কীভাবে ব্রিকসকে শক্তিশালী করছে মার্কিন নীতি

Send
আশিষ বিশ্বাস
প্রকাশিত : ১৪:২০, জুলাই ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩১, জুলাই ০৬, ২০১৮

আশিষ বিশ্বাস

আন্তর্জাতিক জোট ব্রিকসকে যদি শক্তিশালী হতে কোনও কিছু সহায়তা করে থাকে তবে সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের এশিয়া ও আফ্রিকা বিষয়ক পররাষ্ট্র নীতি।  ব্রিকসের সদস্য রাশিয়া ও চীন ভারতকে অনুরোধ করেছিল যেন তারা বাণিজ্যিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ব্যবহার কমিয়ে দেয়। তবে তাতে খুব ইতিবাচক সাড়া দেয়নি ভারত।

ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা ও তাদের ওপর পুনরায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ভারত চিন্তা করছে আসলেই মার্কিন ডলারের ব্যবহার কমিয়ে দেবে নাকি। তেহরানের সঙ্গে একসময় বাণিজ্যে রুপি-রিয়াল ব্যবহার করতো দিল্লি। আবারও তেমন কিছু ভাবছে ভারত। ওবামা প্রশাসন প্রথম যখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে তখনই এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত। এখন এই বিষয়ে আবারও ব্যবস্থা নিতে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে রাশিয়া ও চীন। আর এজন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিই দায়ী।  চক্রাকার প্রক্রিয়ায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার না করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এড়াতে পারে এশীয় দেশগুলো।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মধ্যে যা হয়েছে সেটা হলো দিল্লির মুখের ওপর ওয়াশিংটনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া।  ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় এমন সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাম্প প্রশাসন।  যদিও বেশিরভাগ ইন্দো-মার্কিন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রই অনেক বেশি লাভবান হয়। সেটা ওবামা প্রশাসন হোক কিংবা ট্রাম্প।  এমনকি ভারতীয় খরচে মার্কিনিদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়।

এখনও ভারত পশ্চিমাপন্থি পররাষ্ট্রনীতিতে অটল থাকার চিন্তা করছে। তাদের উদ্দেশ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা ও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।  এছাড়া এশীয় অর্থনীতিতে চীনের মুখোমুখি হয়ে পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্বাস অর্জনও তাদের কৌশল।

তবে যু্ক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারত কতটুকু প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে সেটা বলা কঠিন।  প্রতিরক্ষা খাতে তো পায়নি।  তবে দোকলাম থেকে শুরু করে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে ভারতের মুখোমুখি অবস্থানে সমর্থনের অভাব নেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউয়ের। কিন্তু সেটাও মৌখিক পর্যায়ের।

ভারতের কাছে সর্বাধুনিক জঙ্গিবিমান এফ-৩৫ বিক্রিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।  তবে ইসরায়েল ঠিকই পাচ্ছে।  আবার রাশিয়া থেকে এসএস-৪০০ মিসাইলবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না কিনতেও ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।  এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সুবিধার্থে ভারতীয় পণ্যে শুল্কও বাড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প।  সামনাসামনি খুব ট্রাম্প-মোদিকে খুব অন্তরঙ্গ দেখা গেলেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এমন নয়।  কলকাতার একজন রাজনীতি বিশ্লেষক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতকে এশীয় সহযোগী বলে অভিহিত করেন তখন অবাক লাগে যে আসলে এর মানে কী।’

প্রশ্ন ওঠে, ঠিক কী কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোন বিষয় ভারতীয় নেতা ও নীতিনির্ধারকদের আকৃষ্ট করে।  এমনকি তারা জানেও যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সবসময়ই বঞ্চিত থাকবে তারা।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক এম কে ভদ্রকুমার বলেন, ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিরাই সবকিছু নির্ধারণ করেন।  তারা লন্ডন, ওয়াশিংটন, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজের সংস্কৃতিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।  রুশ কিংবা চীনাদের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে চায় না।  আর এই দুই দেশই পশ্চিমা অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়।

ভদ্রকুমার বলেন, ব্রিকস সম্মেলনে ভ্লাদিমির পুতিনের মতো নেতারা যখন ডলারের ব্যবহার কমাতে চাওয়ার কথা বলে, ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চান,  তখন সবসময়ই নীরব থাকেন নরেন্দ্র মোদি।

ভারতে এটা সবাই জানে।  তারপরও কাশ্মির ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার সমর্থন দরকার তাদের।  কারণ, সেখানে পাকিস্তান ও জঙ্গি গোষ্ঠীদের একসঙ্গেই সামলাতে হচ্ছে।  এমনকি বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেইও কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটা বলেছেন।

ধনী ও আকর্ষণীয় পাশ্চাত্য দেশগুলোর প্রতি ভারতের আকর্ষণকে আদতে ঔপনিবেশ পরবর্তী অভ্যাস বলার প্রয়োজন নেই। দক্ষিণপন্থি পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্বের ২৫ শতাংশ জিডিপি ও ৪০ শতাংশ জনগণই ব্রিকসের আওতায়। স্বাভাবিকভাবেই তাই তারা পশ্চিমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।  পুতিন ব্রিকস সদস্যদের পিপিপির প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্রিকস সদস্যরা খুব বেশি দূরে নেই যেদিন তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ দেশগুলোর মতো সুবিধা ভোগ করবেন।

ইরান, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরও ১২টি দেশের ব্রিকসে যোগদানের কথা রয়েছে।  তবে ভারত এখানে খুব একটা স্বচ্ছন্দ্য না। বার্ষিক ২৫-৩০ বিলিয়ন বাণিজ্যে ভারত মাত্র ১০-১৫ শতাংশ আয় করে। পশ্চিমা দেশগুলো এখনও ভারতের চেয়ে বাণিজ্যিক দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে।

এই মুহূর্তে চীন ও রাশিয়াই ব্রিকসকে টেনে নিচ্ছে। তারা বৈশ্বিকভাবেই ডলারের প্রয়োগ কমাতে চাচ্ছে। চীন বারবারই বলে আসছে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি করবে। রাশিয়া জানায়, তারা ডলার ব্যবহার না করেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাবে।

ব্রিকসের গত সম্মেলনে কর্মকর্তারা বলেন, নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের নতুন পথ তৈরি করতে হবে। এতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমে যাবে। চীনের নেতৃত্বে ব্রিকস সদস্যরা গড়ে তুলেছেন এআইআইবি। ছোট হলেও তাদের উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাংককে টেক্কা দেওয়া।  নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা ও বাণিজ্য বাড়াতে তারা নিজ নিজ মুদ্রা ব্যবহার করবে বলে জানানো হয়।  চীন বর্তমানে ডলারের পরিবর্তে ১৬টি দেশে তাদের মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহার করে। ভারতও রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে রুপি-রুবল ব্যবহার করছে।

ব্রিকস অর্থনীতি এখন বিশ্বের বাণিজ্যে প্রভাব রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইইউয়ের মতো না হলেও সেটা একদম উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তবে এখনও অনেক পথ বাকি। বিশ্ববাজারে ডলারের প্রভাব কমানোর ঘোষণা দেওয়া যতটা সহজ, বাস্তবতা ততটা নয়। অন্যদিকে ভারত-বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানানো। কারণ, যুগ পাল্টাচ্ছে। বদলাচ্ছে বিশ্ব।

 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলকাতা

 

/এমএইচ/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