প্রসঙ্গ সিমের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন

Send
রোকেয়া লিটা
প্রকাশিত : ১৪:১১, জুলাই ১৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৭, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬

রোকেয়াবায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন করা নিয়ে অনেক ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা আমরা শুনে আসছিলাম। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। প্রথম দিকে একটা আপত্তি উঠছিল যে, মোবাইল কোম্পানিগুলো আমাদের আঙুলের ছাপ নিয়ে বিদেশিদের কাছে দিয়ে দিতে পারে। এমন কী আঙুলের ছাপ দিয়ে মোবাইল ফোনের সিম নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একটি রিট আবেদনও করেন এক আইনজীবী।
আবেদনকারীর যুক্তি ছিল, দেশের বেশিভাগ মোবাইল অপারেটরই বিদেশি। আর বিদেশিদের হাতে নাগরিকের একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দিলে, তার অপব্যবহার হতে পারে। অনেকেই ফোন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তও নেন, তারপরও বিদেশি মোবাইল কোম্পানির কাছে আঙুলের ছাপ দিতে রাজি নন তারা। এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে অনেকেরই আশঙ্কা ছিল যে- বিদেশিরা এসব আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে সহজেই আমাদের সন্ত্রাসী বানিয়ে দিতে পারবে। তখন আমার বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকেই এসব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বিদেশে না গেলে তো এসব ঝুঁকির মুখে পড়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। আর যে ব্যক্তি বিদেশে যাবে, সে বিদেশি কূটনৈতিক মিশনে পাসপোর্ট জমা দিয়ে ভিসা পাওয়ার পরই তো বিদেশে যাবে। আর পাসপোর্ট জমা দিলেই তো তারা আপনার আঙুলের ছাপও পেয়ে যাবে। তাহলে, আর ভয় পেয়ে লাভ কি। বিদেশে গেলে এমনিতেই বিদেশিরা আমাদের আঙুলের ছাপ পেয়ে যাবে, মোবাইল কোম্পানির কাছ থেকে তা সংগ্রহ করার দরকার হবে না। উপরন্তু বিদেশে যাওয়ার পর উড়োজাহাজ থেকে বিমানবন্দরে নেমে চেক পয়েন্টে গেলেই এমবারকেশন কার্ডে নিজের ঠিকানাটাও দিয়ে রাখতে হয়। কাজেই বিদেশের মাটিতে কেউ যদি চায় আপনাকে অপরাধী বানাতে, ওই আঙুলের ছাপ নিয়ে আপনার পিছু পিছু ছুটে যাওয়াও কোনও বড় বিষয় হবে না। যাই হোক, আদালতও আঙুলের ছাপ দিয়ে মোবাইলের সিম নিবন্ধনের পক্ষেই রায় দিল।
কিন্তু সমস্যা তো দেখা দিলো অন্য জায়গায়। বিদেশ পর্যন্ত যাওয়ার আর দরকার হলো না। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন করে দেশের মাটিতেই নিজেকে অনিরাপদ ভাবার মতো ঘটনা ঘটে গেছে। বেশ কয়েকদিন যাবৎ গণমাধ্যমে খবর আসছে, অন্যের বায়োমেট্রিক তথ্যে হাজার হাজার সিম নিবন্ধন করে বিক্রি করা হচ্ছে দেশে । পুলিশ বলছে, একটি মোবাইল কোম্পানির কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে গ্রাহকের তথ্য চুরি করে তার অজান্তে অন্য সিম নিবন্ধন করছে। এরপর নাকি তারা নিজেদের বিতরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সেগুলো খুচরা পর্যায়ে বিক্রিও করছে।
পুলিশ তো ধরলো মাত্র দু-একটি এলাকায় একটি/দুটি মোবাইল ফোন কোম্পানির কয়েকজন কর্মীকে। চিন্তা করা যায়, পুরো বাংলাদেশে ওইসব কোম্পানির আরও কতজন কর্মী আছে! মোবাইল কোম্পানির অভ্যন্তরে যেহেতু ফাঁকফোকর আছে একজনের বায়োমেট্রিক তথ্যে অন্যজনের সিম নিবন্ধন করে বিক্রি করার, সেহেতু আশঙ্কার সীমা-পরিসীমা শুধু বাড়ছেই। পুরো বাংলাদেশে ওইসব মোবাইল কোম্পানির কর্মীরা যে এমন লাখ লাখ ভুয়া বায়োমেট্রিক তথ্যের সিম বিক্রি করে বেড়াচ্ছে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? মোবাইল কোম্পানিগুলো কি সেই নিশ্চয়তা দিতে পারবে? নাকি ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সেই নিশ্চয়তা দিতে পারবেন?

