উৎসবে মেঘ

তুষার আবদুল্লাহ
১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৭:৪২আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৭:৪৫

তুষার আবদুল্লাহ আবারও বিপর্যয়। রোজার ঈদের আগে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট এবং বেকারিতে জঙ্গি হামলা। ঈদের দিন শোলাকিয়ায় হামলা। এর মধ্য দিয়েই ঈদের সময়টি পেরিয়ে যেতে হয়েছে। ভয়, আতংক নিয়েতো ঈদ উদযাপন করা সম্ভব না। বলা যাবে না সেই শোক, আতংক আমরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছি। তবে নিজেদের সামলে নিয়ে এবার কোরবানির ঈদ স্বস্তির সঙ্গে উদযাপনের একধরনের মানসিক প্রস্তুতি চলছিল। এর মধ্যেই শুক্রবার বিকেলে খবর এলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর।
আখতার জাহান জলি’র ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী এবং আমরা যারা তাকে জানতাম, তাদের পক্ষে এবারের ঈদ উৎসবকে উদযাপন করা সত্যিই সম্ভব? মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিপর্যয় এবং মনস্তাত্ত্বিক ধস সামলাতে না পেরে কেউ কেউ আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা একে এক ধরনের মানসিক দুর্বলতার কথা বললেও, আমরা অস্বীকার করতে পারিনা- সমাজ এ ধরনের মানসিক বিপর্যয়ের পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে। প্ররোচিত করছে জীবনকে হত্যার। এর নানা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আসতে পারে। কিন্তু সকল তর্কের ভাগশেষ হলো আখতার জাহান জলি’র মতো অনেককেই বিদায় নিতে হয়। তাকে হারিয়ে বিপন্ন হয় সন্তান পরিবার।
পরিবারের সঙ্গে ঈদ উৎসবে ঘরমুখো মানুষ পথে কী বিড়ম্বনার মুখে পড়েছেন, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রতিবারের চেনা দৃশ্য। যাত্রা শুরু করতে গিয়ে বাহনে উঠতে পারার একটি লড়াই আছে। যাত্রা শুরুর পর পথে কতো সময় ব্যয় করতে  হবে, কতো ঘণ্টার যাত্রা কতো ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে, তার কোনও নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। আমরা দেখতে পাচ্ছি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস, ট্রেন, লঞ্চের ছাদে, জানালায়, দরজায় ঝুলে মানুষ যাচ্ছে। ট্রেনের ছাদ থেকে ছিটকে পড়তেও দেখলাম। আর দেখছি বেপরোয়া গতিতে চলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণহানীর ঘটনা। দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছে। প্রতিদিনই নিহতের সংখ্যা গড়ে দশ। এই বিপর্যয়ের জন্য কাঠামোগত ত্রুটিতো আছেই। সঙ্গে আছে মানুষের অস্থির আচরণ। ঢাকা চট্টগ্রাম রুটে চারলেন রাস্তা করা হলো, কিন্তু চারলেনের সেতু নিয়ে আমরা ভাবিনি। ফলে চারলেনের সড়কে পরিবহন দ্রুত গতি পেলেও, দুইলেনের সেতুর কাছে এসে শ্লথ হয়ে যাচ্ছে। ঈদের সময় মহাসড়কে ত্রুটিযুক্ত পরিবহনের চলাচল বেড়ে যায়। ত্রুটিযুক্ত এসব পরিবহন পথে বিকল হয়ে যেমন যানজট তৈরি করছে তেমনি ভয়াবহ দুর্ঘটনারও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বিপর্যয়ও উৎসবে স্বস্তি এনে দিতে পারে না।

আর আজ সকাল হলো আরেকটি মানবিক বিপর্যয় দিয়ে। টঙ্গীতে ফয়েল কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ হয়ে ২৪ জনের প্রাণ গেল। এই শ্রমিকরা অপেক্ষা করছিলেন বোনাসের জন্য। সাধারণত বোনাস-বেতনের মুলো ঝুলিয়ে রেখে এই সময়টায় মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উৎপাদন চালু রাখেন। বেতন-বোনাস নিয়ে তারা বাড়ি ফিরবেন। সেই অপেক্ষাতেই ছিলেন প্রিয়জনেরা। কেউ কেউ প্রিয়জনের জন্য হয়তো উপহারও কিনে রেখেছিলেন। কিন্তু শনিবার সকালে তাদের জীবনে বিপর্যয় নিয়ে এলো। বয়লার বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে নিয়মমাফিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা রুটিন মতো প্রতিবেদন দেবে হয়তো। কিন্তু এই কারখানাটির বয়লার মান সম্মত কিনা, তার ‘ওভারহোলিং’ প্রয়োজন কিনা, এগুলো তদারকির দায়িত্বে ছিলেন, তারা কি সেই কাজটি করেছেন রুটিন মেনে। মালিক পক্ষ বয়লারের ত্রুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেরামতে কতোটা সজাগ ছিলেন? সকল পক্ষের দায়িত্বহীনতাই মানবিক বিপর্যয়ের ‘কালো মেঘ’ জড়ো করে। এক সময় সেই মেঘ নেমে আসে ভয়াল ভাবে। শুধু নিহত হলেন যারা, তাদের পরিবার থেকেই কি এবার ঈদের আনন্দ ফুরিয়ে গেল? আমাদের আনন্দের সাদা রোদ্দুরে কি একটুও মেঘ জমবেনা?

মেঘ জমে মেঘ কেটে যায়। আমরা প্রস্তুতি নেই আবারও উৎসব উদযাপনের। কিন্তু সেই প্রস্তুতিতে থাকে না মানবিক বিপর্যয় এড়ানোর নকশা। অথচ আমাদের নিজ নিজ দায়িত্বগুলোই যদি আমরা সাধারণভাবে পালন করে যাই, তাহলে সম্পর্কের ফাটল, পথের বিপজ্জনক বাঁক এবং যন্ত্রের ত্রুটি, আমাদের নজর এড়াতে পারবে না। তখন মানবিক বিপর্যয় অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

আরও খবর: বাতাসে লাশের পোড়া গন্ধ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
সর্বশেষসর্বাধিক