তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক সাদামাটা করা জরুরি

আমিনুল ইসলাম সুজন
৩১ মে ২০১৬, ১৪:১৩আপডেট : ৩১ মে ২০১৬, ১৪:২৮

আমিনুল ইসলাম সুজন বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে তামাককে দায়ী করা হয়। বছরে ৬০ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বহু আগেই তামাকজনিত মৃত্যুকে মহামারী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কারণ, তামাকজনিত মৃত্যু ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, এইচআইডিভ/এইডস -এর সম্মিলিত মৃত্যুর চাইতেও বেশি। পৃথিবীতে অপুষ্টি, ক্ষুধা-দারিদ্র্য, যুদ্ধ, হত্যা ও আত্মহত্যাসহ অসংখ্য কারণে মানুষ মারা যান। কিন্তু প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জনের মৃত্যুর জন্য সরাসরি তামাক সেবনকে দায়ী করা হয়।
তামাকজনিত মৃত্যুর মিছিল কমিয়ে আনতে উন্নত দেশগুলো শক্তিশালী আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে বৃহৎ আকারের সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ও প্লেইন প্যাকেজিং প্রবর্তন, তামাকের উপর কর হার ও মূল্য বৃদ্ধিসহ বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যে কারণে উন্নত দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ১.১ হারে কমছে। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী প্রচারণা, দুর্বল আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তামাক কোম্পানির প্রভাব, স্বল্পমূল্য হওয়ায় বাংলাদেশের মত ঘনবসতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ২.১ হারে বাড়ছে।
এ প্রেক্ষাপটে সমগ্র পৃথিবীতে উদযাপিত হচ্ছে ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরালো করতে ১৯৮৭ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বছরের একটি দিন (প্রথম বছর হিসেবে ১৯৮৮ সালের ৭ এপ্রিল) বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসেবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু ১৯৮৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ৩১ মে নির্ধারণ করা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘Get ready for plain packaging', বাংলায় ভাবানুবাদ করা হয়েছে ‘সাদামাটা মোড়ক, তামাক নিয়ন্ত্রণে আগামী দিন’।
‘সাদামাটা’ শব্দটি খুবই সাদামাটাই! বাংলায় একঘেয়ে, পানসে, বিরক্তিকর, বৈচিত্র্যহীন, আকর্ষণহীন, গুরুত্বহীন ইত্যাদি বোঝাতে শব্দটির প্রয়োগ করা হয়। ২০১২ সালে অষ্ট্রেলিয়া পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক plain packaging- এর আওতায় আনে। এরপর বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের মধ্যে ইংরেজি ‘প্লেইন প্যাকেজিং’ এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে ‘সাদামাটা মোড়ক’ শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। সাদামাটা মোড়ক মানে এমন মোড়ক, যা সম্পূর্ণ আকর্ষণহীন। এতে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে কোনও তামাক কোম্পানি ও তাদের উৎপাদিত তামাক ব্র্যান্ডের লোগো, ব্র্যান্ডচিহ্নিত রং, আকর্ষণীয় কোনও লেবেল ও শব্দ বা শব্দগুচ্ছের ব্যবহার থাকবে না। বরং, তামাকজনিত রোগের বৃহৎ আকারের সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী থাকবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র আকারে ব্র্যান্ডের নাম থাকবে এবং সব তামাকের মোড়কে একই রঙের ও স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ব্যবহার করবে। এতে খুবই ক্ষুদ্র আকারে একটি নির্দিষ্ট রং ও ফন্টে সব তামাকজাত ব্র্যান্ডের নাম থাকবে।

আরও পড়তে পারেন: হয়রানি বন্ধে চূড়ান্ত হচ্ছে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা আইন

ধূমপান ও তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে সবচাইতে কার্যকর পদক্ষেপ হচ্ছে বৃহৎ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীসহ তামাকজাত দ্রব্যের সাদামাটা মোড়ক, যা তামাক সেবীকে তামাক ত্যাগে উৎসাহিত করবে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের তরফ থেকেও তামাক ও ধূমপানের নেশা ত্যাগের জন্য সংশ্লিষ্ট তামাক সেবী ও ধূমপায়ীর ওপর চাপ আসবে। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় তামাক সেবনের হার মাত্র ১২% এ নেমে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার ৪৩.৩%।

তামাক সেবন ও ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয়ে নানারকম প্রকাশনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন করতে হয়। কিন্তু তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে বৃহৎ আকারের স্বাস্থ্য সতর্কবাণীসহ সাদামাটা মোড়কের প্রচলন করতে কোন অর্থই ব্যয় করতে হবে না। এজন্য প্রয়োজন নীতিগত ও আইনী সিদ্ধান্ত।

তামাকজনিত যে মৃত্যুর মিছিল উন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, তা কমিয়ে আনতে সব তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক প্লেইন প্যাকেজিং তথা ‘সাদামাটা’ করার দাবি জোরালো হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের সাদামাটা মোড়কের প্রচলন করেছে যুক্তরাজ্য (ইংল্যান্ড, ওয়েলস, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড),  ফ্রান্স এবং আয়ারল্যান্ড। এছাড়া নরওয়ে, হাঙ্গেরি, স্লোভানিয়া, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ পৃথিবীর অনেক দেশ সাদামাটা মোড়কের দিকে ঝুঁকছে।

