X
মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

কোভিড-১৯ ও বাংলাদেশের ‘রহস্যময়’ প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৫

ডা. মালিহা মান্নান আহমেদ কোভিড-১৯ সামাল দেওয়া নিয়ে আমরা যতটা না ভয় পেয়েছিলাম, বাংলাদেশ তারচেয়ে বেশ ভালোভাবেই এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। মোটামুটি একটা বড় জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় না আসা পর্যন্ত নতুন ভ্যারিয়েন্ট ও ব্রেকথ্রু কেইস (টিকা দেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়া)-এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা চলবে। তবে এখন পর্যন্ত গত ১৯ মাসে আমরা যেহেতু তৃতীয় ঢেউ ও তৃতীয় লকডাউনের ধাক্কা সামলে উঠতে পেরেছি সেটার সাপেক্ষে এখন একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণা করা জরুরি। কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে আমরা একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছি, সেটা বুঝতে পারলে আমরা আমাদের সক্ষমতা সম্পর্কে বুঝতে পারবো। ‘কোভিড ১৯ ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক ব্রাউন ইউনিভার্সিটির একটি প্যানেল আলোচনায় পর্যবেক্ষণটি উপস্থাপন করেছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধি বরখা দত্ত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ড. পি. সারাভানামুত্তু।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৫ লাখ ৪০ হাজার কোভিড আক্রান্তের ৯৭ দশমিক ২ শতাংশই সেরে উঠেছে। আমাদের মৃত্যুর হারও এখন ১ দশমিক ৭৬ ভাগে রয়েছে। নিঃসন্দেহে আক্রান্তের আসল সংখ্যাটা আরও বেশি হবে— সেটা হতে পারে পরীক্ষার সংখ্যা কম ছিল কিংবা অনেকেই উপসর্গহীন ছিলেন। তার মানে, আমাদের সত্যিকার মৃত্যুর হারও আরও কম?

এমনটা হতে পারে, আবার না-ও পারে। কেননা, কোভিডের মতো উপসর্গ নিয়েও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। যেমন, সাতক্ষীরার কথা বলা যায়। সেখানে একপর্যায়ে কোভিডের মতো উপসর্গ নিয়ে ৪৪৬ জনের মৃত্যুর খবর বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেলো তাদের মধ্যে কোভিড-১৯ ছিল ৮০ জনের।

ভবিষ্যতের রেফারেন্সের খাতিরে এমন শ্রেণি করে হিসাব রাখলেই ভালো হতো- কোভিড সন্দেহে মৃত্যু, নিশ্চিত কোভিড, লং-কোভিড ও কোভিড-পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যু। যাবতীয় বিতর্কের পরও ২০২০ সালে বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর হার ছিল ৫.৫৪১। যার মানে হলো প্রতি হাজারে সাড়ে পাঁচ জন মারা গিয়েছিল। ২০১৯ সালেও সংখ্যাটা ছিল ৫.৫৪৫ জন। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এ সংখ্যাটা ছিল সন্তোষজনক।

ঠিক কোন জিনিসটা এখানে কাজে এসেছে? ২০২০ সালে সবার জন্য এটুআই-তে কাজ করার সুবাদে আমি একটা বিষয় জানি যে আমাদের কোভিড সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো অন্য দেশের মহামারি নিয়ন্ত্রণের সফল কৌশল, লোকজনের চলাফেরা, সম্পদের স্মার্ট ব্যবহার ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে নেওয়া বিজ্ঞানসম্মত মতামতের ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া। এটা সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর এমন এক সমন্বিত প্রচেষ্টা, যা প্রতিটি সময়ই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে সহায়তা করেছে। তেমনই কিছু সিদ্ধান্তের কথা এখানে বলবো। আর এসব তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভারটা আপাতত পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি।

তিনটি ঢেউ ও তিনটি লকডাউন

এ নিয়ে কোনও বিতর্কের অবকাশ নেই যে লকডাউনই সংক্রমণের চেইনটা ভাঙতে পেরেছিল। যেসব নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো অন্য সব দেশের সঙ্গে ছিল সঙ্গতিপূর্ণ—জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, কারখানা বন্ধ রাখা, জেলার ভেতর ও আন্তজেলার পরিবহন বন্ধ রাখা, ফ্লাইট বাতিল করা ইত্যাদি।

বিদেশ ফেরত আক্রান্তদের কারণে সৃষ্ট প্রথম ঢেউয়ের সময় পজিটিভ টেস্টের হার ছিল গড়পড়তায় ২৩ শতাংশ। আর সাধারণ লকডাউন তখনই তুলে দেওয়া হয়েছিল, যখন ছোটখাটো অনেক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে কোভিডের হটস্পটগুলোর ম্যাপিং করা সম্ভব হয়েছিল। ওই সময়কার তুলনামূলক ভালো তিনটি মাসের বলয়টা ভেঙে গিয়েছিল ২০২১ সালের মার্চে—বেটা ভ্যারিয়েন্টের আগমনে। ওই সময় যখন আবার শনাক্তের হার ১৮ শতাংশর কাছাকাছি চলে এলো তখনই আরোপ করা হলো দ্বিতীয় লকডাউন। এরপর খুব তাড়াতাড়িই সীমান্ত এলাকাগুলোতে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়লে তৃতীয়বারের মতো লকডাউন দেওয়া হয়। তখন রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের ১৫টি ‘রেড জোন’ জেলা থেকে ঢাকাকে রক্ষা করাই ছিল বড় লক্ষ্য।

তৃতীয় লকডাউনের ৪২ দিনেই ৪ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ নতুন শনাক্ত হয়, যখন কিনা ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে শনাক্ত ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার। এ সংখ্যা ও ২৮-৩১ শতাংশ শনাক্তের হার—দুটোই ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলে যায়, যাতে বলা হয়েছিল অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ডেলটায় আক্রান্ত এক ব্যক্তি গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার জনকে আক্রান্ত করছে। আগের সার্স কভ-২ ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ছিল ২ দশমিক ৫ জন।

স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বেড়েছে

২০২০ সালের এপ্রিলে যেখানে গোটা দেশের জন্য ঢাকায় মাত্র ৫টি টেস্ট সেন্টার ছিল, সেখানে এখন দেশজুড়ে আছে ৮০০টি। মোট পরীক্ষা কেন্দ্রের মধ্যে ৯০ শতাংশই এখন আরটি-পিসিআর। আর ১৪০টি আরটি-পিসিআরের মধ্যে ৮৬টি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারিভাবে। ৫৪৫টি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ও ৫১টি জিন এক্সপার্ট টেস্ট সেন্টারে বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ দিয়েছে সরকার। সরকারি কেন্দ্রগুলোতে আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় লাগছে জনপ্রতি ১০০ টাকা, দরিদ্রদের জন্য তা আবার বিনামূল্যে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে খরচ হচ্ছে ৩০০০-৪৫০০ টাকা পর্যন্ত। গত বছরেই আমদানি করা আরটি-পিসিআর টেস্ট কিটের দাম ৩০০০ থেকে কমে ৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৯৪ লাখ পরীক্ষা করা হয়েছে, যার ৭৪ শতাংশই হয়েছে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে। এখন দিনে পরীক্ষা করার সক্ষমতা ৫৫ হাজারের কাছাকাছি। অথচ, মহামারির একদম শুরুর দিকে আইইডিসিআর দিনে মাত্র ৩৩ জনের কোভিড পরীক্ষা করতে পারতো।

২০২০ সালের এপ্রিলে আমাদের কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল ছিল মাত্র ৯টি। এখন ১০০টি সরকারি ও ৩৯টি বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড ১৯ রোগীদের সেবা দিচ্ছে। ২০২০ সালের জুনে ২১৮টি সরকারি আইসিইউ বেডের মধ্যে মাত্র ৬৯টি ঠিকঠাক কাজ করতো। দেশজুড়ে তখন এর মোট সংখ্যা ছিল ৩৮১। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোভিড ডেডিকেটেড জেনারেল বেড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজারে, আইসিইউ হয়েছে ১৩২১টি ও এইচডিইউ বেড হয়েছে ৮৫৬টি।

আর ঢাকা যেহেতু দারুণভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এবং মোট শনাক্তের ৫৪ শতাংশ ও মোট মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই এখানে। আর তাই মোট হাসপাতালের ৪৪ শতাংশই আছে ঢাকায়। কোভিড আক্রান্তদের জন্য হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহের বিষয়টি শুরু থেকেই জানতে পারি আমরা, আর তাই সেই অনুযায়ী একটি কৌশল গ্রহণ করা হয় ২০২০ সালের জুনে। যে কৌশলের আওতায় কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর সেন্ট্রাল পাইপলাইনে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে তরল অক্সিজেনের ট্যাংক স্থাপন করা হয়। সেন্ট্রাল অক্সিজেন ট্যাংক, অক্সিজেন সিলিন্ডার ও অক্সিজেন কনসেনট্রেটর থেকে অক্সিজেন সরবরাহে হাসপাতালগুলোও তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়িয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সরবরাহ করা হয়েছে পিপিই।

আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বেশিরভাগটা পকেট থেকেই যায়। আর প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে কোভিড রোগীর চিকিৎসায় দিনে ৩৭ হাজার থেকে শুরু করে ৬৮,৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এ পরিমাণ খরচ ও সরকারি হাসপাতালের বেডগুলোর সংখ্যা—এ দুটো বিষয়ই সরকারি হাসপাতালে মৃত্যুর হার (মোট মৃত্যুর ৮৪ শতাংশ) বেশি হওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করতে পারে।

আমাদের ওষুধ শিল্পও এ কৃতিত্বের দাবিদার। দরকারি ওষুধপত্রের ৯৮ শতাংশই এসেছে এ শিল্প থেকে। শুধু টোসিলিজুমাব (অ্যাকটেমরা) ছাড়া। যে ইমিউনোমডিউলেটরটি ব্যবহৃত হয়েছিল সাইটোকাইন স্টর্ম কমানোর জন্য। এর বাইরে কোভিড ১৯ সংক্রমণের যাবতীয় ওষুধই তৈরি করা হয়েছিল দেশে। এমনকি সরকার যাতে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করতে পারে সেজন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সংরক্ষণ ফ্যাসিলিটিও বাড়িয়েছিল।

