X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

৫০ শতাংশ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অর্থ কী?

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২২, ১৭:৪৪

আমীন আল রশীদ নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল মনে করেন, ভোট ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ গ্রহণযোগ্য হলেই সেটিকে সফলতা বলা যায়। তিনি এও মনে করেন, নির্বাচনে শতভাগ সফলতা কখনও সম্ভব নয়। গত ২২ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রশ্ন হলো, ‘৫০ ভাগ গ্রহণযোগ্য’ মানে কী এবং এর মানদণ্ড কী? কেমন ভোট হলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য বলা যাবে? এটি কি পরীক্ষায় পাসের মতো, জিপিএ ফাইভ না হলেও অন্তত ১০০-এর মধ্যে ৫০ পেলেও খুশি? তার মানে সিইসি তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে—তার একটি ইঙ্গিত দিয়ে দিলেন?

দায়িত্ব নেওয়ার পরেই যদি তারা ৫০-৬০ ভাগ গ্রহণযোগ্যতার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকেন, তাহলে সেটি এক ধরনের ডিফেন্সিভ বা রক্ষণাত্মক কৌশল কিনা, অর্থাৎ তিনি ধরেই নিয়েছেন কিনা যে বিগত কয়েক বছরে নির্বাচনি ব্যবস্থাটি যে মাত্রায় বিচ্যুত হয়েছে, সেখানে খুব বেশি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই? এটি কি তার এক ধরনের সরল স্বীকারোক্তি বা অসহায় আত্মসমর্পণ? তিনি এবং তার পুরো কমিশন কি তাহলে শতভাগ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম নন? নাকি তাদের আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি রয়েছে? নাকি তিনি ধরেই নিয়েছেন যে সরকারের অধীনে এবং যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, তাতে শতভাগ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়?

একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ বা অগ্রহণযোগ্য হতে পারে যদি সেটি অংশগ্রহণমূলক না হয়। যদি প্রধান দলগুলো সেই নির্বাচনে অংশ না নেয়। যদি নির্বাচনটি একতরফা হয়। যদি সেই নির্বাচনে বিরাট সংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। যদি সেই নির্বাচনে জনগণের বিরাট অংশ ভোটকেন্দ্রেই না যায়।

সুতরাং, একটি নির্বাচনকে তখনই গ্রহণযোগ্য বলা যায় যখন সেটি হয় অংশগ্রহণমূলক; শান্তিপূর্ণ; উৎসবমুখর; যে নির্বাচনে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন এবং ভোট শেষে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীরা ভোটের ফলাফল মোটা দাগে মেনে নেন। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আরেকটি বড় শর্ত, সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ থাকা। সমান প্রচারের সুযোগ পাওয়া। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা নির্বিঘ্নে ভোটের প্রচার করলেন আর সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোর প্রার্থীরা পুলিশি হয়রানির মধ্যে থাকলেন—এটিও একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য হওয়ার পথে বড় অন্তরায়।

নির্বাচনের সফলতা কেবল একা নির্বাচন কমিশনের নয়; বরং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল ও প্রার্থীর এবং সর্বোপরি ভোটারদের। এমনকি গণমাধ্যমেরও। কারণ, নির্বাচন পূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনের পরে কোথায় কী ঘটছে, গণমাধ্যম যদি স্বাধীন ও নির্ভয়ে তা তুলে ধরতে না পারে, তাহলে সেটিকেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা যাবে না। আর গণমাধ্যম কতটুকু প্রচার করতে পারছে, কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছে, সেটি পুরোপুরি নির্ভর করে নির্বাচনটি যাদের অধীনে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন—তার ওপর। তার মানে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু কয়েকটি দলের অংশগ্রহণে মারপিটবিহীন ভোটের ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আরও অনেক কিছু। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসন।

বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি নিজেও স্বীকার করেছেন, নির্বাচন কমিশনের বিধিবিধানের অভাব নেই। কিন্তু এনফোর্সমেন্টের ঘাটতি আছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা ‘কষ্টসাধ্য কাজ’ বলেও তিনি মনে করেন। তবে আশ্বস্ত করেছেন যে তারা চেষ্টা করবেন।

বস্তুত নির্বাচন কমিশন যত আন্তরিকই হোক না কেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এবং ভোটের মাঠের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নির্বাচন কমিশনকে শতভাগ সহায়তা না করে, তাহলে একশভাগ সফল বা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তার মানে সিইসি কি ধরেই নিয়েছেন যে তিনি মাঠ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকে শতভাগ সহায়তা পাবেন না এবং সে কারণেই কি নির্বাচন ৫০ ভাগ গ্রহণযোগ্য হলেই সন্তুষ্ট থাকতে চান?

