X
রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ক্লাস-পরীক্ষা চালু করা সম্ভব

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৮:৩৪

উমর ফারুক
একটি চলন্ত ট্রেন একটুও না থেমে, শুধু গতি বন্ধ করে যদি আবার চলতে শুরু করে তাহলে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের অন্তত সাত মিনিট পর গন্তব্যে পৌঁছায়। শুধু গতি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সাত মিনিট বিলম্ব! গতিশীল পৃথিবী, গতিশীল অর্থনীতি ও গতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এই স্থবিরতার উদাহরণ খুবই আতঙ্কের। আমাদের পৃথিবী থমকে আছে গেলো এক বছর। তাহলে কতটা পিছিয়ে গেছে পৃথিবী? কতটা পিছিয়ে গেছি আমরা? কতটা পিছিয়ে গেছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা? কতটা পিছিয়ে গেছে আমাদের পথচলা? গন্তব্যে পৌঁছাতে আমাদের কতটা বাড়তি সময় লাগবে?

করোনাকালীন আমাদের বিদগ্ধ বহমান ইতিহাস বলছে, এই সংকটময় মুহূর্তে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া খাত আমাদের শিক্ষা। কোভিড-১৯ মহামারিতে, শিক্ষা খাত আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত। বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশের প্রায় ১৬০ কোটি শিক্ষার্থী প্রায় এক বছর যাবৎ শ্রেণিকক্ষ বিমুখ। প্রায় ১০০ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য আজ ব্যাহত। গেলো এক বছরে, পৃথিবীতে অন্তত ৪ কোটি শিশু প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নথি বলছে, করোনাকালে নেতিবাচক অর্থনীতির প্রভাবে অন্তত ২ কোটি ৩৮ লাখেরও বেশি শিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

অক্টোবর ২০২০, এশিয়ান জার্নাল অব এডুকেশন অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৯১ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মানসিক যন্ত্রণা ও অস্থিরতায় ভুগছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ৩৪ লক্ষ পথশিশু নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। গবেষণায় এও বলা হয়েছে, অন্তত ৫০ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ব্যাপক পারিবারিক সমস্যার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অন্তত ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রযুক্তি, টিভি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উদ্বেগজনক সময় পার করছে।

এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে আমাদের ভাবতে হচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে ফেরার সময় কি এখনও আসেনি? নাকি আরও অপেক্ষা করতে হবে? আমাদের অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম কী যথেষ্ট? আমাদের শিক্ষায় স্থবিরতার পথ আর কত দীর্ঘ হবে? নানান প্রশ্ন আমাদের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়, যেহেতু এই সংকট খুব শিগগিরই শেষ হওয়ার নয়, সেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে আমাদের এখনই ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এবং সেটা সম্ভবও। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস-পরীক্ষা দুটোই চালু করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হলো, সংকট থেকে মুক্তির পথ কী এবং কীভাবে? স্বাস্থ্যবিধি মেনে কি ক্লাস ও পরীক্ষা চালু করা সম্ভব? মনে রাখা দরকার, আমরা ইতোমধ্যে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সরাসরি নতুন বই পৌঁছে দিতে পেরেছি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা দুটোই চালু করা সম্ভব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালা খুলে দেওয়া সম্ভব। ধুলো মুছে ফেলা সম্ভব। এতে হয়তো সামান্য ব্যয় বাড়বে, পরিশ্রমও বাড়বে। বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য আমরা একটা উদাহরণ দাঁড় করাতে পারি। ধরে নিলাম, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, একটি শ্রেণিকক্ষে ৫১ জন শিক্ষার্থী পাঠগ্রহণ করে। এই শিক্ষার্থীদের আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে চাই। তাহলে প্রতি ভাগে পড়বে ১৭ জন। ফলে চেষ্টা করলে এই স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব। তিনটি পৃথক সময়ে তারা ক্লাস করবে। একইভাবে পরীক্ষাও। এই প্রক্রিয়ায় সবাই মুখোমুখি বসে ক্লাস করতে পারবে। এখন প্রশ্ন হলো, যখনই আমরা তিনটি পৃথক ভাগে ভাগ করবো তখন ক্লাসের সংখ্যা গাণিতিকভাবে তিনগুণ হয়ে যাবে। আমাদের শিক্ষক সংখ্যা কী সেই পরিমাণ আছে? আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কি সেই বাড়তি সক্ষমতা আছে? আমাদের শিক্ষকরা কি এই বাড়তি চাপ নিতে প্রস্তুত? আবার ধরে নিলাম, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে, সপ্তাহে তিনটি ক্লাস হতো। এখন যদি একটি শ্রেণিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় তাহলে ক্লাস সংখ্যা হবে নয়টি। এটা শিক্ষকের জন্য নিশ্চিতভাবে একটু বাড়তি চাপ। ফলে আমরা যদি ক্লাস সংখ্যা কমিয়ে সপ্তাহে দুটো করি তাহলে তাঁর চাপ কমে। আর বাড়তি চাপ সামলাতে তিনি সকাল-বিকেল ক্লাস নিতে পারবেন। একথা সত্য, অনেকেই এই বাড়তি চাপের বিরোধিতা করবেন। বলবেন, আমাদেরও তো একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে! আমাদের মনে রাখা দরকার, আমরা অধিকাংশ শিক্ষক এই করোনাকালে বাসায় অলস বসে বেতন-ভাতার সুবিধা ভোগ করেছি। ফলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে, তাদের মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজনে, শিক্ষার ধারাবাহিক সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনে এই বাড়তি চাপ আমাদের নেওয়া উচিত। ক্যাডেট কলেজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজিনা মমতাজ জাহান আপা, সেদিন খুব আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘স্যার ক্লাস না নিয়ে বেতন তুলতে আমার খুব লজ্জা করে। কে জানে কতদিন এই লজ্জা বয়ে বেড়াতে হবে!’ আমাদের শিক্ষক সমাজে রেজিনা আপারাই প্রকৃত উদাহরণ, যারা শ্রেণিকক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে কষ্ট পান। ফলে এই বাড়তি চাপকে শিক্ষকরা চাপ মনে করবেন না, আনন্দ মনে করবেন, দায়িত্ব মনে করবেন, এটা আমার বিশ্বাস। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে একটি বড় প্রশ্ন হলগুলো কি খোলা সম্ভব? উত্তর হলো, হ্যাঁ, হলগুলোও স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা সম্ভব। আমাদের হলগুলোতে যেসব বৈধ শিক্ষার্থী থাকার কথা যদি কেবল সেসব শিক্ষার্থীই হলে অবস্থান করে তাহলে ওখানেও স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব।

