আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি: ইরানের প্রতিরোধের স্থপতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
০৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫৪ আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫৪

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা ছিল, সর্বোচ্চ মাত্রার চাপ, নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক ঝুঁকি একসময় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নতিস্বীকারে বাধ্য করবে। তবে এই ধারণা ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার রাজনৈতিক দর্শন ও মানসিকতাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি। তার কাছে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছিল না কোনও রাজনৈতিক বিকল্প; বরং তা ছিল তার আদর্শিক পরিচয় থেকে বিচ্যুতি।

খামেনির দৃষ্টিতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান সংগ্রাম। তার কাছে ‘প্রতিরোধ’ ছিল সাময়িক কৌশল নয়, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শাহবিরোধী আন্দোলন, কারাবাস এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় এই রাজনৈতিক সত্তার বিকাশ ঘটে।

তার সাহিত্যপ্রীতিও এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। রুশ লেখক মিখাইল শলোখভের অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোস দ্য ডন উপন্যাসের নায়ক গ্রিগরি মেলেখভ যেমন যুদ্ধ ও বিপ্লবের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ব্যক্তিগত সম্মান ও সহনশীলতা ধরে রাখেন, খামেনিও সেই দর্শনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত মনে করতেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকাকে তিনি আত্মবিশ্বস্ততার প্রকাশ হিসেবে দেখতেন।

সংগ্রাম ও প্রতিরোধের সত্তা

১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের অবসানে জাতিসংঘের প্রস্তাব গ্রহণকে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ‘বিষপান’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর খামেনির সামনে খোমেনির মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের উত্তরাধিকার ছিল। পরবর্তী তিন দশকে তিনি নিজস্ব একটি আপসহীন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন। সেই প্রেক্ষাপটে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ তার দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করত। ফলে ‘বিষপান’ এড়িয়ে চলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নয়, বরং নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অক্ষুণ্ন রাখারও অংশ ছিল।

‘শাহাদাত’ যখন নৈতিক বিজয়

পশ্চিমা বিশ্বের একটি ধারণা ছিল, সামরিক হুমকি খামেনিকে নমনীয় করে তুলবে। কিন্তু এই ধারণা কার্যকর হয় তখনই, যখন টিকে থাকাই একজন নেতার প্রধান লক্ষ্য হয়। খামেনির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগ ছিল নৈতিক বিজয়ের প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু হলে তিনি ‘শহীদ’-এ পরিণত হন।

মর্যাদার প্রতীক পারমাণবিক কর্মসূচি

খামেনির কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু দরকষাকষির হাতিয়ার বা অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল একটি বিপ্লবী রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক। তার বক্তব্যে পশ্চিমা চাপকে কেবল নীতিগত মতপার্থক্য নয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বৈরিতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার কাছে অর্থনৈতিক সংকটের চেয়েও জাতীয় অপমান ছিল বড় হুমকি।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, কারণ সেখানে ‘বীরত্বপূর্ণ নমনীয়তা’ প্রদর্শনের সুযোগ ছিল এবং সেটিকে তিনি আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর খামেনির বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য নয় এবং একবার ছাড় দিলে তারা আরও নতুন দাবি উত্থাপন করবে।

নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং সামরিক হামলা দেশটিকে হয়তো দুর্বলতার দিকেও নিয়ে গেছে। তবে এসব চাপ ইরানকে খামেনির আদর্শে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। ওয়াশিংটন যদি মনে করে,  চাপের মুখে ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করবে, তাহলে তা খামেনির রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান সম্পর্কে ভুল মূল্যায়ন হবে।

বিশ্ব এমন একজন নেতাকে হারিয়েছে, যার কাছে চাপের মুখে আপস করা ছিল অস্তিত্বের পরাজয়ের সমার্থক। আর যিনি পরাজয়ের চেয়ে মৃত্যু বা ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণকেই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতেন।

সূত্র: আল জাজিরা

/এএস/ 
টাইমলাইন: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়
০৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫৪
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি: ইরানের প্রতিরোধের স্থপতি
০৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২
০৩ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৭
সম্পর্কিত
ইরান যুদ্ধে মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা কি বাড়ছে? নতুন হিসাব পেন্টাগনের
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি
ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের পর হাসপাতাল ছাড়লেন ক্রিস্টা পাইক, আবারও ফিরলেন কারাগারে
সর্বশেষ খবর
কর অঞ্চল-৩ ঢাকায় ৪৭ জনের নিয়োগ, আবেদন শুরু ১২ অক্টোবর 
কর অঞ্চল-৩ ঢাকায় ৪৭ জনের নিয়োগ, আবেদন শুরু ১২ অক্টোবর 
রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা: আয়াসসহ ৪ জনকে রিমান্ডে চায় পুলিশ
রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা: আয়াসসহ ৪ জনকে রিমান্ডে চায় পুলিশ
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে পরিকল্পনা করছে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে পরিকল্পনা করছে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
 সৌদি আরবে নিহত দুই বাংলাদেশি, আহত ৪ জন আইসিইউতে
 সৌদি আরবে নিহত দুই বাংলাদেশি, আহত ৪ জন আইসিইউতে
সর্বাধিক পঠিত
ম্যাকবুক উপহার দি‌য়ে জার্মান পর্যট‌কের দুঃখ ঘোচা‌লেন একজন
ম্যাকবুক উপহার দি‌য়ে জার্মান পর্যট‌কের দুঃখ ঘোচা‌লেন একজন
আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন: কেয়া পায়েল
আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন: কেয়া পায়েল
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা, কার ডাকে কক্সবাজার গেলো কিশোরী?
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা, কার ডাকে কক্সবাজার গেলো কিশোরী?
বিমানের পাইলট ও সহ-পাইলট একই খাবার খান না কেন?
বিমানের পাইলট ও সহ-পাইলট একই খাবার খান না কেন?
খোলা হয়েছে লালনের আখড়াবাড়ির দানবাক্স, কত টাকা পাওয়া গেলো?
খোলা হয়েছে লালনের আখড়াবাড়ির দানবাক্স, কত টাকা পাওয়া গেলো?