(আমার নানী নূরজাহান বেগমের প্রতি শ্রদ্ধা)
আমার নানী নূরজাহান বেগম ছিলেন একজন সুন্দর মানুষ। যে কাজে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা তার শারীরিক সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে গেছে। আমৃত্যু তিনি নারীদের শিক্ষা ও মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। শক্তিশালী কলমের মধ্য দিয়ে তাদের চাপাপড়া মেধাকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।
নূরজাহানের জন্ম এমন এক সময়, যখন আমাদের সমাজে বিপ্লবী নারীদের খুব প্রয়োজন ছিল। ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম চালিতাতলিতে তার জন্ম। এরপর তিনি ওই সময়কার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কলকাতায় পাড়ি জমান। তার বাবা মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন ছিলেন একজন বিখ্যাত সাংবাদিক। কলকাতা থেকে ১৯১৮ সাল হতে প্রকাশিত নেতৃত্বাস্থানীয় বাংলা সাহিত্য পত্রিকা সওগাত এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন নাসিরুদ্দিন। মেয়ে নূরজাহানকে স্কুলে পাঠানো ছাড়াও তাকে গান, নাচ, অভিনয়, খেলা, চারু ও কারুকলা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে শুরু করেন। ওই সময় মুসলিম পরিবারগুলোতে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোও স্বাভাবিক বিষয় ছিল না। মা ফাতেমা খাতুন ছিলেন নূরজাহানের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। তিনিই নূরজাহানকে আরবি লেখা ও পড়া শিখিয়েছেন। সেলাই, রান্না ও একজন পূর্ণাঙ্গ নারী হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয়তা নূরজাহান পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকেই।
১৯৪২ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্ল’স স্কুল থেকে এন্ট্রাস পরীক্ষা দিয়ে নূরজাহান ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবর্ন কলেজে। এখান থেকেই ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। প্রগতিশীল মনস্ক ব্যক্তি হওয়ার কারণে মো. নাসিরুদ্দিন মনে করেছিলেন সাহিত্য ক্ষেত্রে নারীদের (বিশেষ করে মুসলিম নারী) সামনে নিয়ে আসতে হলে তাদের জন্য পৃথক ক্ষেত্র তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবনা থেকেই উপমহাদেশে নারীদের প্রথম ও একমাত্র সাময়িকী ‘বেগম’ প্রকাশ করা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই সাময়িকীটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশের পরই নূরজাহান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সাময়িকীটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, এর সব লেখক ও প্রদায়ক ছিলেন নারী। এ সাময়িকীর মাধ্যমে নারীরা তাদের সামাজিক শৃঙ্খলায় চাপাপড়া সামর্থ্য ও উৎসাহ প্রকাশ করার সুযোগ পেলেন। দেশের আনাচে-কানাচে থাকা সব নারীকেই তাদের লেখা পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া হতো। ‘বেগম’ সাময়িকী ছিল উপমহাদেশের প্রথম সাময়িকী, যা নারী লেখকদের ছবি প্রকাশ করেছিল। সব বাধা ও নিষেধ অতিক্রম করে ১৯৪৭ সালে ‘বেগম’-এর প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে মুসলিম নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ছাপা হয়েছিল।
১৯৫০ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর পরিবার স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন মো. নাসিরুদ্দিন। নতুন ঠিকানা ঢাকার পটুয়াটুলির ৬৬ থেকে ‘বেগম’ ও ‘সওগাত’ প্রকাশিত হতে লাগলো।
এতেই থেমে থাকেননি প্রচণ্ড মেধাবী বাবা ও মেয়ে। ১৯৫৪ সালে ‘বেগম’ সাময়িকীর সব লেখক ও প্রদায়ককে একত্রিত করার জন্য তারা গড়ে তোলেন ‘বেগম ক্লাব’। বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন শুরু করে ‘বেগম ক্লাব’। এ সম্মেলনে নারীরা তাদের মত ও ধারণা তুলে ধরতেন। বৃদ্ধি পেতো তাদের সম্পাদনার দক্ষতা। নাচ-গানের অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে শুরু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সমাজ সেবার উদ্যোগ নিয়ে ক্লাবটি তার কার্যক্রম বহুমাত্রিক দিকে নিয়ে যায়। প্রতি সপ্তাহে বাসায় সেলাই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হতো। যেখানে প্রাণবন্ত আবহে নারীরা নিজেদের স্বালবম্বী ও আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ পেতেন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সংগ্রামের মধ্যেই আমার নানী খুঁজে পান তার যথার্থ জীবন সঙ্গী। আমার নানা রোকনুজ্জামান খান (দাদা-ভাই বলে বেশি পরিচিত) প্রথম দিকে কিছুদিন ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ ও ‘শিশু সওগাত’-এ কাজ করেছেন। এরপর ‘দৈনিক ইত্তেফাকে’ সাহিত্য ও ফিচার পাতার সম্পাদক হন। ছিলেন ‘কচি কাচার আসর’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ১৯৫২ সালে নূরজাহান ও রোকনোজ্জুমান বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। নারীর প্রগতিশীলতা নিয়ে কাজে ব্যস্ত থাকেন নূরজাহান আর তার স্বামী পরিণত হন প্রখ্যাত সাংবাদিক, কবি ও শিশুদের শৈশব নিয়ে করা ব্যক্তিতে। ১৯৫৬ সালে দাদা-ভাই প্রতিষ্ঠা করেন ‘কচি কাচার মেলা’ নামক শিশুদের সংগঠন। শিশুদের নির্মল শরীর ও মন গঠনের জন্য আজীবন এ সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করে গেছেন তিনি। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল শান্তিময়। ধারাবাহিকভাবে একে অন্যের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা সমাজে তাদের আরও বেশি উজ্জ্বল করে তুলেছে।
১৯৪৭ সালে ‘বেগম’-এর শুরু থেকে ২০১৬ সালে ২৩ মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত নূরজাহান বেগম নিবেদিত ও দক্ষ সম্পাদক হিসেবে দেশের সব অংশের হাজার হাজার নারী লেখকের জন্য পথ সুগম করে গেছেন। জীবিত থাকা অবস্থায় একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৭), অন্যন্যা সাহিত্য পুরস্কার (২০০২), একুশে পদক (২০১১)। তবে তার কাজের সবচেয়ে বড় পুরস্কার দেশের লাখো নারীর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। যেসব নারীদের তিনি উৎসাহিত করেছেন ও পরিবর্তন করেছেন।
আমি নানীকে দেখেছি একজন বহুমুখী মেধা ও বহুমাত্রিক নারী হিসেবে। যিনি প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠতেন, সাদা চুলে কালো পাতলা কাপড়ের ফিতা বেঁধে জীবনের উৎকর্ষের জন্য কাজে নেমে পড়তেন।
‘বেগম’ শুধু বিবাহিত নারীর পদবি নয়। আমার নানী যা ছিলেন, তা-ই আমার কাছে ‘বেগম’-এর যথার্থ তাৎপর্য। তিনি ছিলেন একাধারে একজন নারী, একজন স্ত্রী, একজন মা এবং তার আশপাশের মানুষের জন্য অনেক কিছুই করেছেন। আমার দেখা সবচেয়ে দয়ালু মনের মানুষ তিনি। নারীর মুক্তির জন্য সারাক্ষণ কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঘর সামলেছেন সমান গুরুত্ব দিয়ে। তিনি ছিলেন খুব ভালো রাঁধুনি। আমাকে প্রথম মাছ রান্না শিখিয়েছিলেন। তার বিখ্যাত হারি কাবাব রান্নাও আমাকে শিখিয়েছেন তিনি! যতদিন তার রান্না করার সামর্থ্য ছিল ততদিন কোনও একটি ঈদের দিনও আমরা তার হাতের সুস্বাদু রান্না না খেয়ে কাটাইনি। নানী ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু কখনোই নামাজ পড়া ভুলতেন না। অবসর সময়ে তিনি লুডু খেলতে পছন্দ করতেন বাড়ির প্রিয় মানুষদের সঙ্গে। সবক্ষেত্রের মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধা তিনি পেয়েছেন। আমি তার মতো অমায়িক, ক্ষমাসীল ও সহজাত মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবতেই পারি না। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই ‘বেগম’। এই আলোকিত নারী অসংখ্য নারীর জীবন উদ্ভাসিত করেছেন নিজের প্রদীপ্ত মশাল দিয়ে।
আমার নানীকে ভালোবেসে নুরি বলে ডাকা হতো। প্রকৃতপক্ষেই গাঢ় অন্ধকার তার আলোতেই জ্বলজ্বলে হয়ে উঠেছে। যদিও তার মৃত্যু আমাদের সমাজের জন্য বিরাট ক্ষতি। তবে তিনি যে কর্ম নির্দেশনা ও উদাহরণ আমাদের মাঝে রেখে গেছেন তা নারীদের কল্যাণের পথ আলোকিত করে যাবে। সবার প্রিয় ‘বেগম’ হয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। সারাজীবন যত ‘বেগম’কে উদ্ভাসিত করেছেন, তাদের মধ্যেও তিনি বেঁচে থাকবেন।
লেখক: নুরজাহানের বেগমের বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন খানের একমাত্র কন্যা ।



