যুবলীগ-ছাত্রলীগ কাণ্ড এবং কিছু ‘অবান্তর’ প্রশ্ন

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৭:০১, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০১, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯

রুমিন ফারহানা‘ঢাকাকে ক্যাসিনোর শহর বানিয়েছে বিএনপি। তাদের সময় এই ক্যাসিনোগুলো ছিল। সেই ক্যাসিনোগুলোর ব্যাপারে অ্যাকশন তো নেওয়া হচ্ছে। সরকারের প্রথম বছরেই কিন্তু অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে। সময় তো এখনও ফুরিয়ে যায়নি।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে না, গত দশ বছর বিএনপি ক্ষমতায় থাকার পরে আওয়ামী লীগ একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মাত্রই ক্ষমতায় এলো? কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ১০ বছরে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সেলামি, জুয়া, ক্যাসিনো, দুর্নীতি, টর্চার সেলের নানা খবর পত্রিকায় এলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরন্তু হয় অস্বীকার, না হয় বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপানোতেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে সরকার।
সরকার এতদিন মহাব্যস্ত ছিল ‘উন্নয়নের মহাসড়কে কীভাবে শণৈঃ শণৈঃ গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ’ এই বয়ান মানুষকে গেলাতে। যদিও এই কথিত মহাসড়ক ধরেই যে বীভৎস দুর্নীতি, বৈষম্য, বেকারত্ব, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলেছে সে বিষয়ে সরকার ছিল পুরোপুরি নির্বিকার। সরকার বিগত কয়েক বছর যাবৎ জোর গলায় দাবি করে যাচ্ছে ঢাকা নাকি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো এশিয়ার দেশগুলোকে ছাড়িয়ে ইউরোপ আমেরিকার প্যারিস, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্কের রূপ নিয়েছে। প্যারিস লস অ্যাঞ্জেলেসের খবর জানি না, তবে ঢাকা যে বর্ষাকালে ভেনিস আর রাতের বেলা লাস ভেগাসে পরিণত হয়, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

গত কয়েক দিন গণমাধ্যমজুড়েই ছিল যুবলীগ, ছাত্রলীগের নানা অনিয়ম, অনাচার আর দুর্নীতির খবর। দেখে মনে হয়েছে, গত ১০ বছর তারা ‘ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির’ থাকার পরে হঠাৎ করে এই সব অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুকের কথাগুলোয় মজা পেয়েছি। তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনারা বলেছেন ৬০টি ক্যাসিনো আছে, আপনারা ৬০ জনে কি এতদিন আঙুল চুষছিলেন? তাহলে যে ৬০ জায়গায় এই ক্যাসিনো, সেই ৬০ জায়গার থানাকে অ্যারেস্ট করা হোক। সেই ৬০ থানার যে র‍্যাব ছিল, তাদের অ্যারেস্ট করা হোক’। তিনি বোধ করি ভুলে গিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে সবাই আঙুল চুষতে মহাপারদর্শী। যতক্ষণ পর্যন্ত না ওপরের নির্দেশ আসে ক্ষমতাবানদের সব কর্মে, অপকর্মে আঙুল চুষে। যখন বুঝি ঝুঁকি নেই, তখন গর্ত থেকে বের হয়ে বিরাট বীর। ভোট দিতে পারেনি, কথা নেই, গণপিটুনিতে মানুষ মরে, আওয়াজ নেই, মানুষ হাওয়া হয়ে যায়, চুপ, বিচার ছাড়া মানুষ হত্যা, দেখেও দেখি না। টাকা পাচার, ব্যাংক লুট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক লোপাট, মহাপ্রকল্প মহালুট, সীমান্তে লাশ ঝোলে, পতাকা বৈঠকে ডিসমিস, আমাদের আঙুল সদা সর্বদা মুখে।

ওমর ফারুক অবশ্য তার ভাষায় ‘পিটিয়ে পাছা লাল’ হওয়ার ভয়েই হোক আর যে কারণেই হোক পরবর্তী সময়ে নিজ দলের নেতা কর্মীদের সাবধান করেছেন। ওনার প্রাথমিক বক্তব্যে তিনি নিজেকেসহ রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ, সাংবাদিক—সবাইকে তাদের নিজ নিজ দায়ভার সম্পর্কে সচেতন করে দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘হঠাৎ করে কেন জেগে উঠলেন? কারণটা কী? এটা কি বিরাজনীতিকরণ নীতিতে আসছেন?’

তার এই প্রশ্নের উত্তর চমৎকারভাবে দিয়েছেন তারই দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বিবিসির কাছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেছেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই এই সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি তার সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছেন,  প্রধানমন্ত্রী খুবই চিন্তা-ভাবনা করে মনে করেছেন ‘এখনই সময়’ তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করার, যদিও তাদের বিষয়ে তার উষ্মা আগে থেকেই ছিল।