সরকারের যত প্রণোদনা প্যাকেজ

গত ১৯ মাসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। ৭২ হাজার ৭৫০ টাকার প্রথম প্রণোদনা প্যাকেজটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২০ সালের এপ্রিলে এবং ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা হয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বরে। এটি আমাদের জিডিপির ৪.৩ শতাংশ এবং এর ৭০ ভাগই বিতরণ হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে।

সর্বশেষ ৩২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয় ২০২১ সালের জুলাইয়ে। এর লক্ষ্য ছিল সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে লোকজনের কাজের সংস্থান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে শিল্পকারখানাকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন নানা খাতে কর্মরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে আসতে খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থ ও আবাসনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে।

একনজরে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রণোদনা প্যাকেজ

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও এনজিও খাত

মহামারি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউএসএইড যৌথভাবে ৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে বাংলাদেশকে। যুক্তরাজ্য, বিশ্বব্যাংক ও আরও কিছু দেশও বেশ ভালো অঙ্কের সহায়তা দিয়েছিল। স্থানীয় এনজিওগুলোকে এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বে দিয়েছিল ব্র্যাক। এক লাখ মানুষকে নগদ ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা করেছে সংস্থাটি। স্বাস্থ্যসেবা খাতে তাদের ৫০ হাজার নারীকর্মী কোভিড দূরীকরণ তথ্য শিক্ষা দিয়েছিলেন প্রায় ৪৭ লাখ মানুষকে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণাতেও তারা ভূমিকা রেখেছেন।

করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মানবিক সাহায্য সংস্থা; প্রত্যেকেই কমিউনিটির প্রতি যার যার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছিলেন। সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া ও খাবারের রেশন নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন।

এই সময়ে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০৬ কর্মকর্তাকে হারিয়েছি। হারিয়েছি কোভিড-১৯ ফ্রন্টলাইনে ডিউটিরত ১৮৬ ডাক্তারকে। সংসদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অর্থাৎ প্রায় ১০০ সংসদ সদস্য আক্রান্ত হয়েছিলেন কোভিডে এবং দুঃখজনক যে তাদের চার জনকেও আমরা হারিয়েছি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার

আমাদের ১১ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী আছে। এদের মধ্যে ১০ কোটি ৭০ লাখের ইন্টারনেট সংযোগ আছে এবং মোবাইল ব্যবহারকারীদের ৪০ শতাংশেরই আছে স্মার্টফোন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার করে সরকারি ও বেসরকারি খাত লকডাউনে টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে কার্যকরভাবে চালু করেছে ই-কমার্স, ই-হেলথ, ই-ব্যাংকিং, ই-গভর্ন্যান্স ও ই-এডুকেশন। আরও অনেক কিছুর মধ্যে মহামারির সময়টাতে আইসিটির সবচেয়ে বড় সেবাটা ছিল ‘সুরক্ষা’ পোর্টালের মাধ্যমে ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশন, করোনা হেলপলাইন ৩৩৩, ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম (মাইকোর্ট), টেলিহেলথ সেবা ও ডিজিটাল ক্লাসরুম। নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সুবিধাসম্পন্ন অনলাইন অফিস পরিচালনা, মুদিপণ্য কেনা, খাবারের অর্ডার ও ডেলিভারি অ্যাপ, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ফার্মেসি, বিল পরিশোধ, টেলিমেডিসিন ও বিনোদন পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছিল আইসিটির বিজনেস কনটিনিউইটি প্ল্যান।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার

ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও ভ্যাকসিন প্রকল্প

এফডিএ, ইইউ এবং ডব্লিউএইচও কর্তৃক জরুরি অনুমোদনপ্রাপ্ত ভ্যাকসিনগুলোর অনুমোদন দিয়ে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ এবং প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ (জনসংখ্যার ৮০%) বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এই অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশই সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে ২০২০ সালের নভেম্বরের প্রথম দিকে ভ্যাকসিন চুক্তি করে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারিতে এ যাত্রার সফল সূচনা হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারত ভ্যাকসিন রফতানি বন্ধ ঘোষণা করলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত একটি বিপর্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এদিকে ধাপে ধাপে ৬ কোটি ভ্যাকসিনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোভ্যাক্স। আর এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করেছে ৬৫ লাখ ফাইজার ও ৫৫ লাখ মডার্নার টিকা। জাপান দিয়েছে ৩০ লাখেরও বেশি অ্যাস্ট্রাজেনেকা, চীন দিয়েছে ৩৪ লাখ সিনোফার্ম ভ্যাকসিন।

বাংলাদেশ এখন বেশিরভাগ টিকা সিনোফার্ম থেকে কিনে স্থানীয়ভাবে প্যাকেটজাত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

টিকাদান কার্যক্রমটাকে সহজ করেছে সুরক্ষা অ্যাপ, যা নিবন্ধনের পাশাপাশি টিকার সনদও দিচ্ছে।

সৌদি আরব ও কুয়েতগামী প্রবাসীদের জন্য ফাইজার ও মডার্নার টিকা দিয়ে অযাচিত কোয়ারেন্টিনের খরচ কমাতে সরকার যে কৌশল নিয়েছে সেটাও কিন্তু প্রশংসার দাবি রাখে। স্কুল খোলার এই সময়টাতে ১২-১৮ বছর বয়সীদের ফাইজার ও মডার্নার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এখন পর্যন্ত মোট জনগোষ্ঠীর ১২ শতাংশ টিকার আওতায় এসেছে। ১৮ শতাংশ পেয়েছে এক ডোজ করে টিকা।

পরিস্থিতির উন্নয়নে আরও যা ভূমিকা রেখেছে

  • সরকারের ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি ও প্রতিটি ফোন কলে মাস্কের ব্যবহার নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার।
  • গত চার দশকে গড়ে ওঠা ইপিআই প্রোগ্রাম, যা কিনা কোভিড-১৯ টিকা কার্যক্রমের ভিত গড়ে দিয়েছিল। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ছয় দিনের গণটিকা কার্যক্রমে মোট ৫০ লাখ মানুষ পরিপূর্ণভাবে ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছিল।
  • জনসংখ্যা সমঘনত্ব ও সমজাতীয়তার কারণে যোগাযোগটা হয়েছিল সহজ। আবার বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নেতারাও সচেতনতা ছড়াতে অংশ নিয়েছিলেন।
  • ২০২০ সালে রেকর্ড পরিমাণ ১৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। একই বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
  • একটি গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ মিলেছে যে, ৬০-৭০ শতাংশ মানুষের শরীরে হয়তো ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ অ্যান্ডিবডি তৈরি হয়েছে।
  • যুব সমাজের একটি বড় অংশও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে বলা যায়। জাতির গঠনে এই যুব সমাজের উৎপাদনমুখী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিতে পারে।
  • ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রাখতে পারা।

আর্থসামাজিক প্রভাব

অনেক সূচকের মধ্যে কোনোটিতে কাঙ্ক্ষিত অর্জন আসতে দশকেরও বেশি সময় লাগলেও মহামারিতে এগুলো বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছিল-

  • ২০২১ সালে বাংলাদেশে ‘নতুন দরিদ্র’ হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ।
  • নারীদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চহার চলমান আছে। গত বছরেই চাকরি হারিয়েছিল প্রায় ১০ লাখ গার্মেন্ট কর্মী।
  • ৫৩টি জেলার ৬৫ হাজার নারী ও শিশুর ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে, এদের ৩০ শতাংশই মহামারিকালে প্রথমবারের মতো পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
  • স্কুল বন্ধ হওয়া, বেকারত্ব ও দরিদ্রদের ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাল্যবিয়ে বেড়েছে কয়েকগুণ।
  • তালিকাভুক্ত প্রায় আট হাজার যৌনকর্মী হয়েছে আশ্রয়হীন।
  • ১৮ মাস স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষায় ক্ষতি হয়েছে অনেক। এ সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১৫ হাজার বেসরকারি কিন্ডার গার্টেন স্কুল।
  • অভিভাবকের আয় কমে যাওয়ার কারণে ৪০ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার হয়েছে।
  • আগের চেয়ে কম হলেও এখনও কোভিড সম্পর্কিত মানসিক অবসাদ কেটে যায়নি।

আমাদের বিজয়, এরপর কী?

এ যুদ্ধে আমাদের বড় জয়টা হলো কোভিডে আমরা যাদেরই হারিয়েছি, আমাদের স্বেচ্ছাসেবী মানবিক সংস্থাগুলোর সুবাদে প্রত্যেকেই সম্মানজনক একটি শেষকৃত্য পেয়েছেন। আমাদের কোনও গণকবর খুঁড়তে হয়নি। এছাড়া, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো একজোট হয়ে খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলমান রেখে বেকারত্ব দূর করা, শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রেখে জিডিপি ধরে রাখা এবং সংক্রমণের চেইন ভেঙে ভারতের মতো ভয়ানক পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে দেশকে। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এসব উপাত্ত দেখানোর সুযোগ আমি পেয়েছিলাম তখন বিশেষজ্ঞ মডারেটররা কিন্তু বাংলাদেশের এসব সংখ্যাতত্ত্বের প্রতি মনোযোগী ছিলেন। তারা এও বুঝতে পেরেছিলেন যে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো মহামারিতে লাগাম দেওয়ার নেপথ্যে টিকার ভূমিকা ছিল না। এটা সম্ভব হয়েছিল আমাদের সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে, কৌশলের কারণে। এ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের আরও শক্তিশালীরূপে বেরিয়ে আসতে আমরা ছিলাম দৃঢ় প্রত্যয়ী। তাই আশা করি, এসব তথ্য-উপাত্ত নিজেদের সক্ষমতার ওপর আমাদের আত্মবিশ্বাস আরও জোরালো করবে। আর হ্যাঁ, এখনও মাস্ক পরতে ভুল করবেন না।

লেখক: অর্গানিকেয়ার-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। এমবিবিএস, এমবিএ ও হেলথ কেয়ার লিডারশিপ-এ স্নাতকোত্তর।

 

/এফএ/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

অজ্ঞতায় সুখ নেই

অজ্ঞতায় সুখ নেই

টিকা মানেই রক্ষাকবচ নয়

টিকা মানেই রক্ষাকবচ নয়

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

পাপের বোঝা হালকা হলো কি?

