X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

ঘরে বাইরে আমাদের সাকিব সোনা!

আহসান কবির
১৯ মার্চ ২০২৩, ১৯:৫০আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৩, ২০:০৬

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ‘সোনার ছেলে’! ‘সোনা’ বিষয়ক যেকোনও কিছুর সঙ্গে তিনি জড়াতেই পারেন। বিশ্বখ্যাত ক্রিকেট অলরাউন্ডারকে নিয়ে এটা মোটেও আদিখ্যেতা নয়। তবে সোনা নিয়ে এ দেশের মানুষের আদিখ্যেতা আছে। এই আদিখ্যেতা বা সোনার ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এমনকি সোনা বিদ্রোহ বিপ্লব বা দেশের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। যেমন, আইয়ুব ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রতিবাদ বা যুদ্ধের সময়ে জনপ্রিয় একটা দেয়াল লিখন ছিল এমন– ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন আইয়ুব খান জবাব চাই’ কিংবা ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন ইয়াহিয়া খান জবাব চাই’ । আমাদের জাতীয় সংগীতে আছে– ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।

গানে আছে– ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা সোনা নয় যতো খাটি’। বাংলাদেশের মাটি অনেক দিন থেকেই সোনার চেয়ে খাঁটি।

গানের বিরহেও আছে এমন– ‘আমার সোনা বন্ধুরে তুমি কোথায় রইলা রে!’ প্রেম হবার পর গানে গানে বলা হয়– ‘সোনাবন্ধে আমারে দিওয়ানা বানাইছে’। কিংবা ধরুন- ‘সব সখীরে পার করিতে নিব আনায় আনা/ তোমার বেলায় নেবো সখী তোমার কানের সোনা’।

তবে সাকিব আল হাসানের জন্য ওই গানটাই উপযোগী হতে পারে– ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না/ তার সঙ্গে নাই লেনাদেনা/ আসল সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা!...

সাকিব রাখঢাক রেখে কোনও কিছু হয়তো করেন না। অনেকেই এজন্য ভাবতে বসেন– সাকিব আল হাসান কি নকল সোনা? নাকি তাকে সোনার মতো দেখায়? বিশ্বের সবচেয়ে বড় অলরাউন্ডার হওয়ার পরেও কি এ কথা মনে করতে হবে যে– ‘সবাই বড় না, কাউকে কাউকে বড়র মতো দেখায়?’ প্রবাদে অবশ্য আছে– ‘চকচক করিলেই সোনা হয় না’।

সাত হাজার রান করা এবং তিন শত উইকেট পাওয়া সাকিব মাঠ ও মাঠের বাইরেও অনেক কিছু করতে পারেন. যা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেমন–

এক. আবাহনী মোহামেডানের মতো ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে লাথি মেরে উইকেট ভাঙতে পারেন।

দুই. আম্পায়ার বৃষ্টির জন্য খেলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দিলে সাকিব নিজ হাতে উইকেট উপড়ে ফেলতে পারেন। তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ এবং লাখ টাকা জরিমানা হলেও কিছু যায় আসে না।

তিন. জুয়াড়িদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে না জানানোর অপরাধে এক বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হন।

চার. ভক্তের মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা, গ্যালারিতে গিয়ে হুমকি, টেস্ট খেলতে না চাওয়া, ফটোসেশন না করা এমনকি ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার রেকর্ড আছে সাকিবের। বোর্ডকে না জানিয়ে ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জে ক্রিকেট খেলতে যাওয়ার একমাত্র রেকর্ডও সাকিবের।

ব্যক্তিগত কিছু বিষয় বাদ দিয়ে বলা যায় মাঠের বাইরেও সাকিব সমান বিতর্কিত। যেমন–

এক. বিদেশের বিভিন্ন লীগ ও ক্লাবে খেলেছেন সাকিব। টাকা এ দেশে আনেননি বলে কয়েকটি দৈনিকে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। এটা কি মানি লন্ডারিং? মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধে এ দেশে বারো বছর জেল খাটার নজিরও আছে।

দুই. মোনার্ক হোল্ডিংস-এর চেয়ারম্যান হিসেবে সাকিব শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের কথা জানিয়েছিলেন। যেটা জানাননি পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী সেটা হচ্ছে মোনার্ক হোল্ডিংসের অন্য অংশীদাররা শেয়ার কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্ত এবং তাদের জরিমানাও করা হয়েছে।

তিন. জুয়া ও ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত বেটিংয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘বেটউইনার নিউজে’র শুভেচ্ছাদূত হয়েছিলেন তিনি। পরে ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড শক্ত অবস্থান নিলে এই চুক্তি থেকে সরে আসতে বাধ্য হন সাকিব।

চার. সাকিবের আমেরিকায় বাড়ি কেনা আর সৌদি আরবে হোটেল ব্যবসায় জড়িত হওয়ার পর একটি জনপ্রিয় দৈনিকের প্রশ্ন ছিল– সাকিবের এসব সম্পদ কি তার করের হিসাববহির্ভূত? মাগুরাতে সাকিব একবার কুচের খামার করেছিলেন। জমির মালিকদের টাকা দেননি বলেও অভিযোগ উঠেছিল তখন।

