল্লিশ বছরে এই খাতকে এগিয়ে নিতে আপনাদের নিজেদের অবদান কতটুকু?

এই দেশে কয়েক হাজার ভারতীয় আর কয়েকশ’ শ্রীলংকান মিলে এই খাতের বড় একটা বেতনভাতা নিয়ে যাচ্ছে। কেন গত ৪০ বছরে আমরা মিড ম্যানেজমেন্টের একটা বড় শক্তি দাঁড় করাতে পারলাম না? কেন এটা নিয়ে আপনারা দেনদরবার করলেন না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোর্স চালু করালেন না, কেন আমার সব তরুণকে বিসিএস দিতে ভিড় করতে হবে আর ইন্ডিয়ান-শ্রীলংকানরা হাফ মিলিয়ন টাকায় চাকরি করে যাবে কারখানাগুলোতে?

চীনের কারখানাগুলো দেখেছেন? কয়টা কারখানা আছে যেখানে কারখানার পাশেই তারা বড় বড় টাওয়ার তৈরি করে শ্রমিকদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেনি? এই যে আপনারা আশুলিয়া-সাভার-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ থেকে হবিগঞ্জ পর্যন্ত শত শত বিঘা জমি কিনে রেখেছেন, তারা নিজেদের শ্রমিকদের জন্য কয়টি বাসস্থান তৈরি করেছেন? ফ্রি দিতে তো বলিনি, ভাড়াই নেবেন বা বেতন থেকে কাটবেন, কিন্তু করেন না কেন?

রানা প্লাজার মতো শত শত অবৈধ বিল্ডিংয়ে যে ২০১৩ সাল পর্যন্ত গার্মেন্ট কারখানাগুলো চলল, কতবার আপনারা মালিকরা জোর গলায় বলেছেন, ‘এই কারখানাগুলোতে বন্ড সুবিধা দেব না। মৃত্যুপুরি ইজ নট ইন আওয়ার নেম!’ বলেছেন কখনও? না, বলেননি।

আজ তাই আমাদের দুর্বল, জীবনভারে পিষ্ট শ্রমিকদের এফিশিয়েন্সি নেই। যে কাজ অন্য দেশে একজন শ্রমিক করে, সেখানে আমাদের শ্রমিক লাগে তিন জন। আর তাদের যে নেতৃত্ব দেবে, তেমন দেশীয় টেকনিশিয়ান তৈরি হয়নি, ইন্ডিয়ান-শ্রীলংকাদের ভিড়ে আমাদের সম্ভাবনাময় শিক্ষিত তরুণরা এই খাতে সুবিধাই করতে পারেনি কখনও। কেউ তাদের শেখায়নি, শেখাতে চায়নি।

আমাদের গার্মেন্ট কারখানার মালিকদের বুঝতে হবে, দুনিয়া এখন রকেট গতিতে দৌড়াচ্ছে। আলী এক্সপ্রেসের নাম শুনেছেন তো? চীনের কারখানায় তৈরি হওয়া একেকটি টিশার্ট সরাসরি আমেরিকার ক্রেতার বাড়ির ঠিকানায় চলে যাচ্ছে। এই সময়ে এসে বাল্ক বেসিক ডিজাইনের লাখ লাখ পিস প্রোডাক্ট শিপমেন্ট আগামীতে ঝুঁকির মুখে পড়বেই। এখন সেখান থেকে বের হতে হলে নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে, পাশ্চাত্যের দেশে নিজেদের অফিস-ফুলফিলমেন্ট সেন্টার-ব্র্যান্ড নিয়ে বসতে হবে। ইন্টারনেট যে অপার সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে, সেটার পুরো সুযোগ নিতে হবে।

দুনিয়া ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসছে। এই কঠিন কঠোর প্রতিযোগিতাময় দুনিয়ায়, সরকারের কোলে উঠে দশকের পর দশক শিল্প চালিয়ে নেওয়া যাবে না—এই কথাটি আমাদের বিজিএমইএ নেতারা যতো আগে বুঝবেন, ততোই সবার মঙ্গল।

লেখক: ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

ভারতকে হারানো জিডিপি: অহম নাকি আশঙ্কা করবো?

ভারতকে হারানো জিডিপি: অহম নাকি আশঙ্কা করবো?

সর্বশেষ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে ২৩ দিনের আল্টিমেটাম

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে ২৩ দিনের আল্টিমেটাম

কিউলেক্স মশা খুব বিপদজনক নয়: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

কিউলেক্স মশা খুব বিপদজনক নয়: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

ওয়েবের জন্য চুক্তিবদ্ধ মৌ

ওয়েবের জন্য চুক্তিবদ্ধ মৌ

৭৩৯৮ ভরি সোনা আত্মসাৎ: সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানের জামিন

৭৩৯৮ ভরি সোনা আত্মসাৎ: সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানের জামিন

‘বন্যপ্রাণী রক্ষায় আন্তরিকভাবে কাজ করছে সরকার’

‘বন্যপ্রাণী রক্ষায় আন্তরিকভাবে কাজ করছে সরকার’

সাংবাদিক মুজাক্কির হত্যার বিচার দাবিতে নোবিপ্রবিসাসের মানববন্ধন

সাংবাদিক মুজাক্কির হত্যার বিচার দাবিতে নোবিপ্রবিসাসের মানববন্ধন

ইরাকের মার্কিন সেনা অবস্থানে অন্তত ১০ রকেট হামলা

ইরাকের মার্কিন সেনা অবস্থানে অন্তত ১০ রকেট হামলা

ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক লোন নিতো তারা

ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক লোন নিতো তারা

কালীগঞ্জে গত ২০ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬

কালীগঞ্জে গত ২০ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬

কালীগঞ্জে গত ২০ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬

কালীগঞ্জে গত ২০ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬

আগুন নিয়ে খেলবেন না: যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া

আগুন নিয়ে খেলবেন না: যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ে জবাবদিহি নিশ্চিতের আহ্বান ইউজিসি চেয়ারম্যানের

বিশ্ববিদ্যালয়ে জবাবদিহি নিশ্চিতের আহ্বান ইউজিসি চেয়ারম্যানের

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.