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৪১

ধ্রুব নীল কুকুরের একটা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য আছে। গাড়ি দেখলেই তাড়া করে। গাড়িটা থামলে বা সেটাকে যদি ধরেও ফেলে তারপর যে কী করবে, সেটা ওই কুকুর জানে না। তবুও সে উদভ্রান্তের মতো তাড়া করে। ইংরেজিতে যাকে বলে ন্যাচারাল ইনস্টিংক্ট। কুকুরের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাচ্ছি না। স্রেফ উদাহরণ দেওয়ার খাতিরে বলা। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতার কারণে প্রাণীটি এ কাজ করে। অন্য কোনও কারণে নয়।

প্রাণী হিসেবে মানুষেরও ন্যাচারাল ইনস্টিংক্ট ওরফে স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য আছে। মানুষ শুধু কিছু করেই সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, একটা কিছু ঘটিয়ে দিতে চায়। বিজ্ঞানীরা চান, নতুন কিছু বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে, লেখক চান এমন গল্প লিখে হইচই ফেলে দিতে, সিনেমার পরিচালক মনে মনে ভাবেন, এবার অস্কারে ডাক না দিয়ে যাবে কই। তো, এমন কিছু মানুষ আছে, যারা ‘গাড়ি’ দেখলেই ছোটে। গাড়ির পেছনের বাম্পারে ঝুলে পড়লে কী হবে জানে না তারা। অন্য গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে আহত হওয়ার ভয় আছে, সেটাও জেনেও ছোটে। তারা ওই ‘একটা কিছু করার’ মোহে দ্বিগবিদিক জ্ঞান হারায়। তাদের দরকার একটা কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার। শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, এরপর যে চেইন রিয়েকশন শুরু হবে এটা তারা জানে। একান ওকান হতে হতে তারা তখন গল্প বলে ‘রানী কাক প্রসব করেছেন’। তারপর আনন্দের সাগরে হাবুডুবু খায়। ‘আমি কী ঘটিয়ে দিলাম!’ ভাবতে ভাবতেই দিন কাটে রাত কাটে। খবরে খবরে তার কীর্তি। আনন্দের চোটে জিভ দিয়ে চুইয়ে পড়ে ডোপামিন হরমোন। মগজের কোণায় কোণায় বিকৃত খেলা দেখার আনন্দ। সে এটা বোঝে না যে, এসব খেলা একটা অসুখ—‘ভাইরাল’ ফিভার। আর ভাইরাল শব্দটা যে ভাইরাস থেকে এসেছে, এটা কি তারা জানে না?

যাদের কথা বলছিলাম, সেই ‘ভাইরাল’ জ্বরে অসুস্থ মানুষগুলো কোনও কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করে না। পুলিশ, প্রশাসন সবাই চায় সব সময় পরিস্থিতি নিয়্ন্ত্রণে রাখতে। ব্যাপারটি ওদের পছন্দ নয়। নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে যত বড় ঘটনাই হোক, তাতে এক শ্রেণির মানুষ ওই থ্রিলটুকু বোধ করে না। তারা চায় একটা কিছু ঘটিয়ে সেই নিয়ন্ত্রণের খুঁটি নড়বড়ে করে দিতে। দমকল বাহিনীর ছোটাছুটি, লাঠি হাতে হই হই করা কিছু তাগড়া জোয়ানের হুংকার, মাইকে মাইকে রক্ত টগবগ করা ভাষণ—  আড়াল থেকে এসব দেখা ওই সব খেলুড়েদের কাছে বিশাল এক বিনোদন বটে।

তারা এও জানে, এখনকার ফেসবুক-যুগে ‘সামান্য’ কিংবা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে কিছু নেই। যে কারণে কুমিল্লার গাছে কাক বসলে রংপুরে তাল পড়ে।

এরা তবে কারা? বেকার লোকজন? চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া বখাটে যুবক? অনবরত হুংকার দিয়ে কথা বলা কোনও বক্তা? নাহ, এভাবে শ্রেণিবিভাগ করা যাবে না ওদের। ওরা সবখানেই আছে। এরা হলো তারা, যাদের কাছে মানুষের সংজ্ঞা হলো ‘হিউম্যান ইজ আ স্যোশাল অ্যানিমেল।’ তারা একতাবদ্ধ, সামাজিকও বটে। কিন্তু অ্যানিমেল ক্যাটাগরি থেকে বের হতে পারেনি।

অনেকেই এখন বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ, অধ্যায় ও লাইন নম্বর টুকে বলছেন, ইসলামে এভাবে বিধর্মীদের ঘর পোড়াতে বলা হয়নি কিংবা ইসলামে সহনশীলতার এই এই উদাহরণ দেওয়া আছে। এটা কি আদৌ জরুরি? কোনও ধর্মেই তো এমন জ্বালাও পোড়াওকে বৈধতা দেওয়ার কথা নেই। ধর্ম মানেই তো সহনশীলতা, শান্তি। যে কারণে অন্তত আমার মনে হয় ‘রেফারেন্স’ টানার চর্চাটা বন্ধ করতে হবে। যারাই দাঙ্গা-হাঙ্গামার সমর্থনে কথা বলবে, তাদের চিনে রাখতে হবে। তার সঙ্গে জেনে বুঝে বাতচিত করতে হবে। তাকে চটানো চলবে না। তাকে হাসিমুখে বলতে হবে যে, ভাই আপনার নাতনির আকিকার মিষ্টিটা কিন্তু জয়গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে আনা হয়েছে। মানসিক বিকলাঙ্গকে তো আর ধরে বেঁধে রিমান্ডে নিয়ে ‘মানুষ’ বানানো যাবে না। তাতে বিদ্বেষের দুষ্টচক্রটাই বাড়বে।

আরও একটা বিষয় এখানে কাজ করতে পারে—  পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু ঘটলে (ধরুন চালের দাম ১৫০ বা ব্রয়লারের দাম ৩০০ টাকা হলো) তাতে আমরা সাধারণত প্যানিকড হই না। আমরা মানে সাতে-পাঁচে-চারে না থাকা জনগণ এসবে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। এসব ঘটনায় কোটি কোটি টাকা লুটপাট বা অগণিত মানুষের একবেলা খাবার অনিশ্চিত হলেও একজোট হয়ে জ্বালাও-পোড়াওয়ের প্রশ্নই আসে না। কেননা, এসব ঘটনায় বিশেষ সেই ‘ভাইরাল’ মজাটা নেই। পরিস্থিতি যখন পরিকল্পনার বাইরে যায়, তখনই খেলাটা জমে। আর খেলা মানে তো মগজের রসদ। সুতরাং এই যে জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়েছে এর উদ্দেশ্য মূলত একটাই, ভিন্ন কিছু খেলা চাই। নিরানন্দ ইস্যুবিহীন দিন যে ওই খেলুড়েদের কাটতেই চায় না। তারা মানুষকে দাবার ঘুঁটি বানায়। দুর্বল বিবেকসম্পন্ন ওই স্যোশিওপ্যাথদের ধর্মীয় ট্যাগ দেওয়াটাই বোকামি।

এ কারণে আমাদের আগেই বুঝে নিতে হবে, যে হিন্দুদের বাড়ি পোড়ায় সে কোন ধর্মের? উত্তর পেতে খানিকটা ফ্রয়েডীয় রিপ্রেশেন তত্ত্ব কপচানো জরুরি। ওই তত্ত্ব মতে, আমরা আমাদের ভেতর যন্ত্রণাদায়ক ঘটনা, স্মৃতি বা কোনও পাপের অনুভূতি ধরে রাখতে চাই না। তখন আমাদের অবচেতন মন সেই ঘটনা বা অনুভূতিটাকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ কাজটা অবচেতন মনও করে, আবার আমরা নিজেরাও করি। আগুন, জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, খুন—এসব ঘটনায় দেশের বেশিরভাগ মানুষ জড়িত না হলেও একটা বড় অংশ কিন্তু সেই বিকৃত খেলার অতি-নীরব দর্শক সেজে বসে আছে। তাদের ভেতর কাজ করে সেই রিপ্রেশন। নিজের ভেতর পাপের বোঝা এত বেশি যে তাদের অবচেতন মন বলছে, কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হলেও বোঝাটা হালকা করি। প্রতিমা, ঘর, মন্দির যারা পোড়ালেন, যদি ধর্মের দোহাই দিয়েই পোড়ান, তবে তাদের কাছে প্রশ্ন— পাপের বোঝা হালকা হলো, নাকি বাড়লো?

পরিশেষে ব্যাটম্যান সিরিজের ‘ডার্ক নাইট’ সিনেমার শেষের দিককার একটি দৃশ্যের প্রসঙ্গে টানা যাক। দুটো জাহাজ। একটিতে সাধারণ লোকজন, আরেকটিতে আছে সাজাপ্রাপ্ত একদল কয়েদি। দুটো জাহাজেই রিমোট কন্ট্রোলারচালিত বোমা রাখা আছে। একটি জাহাজের বোমার কন্ট্রোলার রাখা আছে আরেকটি জাহাজের লোকজনের হাতে। সময় দেওয়া হলো রাত ১২টা। এর মধ্যে কয়েদিরা যদি বাটনে চাপ দেয় তো সাধারণ লোকজন মারা যাবে, আর সাধারণ মানুষরা যদি বাটনে চাপ দেয় তো কয়েদিরা মারা যাবে। শেষতক ১২টা বেজে গেলেও কেউ বাটনে চাপ দেয়নি। দুটো জাহাজই ছিল অক্ষত। হারলো ভিলেন, জিতলো মানবতা।

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/

সম্পর্কিত

আফগানিস্তানে একটি বাতি বদলাতে ক’জন লাগবে?

আফগানিস্তানে একটি বাতি বদলাতে ক’জন লাগবে?