আমরা আর কোনও অভিযোগে না যাই। সোনার ছেলে সাকিবকে নিয়ে থাকি। বাংলাদেশের পাসপোর্ট বদলে ফেলা আরেক সোনার ছেলের নাম রবিউল ইসলাম ওরফে ‘সোহাগ মোল্লা’। সোহাগ সাহেবের বাবা ভাঙারির বিজনেস করতেন। রবিউল পুলিশ ইন্সপেক্টর মামুন এমরান খানের হত্যার সঙ্গে জড়িত বিধায় পুলিশ তার নামে অভিযোগপত্র দেয়। এরপর রবিউল সোহাগ পাসপোর্ট বদলে ভারতীয় পাসপোর্ট নেন এবং নিজের নাম দেন আরাভ খান। দুবাইতে তিনি সোনার ব্যবসা শুরু করেন। মাঝে বাংলাদেশে এসে ফেসবুকে লাইভও করেন। রবিউলের বদলে ‘সাজানো আসামি’কে জেল খাটানো এবং পুলিশ হত্যার পরে দেশে এলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি। অনেকেই অভিযোগ করেছেন– রবিউল আসলে কলাগাছ।

সাকিব আল হাসান, হিরো আলম এবং শোবিজের আরও অনেকে রবিউল ওরফে আরাভ খানের দুবাইস্থ সোনার দোকান উদ্বোধনে যোগদান করলে পুরো বিষয়টা সবার সামনে আসে। এরপর প্রশ্ন ওঠে পরশ পাথরটা আসলে কে?

আমরা রবিউল আরাভ সোহাগ বা সাকিব আল হাসানকে নিয়ে আর প্রশ্ন না তুলি, নৈতিকভাবে সাকিব আর মানুষের হৃদয়ে থাকতে পারেন কিনা সেই বিতর্কেও না যাই।

২০২৩-এ অর্থাৎ এই লেখার সময়কালীন সাকিবের বয়স ৩৫। তার মানে ছোট না। এ দেশে ছোট বাচ্চাদের ডাকা হয় ‘সোনামণি’। ফেনী নোয়াখালীর দিকে একটা জায়গা আছে যার নাম সোনাপুর। গাইবান্ধায় একটা জায়গার নাম আছে ডাকুনি সোনাপাড়া। খুলনায় সোনাপোতা নামেও একটা জায়গা আছে। জানি না এই এলাকার মাটির নিচে কোনোদিন সোনা ছিল কিনা। পশ্চিমবঙ্গেও সোনাখালি নামে একটা জায়গা রয়েছে। এ দেশে বহু মানুষের নাম আছে সোনা মিঞা। বাংলা উপকথায় ‘সোনাই’ নামটা একটা জনপ্রিয় নাম। গানে আছে- ‘বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম/ সোনা কিনিলাম নাকি রুপা কিনিলাম!

কে আসল সোনা আর কে নকল, কে চকচক করছে আর কাকে সোনার মতো দেখায় সেসব না ভবে চলুন সোনা বিষয়ক কিছু কথা ও গল্প শুনে বিদায় নিই।

এক. ‘আমার মৃত্যুর পর আমার রেখে যাওয়া সোনাদানা যেন রাস্তায় ছড়িয়ে রাখা হয়। কফিন আর আমার হাতটা যেন উন্মুক্ত থাকে। শেষযাত্রায় মানুষ দেখবে মৃত্যুর পর আমি খালি হাতে যাচ্ছি।’– আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট

দুই. এ দেশে ‘সোনাবউ’ নামে একটা ছবি মুক্তি পেয়েছিল। এই ছবির রিমেক হলে নাম হতে পারে– রঙিন সোনাবউ। ইংরেজি হতে পারে– ‘দ্য গোল্ডেন ওয়াইফ।

তিন. সোনা চোরাচালানের দায়ে কারও কারও নাম হয়ে যায় ‘সোনা রফিক’। ইদানীং এই নাম চলে যেতে পারে রবিউল ওরফে আরাভের কাছে। তার নাম হতে পারে ‘সোনা রবি’ অথবা ‘সোনা আরাভ’।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট জানতেন বিদায়বেলায় সোনা হীরা জহরত কোনও কাজে আসে না। ‘চকচক করিলেই যেমন সোনা হয় না’, তেমনি সোনার মতো দেখালেও সব সোনা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাংলাদেশে চাকরি না পাওয়া আর্চার গ্রিনকার্ড পেলেন যুক্তরাষ্ট্রে
বাংলাদেশে চাকরি না পাওয়া আর্চার গ্রিনকার্ড পেলেন যুক্তরাষ্ট্রে
লাকড়ি তোলা নিয়ে বউ-শাশুড়ির ঝগড়া, মারধরে আহত যুবকের মৃত্যু
লাকড়ি তোলা নিয়ে বউ-শাশুড়ির ঝগড়া, মারধরে আহত যুবকের মৃত্যু
এক দিনের ব্যবধানে মাতৃহারা নায়ক ও গায়ক
এক দিনের ব্যবধানে মাতৃহারা নায়ক ও গায়ক
হাইতির প্রধান বিমানবন্দর দখলের চেষ্টা গ্যাংদের
হাইতির প্রধান বিমানবন্দর দখলের চেষ্টা গ্যাংদের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