অ্যাসিড-সন্ত্রাস কমেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন কেন নয়? 

শফিক আর. ভূঁইয়া
০৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০

বাংলাদেশের ইতিহাস ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে ভরা। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থান কিংবা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ—প্রতিবারই আমরা প্রমাণ করেছি, সংকট যত বড়ই হোক, সম্মিলিত ইচ্ছা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব।

তবে আমাদের জাতীয় সাফল্যের গল্প শুধু রাজনীতি বা দুর্যোগ মোকাবিলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু নীরব বিজয় রয়েছে। অ্যাসিড-সন্ত্রাস রোধ তার অন্যতম।

আজকের অনেক তরুণ-তরুণী হয়তো কল্পনাও করতে পারবেন না, মাত্র দুই দশক আগে অ্যাসিড হামলা কত বড় সামাজিক আতংক ছিল। সংবাদপত্র খুললেই দেখা যেত কোনও তরুণীর মুখ ঝলসে দেওয়া হয়েছে, কোনও শিশুকে বিকৃত করা হয়েছে, কিংবা সামান্য বিরোধের জেরে একটি পরিবারের জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এবং দুই হাজার সালের শুরুতে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রেমের প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ—এসব কারণে সংঘটিত অ্যাসিড হামলার বড় অংশের শিকার ছিলেন নারী ও শিশু। ১৯৯৯ সালে দেশে অ্যাসিড হামলার ঘটনা ছিল ১৬৮টি। ২০০২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯৬টিতে।

এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে ছিল একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং আজীবন বয়ে বেড়ানো শারীরিক ও মানসিক ক্ষত। সেই সময় যদি কেউ বলতেন, একদিন এই অপরাধ প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে আসবে, অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু তাই-ই হয়েছে।

এর কারণ শুধু কঠোর আইন নয়। আমরা একটি বিষয়ে জাতীয়ভাবে একমত হয়েছিলাম—অ্যাসিড-সন্ত্রাস আর মেনে নেওয়া যাবে না। এই সামাজিক ঐকমত্যই ছিল পরিবর্তনের ভিত্তি।

গণমাধ্যম বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। বিশেষ করে প্রথম আলোর ধারাবাহিক প্রচারণা জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সময়ে অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশন, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা এবং নীতিনির্ধারণী উদ্যোগে যুক্ত হয়। নাগরিক সমাজও সোচ্চার হয়ে ওঠে। চিকিৎসক, আইনজীবী ও উন্নয়নকর্মীরা ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ান।

সরকারও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। ২০০২ সালে প্রণীত ‘অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন’ এবং ‘অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর মাধ্যমে অ্যাসিড নিক্ষেপ, বিক্রি ও সংরক্ষণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। একইসঙ্গে বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০০২ সালে যেখানে দেশে বছরে সর্বোচ্চ ৪৯৬টি অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটেছিল, ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১১-তে। অ্যাসিড-সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, ২০২৫ সালেও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এটি আর আগের মতো ভয়াবহ সামাজিক মহামারি নয়। কারণ রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ—সবাই মিলে অ্যাসিড-সন্ত্রাসকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।

আজ নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার খবর দেখলে সেই অভিজ্ঞতার কথাই মনে পড়ে। প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, নারী হত্যা কিংবা যৌন সহিংসতার খবর আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, প্রতিবাদ হয়, বিচারের দাবি ওঠে।

এসব অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু অ্যাসিড-সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতা আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়—শুধু ক্ষোভ দিয়ে সামাজিক সমস্যার সমাধান হয় না। সমাধানের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এর শেকড় পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের গভীরে প্রোথিত।

একটি শিশু কী ধরনের পরিবেশে বড় হচ্ছে? সে কি অন্যকে সম্মান করতে শিখছে? একটি কিশোরের জীবনে খেলাধুলা, বই, সংস্কৃতি কিংবা ইতিবাচক সামাজিক মেলামেশার সুযোগ কতটা আছে? একজন তরুণ কি বুঝে বড় হচ্ছে যে সম্মান ও সম্মতি একটি সুস্থ সম্পর্কের মৌলিক শর্ত?

এসব প্রশ্নের উত্তরও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা প্রায়ই দ্রুত ফল চাই। কিন্তু সামাজিক পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। অ্যাসিড-সন্ত্রাসও এক বছরে কমেনি। এর পেছনে ছিল বহু বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, সচেতনতা এবং সামাজিক চাপ।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও হয়তো আমাদের আবার তেমনই একটি জাতীয় উদ্যোগ দরকার। সরকার, আদালত কিংবা পুলিশ একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পরিবার, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি খাত—সবারই ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ করে তরুণদের জন্য ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করা জরুরি। আমরা অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলি, কিন্তু একটি মানবিক সমাজ গড়তে সামাজিক অবকাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, নাটক, সংগীত, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং কমিউনিটি উদ্যোগ —এসবও সামাজিক নিরাপত্তার অংশ। কারণ মানুষকে শুধু আইন দিয়ে পরিচালনা করা যায় না, মূল্যবোধ দিয়েও পরিচালনা করতে হয়।

অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের অতীত সাফল্য প্রমাণ করে, কোনও সামাজিক সমস্যা এত বড় নয় যে তার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা অসম্ভব। একসময় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—অ্যাসিড-সন্ত্রাস কমাতেই হবে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ মিলে সেই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল।

আজ হয়তো সময় এসেছে আরেকটি জাতীয় অঙ্গীকার করার। আমাদের নারী, শিশু ও কন্যারা যেন ভয় নয়, নিরাপত্তা নিয়ে বড় হতে পারে। একটি শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবার, একটি কিশোরের জন্য ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ এবং একজন নারীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের সামাজিক উন্নয়নেরও মানদণ্ড।

আমরা কেমন দেশ গড়তে চাই—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমরা কোন পথে এগোবো।

একসময় সংবাদপত্রের পাতায় অ্যাসিডে দগ্ধ মানুষের ছবি ছিল আমাদের জাতীয় লজ্জার প্রতীক। আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল। হয়তো একদিন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার খবরও তেমনি ব্যতিক্রম হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের একটি কথাই শেখায়—যে অন্যায়কে আমরা আর মেনে নিতে রাজি হই না, তার পতন সেখান থেকেই শুরু হয়।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিশ্বকাপ চলাকালেই ফ্রান্সের দাপটে সিংহাসন হারালো আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপ চলাকালেই ফ্রান্সের দাপটে সিংহাসন হারালো আর্জেন্টিনা
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধ এলাকায় বন্ধ থাকবে প্রাথমিক বিদ্যালয় 
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধ এলাকায় বন্ধ থাকবে প্রাথমিক বিদ্যালয় 
ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে ২ কৃষকের মৃত্যু 
ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে ২ কৃষকের মৃত্যু 
ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে এখনও নিখোঁজ হাজারো মানুষ, তাদের ভাগ্যে কী আছে
ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে এখনও নিখোঁজ হাজারো মানুষ, তাদের ভাগ্যে কী আছে
সর্বশেষসর্বাধিক