জাতীয় বাজেটকে সাধারণত সরকারের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের গুরুত্ব সেই প্রচলিত ধারণার অনেক বাইরে। দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাজেটের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলবে শিল্প উৎপাদন, রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকার ওপর।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এবারের বাজেট অনেকটাই ‘বাঁচা-মরার’ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটিরও বেশি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পোশাক শিল্পের সংকট মানেই শুধু কিছু কারখানার সমস্যা নয়— এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকির বিষয়।
চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি
গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চাপের মুখে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। করোনা মহামারির অভিঘাত কাটতে না কাটতেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয় কমেছে প্রায় ২.৮২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা কমেছে, একই সঙ্গে মূল্যছাড়ের চাপও বেড়েছে। অনেক ক্রেতা আগের তুলনায় কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও মুনাফা কমছে।
অন্যদিকে বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। নতুন বিনিয়োগ কমে এসেছে, ব্যাংক ঋণের চাপ বেড়েছে এবং অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছেন।
দেশীয় অর্থনীতিতেও রয়েছে নানা চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ব্যবসার খরচ বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে ডলারের বিনিময় হার অস্থিতিশীল হওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।
প্রতিযোগিতা এখন আগের চেয়ে কঠিন
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এক সময় স্বল্প শ্রমমূল্যের কারণে বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।
ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া দ্রুত নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তারা শুধু উৎপাদন নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বন্দর সুবিধা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কর কাঠামোর ক্ষেত্রেও অনেক সুবিধা দিচ্ছে।
বিশেষ করে ভিয়েতনাম বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করেছে। ভারতের সরকারও উৎপাদনমুখী শিল্পে বড় ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বাজেট যদি বিনিয়োগ ও উৎপাদনবান্ধব না হয়, তাহলে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব আরও কমে যেতে পারে।
কী হতে পারে বাজেটের আকার
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা হতে পারে।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব?
অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রফতানি বাড়ানো ছাড়া রাজস্ব আহরণের উচ্চ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। আর সে কারণে এবারের বাজেটে কর কাঠামো সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ব্যবসায়ী সমাজ কী চায়?
দেশের প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এবারের বাজেটকে সামনে রেখে বেশ কিছু সাধারণ দাবি জানিয়েছে।
তাদের প্রথম দাবি করপোরেট কর হার কমানো। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি তালিকাবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কর হার যৌক্তিক করার দাবি রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বর্তমানে উচ্চ করহার নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। কর কমানো হলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণও বাড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো— ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং তাদের ভোগব্যয় বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাঙা করতে সহায়তা করবে।
এছাড়া উৎসে কর ব্যবস্থা সহজ করা, দ্বৈত করের অবসান ঘটানো এবং ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে।
ভ্যাট সংস্কারের দাবি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো ভ্যাট ফেরত পেতে দীর্ঘসূত্রতা। অনেক প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফেরতের অপেক্ষায় থাকে। এতে তাদের কার্যকর মূলধন আটকে যায় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিফান্ড নিশ্চিত করা গেলে শিল্প খাতে তারল্য সংকট অনেকটাই কমে যাবে। তারা টিআইএন, ভ্যাট ও কাস্টমস তথ্যকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার দাবিও জানিয়েছে। এতে করদাতাদের হয়রানি কমবে এবং কর প্রশাসনের দক্ষতাও বাড়বে।
পোশাক শিল্পের বিশেষ দাবি
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এলডিসি উত্তরণের আগে শিল্পটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে বিশেষ নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। তাদের অন্যতম দাবি হলো— গার্মেন্টস কোম্পানির সব ধরনের আয়ের ওপর একই করহার প্রয়োগ করা। বর্তমানে মূল ব্যবসার আয় ও অন্যান্য আয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন করহার প্রযোজ্য হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। বিজিএমইএ চায় সব ধরনের আয়কে ১২ শতাংশ কর্পোরেট করের আওতায় আনা হোক।
এছাড়া সরকারি ভর্তুকির ওপর বর্তমানে যে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়, তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। উদ্যোক্তাদের যুক্তি হলো— ভর্তুকি শিল্পকে সহায়তা করার জন্য দেওয়া হয়, সেই অর্থের ওপর আবার কর আরোপ করলে প্রণোদনার কার্যকারিতা কমে যায়।
রফতানি আয়ের ওপর কর কমানোর দাবি
বর্তমানে রফতানি আয়ের ওপর ১ শতাংশ উৎসে কর রয়েছে। পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা এটি কমিয়ে ০.৬৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, আগামী চার বছর এই হার স্থিতিশীল রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, করনীতিতে ঘনঘন পরিবর্তন হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাব-কন্ট্র্যাক্টিং খাতের গুরুত্ব
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শত শত ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান সাব-কন্ট্র্যাক্টিংয়ের মাধ্যমে কাজ করে। বর্তমানে এই খাতে ৯ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। উদ্যোক্তারা এটি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, করহার কমানো হলে অনেক প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
জ্বালানি সংকট ও এলপিজি ভ্যাট
গ্যাস সংকট এখন শিল্প খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে এলপিজি ব্যবহার করছে। কিন্তু এলপিজির ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলপিজির ওপর কর ছাড় দিলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
নমুনা আমদানির শুল্ক সমস্যা
রফতানি শিল্পে নতুন অর্ডার পেতে ক্রেতাদের কাছে নমুনা পণ্য পাঠানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে নমুনা আমদানির ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়। উদ্যোক্তাদের দাবি, নমুনা আমদানিতে শুল্ক কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হলে নতুন অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
সরকারের অবস্থান
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পোশাক শিল্পের কিছু দাবি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সরকারের প্রধান উদ্বেগ রাজস্ব সংগ্রহ। আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব বাড়ানোর চাপ রয়েছে। ফলে ব্যাপক করছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, করহার কমানোর পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো এবং কর প্রশাসনকে আধুনিক করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাজেটের আসল পরীক্ষা
এবারের বাজেটের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— এটি কি রাজস্ব আহরণ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে? শুধু কর বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় সম্ভব নয়। আবার অতিরিক্ত করছাড় দিয়েও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় না।
সফল বাজেট হবে সেই বাজেট, যা একদিকে রাজস্ব বাড়াবে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পথ খুলে দেবে।
শেষ কথা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদলের সুযোগ। একদিকে রয়েছে রফতানি আয় কমে যাওয়ার চাপ, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার দীর্ঘ তালিকা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে রয়েছে অর্থনীতিকে নতুন গতিতে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা। তাই এবারের বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের খাতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে হবে শিল্প পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ।
কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দেশের কারখানা, উদ্যোক্তা, শ্রমিক এবং রপ্তানিকারকদের সাফল্যের ওপর। বাজেট যদি তাদের জন্য আস্থার বার্তা দিতে পারে, তাহলে বর্তমান সংকট কাটিয়ে নতুন প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। আর যদি সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়, তাহলে অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ




