বাংলাদেশ কেন অস্কার জেতে না?

Send
জনি হক
প্রকাশিত : ১৯:০৯, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৭, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯

জনি হকবাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে একটি চলচ্চিত্র নির্বাচন করে অস্কারে জমা দেয়। অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে সেটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। বেশিদূর যাবো না, পাশের দেশ ভারতের কথাই বলি। সেখানে একটি ছবি অস্কারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেকে মনমরা হয়ে যায়! তারা মনে করেন, তাদের ছবিও পাঠানো যেতো। ভক্ত-দর্শকরাও তাতে যোগ দেয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের সুবাদে। সবমিলিয়ে একটা প্রতিযোগিতার আমেজ লক্ষ্য করা যায়। ভারতের ফিল্ম ফেডারেশন রীতিমতো হিমশিম খায়, কোন ছবি রেখে কোনটা পাঠাবে। কিন্তু বাংলাদেশে বছরজুড়ে দুটি ছবিও একে অন্যের সঙ্গে লড়াই করার মতো মেলে না! এমনও হয়েছে, ছবিই জমা পড়ে না। পড়লেও এমন ছবি আসে যে, সেটির নাম ঘোষণা করলে ফেডারেশনের নাক কাটা যাবে! তখন তারা কোনোমতে মান বাঁচবে এমন ছবি জমাদানে উদ্বুদ্ধ করেন। এরপরে কি আর বলার দরকার পড়ে, আমরা কেন অস্কার জিতি না? তবুও বলি। 

সত্যি কথা বলতে, অস্কারে শুধু ছবি পাঠিয়ে বসে থাকা নিরর্থক। যে কেউ তার ছবি অস্কারে জমা দিতে পারে। এর মানে এই নয় যে, চূড়ান্ত মনোনয়নে জায়গা মিলে যাবে। পুরস্কার তো দূরের কথা। জমাদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আরও মেলা পথ পাড়ি দেওয়া লাগে। আসুন সেই কঠোর সত্যের মুখোমুখি হই। 

অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের আট হাজার জুরি সদস্যের বেশিরভাগই গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে ছবি দেখে থাকেন। যেমন কান, টরন্টো, ভেনিস, বার্লিন, ট্রাইবেকা, সানড্যান্স। এসব আয়োজনে কোনও ছবি প্রশংসা কুড়ালে অস্কার সম্ভাবনা জাগতে শুরু করে। তখন সনি পিকচার্স ক্ল্যাসিকস কিংবা ফক্স সার্চলাইট পিকচার্সের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উত্তর আমেরিকায় পরিবেশনার দায়িত্ব নেয়। এভাবে ধীরে ধীরে সুযোগ সৃষ্টি হতে থাকে। 

একটা পরিসংখ্যান দিয়ে রাখি, অ্যাকাডেমি সদস্যদের অর্ধেকেরও বেশি ষাটোর্ধ্ব। ৫০ বছর বয়সীরা ২৫ শতাংশ, ৪০-এর ঘরে আছেন ১২ শতাংশ। অস্কার ভোটারদের ৯৪ শতাংশই শ্বেতাঙ্গ, ৭৭ শতাংশ পুরুষ। 

এখন বলা অসম্ভব বাংলাদেশের কোনও ছবি কবে  বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোতে হৈচৈ ফেলতে পারবে। তেমন হাইপ সৃষ্টি করতে দুই বছর কিংবা তিন বছর নয়তো পাঁচ বছর বা ১০ বছর লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে কখনই আমাদের সেই ছবি পাওয়া হবে না!

প্রথমত, অস্কারে ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম বিভাগে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ৮০ থেকে ৯০টি ছবির মধ্যে লড়াই হয়। এর মধ্যে ৭-৮টি ছবি সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পায়। ৯১তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের উদাহরণ দিই। এবারের আসরে সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই গত বছর ৭১তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে ছিল। জাপানের কোরি-ইদা হিরোকাজু পরিচালিত ‘শপলিফটারস’ স্বর্ণ পাম জিতেছে। পোল্যান্ডের ‘কোল্ড ওয়ার’ ছবির জন্য পাউয়েল পাওলোকস্কি কানে সেরা পরিচালকের সম্মান জিতেছেন। লেবাননের ‘কেপারনম’ ছবির জন্য নারী নির্মাতা নাদিন লাবাকি প্রিঁ দ্যু জুরি পুরস্কার পান কানে। কাজাখস্তানের সের্গেই দিভোর্তসেভয়ের ‘আইকা’য় অনবদ্য অভিনয়ের জন্য কানে সেরা অভিনেত্রী হন সামাল ইয়েসলিয়ামোভা। আর ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম ক্রিটিকসের (ফিপরেস্কি) বিচারে প্রতিযোগিতা বিভাগ থেকে সেরা হয় দক্ষিণ কোরিয়ার লি চ্যাং-ডং পরিচালিত ‘বার্নিং’। এছাড়া কলম্বিয়ার ‘বার্ডস অব প্যাসেজ’ ছবির মাধ্যমে কানে ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইটের ৫০তম আয়োজনের উদ্বোধন হয়।