একটা বিশাল জট নিয়েই বেড়ে উঠছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। সেই জট আরও বাড়লো। ফলে জট নিরসনে আমাদের এখনই পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি, একই সঙ্গে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো আশু আবশ্যক। এবং একই সঙ্গে একথাও সত্য, পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের মূল গন্তব্য হতে পারে না। কিন্তু এটাও সত্য, মূল্যায়ন হতে হবে, সে যেকোনও পদ্ধতিতেই হোক না কেন। ফলে সময়ক্ষেপণ করে, বিনা মূল্যায়নে পার করে দেওয়া কোনও পদ্ধতি হতে পারে না। এই প্রক্রিয়া থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।

সবই উন্মুক্ত। বাজার, ধর্মালয়, সিনেমা হল সবই। সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য প্রচারণা চলছে। মিছিল চলছে। মিটিংও থেমে নেই। সম্প্রতি আতশবাজি ও ডিজে উৎস হলো পুরান ঢাকায়। শুধু আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। বিষয়টা খানিকটা হাস্যকর ও লজ্জার। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। যেহেতু স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুখোমুখি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব, সেহেতু তা এখনই শুরু করতে হবে। এখনই। করোনা সংকটে আমাদের শিশু ও যুবকদের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তা এখনই বন্ধ করতে হবে। নয়তো দীর্ঘস্থায়ীভাবে আমাদের অর্থনীতি ও সমাজকে ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত করবে।

‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এই দূর সত্যবচনটি আমরা বারবার আওড়াই। হৃদগভীর থেকে আওড়াই। আমরা বিশ্বাস করি, খুব শিগগিরই সবকিছু ঠিক হয়ে যাক। আজ অথবা কাল। আমরা বিশ্বাস করি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এখনই আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালা খুলে দেওয়া সম্ভব। পরীক্ষামূলকভাবে আগে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খোলার এখনই চূড়ান্ত সময়। নয়তো আমরা অনেকটা পিছিয়ে পড়বো। হয়তো কয়েক বছর, নয়তো কয়েক যুগ। সেই ক্ষণকালের গতিহীন চলন্ত ট্রেনের মতো।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

বিসিএস, বিসিএস এবং বিসিএস

বিসিএস, বিসিএস এবং বিসিএস

ঝরে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কী হবে?

ঝরে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কী হবে?

শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ, উপহার কেন নয়?

শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ, উপহার কেন নয়?

শিক্ষক হবো নাকি অধ্যাপক?

শিক্ষক হবো নাকি অধ্যাপক?

মানুষ শুধু ছুটছে কেন?

মানুষ শুধু ছুটছে কেন?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যেভাবে পাশে থাকতে পারে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যেভাবে পাশে থাকতে পারে

সর্বশেষ

এমপি বাদশার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুজব ছড়ানোয় জিডি

এমপি বাদশার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুজব ছড়ানোয় জিডি

সোনারগাঁয়ে সহিংসতা: কাউন্সিলর ফারুক ২ দিনের রিমান্ডে

সোনারগাঁয়ে সহিংসতা: কাউন্সিলর ফারুক ২ দিনের রিমান্ডে

রাষ্ট্রীয় সম্মানে শায়িত হলেন নাট্যজন মহসিন

রাষ্ট্রীয় সম্মানে শায়িত হলেন নাট্যজন মহসিন

মোবাইল থেকে কেটে নেওয়া টাকা কবে ফেরত আসবে?

মোবাইল থেকে কেটে নেওয়া টাকা কবে ফেরত আসবে?

‘রমজানে লকডাউন দিয়ে আলেমদের দমন গ্রহণযোগ্য নয়’

‘রমজানে লকডাউন দিয়ে আলেমদের দমন গ্রহণযোগ্য নয়’

ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার: অর্থমন্ত্রী

ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার: অর্থমন্ত্রী

‘মির্জা আব্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার’

‘মির্জা আব্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার’

আবারও দোকান খুলে দেওয়ার দাবি মালিক সমিতির 

আবারও দোকান খুলে দেওয়ার দাবি মালিক সমিতির 

করোনায় আক্রান্তরা দ্রুত মারা যাচ্ছেন: আইইডিসিআর

করোনায় আক্রান্তরা দ্রুত মারা যাচ্ছেন: আইইডিসিআর

আফগানিস্তানে এক পরিবারের ৮ জনকে মসজিদে গুলি করে হত্যা

আফগানিস্তানে এক পরিবারের ৮ জনকে মসজিদে গুলি করে হত্যা

অপরাধ দমনে ২ শতাধিক সিসি ক্যামেরা

অপরাধ দমনে ২ শতাধিক সিসি ক্যামেরা

‘মির্জা আব্বাস ইউটার্ন নিতে শেখে নাই’

‘মির্জা আব্বাস ইউটার্ন নিতে শেখে নাই’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune