রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুলির ঘটনা উদ্বেগ ছড়ায় 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
০৮ মে ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ১৪:২৪

রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মাত্র ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার ক্যাম্পে দুই দফা গুলিতে নিহত হয়েছেন দুই রোহিঙ্গা তরুণ। যে আশ্রয়শিবির একসময় ছিল জীবন বাঁচানোর আশ্রয়, সেটি আজ ধীরে ধীরে কেন পরিণত হচ্ছে ভীতি, আধিপত্য, সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অনিশ্চয়তার জায়গা। 

২০১৭ সালে মানবিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে  একটি নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছর পর বাস্তবতা হলো—এই সংকটের কোনও রাজনৈতিক সমাধান হয়নি, প্রত্যাবাসনের কার্যকর পথ তৈরি হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকটের প্রকৃতি আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।  

উখিয়ার সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো সেই বিপজ্জনক বাস্তবতারই নির্মম স্মারক। ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এখন আর গোপন কোনও বিষয় নয়। আরসা, এসআরও কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তি নামের বাহিনীর মতো গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে যে আশ্রয়শিবিরের ভেতরে ইতোমধ্যে সমান্তরাল ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়েছে। সেখানে ভয়, আনুগত্য এবং অস্ত্র—এই তিনটির সমন্বয়ে এক ধরনের অদৃশ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। যদিও সাধারণ রোহিঙ্গারা এই সংঘাতের মাঝখানে সবচেয়ে অসহায় পক্ষ হয়ে পড়ছে।   

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সহিংসতা কেবল ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি। মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ, রাখাইনে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল এক নতুন অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের ভেতরের সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তার অভিঘাত তত বেশি এসে পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। কারণ বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্র এখন কেবল রাখাইনে সীমাবদ্ধ নেই, এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থানান্তরিত হয়েছে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে।

বিশ্ব রাজনীতির নির্মম দিকটি এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, বিবৃতি দিয়েছে—আদালতে মামলা হয়েছে। কিন্তু সংকটের কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ কখনোই দৃশ্যমান হয়নি। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, মিয়ানমারকে ঘিরে কৌশলগত হিসাব এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এই মানবিক বিপর্যয়কে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। ফলে বাংলাদেশ এমন একটি সংকটের ভার বহন করছে, যার দায় আন্তর্জাতিক, কিন্তু যার চাপ দুঃখজনকভাবে ক্রমশ স্থানীয় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মানবিক দায়িত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে রোহিঙ্গারা নিপীড়নের শিকার বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী, অপরদিকে ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধ ও সশস্ত্র তৎপরতা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। ফলে শুধু অভিযান চালিয়ে বা টহল বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না। প্রয়োজন আরও সমন্বিত ও দূরদর্শী কৌশল।

প্রথমত, ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও গোয়েন্দাভিত্তিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভেতরে শিক্ষা, মানসিক সহায়তা ও বিকল্প সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তরুণরা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে প্রত্যাবাসন প্রশ্নটি আবারও বৈশ্বিক অগ্রাধিকারে ফিরে আসে। 

সবশেষে একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যায়—আর কত দিন বাংলাদেশ এই অনিশ্চয়তার ভার একা বহন করবে? কোনও মানবিক সংকট দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে তা একসময় সীমান্ত অতিক্রম করে নিরাপত্তা, রাজনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সংকটে পরিণত হয়। 

লেখক: মানবাধিকার কর্মী

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম চলবে: অর্থমন্ত্রী
বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম চলবে: অর্থমন্ত্রী
বাড়ছে পানি, শনিবার খোলা হবে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট
বাড়ছে পানি, শনিবার খোলা হবে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট
বৃষ্টি-বন্যার ধাক্কায় রাজধানীর বাজারে অস্থিরতা, ভোগান্তিতে ক্রেতারা
বৃষ্টি-বন্যার ধাক্কায় রাজধানীর বাজারে অস্থিরতা, ভোগান্তিতে ক্রেতারা
চাচার চোখের সামনেই ১২ বছরের ভাতিজাকে টেনে নিলো কুমির, পরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার
চাচার চোখের সামনেই ১২ বছরের ভাতিজাকে টেনে নিলো কুমির, পরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার
সর্বশেষসর্বাধিক