বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তি ও আমাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা

Send
বন্যা মির্জা
প্রকাশিত : ১৩:২৮, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫৯, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬

বন্যা মির্জাবব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তি ও স্বীকার করার মধ্য দিয়ে অনেক জল্পনার শেষ হলো। বাংলাদেশের মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়েছিলো বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তির খবরে। নানা জনের নানান মত! উপচে পড়া অনুভূতির প্রকাশই জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশে বব ডিলানের জনপ্রিয়তা। এই জনপ্রিয়তার বেশিরভাগই ঢাকা বা নগরকেন্দ্রিক। তাতে কী! জনপ্রিয়তা জনপ্রিয়তাই। বব ডিলান কে, তার গান কী, অথবা কেনই বা তিনি নোবেল পেলেন—এসব জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে যারা অল্প চিনতেন তাকে, বা চিনতেন না তারাও চিনেছেন বব ডিলানকে। বিতর্কের চায়ের পেয়ালা টুংটাং বেজেই চলছিল তাকে ঘিরে কয়েকদিন।
কেউ বলেছেন কেন দেওয়া হলো তাকে নোবেল! ঠিক হয়নি! কেউ বলেছেন নোবেল দিয়ে বিচার করা যাবে না বব ডিলানকে! বব ডিলান তারও ওপরে বাস করেন! নোবেলের তোয়াক্কাও নাকি করেন না তিনি! সকল কল্পনার অবসান করে বব ডিলান নোবেলপ্রাপ্তি স্বীকার করলেন যখন, তখন সেখানে তিনি সশরীরে হাজির হননি। তবে ভাষণটি পাঠিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে তখন কিন্তু খুব একটা কলরব নেই। সকলেই কি খানিকটা থমকেছেন? কী কারণে?
একটু ফিরে দেখি বাংলাদেশিদের আকাঙ্ক্ষার বব ডিলান কেমন। আর এই আকাঙ্ক্ষার জন্মই বা কোথায়। বব ডিলান আমেরিকান সঙ্গীতশিল্পী, গায়ক, লেখক, এবং পরিশেষে নোবেল বিজয়ী লেখক। ফোক, ব্লুজ, রক, পপ, কান্ট্রি ধারার গাইয়ে। ৭৫ বছর বয়সী এই শিল্পী সরব ছিলেন আমেরিকান সিভিল রাইট মুভমেন্ট ও এন্টি ওয়ার মুভমেন্টে। তার গানও ছিল সেই ধারারই বাহন, সেই ধারাবাহিকতার উত্তরাধিকার। ‘ব্লইং ইন দ্য উইন্ড’ বা ‘দ্য টাইম দে আর চেঞ্জিং’ এর মতো গানের সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক বিষয় সম্পৃক্ত থেকেছে বরাবর। ছবি আঁকতেও সমান পটু এই শিল্পী। অনেক বড় বড় প্রদর্শনীও হয়েছে তার। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে তার চিত্রকর্ম। গানের রেকর্ড থেকেও তিনি আয় করেছেন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। সব সময়েই বব ডিলান ছিলেন বেস্ট সেলিং শিল্পী।
সব পেয়ে পূর্ণ যখন ৭৫ বছর বয়সী এই শিল্পী তখন নোবেল পেয়ে তিনি হয়ে পড়লেন নিস্তব্ধ। কেউ তাকে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। তিনিও নিভৃত থেকেছেন। কেন এই নাটক? আর এই কারণেই বুঝি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মানুষগুলো ভাবতে শুরু করেছিলেন—শেষ পর্যন্ত নোবেল নেবেন তো বব ডিলান? পুরো বিষয়টি খুব নাটকীয়। এতটা নাটকীয়তা কি তিনি করলেন? নাকি তার ভক্তরা? যারা বব ডিলানকে মানুষ থেকে ‘মহামানব’ বানাতে চেয়েছেন, তারা কেন চেয়েছেন! কেন বব ডিলান ‘মহামানব’ হবেন! প্রশ্নটার একটু উত্তর খুঁজি আমরা বরং।

এই তো প্রথম নয়। পুলিৎজার জুরি ২০০৮ সালে তাকে ‘স্পেশাল সাইটেশন’ দিয়েছে পপুলার মিউজিকে অবদানের জন্য। তিনি তা গ্রহণ করেছেন। ২০১২ সালে ‘প্রেসিডেন্ট মেডেল অব ফ্রিডম’ নিয়েছেন তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছ থেকে। বাংলাদেশের উৎসাহী মানুষজন, আধুনিক সুশীল শিক্ষিত মানুষজন তাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে নোবেলই তার জন্য সামান্য! কী অদ্ভুত!

