“বাবা আমাকে বুকে নাও। আমাকে পানি দাও।” বাবা আল আমিনের কাছে তার ৪ বছর ৩ মাস বয়সী মেয়ে আরশির এটাই ছিল শেষ আবদার। কিন্তু তিনি সেই আবদার পূরণ করতে পারেননি। কারণ, মেয়ে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ)। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ২ এপ্রিল রাত আটটার পর চিকিৎসকেরা আকিরাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে বাবা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, তার কলিজাটা আর নেই।
আফসোস করে বাবা আল আমিন বলছিলেন, “মেয়েটা যেন আইসিইউতে আমার অপেক্ষাতেই ছিল। হাত দুটো বাঁধা ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখে হাত দুটো যতটুকু উঁচু করা যায়, তা করে বলল,“বাবা আমাকে বুকে নাও। আমাকে পানি দাও। আমি পারলাম না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
খবরটা পড়তে গিয়ে, এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে আমারও দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ দুটো ভিজে আসছে। দুটো শিশু সন্তানের পিতা বলে এই বাবার যন্ত্রণাটা অনুভব করতে পারছি।
আফসোসের বিষয় হলো এই কথাগুলো যখন লিখছি তখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে হাম সন্দেহে বা হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ১৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরে হামে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত দুই দশকে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ১০ জন। সমকালের তথ্য বলছে, গত ২৬ দিনেই মারা গেছেন ১৬৬ জন। আর আক্রান্ত ১৪ হাজার।
আমি একটা কথা সবসময় লিখি। গোটা পৃথিবীর বিনিময়ে একজন মানুষের জীবন পাওয়া যায় না। আর এই দেশে টিকা না পাওয়ায় কিংবা যখন শুনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ আইসিইউ সংকটে এক রাজশাহীতেই মারা যায় ২২৯ রোগী, যার মধ্যে ৯১ জনই শিশু!
একবার ভাবুন! মার্চে এই হাসপাতালের শিশু আইসিইউয়ে ভর্তি ছিল ১১৯ শিশু। এর মধ্যে ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬ শিশু। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৯১ শিশু। যখন বাবা মায়ের আহাজারি দেখি যখন দেখি যমজ দুই ভাই হাসান ও হোসেনের একজন হামে মারা গেছে আরেকজন টাকার অভাবে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছে বুকটা ভেঙে যায়!
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ঢাকা কার্যালয় বলছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। সংক্রমণের মূল কারণ হিসেবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা, যারা গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
পৃথিবীর অন্যকোনও দেশ হলে কেন গত দুই বছর টিকার অভাব হলো, কারা দায়ী, কেন রাজশাহীর হাসপাতালে আইসিইউর অভাবে প্রায় একশ শিশু মারা গেল তা নিয়ে শোরগোল হতো! দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো! যেই বাংলাদেশে টিকার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি হচ্ছিল সেই দেশে হঠাৎ করে টিকার এমন বিপর্যয় কেন হলো, করা জন্য হলো, অন্তবর্তী সরকারের প্রধান না উপদেষ্টা এবং তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ভূমিকা কী, আগের সরকারের ভূমিকা কী ছিল; এমন প্রতিটা বিষয়ের তদন্ত জরুরি। এরপর দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত!
আফসোস, আমাদের দেশে মানুষের জীবনের দাম নেই এমনকি শিশুদেরও! ফলে এই দেশের জাতীয় সংসদ যেখানে প্রতি মিনিটে যেখানে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়, কখনো কখনো এক অধিবেশনেই প্রায় শত কোটি টাকা সেখানে এই সংকটের বিষয়ে জরুরি কোনও ব্যবস্থা নেই। বরং দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘হাম কিন্তু আমারও ছোটবেলায় হয়েছে। নিশ্চয়ই আপনারও হয়েছে। সব শিশুর হাম হয়, আমরা কিন্তু সব মরে যাইনি।’
ধন্যবাদ আপনাকে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী! মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এমন কথা কীভাবে বলা যায় আমার জানা নেই।
আপনার কাছে এই সরকারের কাছে, এই দেশের নীতি নির্ধারকদের কাছে আমার কোনও অভিযোগ নেই শুধু দুটো শিশু সন্তানের বাবা আর এই দেশের একজন নাগরিক হিসেবে অনুরোধ, স্বাস্থ্যসেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন বিশেষত শিশুদের!
এই যে শতাধিক বাবা মায়ের আহাজারি, এই যে একজন সন্তান বলছে, “বাবা আমাকে বুকে নাও। আমাকে পানি দাও" এমন আহাজারিতে আর কোনও সন্তানের যেন মৃত্যু দেখতে না হয় কোন বাবা-মাকে! আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোধ দিন! ভালো থাকুক এই দেশের শিশুরা, অন্তত বেঁচে থাকুক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম!
লেখক: উন্নয়নকর্মী