অস্কারে এবার সবচেয়ে বেশি হৈচৈ হয়েছে নেটফ্লিক্স প্রযোজিত ‘রোমা’কে ঘিরে। এটিও ৭১তম কান উৎসবে প্রদর্শন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আয়োজকদের সঙ্গে নেটফ্লিক্সের আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে তা বাতিল হয়। পরে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার জেতে আলফনসো কুয়ারনের পরিচালনায় স্প্যানিশ ভাষায় নির্মিত ‘রোমা’। ৭৫তম ভেনিস উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত জার্মানির ‘নেভার লুক অ্যাওয়ে’ ছবিটিও জায়গা পায় ৯১তম অস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। এছাড়া সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত ডেনমার্কের ‘দ্য গিল্টি’কে জায়গা দেওয়া হয় এতে। 

এরপর চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকা দেখুন। কান উৎসবের তিন ছবি ‘শপলিফটারস’, ‘কেপারনম’ ও ‘কোল্ড ওয়ার’ আর ভেনিসের দুই ছবি ‘রোমা’ ও ‘নেভার লুক অ্যাওয়ে’ জায়গা পায়। সেরা ছবি ‘গ্রিন বুক’-এর কথাই ধরুন। ষাটের দশকে আমেরিকার দক্ষিণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণে গিয়েছিলেন এক কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতশিল্পী। তার গাড়ি চালিয়েছেন এক শ্বেতাঙ্গ ড্রাইভার। এই সত্যি গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিটি গত বছর ৪৩তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রভাব বিস্তারকারী পুরস্কার পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ড জেতে। পিটার ফ্যারেলি পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন অস্কার জয়ী মাহেরশালা আলি ও ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ তারকা ভিগো মর্টেনসেন।

টরন্টো উৎসবের পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ডকে হলিউডের পুরস্কার মৌসুমে সাফল্য পাওয়ার প্রভাবশালী অর্জন হিসেবে দেখা হয়। এর আগে এই অ্যাওয়ার্ড জয়ী ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’, ‘দ্য কিংস স্পিচ’ ও ‘টুয়েলভ ইয়ারস অ্যা স্লেভ’ অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া টরন্টোতে পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ড জেতা সর্বশেষ ১০ ছবির মধ্যে ৯টিই অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়।

চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে সাড়া ফেলার পাশাপাশি অস্কারে জমা দেওয়ার পর লস অ্যাঞ্জেলেসের বড় কোনও পরিবেশনা সংস্থাকে সঠিকভাবে ছবি সম্পর্কে ধারণা দিতে হয়। এখানে আমরা একটা ভুল করি, অনেক দেরিতে ছবি পাঠাই। অস্কারের দৌড়ে আমাদের যেতে যেতে অন্যান্য দেশের ছবির স্ক্রিনিং ও এজেন্ট বুকড হয়ে যান। দেরিতে যাওয়ার একটা ব্যাপার তো আছেই, তাছাড়া আমরা জানি না কীভাবে কী করতে হয়। আমেরিকা গিয়ে বাংলা ভাষাভাষি কিছু মানুষকে ছবি দেখানো পুরোপুরি অকার্যকর।

টাকা হলো আরেক সমস্যা। ১ কোটি টাকাও অস্কার প্রচারণার জন্য নস্যি! অস্কারে পাঠানো ছবি যেন হৈচৈ ফেলতে পারে ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে সেজন্য নির্মাতাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। উপযুক্ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়াটাও দরকারি। পশ্চিমা বিশ্বে লবিং কার্যক্রমকে গ্রহণযোগ্য চর্চা হিসেবে দেখা হয়। তাদের নিয়ম মেনেই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। পুরস্কারের মৌসুম এলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ হয়ে যায় বিয়েবাড়ির মতো! তারা ব্যবসা চায়, তাই সেভাবেই এগোতে হবে। 

দুঃখজনক হলো, আমাদের বেশিরভাগ নির্মাতার কাছে এসব নিয়ম অজানা। কীভাবে এগোতে হবে তা নিয়ে কোনও গেম প্ল্যানও থাকে না তাদের। সমস্যা হলো আমরা অস্কারকে সিরিয়াসলি নিই না। অস্কার শুধু একটা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এটি দেখে। অস্কারের স্বীকৃতির সুবাদে বিভিন্ন দেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। অস্কারে কোনও ছবি মনোনয়ন পেলেও শুধু ওই চলচ্চিত্র নয়, পুরো দেশের সিনেমা পুরোপুরি নতুনভাবে স্পটলাইটে চলে আসে। ইরানি ছবি বরাবরই সম্মানজনক, তবে আসগর ফারহাদির ‘অ্যা সেপারেশন’ ২০১২ সালে অস্কারে বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড জেতার পর তাতে নতুন হাওয়া লাগে।

বাংলাদেশের সিনেমাও বেড়ে উঠেছে। কিন্তু আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে। যেখানে পৌঁছালে অস্কারের সহায়তা মিলতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, চলচ্চিত্র শিল্প বা সরকারি পর্যায় থেকে এ নিয়ে কোনও কিছু করার ইচ্ছে দেখা যায় না। বেশিরভাগ সময় আমরা নিরর্থক ছবি পাঠাই, যেগুলোর অস্কার জয়ের কোনও সুযোগই থাকে না। আর জুতসই ছবি পাঠাতে পারলেও পুরস্কার জেতার ক্ষেত্রে কোনও সহযোগিতা করি না। 

অস্কার মৌসুমে দ্য হলিউড রিপোর্টার পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপনের পেছনেই খরচ হয় ৭২ হাজার ডলার। দ্য হলিউড রিপোর্টারের এডিটোরিয়াল ডিরেক্টর ম্যাথু বেলোনি স্পষ্ট করেই বলেন, ‘কাঙ্ক্ষিত সোনালি মূর্তি পেতে টাকা খরচ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোর সঙ্গে হাত মেলাতে হবে, তাদের কাছে নিজের ছবির বার্তা পৌঁছাতে হবে। কোনও ভালো নির্মাতা সম্পর্কে অ্যাকাডেমি ভালোভাবে জানলে ও তার ছবির ওপর বিশ্বাস রাখতে পারলে কাজটা সহজ হয়ে যায়।’ 

অস্কারের পেছনে টাকা খরচ করলে টাকা আসে। সেরা ছবির ট্রফি বক্স অফিসে বাড়তি টাকা নিয়ে আসে। এবারের সেরা চলচ্চিত্র ‘গ্রিন বুক’-এর বেলায়ও তা হচ্ছে। তাছাড়া আগামী কাজের জন্য প্রথম সারির তারকাদের অনায়াসে আকর্ষণ করা যায়। সেজন্য ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি অবধি নিউ ইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসে ভোটারদের সঙ্গে লাঞ্চ, স্ক্রিনিং, ককটেল রিসিপশন ও প্যানেল ডিসকাশনে তুমুল ব্যস্ত থাকেন অভিনয়শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকাররা। 

হলিউড সাময়িকী ভ্যারাইটির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ‘রোমা’র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নেটফ্লিক্স আড়াই কোটি ডলার খরচ করেছে। এর মধ্যে অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে দিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করায় তারা। এছাড়া ‘রোমা’র শুটিংয়ে ব্যবহৃত কস্টিউম ও প্রপসের প্রদর্শনী হয়েছে। ওয়ার্নার ব্রাদার্স দুই কোটি ডলার ব্যয় করেছে ‘অ্যা স্টার ইজ বর্ন’ ছবির জন্য। এসবের বেশিরভাগই গেছে টিভি বিজ্ঞাপন, হলিউডকেন্দ্রিক নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুকের বিজ্ঞাপনে। কিছু বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শকদের ছবিটি দেখতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ভাড়া নেওয়া হয় বিলবোর্ডও। ডিভিডি কিংবা ভিডিও অন ডিমান্ড পদ্ধতিতে নিজেদের ছবি দেখিয়ে, পত্রিকা, ওয়েবসাইট ও বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দিয়ে, ভোটারদের সরাসরি তথ্যাদি পাঠিয়ে, জনসংযোগ ও লবিং করে অস্কার মৌসুমে প্রচারণা চালাতে হয়।

মোদ্দা কথা, অস্কার জিততে হলে টিভি ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন আর অভিনয়শিল্পীদের কাজ তুলে ধরতে তাদের ভ্রমণ-রূপসজ্জা-চুলসজ্জাসহ কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। দারুণ একটা চলচ্চিত্র তৈরি করলেই অস্কার জিতে যাবেন তা ভাবা ঠিক নয়। তবে অস্কার জয়ের সিঁড়ি তৈরি করতে হলে আগে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোতে জায়গা পাওয়া জরুরি। 

লেখক: সাংবাদিক

 

 

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