তাই যেন হয় সিইসি…

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৪:২৩, মার্চ ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৭, মার্চ ১৪, ২০১৭

Salek Uddinবাংলা ট্রিবিউনে ৯ মার্চ প্রকাশিত ‘কুসিক নির্বাচন নিয়ে ইসির ওপর আস্থা তৈরি হবে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি পড়লাম। প্রতিবেদনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেছেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন ইসির প্রতি মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি হবে। তিনি জানিয়েছেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এজন্যে এ নির্বাচনটিকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। জঙ্গি হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করে গাইবান্ধার নির্বাচনও গুরুত্ববহ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন যে, ‘এ কমিশনের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা আশা করছি, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কমিশনের প্রতি সকলের আস্থার ক্ষেত্র তৈরি হবে।’
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সীমানা সম্প্রসারণ নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আটকে ছিল অনেকদিন। আটকে থাকা এই নির্বাচন আগামী ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর কারণে সুনামগঞ্জ ২ এবং গাইবান্দা ১ আসনের সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন সন্ত্রাসীর হাতে খুন হওয়ায় শূন্য এ দুটি আসনেরও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে নব নিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে শুরুতেই নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা, জনগণের আস্থার ক্ষেত্র তৈরির কথা বলতে হচ্ছে কেন? কেন তাকে নিয়েও পচা ঘাঁটা হচ্ছে? বলা হচ্ছে জনতার মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করেছিল। কেন তাকে বলতে হচ্ছে, ‘আমি অতীত ভুলে যেতে চাই। নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে চাই। বিএনপি কী করেছে বা করবে? আওয়ামী লীগ কী করবে বা করবে না, তা আমার কাছে একেবারেই বিবেচ্য বিষয় নয়। কোনও দলের ওপরই আমার কোনও মান-অভিমান বা ক্ষোভ কোনও কিছুই নেই। আমি পেছনের দিকে তাকাতে চাই না। কারও প্রতি রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী হব না। আমি নিরপেক্ষভাবে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকব।’ কেনই বা নিযুক্তি পাওয়ার পর ইসির প্রথম বৈঠকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলকে আনার লক্ষ্য ঠিক করতে হচ্ছে? কেন তাকে বলতে হচ্ছে, ‘আমরা যে কোনও প্রভাব, হস্তক্ষেপ কঠোরভাবে মোকাবিলা করবো, আইনবিধির বাইরে কোনও কিছুকেই প্রশ্রয় দেব না’।
এই সব ‘কেন’এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে তার পূর্বসূরি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন কমিশনের সীমাহীন ব্যর্থতা নির্লজ্জতা মেরুদণ্ডহীনতা ও সরকারের অজ্ঞাবহতা। বর্তমান কমিশনের মতো রকিব কমিশনও একই পদ্ধতিতে ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ পেয়েছিলেন। এই কমিশনের বিরুদ্ধে বড় অপবাদ উত্থাপিত হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নিয়ে। সেই নির্বাচনে সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করেছিল। আর বিএনপি জামায়াত তা বর্জন করেছিল। তৈরি হয়েছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অধিক সংখ্যক সাংসদ নির্বাচনের বিশ্বরেকর্ড। সেই নির্বাচন হয়েছিল ভোটার বিহীন। নির্বাচন কমিশন তাই করেছেন যা সরকার চেয়েছে। ফলে জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে দেশের মানুষের বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটেছে। মোট কথায় বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে রকিব কমিশন। নির্বাচন কমিশন সরকারের তাবেদার হবে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের চাহিদানুযায়ী কাজ করবে মানুষের মধ্যে এমন দৃঢ়মূল বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে গেছেন তারা। আর তাইতো নবনিযুক্ত সিইসিকে এত কথা বলতে হচ্ছে।

নতুন সিইসির এ সব কথা বলার আর একটি কারণ হলো রাকিব কমিশনের নিয়োগ ও এই কমিশনের নিয়োগ একই সরকারের আমলে ও একই পদ্ধতিতে হয়েছে এবং বিদায়ী কমিশনের সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বিদায়ক্ষণে বলেছেন, নতুন নির্বাচন কমিশন তাদের মতোই হবে এবং এই কমিশনও তাঁদের মতোই কাজ করবে। সে সময়ে জাতীয় পত্রিকাগুলোতে তাঁর এই বক্তব্য বেশ প্রচার পেয়েছিল। বাংলা ট্রিবিউনে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জনাব গোলাম মোর্তোজার ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য যে আশঙ্কা জাগায়’ শিরোনামের লেখাতেও বিদায়ী কমিশনের সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের এই বক্তব্যটি স্থান পেয়েছে। এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নতুন কমিশনের সিইসিকে উদ্দেশ করে লেখক বলেছেন, ‘তার মানে রকিব সাহেবের প্রত্যাশা সরকার তাকে যা বলেছিলেন তিনি তাই করেছিলেন আপনারাও তাই করবেন। রাকিব সাহেব ভোটার বিহীন নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন, ৫% ভোটকে ৪০% করে দেখিয়েছিলেন আপনারাও তাই করবেন। তিনি নির্বাচন আয়োজন করে বিনোদন ভ্রমণে চলে গেছেন, আপনিও তাই যাবেন।'

এছাড়াও সিইসির আস্থা জাগানোর কথা বলার আর যে সব কারণ রয়েছে তাঁর মধ্যে একটি  হলো, ২০১৪ এর নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি তার নিয়োগ প্রত্যাখ্যান না করলেও তারপ্রতি আশঙ্কামুক্ত হতে পারেনি এবং হতাশা প্রকাশ করেছে। এছাড়া নিয়োগ প্রাপ্তির শুরুতেই তিনি উপযাজক হয়ে এমন কিছু কথা বলেছেন তাতে জনসাধারণের চোখে তিনি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকার বাক্স ভরতে বলে না, সরকার চাপ দেয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। বলতে দ্বিধা নেই সরকার চাপ দেয় কী দেয় না, বাক্স ভরতে বলে কী বলে না তা সম্ভবত এদেশের মানুষের অজানা নেই। রাজনীতি জনসেবার জন্য ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নয় এমন অবস্থা সম্ভবত এখনও এদেশের মানুষ দেখেনি।

যা হোক যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম আবার তাতেই ফিরে আসি। সিইসি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ইসির প্রতি মানুষের আস্থা তৈরির যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আমরা সে বিষয়ে সাধুবাদ জানাই। সুনামগঞ্জ ২ ও গাইবান্দা ১ আসনের উপ নির্বাচনেও তার প্রত্যয়ী মনভাবেরই প্রতিফলন ঘটবে বলেই আশা করি। দেখতে চাই নির্বাচন কমিশন শুধু এই তিনটি নির্বাচন নয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মেরুদণ্ড সোজা করে  সুষ্ঠুভাবে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের আজ্ঞাবহতার কালচার কঠিন ভাবে প্রতিরোধ করেতে পারছেন। নিরপেক্ষতার মানদণ্ড রক্ষা করে নির্বাচন পরিচালনা করছেন। শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন ও নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং তাদের থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার সহযগিতা আদায় করে নিতে পারছেন। আর এসব পারলেই নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর এদেশের বিরোধী দলের এবং সাধারণ মানুষের যে আস্থাহীনতা কাজ করছে তা আবার ফিরে আসবে। মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে এই কমিশনকে স্মরণ করবে চিরকাল। ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এই কমিশনের নাম। আর তা না হয়ে যদি বিদায়ী কমিশনের সিইসি'র বক্তব্যটিই সত্য হয় অর্থাৎ যদি এই নির্বাচন কমিশনও পূর্বের নির্বাচন কমিশনের মতোই হয় এবং তাদের মতোই সরকারের আজ্ঞাবাহ হয়ে সরকারি দলকে ক্ষমতায় অমর করার কাজে লেগে যায় তাহলে সে হবে এক ট্র্যাজেডি।    

আমরা বিশ্বাস করতে চাই এ রকমটি হবে না। দেখতে চাই তেমনটিই হচ্ছে যেমনটি মুখে বলেছেন সিইসি এবং যেমনটি চাচ্ছেন এদেশের মানুষ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