তোতাকাহিনি

তোতাকাহিনি

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৪

আনিস আলমগীর সাম্প্রতিক সময়ে ১৯৭২ সালের সংবিধান বা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা খুব বলা হচ্ছে। এই নিয়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় তুলেছে। তিনি চান বঙ্গবন্ধু সরকার প্রণীত ওই সংবিধানে ফিরে যেতে এবং প্রয়োজনে সংসদে প্রস্তাব আনতে। তবে এটি তার নিজের ইচ্ছায় নাকি দলীয় সিদ্ধান্ত, সে বিষয়ে তার বক্তব্য পরিষ্কার নয় বা তিনি কায়দা করে এটি এড়িয়ে গেছেন।

বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং পরিকল্পনা কতটা আছে সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে ’৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনার বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। বাহাত্তরের সংবিধানের সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা।

ভারত উপমহাদেশ থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্ম পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প দেখতে দেখতে এই অঞ্চলের মানুষ বড় হয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিল, যেটি হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। বাঙালি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- সবাই এক হয়ে দেশ গড়বে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এই স্বাধীন বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কখনও থেমে থাকেনি।

গত ১৩ অক্টোবর ২০২১ কুমিল্লায় একটি পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পর ওই ঘটনার জের ধরে ঢাকা, কুমিল্লা, ফেনী, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এমন দেশটি কারও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। বাহাত্তরের চেতনার সঙ্গে তা যায় না। পুলিশ জানিয়েছে, গত ১৩ অক্টোবর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দির, স্থাপনা ও বাড়িঘরে হামলার যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে ৭১টি মামলা হয়েছে এবং ১৮ অক্টোবর রাত পর্যন্ত এসব মামলায় ৪৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুসলিম মৌলবাদীরাই এসব করেছে তাতে সন্দেহ নেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সন্তোষজনক না হলেও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের নানা শ্রেণির ব্যক্তিরা এসব কলঙ্কজনক ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। ওদিকে, ঘোলা পানিতে মাছ ধরায় ব্যস্ত ভারতীয় হিন্দু মৌলবাদীরা।

বিবিসি বাংলা রিপোর্ট করেছে, ‘কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়া এবং সেটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি মন্দিরে হামলা ও পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে ভারতের সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষার দাবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম পোস্ট এবং কমেন্ট করা হচ্ছে। ভারতের সামাজিক মাধ্যমে শুধু যে বাংলা ভাষাভাষীরা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তা নয়। অনেক পোস্ট দেখা যাচ্ছে হিন্দি এবং ইংরেজিতে লেখা। বেশিরভাগ মানুষের পোস্ট বা টুইট দেখে বোঝাই যাচ্ছে তারা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত এবং পরিকল্পনা মাফিক পোস্ট করছেন। বিশেষত যেগুলো হিন্দি বা ইংরেজিতে লেখা সেখানে সরাসরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়া হচ্ছে।’

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন কয়েকগুণ বেড়েছে। আবার এই নির্যাতনকে কেন্দ্র করে ভারতেও বাড়ছে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্যাতন। ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যা এবং ২০২০ সালে দিল্লি গণহত্যায় মুসলমানদের প্রাণ দিতে হয়েছে হিন্দু জঙ্গিদের হাতে, যদিও এগুলোকে দাঙ্গা বলা হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশকে উদাহরণ দিয়ে ভারতীয় হিন্দু মৌলবাদীরা এসব বেশি প্রচার করছে তাদের হত্যা নির্যাতন জায়েজ করতে। এমনকি এই ঘটনাকে ক্যাশ করে আসন্ন উপনির্বাচনে জিতবে সেটাও প্রকাশ্যে বলছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির মৌলবাদী নেতৃত্ব।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে তা ধর্মীয় আবরণে ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিস আর ভারতে বিজেপি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভোটের বাজারে বক্তৃতা দিচ্ছে, যেন সংখ্যালঘুরা ভিন দেশি নাগরিক। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মর্যাদা দিতেও আপত্তি বিজেপি সরকারের। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের ভিন দেশি নাগরিক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু সেটা মগজে মৌলবাদ, হিংসা লালন করা ব্যক্তি বিশেষের কাজ, রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা নয়।

সম্ভবত এসব কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতকে সতর্ক করেছেন। ১৩ অক্টোবর হিন্দু নেতাদের পূজার শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় দেওয়া বিবৃতিতে তিনি যেভাবে সরাসরি ভারতের প্রসঙ্গ টেনেছেন, তার নজির বিরল। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতকেও সচেতন হতে হবে। ‘সেখানেও (ভারতে) এমন কিছু যেন না করা হয় যার প্রভাব আমাদের দেশে এসে পড়ে, আর আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত আসে।’

বাংলাদেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রকাশ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর কোনও বিষয় নিয়ে আপত্তি-অস্বস্তির কথা বলার নজির বিরল, যদিও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রশ্নে পান থেকে চুন খসলে ভারতের তরফ থেকে প্রকাশ্যে নসিহত করা হয়। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে আগে ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীর প্রসঙ্গ টেনে তাদের উইপোকার সঙ্গে তুলনা করলেও সরকারের তরফ থেকে অন্তত প্রকাশ্যে তা নিয়ে ভারতের কাছে কোনও প্রতিবাদ জানানো হয়নি।

যাহোক, অসাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি বাহাত্তরের সংবিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র। আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার এমনভাবে খুলে দিয়েছি যে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র বাজারকে এতটা নিয়ন্ত্রণহীন করে দেওয়া ঠিক না।

একটি রাস্তায় যদি ট্রাক-বাস-গাড়ি-রিকশা যে যেভাবে পারে চলে তাহলে সেখানে চলাচল অসম্ভব। সেই কারণে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ট্রাফিক পুলিশকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া আছে। এই তদারকি ছাড়া রাস্তায় যেমন যান চলাচল সম্ভব না, তেমনি ব্যবসার ওপর রাষ্ট্রের তদারকি না থাকলে বাণিজ্য বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে না। বাজারের ওপর যে সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই সেটা তো নিত্যপণ্যের বাজারে গেলেই দেখা যাচ্ছে।

ইভ্যালির মতো ভুঁইফোড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের হাজার কোটি টাকা মেরে দেওয়ার মধ্যেও তা প্রমাণিত। ডেসটিনি, যুবকের মতো প্রতিষ্ঠান একের পর এক জনগণের টাকা মেরে দিচ্ছে। রাষ্ট্র দেখে যাচ্ছে শুধু।

মাহবুবুল কবীর মিলন নামে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব ইভ্যালির ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন প্রকাশ্যে, কিন্তু রাষ্ট্র তার কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা সম্পর্কে প্রতিদিন সরকারকে সতর্ক করেছেন, সেখানেও রাষ্ট্র কোনও মাথা ঘামায়নি। তাতে মনে হচ্ছে সরকারের মধ্যে এই ভীতি কাজ করছে যে ব্যবসায়ীরা ক্ষেপে গেলে তাদের বিপদ হতে পারে। সরকার ব্যাংক লোন আদায় করতে পারছে না তাদের কাছ থেকে।

বাহাত্তরের সংবিধানে আমরা যদি ফিরে তাকাই তাহলে দেখি যে সেখানে ব্যবসায়ীদের এই লুটেরার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ ছিল না। ব্যবসায়ীদের সম্মানজনক পরিচয়ও ছিল না। সোসাইটি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে সম্মান করতো, সমাজে ব্যবসায়ী নয়, পেশাজীবীদের সম্মান ছিল। বঙ্গবন্ধু তার কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য একজন বিজ্ঞানীকে পছন্দ করেছিলেন। আজকের দিনে বিয়ের বাজারে বিজ্ঞানীর দাম ব্যবসায়ী থেকে বেশি নয় বলেই তো এখন আর বিজ্ঞান পড়ার শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।

বাহাত্তরের সংবিধানে রাষ্ট্রকে ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়েছিল, যা ইউরোপে এখনও বিরাজমান। সেই সামাজিক আদর্শ ধারণ করলে সমাজে আজ এই বৈষম্য সৃষ্টি হতো না। গরিব আর ধনীর মাঝখানের ব্যবধান এত বেশি দেখা যেত না। মধ্যবিত্ত নিষ্পেষিত হতো না।

জাতীয় সংসদ চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। সচিবালয়ও ব্যবসায়ীদের হাতে। ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেই বলছেন তিনি কী ব্যবসায়ী না মন্ত্রী মাঝে মাঝে সেটা ভুলে যান। ‘ক্ল্যাস অব ইন্টারেস্ট’ দেখা হচ্ছে না মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে। আগে একজন ব্যবসায়ী একজন উপ-সচিবের রুমে ঢুকতে অনুমতির অপেক্ষায় থাকতেন। এখন সেই ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী-মন্ত্রীর বন্ধু বলে উপ-সচিবকে মন্ত্রী তার রুমে ডেকে ব্যবসায়ী বন্ধুকে দেখিয়ে বলেন, উনার কী সমস্যা ওই সোফায় বসে ঝামেলা শেষ করে ফেলেন।

বিচার ব্যবস্থা আজ এত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে যে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাহাত্তরের সংবিধানে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করতে বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে আইন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার কোনোটারই প্রতিফলন নেই। বিচারপতি নিয়োগের কোনও যোগ্যতার মাপকাঠি লিপিবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হতে যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা নেই।

এমনকি সংস্কৃতির জগতেও এই ব্যবসায়ীরা প্রভাব ফেলেছে।

শেষ করার আগে বলতে চাই, ‘৭২-এর মূল সংবিধান এত কাটাছেঁড়া করার পর হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ওই সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা একটা রাজনৈতিক বুলি মাত্র। কিন্তু আমরা যেটি করতে পারি সেটা হচ্ছে, বাহাত্তরের সংবিধানের মূল লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, সকল প্রকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আমাদের ফেরত যাওয়ার অফুরান সুযোগ রয়েছে। আমরা সেই আদর্শ, লক্ষ্যকে ফিরিয়ে আনতে পারি। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

শেখ রাসেল: ফুল-পাখির অমলিন সুর

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১০

হায়দার মোহাম্মদ জিতু বিশ্বজুড়ে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে মানবাধিকার কাউন্সিল নামের সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। যদিও বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর ব্লকভিত্তিক কিংবা স্বার্থগত চর্চার কারণে দেশে-দেশে এর আচরণ ও কার্যক্রমের হেরফের আছে। অর্থাৎ কোথাও কোথাও একে বগলদাবায় ঘুমিয়ে পড়তে দেখা যায়, আবার কোথাও কোথাও মাত্রাতিরিক্ত সোচ্চার কণ্ঠে আলোড়ন তুলতে দেখা যায়। আরও বিস্তৃত অর্থে বললে, ১৯৪৬ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন সর্বস্থানে নিজেদের স্বতন্ত্রবোধ এবং সত্তাগত ভূমিকা ধরে রাখতে পারেনি। এ দেশের ক্ষেত্রেও এই যুক্তি উপস্থাপনের কারণ আছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর মানবাধিকার সংস্থাসহ আঞ্চলিক পর্যায়ের সংগঠনগুলোর কার্যত কোনও জাগরণ লক্ষ করা যায়নি। বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সুবিধা বিবেচনায় এবং নিজেদের পৃষ্ঠপোষকতার আদলে একে সর্বস্থানে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশলে সায় দিতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ফুল পাখির সুর শিশু শেখ রাসেল ও তাঁর পরিবারের অনাগত সন্তানগণ কোনও রাজনৈতিক মানচিত্র কিংবা হিসাব-নিকাশে পড়েন এ বিষয়ে সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী কিংবা মানবাধিকার সংগঠন-সংস্থাগুলো কোনও জোরালো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি।

বলা যায়, সেই বিচারহীন সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার ফলাফলই আজকের শিশুদের আক্রান্ত ও আক্রোশের কারণ। পরিসংখ্যান বিচারে না গেলেও এটা স্পষ্ট যে বর্তমানে শিশুরা ভীষণভাবে নির্যাতিত। তবে ট্র্যাজিডি হলো– টকশো-আলোচনায় এ নিয়ে বেশ সরগরম মন্তব্য এবং তাত্ত্বিক পরিসংখ্যান তুলে ধরলেও ময়নাতদন্তের আদলে এর সূত্রপাত কোথায় সেটার ইঙ্গিত করা হয় না।

পুকুরে একখানা ঢিল ছুড়লে তা পাড়ের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লহরি খেলে। কাজেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ রাসেলসহ তাঁর পরিবারের অনাগত সন্তানগণের আনুষ্ঠানিক অথচ বিচারহীন হত্যাকাণ্ডই যে এই বেড়ে চলা শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের সামাজিক প্রবাহের ফসল, সেটাও বুঝে ওঠা যৌক্তিক।

কেসস্টাডি শীর্ষক গবেষণার আশ্রয় নিলে তা-ই নির্দেশ করে। অথচ সেই হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের বিরুদ্ধে যদি দল-মত নির্বিশেষে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় পরিলক্ষিত হতো তবে আজ হয়তো কোনও শিশুকে কেউ পারিবারিক আক্রোশ কিংবা ফাঁদে ফেলে নির্যাতন ও মৃত্যুমুখে ফেলার সাহস করতে পারত না।

ভিন্নভাবে বললে, রাষ্ট্র এবং সামাজিক কাঠামোয় এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক শিশু হত্যাকাণ্ড, যা বিচারবহির্ভূত থেকেছে দীর্ঘদিন। অথচ এই বিষয়টিই ঘটেছে এবং ঘটা করে বহাল ছিল। নির্লজ্জের মতো বললে, সকলের নাকের ডগায়ই বিচারহীন রয়ে গেছে। কিন্তু কেউ একে প্রশ্নোত্তর বা জবাবদিহির ভেতরে আনেননি। অথচ একে সামনে আনা এবং বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজন ছিল।

কথায় আছে, লাভের গুঁড় পিঁপড়ায় খায়। কাজেই এখানে আর কেউ যেন বঙ্গবন্ধুর সাজানো বাগানে শিশু হত্যার মতো জঘন্য কার্যক্রম চালাতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এখানে এখনও কোথাও কোথাও পাকিস্তানি ভূত আওড়ানোর চেষ্টা দেখা যায়। সেই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি ভূত, শিশু নির্যাতনকারী সিরিয়াল কিলার জাভেদের মতো কেউ যেন ১০০ মায়ের বুক খালি করার সাহস বা টার্গেট করতে না পারে সেই বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি।

আর এসব মোকাবিলায় বাঙালির সাহস, আত্মবিশ্বাস শেখ হাসিনা। কারণ ঝঞ্ঝা, বিক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে সব অপশক্তিকে হটিয়ে সাম্য ও সততার বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনি বিরামহীন লড়াই করে যাচ্ছেন। তাঁর কারণেই দুধে-ভাতে মানুষ করার স্বপ্ন দেখা শিশুদের নির্যাতন করে এখন পর্যন্ত কেউ পার পায়নি।

শিল্প-সাহিত্যে মৃত্যুকে সব সময় নির্মম সত্য, সুন্দর এবং অবধারিত গল্প হিসেবে রূপায়িত করা হয়েছে। নান্দনিক শব্দশৈলী, চিত্রকর্ম এবং সুরে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু কখনোই তা হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নয়। আর শিশুদের ক্ষেত্রে তা নয়ই। তাই সব মিলিয়ে বলতে হয়, আজকের যে রাজনৈতিক, সামাজিক সম্পর্ক-সম্পদের আক্রোশে শিশু হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন তা যদি দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক আক্রান্ত ও হত্যাকাণ্ড শিশু শেখ রাসেলকে দিয়ে গর্জে উঠতো, তবে তা বহুলাংশেই রুখে দেওয়া যেত।

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।
[email protected]

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আজ মহাবরণের মহাদিন

আজ মহাবরণের মহাদিন

শুধু জীবনমান নয়, গুরুত্বে জনগণের আবেগও

শুধু জীবনমান নয়, গুরুত্বে জনগণের আবেগও

মিথ্যাচারে আক্রান্ত শেখ কামাল

মিথ্যাচারে আক্রান্ত শেখ কামাল

মানুষগুলোর শূন্যতাই বিশৃঙ্খলার কারণ

মানুষগুলোর শূন্যতাই বিশৃঙ্খলার কারণ

হাসুপা’র ছোট্ট রাসেল সোনা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৩৪

ড. জেবউননেছা সময়ের ঊর্মিমালায় বয়ে যায় শত স্মৃতি। কোনও একসময়ের ঘটনা রূপান্তরিত হয় স্মৃতির ডায়েরিতে। এমন এক দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায় গোটা জাতিকে। হৃদয়ের মণিকোঠায় ভেসে বেড়ায়, স্মৃতির ডায়েরিতে বেড়ে ওঠা প্রিয় মানুষদের নিষ্পাপ মুখগুলো। যারা দেশের তরে বিলিয়ে দিয়ে গেছে নিজেদের জীবন। ভোগের থেকে ত্যাগের মহিমায় যারা ছিলেন মহিমান্বিত। আজ এমন এক স্মৃতি প্রস্ফুটিত হবে আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। তবে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় যতটা না শিউরে উঠেছিলাম তার থেকে বেশি শিহরিত হচ্ছি ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে। বারবার স্তম্ভিত হয়ে পড়ছি লেখার মাঝে মাঝে। মনে হচ্ছে, এই তো আমি দেখতে পাচ্ছি কী ঘটেছিল ওই ভয়াল রাতে। তবে একটু পেছনের থেকে শুরু করি–

সময়টা ১৯৬৪ সাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পূর্ব পাকিস্তানে সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলের মোর্চা সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী কায়েদে আযম  মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছোট বোন দন্তচিকিৎসক এবং রাজনীতিবিদ ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণায় চট্টগ্রামে ব্যস্ত।

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বরে জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব তার সন্তানের নাম রাখলেন রাসেল। বঙ্গবন্ধু বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত ছিলেন। বঙ্গমাতাকে বঙ্গবন্ধু বার্ট্রান্ড রাসেলের জীবনী বাংলায় ব্যাখ্যা করে পড়ে শোনাতেন। বঙ্গমাতা তখন থেকে বার্ট্রান্ড আর্থার উইলিয়াম রাসেল, তৃতীয় আর্ল রাসেল ও এম এফ আর এস (১৮ মে ১৯৭২- ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০) ব্রিটিশ এই লেখক ও দার্শনিক ১৯৫০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং আত্মজীবনী ‘অটোবায়োগ্রাফি অব বার্ট্রান্ড রাসেল’র লেখকের ভক্ত হয়ে যান। বড় বোন শেখ হাসিনার স্মৃতিকথায় দেখা যায়, রাসেল যখন ছোট তখন তাকে বিছানায় শুইয়ে রাখতেন মা। আর পাশে বই পড়তেন বড় বোন শেখ হাসিনা। সেই বোনের চুলের বেণি ধরে খেলা করতো ভাইটি। রাসেলের জন্মের প্রথম দিন থেকে বোন সব ছবি তুলে রাখতেন। সেই সব ছবি হারিয়ে যায় ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তাদের বাড়ি লুটতরাজের মধ্য দিয়ে। বড় বোনের হাত ধরেই হাঁটতে শিখেছিল সে। বোল ফুটতেই বড় বোনকে ডাকতো ‘হাসুপা’ বলে। ছোটবেলা তাকে একটা পিঁপড়া কামড় দিয়েছিল। এরপর থেকে সে বড় পিঁপড়া দেখলে বলতো– ভুট্টো।

বাসায় বারান্দায় কবুতরের ঘর ছিল। একসময় মায়ের কাছ থেকে শিখে সে কবুতরকে খাওয়াতো। তাদের বাসায় কবুতরের মাংস খাবার রেওয়াজ থাকলেও সে কোনও দিন কবুতর খেতো না। ছোট ফুফার বাসায় গেলেই ফুফা তাকে শিখিয়েছিলেন ডিম পোচের সাথে চিনি দিয়ে খেতে। সেটাই পছন্দ ছিল। বেশ কয়েকবার এই খাবারটি খেতে দেখেছেন তাদের প্রতিবেশী অধ্যাপক ড. নাসরিন আহমাদ। তাঁর স্মৃতিকথায় রাসেল আপন মনে ঘুরে বেড়াতো বাড়ির লনে। তাদের একটি পোষা কুকুর ছিল, নাম ছিল টমি, যার সাথে রাসেল খেলতো।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশী ড. আব্দুস সামাদের চার ছেলে এবং শেখ রাসেল একসাথে খেলাধুলা করতো। রাসেলের ছিল চারটি সাইকেল এবং তাদের ছিল একটি সাইকেল। পাঁচটি সাইকেল নিয়ে পাঁচ জন ধানমন্ডির বিভিন্ন সড়ক অনুসন্ধান করতে বেরিয়ে যেতো বেলা ৩টা বাজলেই। মাঝে মাঝে পথ হারিয়ে ফেলতো। বুদ্ধি খাটিয়ে বাড়িতে ফিরে আসতো বন্ধুরা। একবার বাড়ির লনে বন্ধুদের সঙ্গে এক ফুটের একটি গর্ত করে রাসেলের বাসার অ্যাকুরিয়ামের সব গোল্ড ফিশ এনে সেই গর্তে দিয়ে দেয়। পরের দিন দেখা গেলো সেই মাছগুলো ব্যাঙ খেয়ে ফেলেছে।

