কাজের হাত

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
২৬ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:০৯আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:০৯

টরন্টোর এক অভিজাত হোটেলের রেস্তোরাঁ। আমাদের তিনজনকে যিনি সার্ভ করছিলেন তিনি খুবই চটপটে। দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। পুরো রেস্তোরাঁয় এত লোক, তবে আমাদের দিকে তার বিশেষ নজর। কারণ আমরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি। তিনি ভারতীয়।

আলাপ পরিচয় হলো। নাম তার ওয়াহিদ। তার পুর্বপুরুষের বাস ভারতের মুম্বাইয়ে। ১৯৭৮ সালে তার পিতা পরিবার নিয়ে কানাডায় চলে আসেন।

ওয়াহিদ এই রেস্তোরাঁর নিয়মিত কর্মী নন। পেশায় একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বড় বহুজাতিকে কাজ করছেন। ছুটির সময়টায় এই রেস্তোরাঁয় কাজ নিয়েছেন। এরকম আরও কয়েকজনের সাথে পরিচয় হলো। একজন বাংলাদেশেরই মেয়ে, এখানে এমবিএ করে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বড় চাকুরে। কিন্তু অফিস শেষে কাজ করেন রেস্তোরাঁয়। উবার চালক মরক্কোর, পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরি করেন, অবসরে গাড়ি চালান।

এই যে বড় চাকুরে আবার ছোট কাজও করছেন সেটা তাদের জীবনে মূল্য সংযোজন করছে। কারও কোনও মাথা ব্যথা নেই, যে যার মতো আছে, কাজ করছে।

শ্রমের এই মর্যাদা আমাকে অবাক করে, কারণ আমরা আমাদের পরিবেশে সেটা ভাবতে পারি না। একজন বড় করপোরেট কর্তা, একজন আমলা রেস্তোরাঁয় কাজ করছে নির্দ্বিধায়।

আমাদের শিক্ষিত শ্রমশক্তির চাকরি নেই। আবার এরকম ছোট ছোট কাজের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যও নেই। আর্থিকভাবে অতি দুর্বল আমাদের সমাজের সামন্তরা শ্রমের মর্যাদা উপেক্ষা করে।

মানুষের জীবনে দু’টি জিনিস জরুরি—সম্মান ও অধিকার। এই দু’টির সামনে কোনও সম্পর্কের আড়াল চলে না। কোনও আপসের প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু আমাদের করতে হয়। 

একজন শিল্পপতি আমাকে বলেছিলেন তার আত্মীয়, স্বজন ও পরিচিতদের অনেকেই চাকরি চায় নিজের জন্য,  সন্তানের জন্য। এরা সবাই উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু এদের তার প্রয়োজন নেই। দরকার কারিগরি দক্ষতা আছে এমন কর্মী, বেতনও একজন এমএ পাস কর্মীর চেয়ে বেশি। কিন্তু এরা করবে না। কারণ শ্রেণি চিন্তা এবং সেটা এসেছে এই সমাজ থেকে যে শ্রমের মর্যাদা দেয় না।

উচ্চ আয়ের একজন কারিগরি কর্মীর সাথে নিজের কন্যা সন্তানের বিয়ে দিতে যতটা অনাগ্রহ, ততটাই উদগ্রীব একজন নিম্ন আয়ের এমএ পাস কর্মীর প্রতি। এটাই আমাদের মনোজগৎ।

মানুষকে অধিকার ও মর্যাদা দেয় রাষ্ট্র। কিন্তু আমাদের সমাজ তার ছাড়পত্র দেয় না। মানুষের নিজের মতো করে যেকোনও কাজ করে বাঁচবার অধিকার কতখানি তা ঠিক করে দেয় সমাজ। কোন ধরনের কাজ সম্মানজনক তা বলে দেয় সমাজ। বাংলাদেশে তাই শিক্ষিত মানুষ রেস্তোরাঁ,  কলকারখানায় যে কাজ করবে সেই শ্রমের মর্যাদার দাবি আজও ওঠেনি। কারণ, সমাজ একে মান্যতা দেবে না, অন্যদিকে আমরা এমনই যে এসব কাজে আমাদের পারিবারিক মর্যাদা আহত হয়।

ইদানীং অবশ্য ফুড ডেলিভারি কাজে প্রচুর ছেলেমেয়ে যুক্ত হচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে চিত্রটি আশাপ্রদ নয়। যে ব্যক্তিটি সব বাধা পেরিয়ে এরকম কাজ করতে চান, তাদের সামাজিক পরিসরে মর্যাদা তো দিতে চাই না,  ঠিকমতো পয়সা দিতেও নারাজ নিয়োগ কর্তারা।

আমাদের মতো জটিল অর্থনীতির দেশে বেকারত্ব, ছদ্ম-বেকারত্ব, আধা-বেকারত্ব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কোনও মূল্যবান আলোকপাত নাই কোথাও। অবকাঠামোগত উন্নয়নের গল্পে মানুষ হারিয়ে গেছে সবকিছু থেকে। 

একটি কথা প্রায়ই বলা হয় যে, আমাদের তরুণরা কর্মবিমুখ। কিন্তু কর্মবিমুখতার অন্যতম কারণ যে সমাজ ও পরিবারের অনুশাসন সেটা বলি না আমরা। মানুষের রোজগার ক্ষমতার অভাব, আয়ের সুযোগের অভাব প্রকারান্তরে মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে ঘাটতি সৃষ্টি করছে। এত করে হিংস্র আধিপত্যের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে। মানুষ যদি ব্যাপক হারে যোগ দেয় শ্রমের বাজারে, তা হলে দেশের মোট উৎপাদন বাড়ে। না বাড়ায় ক্ষতি কেবল মানুষেরই নয়, ক্ষতি সকলের, ক্ষতি দেশের। তাই জাতির ভবিষ্যৎ জীবন নির্ভর করছে সমাজের ভূমিকার ওপর।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
সর্বশেষসর্বাধিক