এদিকে গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) অনুযায়ী, ৪৩.৩% (প্রায় সোয়া ৪ কোটি) মানুষ বিভিন্নরকম তামাক ব্যবহার করেন। দেশে বর্তমানে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। এর মধ্যে ২৭.২% (২ কোটি ৫৯ লক্ষ) ধোঁয়াবিহীন তামাক এবং ২৩% (২ কোটি ১৯ লক্ষ) ধূমপানের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার করেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৪৫% অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ জনসমাগম স্থল ও গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। এর মধ্যে, ৩০% প্রাপ্তবয়স্ক নারী কর্মস্থলে এবং ২১% নারী জনসমাগমস্থলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ ধূমপান না করেও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি নারী।

তামাকের ব্যবহার যেহেতু বেশি, তাই মৃত্যুসংখ্যাও অনেক। সর্বশেষ টোব্যাকো এটলাস এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘন্টায় ১০.৫ জন, প্রতিদিন ২৫২ জন, মাসে ৭,৬৬৭ জন এবং বছরে ৯২,০০০ মানুষ মারা যান। বাংলাদেশে অন্য কোনও কারণে এত মানুষের মৃত্যু হয় না! সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও আলোচিত বিষয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার এর চাইতে অনেক কম, বেসরকারি হিসাবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ও সরকারি হিসাবে প্রায় ৬ ভাগের ১ ভাগ। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান কারণ ধূমপান ও তামাক সেবন।

প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি। বাংলাদেশের বহুল প্রতিভাধর ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ধূমপানজনিত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বিপুল অর্থব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও তাকে সুস্থ্য করা যায়নি। যুবরাজ নামে পরিচিত খ্যাতিমান অভিনেতা খালেদ খানও ধূমপানজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন শারীরিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে পরাজিত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বহির্বিশ্বে জনসমর্থন বৃদ্ধি ও আর্থিক সহায়তা করতে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর অন্যতম আয়োজক ও জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটল্স এর গায়ক জর্জ হ্যারিসন ধূমপানজনিত ক্যান্সারে মারা যান। এরকম হাজারো উদাহরণ দেয়া যাবে।

বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার ও ধূমপানজনিত যে মৃত্যুর মিছিল চলমান, তা কমিয়ে আনতে তামাকজাত দ্রব্যের সাদামাটা মোড়ক প্রচলন করা জরুরি। যারা ধূমপান ও তামাক সেবন করেন, তাদের প্রতি দু’জনের একজন তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েই মৃত্যুবরণ করেন। তামাকের কারণে বিভিন্নরকম ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়বেটিস, অ্যাজমাসহ নানাবিধ প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি হয়। তামাকজনিত অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী এবং এসব রোগ একবার দেখা দিলে কখনও ভাল হয় না। ফলে যে পরিবার এসব রোগে আক্রান্ত হয়, সে পরিবার নানা সঙ্কটে পড়ে। এসব রোগের চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে সরকারেরও স্বাস্থ্যখাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি বিত্তবানদের অনেকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে।

আরও পড়তে পারেন: বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস আজ: প্লেইন প্যাকেজিং দরকার বাংলাদেশে

বাংলাদেশ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদানে পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) ২০০৩ সালে স্বাক্ষর ও ২০০৪ সালে অনুস্বাক্ষর করেছে। অথচ তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কের ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রচলন করতেই এক যুগ পার হয়ে যায়। ধূর্ত তামাক কোম্পানিগুলোর ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে এ বছর ১৯ মার্চ থেকে সচিত্র সতর্কবাণীর প্রচলন হয়েছে। আগামী দিনে তামাকজাত দ্রব্যের সাদামাটা মোড়কের প্রচলন করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তামাক কোম্পানিগুলো সাদামাটা মোড়ক প্রচলন করার বিরুদ্ধে আগ্রাসী। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ যত দেশ সাদামাটা মোড়ক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে, সব দেশেই ফিলিপ মরিস, বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি)সহ বহুজাতিক মৃত্যুর ফেরিওয়ালা তামাক কোম্পানিগুলো সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। কিন্তু জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব রোধ করতে বদ্ধপরিকর এসব দেশের সরকারকে আইনী লড়াইয়ে পরাজিত করতে পারেনি। বরং লড়াইয়ে হেরে সিগারেটের মোড়কে বৃহৎ আকারের সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীসহ সাদামাটা মোড়কের প্রচলন করতে বাধ্য হয়েছে।

২০২৫ সালের মধ্যে তামাকের ব্যবহার ৩০% কমানোর যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া আগামী ১৫ বছরব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর কার্যকর বাস্তবায়নেও বাংলাদেশের সব তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক একইরকম সাদামাটা করা খুবই জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
সর্বশেষসর্বাধিক