১৯৭৫’র প্রথম দিকে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ধানমন্ডি প্লাবিত হলো। রাসেল বন্ধুদের সাথে বাসা থেকে বৈয়াম নিয়ে সেই পানি থেকে মাছ নিয়ে বৈয়ামে পুরে রাখলেন। পরে দেখা গেলো সেগুলো ব্যাঙাচি। বাসার লনে স্ট্যাম্প প্যাড দিয়ে ক্রিকেট খেলতো বন্ধুদের নিয়ে। বাবা যখন চলে আসতেন, গাড়ির হর্নের শব্দে সবাই গিয়ে রঙ্গন গাছের ঝোপে ইচ্ছে করে পালাতো। কারণ, রঙ্গন গাছের গোড়ায় পা দেখলেই বঙ্গবন্ধু গাড়ি থেকে নেমে শেখ রাসেলের বন্ধুদের কোলে নিয়ে আদর করে বলতেন, ‘বাবা কেমন আছে। ভালো আছো তোমরা।’ একবার তো দুই বন্ধু মারামারি করে পরস্পরের মাথা ফাটলো। বঙ্গবন্ধু বাড়িতে এসে দেখে বললেন, বাচ্চারা এমনই করে। বাড়ির লনে বৃষ্টির সময় গাছ থেকে পড়া আম খাওয়ার স্মৃতি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে রাসেলের আড়াই দিন তাদের বাসায় অবস্থানের স্মৃতি এবং ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট তাদের বাড়িতে প্রায় ১১টা পর্যন্ত খেলার স্মৃতিসহ এমন আরও অনেক স্মৃতি অমলিন রাসেলের খেলার সাথী সালমানের স্মৃতিতে।

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় বাড়ির বারান্দা থেকে মিছিল দেখে বলতো ‘জয় বাংলা’। পুলিশ দেখলে বলতো ‘ও পুলিশ কাল হরতাল’। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ তাদের বাড়িতে দুষ্কৃতকারীরা গুলি করলে সে গুলি শেখ রাসেলের পায়ের কাছে এসে পড়ে। তিনি বেঁচে যান। ছোট শিশুটি ১৯৭১-এর যুদ্ধে মায়ের সঙ্গে গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। আকাশে মেঘের মতো এয়ার রেইডের শব্দ হলে তুলো নিয়ে বোনের ছেলে জয়ের কানে গুজে দিতো। পাকসেনাদের অস্ত্র পরিষ্কারের পদ্ধতি জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে একসময় অস্ত্রের নাম শিখে ফেলেছিলেন। ১৯৭১’র বিজয়ের দিন রাসেল এবং তার চাচাতো ভাই টিটো দুই জন হেলমেট পরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেছিল। যে ছবি এখনও জীবন্ত। বন্দিদশা থেকে বাবা মুক্ত হয়ে যেদিন আসেন, সেদিন দাদার হাত ধরে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন বাবাকে আনতে। তবে রাসেল অভ্যস্ত ছিল বাবাকে না পেতে পেতে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচায়’ অসংখ্যবার রাসেলের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি  লিখেছেন, ‘ছোট ছেলেটা আমার কানে কানে কথা বলে। একুশ মাস বয়স। বললাম, আমার কানে কানে কথা বললে আইবি নারাজ হবে। ভাববে একুশ মাসের ছেলের সাথে রাজনীতি নিয়ে কথা বলছি। সকলেই হেসে উঠলো। এটা রাসেলের একটা খেলা, কানের কাছে মুখ নিয়ে চুপ করে থাকে আর হাসে। আজ আমার কাছ থেকে ফিরে যাবার চায় না। ওর মায়ের কাছে দিয়ে ভিতরে চলে আসলাম।’

ছোট শিশুটি বাবার সাথে বেশি একটা ঈদ উদযাপনও করতে পারেনি। করতে পারেনি জন্মদিন পালন। পায়নি যথেষ্ট পরিমাণে পিতৃস্নেহ। একসময় ১৮ মাস বয়সী রাসেল কারাগারকে বলতো ‘আব্বার বাড়ি’। তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন তার খালাতো ভাই শেখ শহীদুল ইসলাম। সে সময় ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয় এবং পুরনো অনেক বিদ্যালয়ে ভর্তি না করে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে। তৎকালীন অধ্যক্ষ রাজিয়া মতিন চৌধুরী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন পড়তে চাও এই বিদ্যালয়ে? শেখ রাসেল উত্তর দিয়েছিলেন, ভাই বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তাই আমিও পড়তে এলাম। খালাতো ভাই এই স্মৃতিটি ভুলতে পারেন না। মাঝে মাঝে বঙ্গমাতা যেতেন রাসেলের খবর নিতে। তাঁর সহপাঠী গীতাঞ্জলী বড়ুয়ার স্মৃতিতে রাসেলের স্কুল পোশাক নেভি ব্লু প্যান্টের সাথে চ্যাপ্টা বেল্ট এবং আকাশী সাদা শার্ট এখনও ভাসে। ভাসে খেলার মাঠে রাসেলের খেলার স্মৃতি। সহপাঠী বন্ধুরা আবদার করেছিল, তারা বঙ্গভবন দেখতে যাবে। তখন শেখ রাসেল বলেছিল, আচ্ছা পরীক্ষা শেষ হোক, তোমাদের সবাইকে বঙ্গভবন দেখাতে নিয়ে যাবো। পরীক্ষা শেষ হয়েছে অনেকবার। কিন্তু বঙ্গভবনে আর যাওয়া হয়নি বন্ধুর সাথে। ৪৬ বছর ধরে তার সহপাঠী বন্ধু আসিফ জামান সেই কথা ভুলতে পারেন না। ভুলতে পারেননি রাসেলকে হারিয়ে ক্লাসের সবাই একসাথে কান্না করার স্মৃতি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চ্যান্সেলর হিসেবে অতিথি হয়ে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। সেই অনুষ্ঠানে কীভাবে রাষ্ট্রপতিকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হবে সেই রিহার্সেল দিয়ে ছিলেন বিদ্যালয়ের সংগীত শিক্ষক জাহানারা খান। রিহার্সেল শেষে যখন রাসেলসহ সবাই শ্রেণিকক্ষে বসা, তখন বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশিদা জামান ক্লাসে গিয়ে গল্প শোনাতে শুরু করার পর আর একজন শিক্ষক চলে আসায় তিনি বলেন, ‘কাল তাহলে পুরো গল্পটা শুনাবো। কিন্তু শেখ রাসেল হাতটি ধরে বলেছিল, পুরো গল্পটি শেষ করেন ম্যাডাম। আমি গল্পটা শুনবো।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আচ্ছা কাল বাকিটা বলবো’। সেই কাল সেই শিক্ষকের জীবনে বহুবার এসেছে। কিন্তু যে গল্পটি শুনতে চেয়েছিল, তাকে আর গল্পটা শুনাতে পারেননি। ৪৬ বছর ধরে সেই শিক্ষক এই কথাটি ভুলতে পারেন না। 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে মালা আর পরানো হয়নি শেখ রাসেলের। তবে রাসেল মালা পরিয়েছিল পিতার জন্মদিনে কারাগারে ১৭ মার্চ, ১৯৬৭ সালে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘ছোট মেয়েটা (শেখ রেহানা) আর আড়াই বৎসরের ছেলে রাসেল ফুলের মালা হাতে করে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা নিয়ে রাসেলকে পরাইয়া দিলাম। সে কিছুতেই পরবে না। আমার গলায় দিয়ে দিলো।’ হয়তো ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এর ফুলের মালাটি সে পরাতে পারবে না বলেই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় আগেই পরিয়ে দিয়েছিল শিশু রাসেল।

বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতো শেখ রাসেল। তার মধ্যে ছিল নেতৃত্ব গুণ। খেলার সময় ঘণ্টা পড়ে গেলে বন্ধুদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনতো। স্মৃতিচারণটি করেন রাসেলের শ্রেণিশিক্ষক সিসিলিয়া গুদা। তার মধ্যে কোনও দিন রাষ্ট্রপতির সন্তানের আভিজাত্য লক্ষ করেননি শিক্ষক। রাসেলের বিদ্যালয়ের সংগীত শিক্ষক জাহানারা খান তাদের বিভিন্ন গান শেখাতেন। তার মধ্যে অন্যতম গান শেখাতেন, ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে ছুটি আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি’। এমন আরও অনেক গান। কে জানতো আকস্মিকভাবে পৃথিবীর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে শেখ রাসেল হয়ে যাবে নীল আকাশের একখণ্ড কালো মেঘ।

শেখ রাসেলের গৃহশিক্ষক গীতালী দাশগুপ্ত তার স্মৃতিচারণে বলেছেন, তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তুমি স্কুলে চকোলেট নিয়ে যাও তাহলে? বন্ধুদের দাও না? একা একা চকোলেট ওদের সামনেই খাও? উত্তরে বলে, ‘আপনি কিচ্ছু জানেন না। আমি ক্লাসের সবাইকে আগে দিয়া তারপর খাই। কোনও কোনও দিন আমার জন্য একটাও থাকে না।’

পরিবার থেকে শিখে বড় হচ্ছিল, নিজের জন্য নয়, সবার জন্য বাঁচতে হয়। আর একদিন তাঁর গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ার সময় অঙ্ক খাতা ছিঁড়ে ফেলেছিল। ছিঁড়ে আবার সে নিজেই মাটি থেকে তুলে নিয়ে তার শিক্ষককে বলেছিল, ‘আপা দেখেন, অঙ্কগুলো ছিঁড়ে নাই! পাশ দিয়া ছিঁড়েছে। অঙ্কগুলো আছে। ওরা (অঙ্কগুলো) যদি দুই টুকরো হয়ে যেত তাহলে ওরা ব্যথা পেত, তাই না আপা?’ অথচ কে জানতো তাঁর জীবনের অঙ্ক না কষতেই ছিটকে পড়বে জীবন থেকে।

