নিজ প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষক যখন লাঞ্ছিত

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:১১

রাজশাহীর একটি সরকারি কলেজে নারী শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা, মারধর, চুল ধরে টেনে নেওয়া এবং অধ্যক্ষের কক্ষে ভাঙচুরের যে সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনার বিবরণ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মানসিকতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ। কোনও মতভেদ, প্রশাসনিক বিরোধ কিংবা দাবিদাওয়া থাকলেও তার সমাধান কখনোই সহিংসতা, নারীর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করা কিংবা শিক্ষাঙ্গনে ত্রাস সৃষ্টি করে হতে পারে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের নৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্থান। সেখানে শিক্ষককে অপমান করা মানে জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে আঘাত করা। যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ উন্নয়ন, গণতন্ত্র কিংবা সভ্যতার বড়াই করলেও তা ভিতহীন থেকে যায়।

বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমঅধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনও নারীকে প্রকাশ্যে মারধর, চুল ধরে টেনে নেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যক্তিগত সম্পদ নষ্ট করা-এসব কেবল নৈতিকভাবে নিন্দনীয় নয়, আইনগতভাবেও দণ্ডনীয় অপরাধ। দণ্ডবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় এমন ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে আইনের প্রয়োগই একমাত্র প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো– আমরা কী ধরনের সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি করছি। বেশ কিছু কাল ধরে এ দেশে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় প্রভাব কিংবা স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে কিছু মানুষ এমন ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছে যে, তারা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। এই মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর এবং সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ। কোনোও রাজনৈতিক দলই এমন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় না; বরং সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুন্ন হয়।  

এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়-নারীর প্রতি সহিংসতা অনেক সময় কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়, বরং তাকে ‘শিক্ষা দেওয়া’, ‘চুপ করানো’ বা ‘ভয় দেখানো’ র সামাজিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একজন নারী প্রতিবাদ করলেন, ভিডিও ধারণ করলেন, প্রশ্ন তুললেন-এমন পরিস্থিতিতে কিছু পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সহিংস হয়ে ওঠে। ফলে ঘটনাটি ব্যক্তি বিরোধের চেয়ে বড়; এটি ক্ষমতা ও প্রচলিত আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ।  

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটলে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। শিক্ষার্থীরা দেখে- পেশি শক্তিই ন্যায়, দলীয় পরিচয়ই নিরাপত্তা, আর শিক্ষকও নিরাপদ নন। এটি সবার জন্য বিপজ্জনক বার্তা। যে তরুণ প্রজন্মকে আমরা যুক্তিবাদী, সহনশীল ও মানবিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাদের সামনে যদি সহিংসতার প্রদর্শনী ঘটে, তবে সামাজিক অবক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হবে। 

রাজশাহীর এই ঘটনায় এখন প্রয়োজন কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ। প্রথমত, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত হতে হবে। কারা হামলায় জড়িত, কারা উসকানি দিয়েছে, কারা পরে পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা করেছে-সবকিছু উদ্ঘাটন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থায়ী সংস্কার আনতে হবে-সিসিটিভি, জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় এবং অননুমোদিত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোরও স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে-দলীয় পরিচয়ে কেউ আইন হাতে তুলে নিলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীকে ‘দুর্বল’ বা ‘সহজ লক্ষ্য’ ভাবার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। নারী শিক্ষক, নারী কর্মকর্তা, নারী শ্রমজীবী- যে পরিচয়েই থাকুন, তারা রাষ্ট্রের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। তাদের প্রতি সহিংসতা মানে জাতির বিবেকের ওপর আঘাত। কারণ নারীকে অসম্মান করে কোনো জাতি সম্মানিত হতে পারে না।

নারীর মর্যাদার প্রশ্নে শূন্য সহনশীলতা সময়ের দাবি ।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী

/এম/  

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম চলবে: অর্থমন্ত্রী
বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম চলবে: অর্থমন্ত্রী
বাড়ছে পানি, শনিবার খোলা হবে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট
বাড়ছে পানি, শনিবার খোলা হবে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট
বৃষ্টি-বন্যার ধাক্কায় রাজধানীর বাজারে অস্থিরতা, ভোগান্তিতে ক্রেতারা
বৃষ্টি-বন্যার ধাক্কায় রাজধানীর বাজারে অস্থিরতা, ভোগান্তিতে ক্রেতারা
চাচার চোখের সামনেই ১২ বছরের ভাতিজাকে টেনে নিলো কুমির, পরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার
চাচার চোখের সামনেই ১২ বছরের ভাতিজাকে টেনে নিলো কুমির, পরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার
সর্বশেষসর্বাধিক