আমাদের লোকজনের এসব ভাবনার মধ্যে বব ডিলানের সমসাময়িক বন্ধু জোন বায়েজ কিন্তু খুব স্পষ্ট। তিনি প্রতিক্রিয়া করেছেন নোবেল পাওয়াটা বব ডিলান ডিসার্ভ করেন আর তা খুবই আনন্দের। কিন্তু পাওয়ার পর তার এই চুপ মেরে থাকা নিয়ে বায়েজ কটাক্ষ করেছেন। জোন বায়েজ বহুবছর আগে, সেই ১৯৬৭ সালের রাজনৈতিক ঘনঘটার আমেরিকা বসেই, বব ডিলান সম্পর্কে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, বব ডিলান আর বিটলসের মধ্যে বড় কোনও পার্থক্য নেই। উভয়েই দারুণ বুদ্ধিমান। কিন্তু একই সঙ্গে তারা কখনোই কোনও দায়িত্ব নিতে চাননি। কখনও কখনও নিজেদের লেখার সময়কার অর্থ আর দায়িত্বও ভুলে যেতে চেয়েছে পরে। দায়িত্ব না নেওয়াটা খুবই সহজ। কিন্তু সেটা আমি অসম্ভব বিবেচনা করি। দায়িত্ব নিতে না চাইলে দ্বীপে গিয়ে থাকো, গিয়ে কলা খাও। কিন্তু যখন তুমি একটা পরিস্থিতির মধ্য আছো, তখন এমন হয় না যে তুমি হাওয়ায় মিশে আছো, যেন তুমি নেই।’

জোন বায়েজের এসব কথায় খানিকটা হলেও বব ডিলানকে বোঝা সহজ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের উৎসাহীরা তা বোঝেননি। তারা নানা কিছু ভেবে গেছেন। পরিশেষে বব ডিলান তো একজন সেলিব্রিটিই জগৎবাসীর জন্য। কোনও রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী তো নন! তবুও কেন বারবার মানুষজন তার রাজনৈতিক সত্তাকে সামনে হাজির করছিলেন?

সম্ভবত এই কারণে যে বাংলাদেশের শিক্ষিত মানুষজন ঠিক এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ডিলেমাতে আছেন। তারা নিজেদের সম্পৃক্ত না-থাকাতে বব ডিলানের মধ্য দিয়েই থাকতে চেয়েছেন। বব ডিলান নোবেল না নিলে হয়তো প্রত্যাখানের কারণে খানিকটা স্বস্তি হতে পারত এসব মানুষের। আর হয়তো পুরস্কারটা নিয়েছেন বলেই কথা কলরব সব থেমে গেল।

অথচ ডিলান নিজে পুরস্কারপ্রাপ্তির ভাষণে বলেছেন, ‘সকল লেখক মনের অজান্তে মনের গভীরে এই স্বপ্ন লালন করেন। আর স্বপ্নটা এতই গভীরে থাকে যে সে ব্যক্তি নিজেই জানে না তা এবং নোবেল তার কাছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই ঘটনা।’ তিনি তার সক্ষমতার জন্য সুনাম অর্জনের পাশাপাশি জনপ্রিয়ও হতে চেয়েছেন। সেটা কোনও অপরাধ নয়। কিন্তু আমরা সেই জনপ্রিয় হতে চাওয়াকে দেখতে চাইনি। চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো নোবেল পুরস্কারটিকে তিনি দুহাত পেতে নিয়েছেন। নোবেলের রাজনৈতিক চরিত্র জেনেই নিয়েছেন।

বাংলাদেশের শিক্ষিত মানুষদের বব ডিলানের মধ্যে প্রতিবাদী রাজনৈতিক কর্মী খোঁজা আসলে ডিলানের মতোই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভরা। ডিলানের মতোই হাতড়ে বেড়ানো। ডিলান আর ডিলানভক্তরা তাই এক জায়গাতেই আছেন। ঠিকঠাক বলেই আমার মনে হচ্ছে।

লেখক: অভিনেতা এবং হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস, বাংলা ট্রিবিউন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