অত্যন্ত সহজ সরল এবং মিশুক প্রকৃতির ছেলে ছিল শেখ রাসেল। রাসেলের ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে সামরিক কর্মকর্তা হবে। টুঙ্গিপাড়া তার গ্রামে একটি খুদে বাহিনী ছিল। তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়ে, তাদের বন্দুক দিয়ে প্যারেড করাত। সেই বাহিনীর জন্য বঙ্গমাতা কাপড় কিনে দিতেন। তার চাচা (শেখ নাসের) তাকে এক টাকার নোটের বানডিল দিতেন। সে টাকা দিয়ে তার খুদে বাহিনীকে লজেন্স ও বিস্কুট কিনে দিত। শেখ রাসেল ডাকটিকিট সংগ্রহ করে কৌটায় ভরে রাখতেন এবং বন্ধুদের দেখাতেন। পোশাকের ব্যাপারে ছিল সচেতন। দেশের বাইরে গেলে প্রিন্স কোট পরতেন। তবে একবার কোনও পোশাক পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইতো না।

বাবার সাথে ১৯৭২ সালে লন্ডন, ১৯৭৩ সালে জাপান এবং ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন। একবার ‘মপেট’ চালানোর সময় সাইকেলের পাইপে পা আটকে দিয়ে পা পুড়ে যায়। তখন পায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হলে তিনি রাশিয়ায় চিকিৎসা গ্রহণ করতে যান। তখন রাসেলকে সাথে নিয়ে পায়ের চিকিৎসা করানো হয়। শেখ হাসিনা তাঁর স্মৃতিচারণে বলেন, ‘এই ছোট্ট রাসেল, তাকেও তো গুলি করে মারা হলো। জানি না সেই বুলেটের যন্ত্রণা কী! সেটা তো আমরা বলতে পারি না’।

একটি বাচ্চা যার বিদ্যালয়ের খাতায় স্বাক্ষর করার জন্য বাবাকে নিয়মিত বাসায় পেতো না। দিনের পর দিন বাবাকে ছাড়াই মায়ের কাছে, ভাইবোনের কাছে বড় হয়েছে। যে কিনা মাকেই ‘আব্বা’ বলে ডাকতো। এমন একটি নিষ্পাপ শিশুকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার সাথে বাড়ির নিচতলায় আনা হয়েছিল তার চাচা শেখ নাসের, বাসার কাজের সহকারী আব্দুর রহমানকে (রমা)। বারবার সে আকুতি করছিল মায়ের কাছে যাবে। সে শিশু বাচ্চা মায়ের লাশ দেখে আকুতি নিয়ে বলেছিল, আমাকে হাসুপা’র কাছে নিয়ে যাও। যে কিনা বাসায় যা বায়না ধরতো তা-ই পেতো; সে তার শেষ আবদারের বদৌলতে পেয়েছে বুলেট। শেখ হাসিনা আফসোস করে তার স্মৃতিকথায় বলেন, ‘আমি জার্মানি যাওয়ার সময় রেহানাকে আমার সাথে নিয়ে যাই। রাসেলকে সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওর হঠাৎ জন্ডিস হয়, শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। রাসেলকে যদি আমাদের সাথে নিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে আর ওকে হারাতে হতো না’। দুই বোন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের যদি সবকিছু নিয়ে আমার বাবা মা ছোট্ট রাসেলকে ফিরিয়ে দিলে আমরা কিছু চাই না। আমরা সব দিয়ে দিবো।’ ৪৬ বছর ধরে দুই বোন রাসেলের জন্য চোখের পানি ঝরিয়ে যাচ্ছেন। দিন আসে দিন যায়, রাসেল আসে না। হাসুপা বলে ডাকে না। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘২ বছরের ছেলেটা এসে বলে আব্বা বাড়ি চলো। কি উত্তর ওকে আমি দিবো। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম। তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’

শেখ রাসেল সত্যিই এখন তার মায়ের কাছে থাকে বনানী গোরস্থানে। আর বঙ্গবন্ধু থাকেন টুঙ্গিপাড়ায় শ্যামল ছায়ায় তার বাড়িতে। কিন্তু কেউ কাউকে আর দেখতে আসে না। ‘রাসেল’ নামের আরবি অর্থ ‘প্রশংসনীয় পথ প্রদর্শক’। চকচকে এক জোড়া চোখের শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে হয়তো হতে পারতো কোনও বিষয়ে পথনির্দেশক। তবে সে মরেও পথ নির্দেশ করে দিয়ে গিয়েছেন, জানিয়ে গিয়েছেন ১০ বছর ১০ মাসের এই আমি শেখ রাসেল হারিয়ে গেলেও ফিরে আসব শত কোটি রাসেলের মাঝে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শেখ রাসেলের জন্মদিনকে ‘শেখ রাসেল জাতীয় দিবস’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শেখ রাসেলের বিদ্যালয়ে তার ছবিসহ ম্যুরাল এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শেখ রাসেলের প্রিয় সাইকেল এবং বিদ্যালয়ের খাতার মাঝে শেখ রাসেল বেঁচে থাকবে। ক্ষণজন্মা এই ছোট্ট রাসেলকে ৫৭তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন শেখ রাসেল। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘পিঁপড়ে ও বুনোরা আগন্তুককে অক্কা পাইয়ে ছাড়ে’। হ্যাঁ স্বল্পায়ু শেখ রাসেলকে কতিপয় পিঁপড়ে এবং বুনোরাই দেহকে বুলেট বিদ্ধ করেছে। শেখ রাসেলের জন্মদিনে তার হত্যাকারীদের ধিক্কার জানাই। ‘নীল লোহিত’ ছদ্মনামের লেখক প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘শিশু রক্ত’ কবিতায় লিখেছেন–

রাসেল, অবোধ শিশু, তোর জন্য

আমিও কেঁদেছি

খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে যারা

একদিন তুলেছিল আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি

তারাই দু’দিন বাদে থুতু দেয়, আগুন ছড়ায়-

বয়স্করা এমনই উন্মাদ!

তথ্যসূত্র:

১.   বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  (২০১৭), কারাগারের রোজনামচা, বাংলা একাডেমি।

২.   শেখ হাসিনা ( ২০১৮), আমাদের ছোট রাসেল সোনা, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী।

৩.   শেখ হাসিনা এবং বেবী মওদুদ সম্পাদিত  (১৯৯৬), ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ ইং, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট।

৪.   উত্তরণ (২০২১), স্মরণের আবরণে আমার বুঁচুসোনা শেখ রাসেল, গীতালী দাশগুপ্তা, আগস্ট সংখ্যা।

৫.   মাতৃভূমি, (২০১৯), জাতীয় শোক দিবস, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

৬.   শেখ রাসেলের খালাতো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ শহীদুল ইসলামের সাক্ষাৎকার, ৩০.০৯.২০২১ ইং।

৭.   অধ্যাপক ড. নাসরিন আহমাদের সাক্ষাৎকার, ৩০.০৯.২০২১ ইং।

৮.   শেখ রাসেলের শ্রেণিশিক্ষক রাশিদা জামানের সাক্ষাৎকার, ১৫.১০.২০২১ ইং।

৯.   শেখ রাসেলের শ্রেণিশিক্ষক সিসিলিয়া গুদার সাক্ষাৎকার, ১৫.১০.২০২১ ইং।

১০.  শেখ রাসেলের সঙ্গীত শিক্ষক জাহানারা খানের সাক্ষাৎকার, ১৫.১০.২০২১ ইং।

১১.  ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজেন অধ্যক্ষ সেলিনা আক্তারের সাক্ষাৎকার, ২৮.০৯.২০২১ ইং

১২.  শেখ রাসেলের সহপাঠী আসিফ জামানের সাক্ষাৎকার, ১৫.১০.২০২১ ইং।

১৩.  শেখ রাসেলের সহপাঠী গীতাঞ্জলী বড়ুয়ার সাক্ষাৎকার, ২৮.০৯.২০২১ ইং।

১৪.  শেখ রাসেলের খেলার  সাথী আব্দুল আলীম খান চৌধুরী সালমানের সাক্ষাৎকার, ০৭.১০.২০২১ ইং।

১৫.  কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিশুরক্ত’ কবিতা।

১৬.  বঙ্গবন্ধুর বাসার কাজের সহকারী আব্দুর রহমান রমার সাক্ষাৎকার, ২৮.০৯.২০২১ ইং।

 

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

শুভ জন্মদিন সবার প্রেরণা শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী

শুভ জন্মদিন সবার প্রেরণা শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী

৭৫’র শহীদ রিন্টুর গল্পটা কি আমরা জানি?

৭৫’র শহীদ রিন্টুর গল্পটা কি আমরা জানি?

বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্তজন শহীদ কর্নেল জামিলের কথা

বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্তজন শহীদ কর্নেল জামিলের কথা

তারুণ্যের প্রতীক সব্যসাচী শেখ কামাল

তারুণ্যের প্রতীক সব্যসাচী শেখ কামাল

শেখ রাসেল এক অনন্য শিশুসত্তা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৩

ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ নামের শুরুতেই আসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তিনি আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। দিয়েছেন পরাধীনতা থেকে মুক্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের একমাত্র নেতা। তাঁর ডাকেই বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তি সংগ্রামে। তিনি আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড পৃথিবীতে বিরল ও নজিরবিহীন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সপরিবার হত্যাকাণ্ডের কালো অধ্যায় আজও  আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় নানা বেদনায়। সেদিন হত্যাকারীদের কাছ থেকে রক্ষা মেলেনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলেরও। ছোট শিশুকেও হত্যা করে তারা। সেদিন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ১১ বছর বয়সে নির্মম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছে সম্ভাবনাময় শেখ রাসেলকে। আজ  তিনি জীবিত থাকলে, হয়তো দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতেন। আজ  সেই শিশু শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন। জাতি আজ  তাঁর জন্মদিন স্মরণ করছে হৃদয় থেকে।

শৈশব ও শেখ রাসেল

শেখ রাসেল ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকায় ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান। জন্মের পর বঙ্গবন্ধু নিজে সর্বকনিষ্ঠ পুত্রের নাম রাখেন শেখ রাসেল। এই নাম রাখার পেছনের একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। সেটি হলো, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় লেখক ছিলেন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব বার্ট্রান্ড রাসেল। তার নাম অনুসারে নিজের ছেলের নাম রাখেন। শৈশব থেকেই দুরন্ত প্রাণবন্ত রাসেল ছিলেন পরিবারের সবার অতি আদরের। তবে ছোট থেকেই রাসেল তাঁর বাবাকে খুব বেশি কাছে পায়নি। কারণ, সে সময় বঙ্গবন্ধুকে বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয়েছে জেলের মধ্যে। সে সময় পিতার সঙ্গে শেখ রাসেলের সাক্ষাতের একমাত্র স্থান হয়ে ওঠে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। পুত্র শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচায় ১৯৬৭ সালের ১৪, ১৫ এপ্রিলে লিখেছেন, ‘জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে তুললাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করলো। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বললো, ‘বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে, তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।’ রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগলো। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার ওপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়।