ভালো নির্বাচন মানে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এখন কথা হচ্ছে, নির্বাচন কখন গ্রহণযোগ্য হয়? ইসির সঙ্গে বৈঠকে বিশিষ্ট নাগরিকদের অনেকেই অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে দলীয় সরকারের অধীনে প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করা কঠিন। যে কারণে জাতীয় নির্বাচনের তিন মাস আগে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের পরামর্শও এসেছে। যদিও বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে সেটি করা কঠিন। কারণ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে—যে বিধানটি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইসির সঙ্গে সংলাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন বলেছেন, ভোটের আগে-পরে ছয় মাস নির্বাচনকালীন কর্তৃত্ব কমিশনের কাছে থাকা উচিত। ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ সংসদের অধিবেশন থাকবে না। এ জন্যে ভোটের আগে চার মাস, ভোটের পরে দুই মাস- এই ছয় মাসের জন্য ক্ষমতা ইসির হাতে থাকতে পারে। আস্থা অর্জন করতে পারলে সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ভোট করা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

আগামী নির্বাচন কেমন হবে সেটি অনেক ‘যদি কিন্তু’র উপরে নির্ভর করছে। তবে এই নির্বাচনটি ভালো হওয়া দরকার। সফল হওয়া দরকার। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নির্বাচনি ব্যবস্থাটি যেভাবে বিতর্কিত হয়েছে; ভোট নিয়ে মানুষের মনে যে অনাস্থা ও অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে; নির্বাচনটি যেভাবে সোশাল মিডিয়ায় রসিকতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে—সেখান থেকে উত্তরণ ঘটানো তথা নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্যই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হওয়া প্রয়োজন এবং সেটি ৫০ ভাগ নয়, শতভাগ সাফল্যের লক্ষ্য নিয়েই নির্বাচন কমিশনের কাজ করা দরকার। পরীক্ষায় ৫০ নম্বর পাওয়ার টার্গেট নিয়ে প্রস্তুতি নিলে ৩০-৪০-এর বেশি পাওয়া কঠিন। তাছাড়া জিপিএ ফাইভের যুগে ৫০-৬০ নম্বরে খুশি থাকার কোনও মানে হয় না। অন্তত ৮০ যাতে পাওয়া যায়, সেজন্য একশো ভাগ সফলতার টার্গেট নিয়েই খেলতে হয়। নির্বাচন যেহেতু একটি বিরাট খেলা এবং সেখানে নির্বাচন কমিশনকেই যেহেতু রেফারির দায়িত্ব পালন করতে হয়, ফলে তারা কেমন রেফারিং করছেন, তার ওপর নির্ভর করে কেমন ভোট হবে। আর মাঠে যখন মেসি-রোনালদো-নেইমাররা খেলেন, তখন রেফারিকেও হতে হয় দক্ষ, সাহসী।

সাহসের প্রসঙ্গে সিইসির একটি বক্তব্য দিয়ে লেখাটা শেষ করা যাক। তিনি বলেছেন, ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন নির্বাচন কমিশনারদের সাহস। আর সাহসের পেছনে থাকতে হবে সততা। আমাদের হারানোর কিছু নেই। পাওয়ার কিছুও নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে আমরা ইতিবাচক যদি কিছু করতে পারি, নির্বাচনটা যদি অবাধ ও সুষ্ঠু করা যায় সবার অংশগ্রহণে, সেটাই সফলতা।’

পরিশেষে, নির্বাচন কমিশনের সফল হওয়া প্রয়োজন। কেন প্রয়োজন? কারণ, সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ বলছে, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঝেমধ্যে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ছাড়া আর কোনও ইস্যুতে জনগণের এই ক্ষমতার মালিকানা টের পাওয়া যায় না। কিন্তু সেই ভোটাধিকার যদি না থাকে; বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গণহারে প্রার্থীদের নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকলে; পছন্দের প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোট দিতে না পারলে এবং সময়ের আগেই ভোট শেষ হয়ে গেলে কিংবা ভোটের ব্যাপারে মানুষের মন থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার আয়োজন করা হলে সেই মালিকানার রেশটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। সুতরাং রাষ্ট্রের আর কোথাও জনগণের মালিকানা থাক বা না থাক, অন্তত পাঁচ বছর পরপর ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন কিংবা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার সুযোগটি যাতে জনগণ পায়, নির্বাচন কমিশন সেই ব্যবস্থাটি করুক। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র আদৌ চায় কিনা যে তার জনগণ সংবিধানের আলোকে সব ক্ষমতার মালিকানা ভোগ করুক?  

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ব্লগার দীপুর জামিন স্থগিত
ব্লগার দীপুর জামিন স্থগিত
ঈদকে কেন্দ্র করে ডিএমপি কমিশনারের ৩৩ নির্দেশনা
ঈদকে কেন্দ্র করে ডিএমপি কমিশনারের ৩৩ নির্দেশনা
কারাগার ও থানায় বায়োমেট্রিক সংরক্ষণসহ তিন দফা নির্দেশ
কারাগার ও থানায় বায়োমেট্রিক সংরক্ষণসহ তিন দফা নির্দেশ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