দেশে বর্তমানে ছয়টি মোবাইল অপারেটর কাজ করছে। তাদের সবার অবস্থা কী? যতক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশ দুই একজন অপরাধী ধরিয়ে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের পক্ষে কিছুই জানা সম্ভব নয়। কে জানে, এরই মধ্যে হয়তো আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে নিবন্ধিত কয়েকটি সিম অন্য কয়েকজনের কাছে চলেও গেছে যার কিছুই আপনি জানেন না!

এবার আপনার বায়োমেট্রিক ভীতিতে নতুন একটি আশঙ্কা তুলে ধরি। ভেবে দেখুন তো, কারা নিজের পরিচয় বা বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার না করে, অন্যের বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করতে চায়? এই অসদুপায়টি একমাত্র তারাই অবলম্বন করবে, যাদের উদ্দেশ্য অসৎ। আর সিমগুলোও তারা নিশ্চয়ই ভালো কোনও কাজে ব্যবহার করবে না। কে নিশ্চয়তা দেবে যে, কোনও সন্ত্রাসী আপনারই বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধিত কোনও সিম ব্যবহার করছে না? আসলেই অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, যদি কোনও এক সুন্দর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন পুলিশ আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে! আপনার অপরাধ? আপনার অপরাধ, আপনি আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে কোনও এককালে একটি সিম নিবন্ধন করেছিলেন। আর আপনার সেই বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়েই নিবন্ধিত একটি সিম নিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে একজন অপরাধী। পুলিশ তার মোবাইল ফোন জব্দ করেছে এবং সিমের বায়োমেট্রিক তথ্য হুবহু আপনার সঙ্গে মিলে গেছে। আর তাই পুলিশ সাত সকালে আপনার বাড়িতে হানা দিয়েছে। বিষয়টা আপাতত কাল্পনিক, তবে বায়োমেট্রিক জালিয়াতি দেখে মনে হচ্ছে যে কোনোদিন যে কারও জীবনেই এটি বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।

বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কাজটি সরকার নিজেরাই পরিচালনা করলে পারতো। তাছাড়া সিম নিবন্ধন করতে জাতীয় পরিচয়পত্র লাগেই। আর জাতীয় পরিচয় পত্র নেওয়ার সময় প্রত্যেকেই আঙুলের ছাপ দিয়ে থাকেন। তাহলে, একই কাজ দুইবার করার কারণ কী? সরকার কি নিজস্ব কর্মকাণ্ডে খুশি নয়? নাকি আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রটিই সন্তোষজনক নয়? আমি বলবো- আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রটিই সন্তোষজনক নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র হতে হবে একটি স্মার্ট কার্ড, যা নকল করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রটি এতো সস্তা যে, বাজারে নাকি ২৫-৩০ টাকা দিলেই জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া যায়! বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এমন খবর আমরা পাচ্ছি। তাই সরকারে উচিৎ ছিল, জনগণের অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য মোবাইল কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে না দিয়ে জাতীয়পত্রটির উন্নত সংস্করণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া। এতে করে পুরোনো পরিচয়পত্রের সাথে নতুন পরিচয়পত্রের আঙুলের ছাপ যেমন মিলিয়ে নেয়া যেত, তেমনি মোবাইল ফোনের সিম নিবন্ধনও এটি ব্যবহার করা যেত।। তা না করে সরকার জনগণের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে মোবাইল কোম্পানিগুলোকে জালিয়াতি করার সুযোগ করে দিলো। আর মোবাইল কোম্পানিগুলো সেই সুযোগের অসৎ ব্যবহার করছে। যে সরিষা দিয়ে ভূত তাড়ানোর চেষ্টা, সেই সরিষাতেই এখন ভূত দেখা দিয়েছে। 

লেখক: সাংবাদিক

আরও খবর: বায়োমেট্রিকের ত্রুটি: ধকল এখন মোবাইল গ্রাহকদের

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