পিতার সঙ্গে তাঁর শৈশব

শিশুকাল থেকে চঞ্চল ও সর্বকনিষ্ঠ সন্তান হওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু খুব ভালোবাসতেন শেখ রাসেলকে। যদিও খুব বেশি সময় বাবার সঙ্গে যাপন করতে পারেনি শেখ রাসেল। এ অল্প সময়ের মধ্যেই পিতা-পুত্রের এক অন্যরকম হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শেখ রাসেল ছিলেন ভীষণ দুরন্ত। তার দুরন্তপনার সঙ্গী ছিল বাইসাইকেল। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছাড়াই সাইকেলে করে স্কুলে যেতেন পাড়ার আর দশ জন সাধারণ ছেলের মতো। বাবাকে দেখতে না পেয়ে মা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে আব্বা বলে সম্বোধন করতেন ছোট্ট রাসেল। এই চাপা কষ্ট ছোট্ট রাসেলের মতো তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অনুভব করতেন। যা স্পষ্টত ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকেই রাজবন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার পিতাকে রেখে আসবে না। পিতাকে ছেড়ে আসার কারণেই তাঁর মন খারাপ থাকতো সর্বদা। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ‘৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বাড়ি চলো।’ কী উত্তর ওকে আমি দিবো। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম, ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কী বুঝতে চায়! কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’

দেশরত্ন ও শেখ রাসেলের স্মৃতি

শেখ রাসেলের জন্মের পর বঙ্গবন্ধুর জেলযাপন অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে ছিল অধিক। অন্যদিকে বাড়িতে বেশিরভাগ সময় শেখ হাসিনা ও রেহেনার সঙ্গে সময় কাটাতেন রাসেল। তবে শেখ রেহেনা ও মাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা সংসার দেখাশোনা করতেন। এ সময়টায় রাসেলের একমাত্র সময় কাটানো ও খেলাধুলার সঙ্গী হন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তিনি  ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে লিখেছেন, ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করতো। ওকে বোঝানো হয়েছিল আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাবো। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকতো।

শিশু রাসেলের নেতৃত্বগুণ

শেখ রাসেল মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় ঘাতকের বুলেটে প্রাণ হারান। মাত্র ১১ বছর বয়সেই তাঁর কাজকর্ম ও আচরণে নেতৃত্বের গুণাগুণ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। তিনি যেখানেই যেতেই সেখানেই খেলার আয়োজন করতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক শিশুদের একত্রিত করতে পারতেন তিনি। এছাড়া স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে সে সময়ের তার বন্ধুর বয়ানে জানা যায়। একসঙ্গে পড়া তার এক বন্ধু সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, প্রায়ই শেখ রাসেল বন্ধুদের হাওয়াই মিঠাই কিনে খাওয়াতেন। নিজে খাওয়ার চেয়ে বন্ধুদের মধ্যে হাওয়াই মিঠাই বিলাতেই রাসেল বেশি পছন্দ করতেন। আর সেজন্য স্কুলের বাইরে থেকে হাওয়াই মিঠাই কিনে আনতেন। আর সেটা বিলানোর সময় প্রচুর হই-হুল্লোড় হতো। শেখ রাসেলের বন্ধু হাফিজুল হক রুবেল এক স্মৃতিকথায় বলেন, শেখ রাসেল ফুটবল খেলতে পছন্দ করতেন। ক্লাসের ফাঁকে বা টিফিনে তারা ফুটবল খেলতেন। খেলার ক্ষেত্রে রাসেলের আগ্রহই ছিল বেশি। তিনি অন্যদের উৎসাহ দিতেন। আর ক্লাসে তার আচরণ ছিল শান্ত। পড়া ধরলে সবার আগে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। আর উত্তর জানা না থাকলে চুপ করে থাকতেন। রুবেল আরও বলেন, রাসেল পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। ভালো রেজাল্টও করতেন। তখন স্কুলের নিয়ম ছিল রেজাল্ট শিটে অভিভাবকের স্বাক্ষর নিয়ে আবার স্কুলে জমা দিতে হতো। কিন্তু শেখ রাসেলের রেজাল্ট শিট জমা দিতে মাঝে মধ্যেই দেরি হতো। এজন্য সাধারণত তিন থেকে চার দিন সময় দেওয়া হতো। শিক্ষকেরা রেজাল্ট শিট জমা দিতে দেরির কারণ জানতে চাইলে রাসেল যথাযথ জবাব দিতেন। তার বাবা দেশে না থাকা বা রাষ্ট্রীয় কাজে ঢাকার বাইরে থাকার কারণেই এমন হতো বলে জানাতেন রাসেল।

নৃশংস হত্যাকাণ্ড

পৃথিবীতে যুগে যুগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কিন্তু এমন নির্মম, নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কোথাও ঘটেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ১১ বছর বয়সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঘাতকদের বুলেটে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন শিশু শেখ রাসেল। হত্যাকাণ্ডের সময় শিশু রাসেল আতঙ্কিত হয়ে কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘আমি মায়ের কাছে যাবো’। পরবর্তী সময়ে মায়ের লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিলেন ‘আমাকে হাসু আপার (শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দিন’। ‘মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে রাসেলকে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিরা। শেখ রাসেলের ছোট্ট বুকটা তখন ব্যথায় কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে শিশু রাসেলের ভেতরে কেমন হয়েছিল তা আজ অনুভব করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার নাম রাসেল

ঘাতকেরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধুর কোনও ছেলে অথবা কনিষ্ঠ পুত্র বেঁচে থাকলে একদিন দেশের নেতৃত্বে আসবে। তাই আগেভাগেই তাঁকে হত্যা করা হয়। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বাঙালি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতেন। বিশ্বের শোষিত মানুষের নেতা হতেন। অথবা বাবার দেওয়া নামের স্বাক্ষর রাখতেন পড়ালেখা ও গবেষণায়। বাঙালি জাতি একজন তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিশুকে হারিয়েছেন। যিনি ছোটবেলা থেকে অনেক গুণাবলি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর গুণাবলির স্বাক্ষর রাখতেন বড় হয়ে নিশ্চয়ই তিনি। কীভাবে ঘাতকেরা ফুটফুটে সুন্দর শিশুর বুকে গুলি চালাতে পেরেছিল? শেখ রাসেলের মৃত্যুতে আমরা এক অসম্ভব প্রতিভাবান শিশুকে হারিয়েছি। শেখ রাসেল আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার নাম।

রাসেলের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ুক শিশুদের মাঝে

শেখ রাসেল ছোট থেকেই মেধাবী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন। সবকিছুতে একটু ভিন্ন ও তীক্ষ্ণভাবে চিন্তা করতেন। কারণ, তিনি ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও আমাদের জাতির পিতা সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শেখ রাসেলের শরীরের প্রতিটি শিরায় বহমান ছিল সুন্দর আচরণ, মানবতা ও মমত্ববোধ। ফলে খুব দ্রুতই অন্য শিশুরা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতেন। শেখ রাসেলের শিশুকালের ব্যক্তিত্ব, মানবতাবোধ, উপস্থিত বুদ্ধি, দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন বিষয়গুলো বাঙালি জাতিসহ বিশ্বের সব সব শিশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। এটি হলে দেশ, জাতি ও বিশ্বের মঙ্গল হবে। বিশ্ব একটি সুন্দর, মেধাবী ভবিষ্যৎ পাবে। শেখ রাসেল তাঁর বন্ধুদের যেভাবে খাবার, বই ও ক্রীড়াসামগ্রী উপহার দিয়ে ভালোবাসতেন, ঠিক তেমনি দেশের সব শিশু তার বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করুক। শেখ রাসেল ছিলেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। তাঁর মৃত্যুতে জাতি এক সূর্যসন্তানকে হারিয়েছে। তার লালিত আদর্শ, চিন্তা ও মেধা বিশ্বের সব শিশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। এতে দেশ, জাতি ও বিশ্বের মঙ্গল হবে।

 
লেখক: অধ্যাপক; বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা

আওয়ামী লীগের এক সুদীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের পথপরিক্রমা

আওয়ামী লীগের এক সুদীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের পথপরিক্রমা

বিশ্ব শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু

বিশ্ব শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু

মুজিবনগর সরকারের গৌরবময় পঞ্চাশ বছর

মুজিবনগর সরকারের গৌরবময় পঞ্চাশ বছর

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে শেখ রাসেল দিবস উদযাপিত

প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে শেখ রাসেল দিবস উদযাপিত

জাকাত ব্যবস্থাপনায় নতুন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

জাকাত ব্যবস্থাপনায় নতুন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ডাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের 

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ডাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের 

ক্লুজনারের কাছে বিশ্বকাপের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’ আফগানিস্তান  

ক্লুজনারের কাছে বিশ্বকাপের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’ আফগানিস্তান  

রেললাইন থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

রেললাইন থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

ড্রেনে পড়ে দু’জনের মৃত্যু, কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে আইনি নোটিশ

ড্রেনে পড়ে দু’জনের মৃত্যু, কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে আইনি নোটিশ

শনাক্তের হার আবারও ২ শতাংশের ওপরে

শনাক্তের হার আবারও ২ শতাংশের ওপরে

জাপান উপত্যকায় চীন-রাশিয়ার যৌথ নৌমহড়া

জাপান উপত্যকায় চীন-রাশিয়ার যৌথ নৌমহড়া

টিকটক থেকে সোহানের ছবির নায়ক-নায়িকা

টিকটক থেকে সোহানের ছবির নায়ক-নায়িকা

ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করে কারাগারে সাংবাদিক

ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করে কারাগারে সাংবাদিক

টানা বৃষ্টিতে ডুবেছে বরিশাল নগরী

টানা বৃষ্টিতে ডুবেছে বরিশাল নগরী

আবারও বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম

আবারও বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune