জলবায়ু পরিবর্তন, পারমাণবিক জ্বালানি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ

Send
জিশান হাসান
প্রকাশিত : ১৯:১৯, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৬, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯

জিশান হাসানএটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষ নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে জাতিসংঘের কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জের ২৪তম সম্মেলন (কপ টোয়েন্টি ফোর) নিয়ে বিশেষ কোনও আগ্রহ দেখাননি। এটা দুর্ভাগ্যজনক। একটি নির্বাচন বাংলাদেশের আগামী পাঁচ বছরের নেতা নির্বাচনের বিষয়। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আজকের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে দেবে আগামী শতকের ভবিষ্যৎ। জলবায়ু সম্মেলনটি ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো উন্নত বিশ্বের দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ হ্রাসের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে একমত হতে পারেনি। অথচ এই দুই কারণেই বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। ‘ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের’ (আইপিসিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিশ্বের হাতে আর মাত্র বছর বারো সময় আছে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ হ্রাসের জন্য।

এরমধ্যে যদি তা করা না যায়, তাহলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণকে এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি হতে না দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে মেরু অঞ্চলে গলতে থাকা বরফের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে কয়েক মিটার পর্যন্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তুলনামূলকভাবে কম উচ্চতায় অবস্থিত দেশগুলোর জন্য তা ডেকে আনবে মহাবিপর্যয়। আর এই দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক মহলের এমন নির্বিকারভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে আমরা কী করতে পারি? প্রথমত, বাংলাদেশে যত বেশি সম্ভব পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। এর জন্য প্রথমেই বন্ধ করতে হবে জীবাশ্ম জ্বালানিতে দেওয়া ভর্তুকি। এমনকি কৃষিতে সেচের কাজে ব্যবহৃত পাম্পের ডিজেল ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রেও ভর্তুকি বন্ধ করে দিতে হবে।

সৌর বিদ্যুতকে বাংলাদেশে ব্যয়বহুল মনে করা হয়। এর মূল কারণ, প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির জন্য যে পরিমাণ খরচ হয় তার পুরোটা বহন করতে হয় না জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে। ডিজেলসহ অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করে দিলে সৌর বিদ্যুৎ প্রতিযোগিতা করার মতো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাবে।

বাংলাদেশ কয়লাভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। অথচ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী উৎসগুলোর একটি। বাংলাদেশের উচিত ব্যাপক মাত্রায় সৌর বিদ্যুতের প্রকল্প গ্রহণ করা। এরজন্য সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর কর আরোপ করা এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ সৌর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া।

কয়লা আমদানির ওপর বসানো কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। আবার উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদেরও প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে দরকষাকষি করতে হয় সরকারের সঙ্গে। এটি সময়ক্ষেপণ করে। তাছাড়া, সৌর বিদ্যুতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন দেশে বিনিয়োগ করতে চায় না যেখানে একটি স্বচ্ছ ‘ফিড ইন ট্যারিফ’ ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা করা গেলে সৌর বিদ্যুৎ খাতে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠতো।

এটাই বাস্তবতা, বাংলাদেশে নিঃসরিত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের চেয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর ভূমিকা এক্ষেত্রে অনেক বেশি। আমরা যদি রক্ষা পেতে চাই, তাহলে শুধু নিজেদের দূষণের মাত্রা কমালেই হবে না, অন্যদেরও দূষণের মাত্রা কমাতে সহায়তা করতে হবে। আপাতত এটাকে অসম্ভব কাজ মনে হলেও কাজটা তা নয়।

কার্বন ডাই অক্সাইডের দূষণমুক্ত সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা হচ্ছে পারমাণবিক চুল্লি। রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উঠে এসেছে সেই অল্প কিছু দেশের তালিকায়, যারা তৃতীয় প্রজন্মের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ করছে।

তৃতীয় প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ব্যয়বহুল। কিন্তু এগুলো অনেক বেশি নিরাপদ। কোনোরকম বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ছাড়াই এসব চুল্লি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে। সুনামির কারণে দুর্ঘটনার শিকার জাপানের দ্বিতীয় প্রজন্মের ফুকোসিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল না।

তৃতীয় প্রজন্মের নিরাপদ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু আমাদের এর চেয়েও অনেক বেশিদূর যেতে হবে। এর চেয়েও বেশি নিরাপদ ও পরিবেশ দূষণমুক্ত চতুর্থ প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের নকশা ১৯৯০-এর দশকেই তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু তারা তখন তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বাজেট স্বল্পতার কারণে।

চতুর্থ প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে এমন ব্যবস্থা, যাতে পূর্ববর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তিতে নির্মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পাওয়া পারমাণবিক বর্জ্য সেখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এসব বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়তা থেকে যায় হাজার হাজার বছর। চতুর্থ প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করলে মুক্তি পাওয়া যাবে এসব বর্জ্যের ঝুঁকি থেকে।

শিল্পায়নে শীর্ষে থাকা দেশগুলো কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের মাধ্যমে বিশ্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যে চতুর্থ প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দরকার তা নির্মাণ করতে চাইছে না। বাংলাদেশ এমন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে পারে। বিশ্বজুড়ে আরও বেশি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা সূচনা করতে পারি এক নবযুগের।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। আমাদের টিকে থাকা শুধু আমাদের নিজেদের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাসের ওপর নির্ভর করছে না। বরং বিশ্বজুড়ে অন্যদেরও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখার ওপর তা নির্ভরশীল। চতুর্থ প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অনুসরণীয় উদাহরণ, যা বাকি বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করবে।

লেখক: পরিচালক, টুএ মিডিয়া লিমিটেড

 

 

 

/এএমএ/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