কৃষিমন্ত্রীর এই সাক্ষাৎকার আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, বহুদিন ধরে বলে আসা আমার এক পুরনো কথাকে। প্রধানমন্ত্রী না চাইলে এ দেশে কিছুই হয় না। এই বিষয়ে বিভিন্ন টক শো, কলাম, গোলটেবিলে অসংখ্যবার বলার পরে শেষমেষ সংসদে আমি এই প্রশ্ন রাখতে বাধ্য হয়েছি যে, এ দেশে মানুষ হত্যার বিচার থেকে শুরু করে মশা মারা পর্যন্ত সব কিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা লাগে। এই বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে যেমনই লাগুক না কেন, এটা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়ারই ইঙ্গিত বহন করে, যা একটি রাষ্ট্রকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার পূর্বশর্ত।

ক্যাসিনোর এই ডামাডোলের মধ্যে র‍্যাবের এক বিশেষ অভিযানে ৬ দেহরক্ষী এবং বিপুল পরিমাণ টাকাসহ আটক হয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা জি কে শামীম। তার কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, মাদক, নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ও ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর-এর কাগজ উদ্ধার করা হয়। আওয়ামী লীগের একটি সহযোগী সংগঠনের একজন কেন্দ্রীয় নেতার ঢাকার একটা অফিসে যদি এই পরিমাণ টাকা পাওয়া যায়, তাহলে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের একজন নেতার দেশে-বিদেশে কী পরিমাণ সম্পদ থাকতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। যে দু’জনের ঘটনা মূলত গণমাধ্যমে এসেছে, তারা কেউই উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে এসে বৈধ ব্যবসায় এই অর্থ বানাননি। একজনের বাবা ছিলেন রেলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি, যিনি বেড়ে উঠেছেন শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে।  অন্যজনের বাবা গ্রামের স্কুল মাস্টার। তাদের এই উত্থানের মূলে যে ক্ষমতার রাজনীতি একমাত্র ভূমিকা পালন করেছে, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।

সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম এক ‘সুশীল’, যিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের নানা অপকর্ম বাক আর ছলচাতুরি  দিয়ে লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তাদের উত্থান নিয়ে প্রশ্ন রেখে বলেছেন, তাদের এই অস্ত্র দেহরক্ষী আর টাকার উৎস কী, তাদের পেছনে কোন শক্তি কাজ করছে যে, তারা রাস্তা থেকে উঠে এসে এত বড় লুটেরা হলো। আমি বিনয়ের সঙ্গে তাকে মনে করিয়ে দেই এই ছাত্রলীগ, যুবলীগের শোভন-রাব্বানী, সাদ্দাম, খালেদ কিংবা শামীম যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এত দূর উঠে এসেছেন, তাদের মধ্যে যেমন আছেন এমপি-মন্ত্রীসহ উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, তেমনি আছেন তাদের থেকে নানা সময়ে নানা সুবিধা নেওয়া এসব সুশীলও।  

যুবলীগের এই ঘটনা ঘটার আগে আগে ছাত্রলীগের বদৌলতে আমরা জানতে পারলাম কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে কোনও প্রকল্পে ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের জন্য ‘ন্যায্য পাওনা’ থাকে, সেই ‘পাওনা’ চেয়ে না পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে মিডিয়ার কাছে বলা যায়। আমরা জানতে পারলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সামনের কয়েক বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মধ্যে ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ‘ন্যায্য পাওনা’ ৮৬ কোটি টাকা। আমরা আরও জানলাম, জাবি ভিসি সেই ভার্সিটির ছাত্রলীগকে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়েছেন, এর মধ্যে একজন নেতা স্বীকার করেছেন তিনি ২৫ লাখ টাকা ‘ঈদ বকশিশ’ পেয়েছেন ভিসির কাছ থেকে। কত কী যে শেখা গেলো।

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরের মধ্যে এই প্রথম বারের মতো চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পকেট কমিটি, মাদক সেবনসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পদ ছাড়তে বাধ্য হলেন সংগঠনটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক। এই দু’টো ঘটনা কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্নগুলো করা অহেতুক, অবান্তর, অযৌক্তিক যদিও এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সত্যিকার সমাধান।

(১) দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা সরকারি দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের এই সব অপকর্মের কথা নানা সময় গণমাধ্যমে এলেও এতদিন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?

(২) পুলিশ প্রশাসন কি কিছুই জানতো না, নাকি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ না পাওয়া গেলে সরকারি দলের কোনও অপরাধী ধরা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?

(৩) কৃষিমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তার অর্থ কি এই দেশে সরকারি দলের নেতারা যে কোনও অপকর্ম নির্বিঘ্নে করে পার পেতে পারে, যদি না ক্ষমতাসীন দল তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়?

(৪) শোনা যায়, এই জুয়ার আসর গরম রাখতেন সরকারি বড় কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের তালিকা কি করা হয়েছে? হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

(৫) এই সব অপকর্মের টাকার ভাগ কাদের কাছে যেতো এবং তাদের বিরুদ্ধে আদৌ কি কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

(৬) ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ সূচক হয়, তাহলে বেছে বেছে মধ্যম সারির হাতেগোনা কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্য কী? আইওয়াশ, নাকি কৃষিমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন, মুখ রক্ষা?

(৭) শোনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধেও নাকি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশ্ন থাকে কোন পর্যায়ের কতজন নেতার বিরুদ্ধে কোন কোন অপরাধের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

(৮) শেয়ার বাজার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, টাকা পাচার, ব্যাংক লুট তো বাদই দিলাম, বালিশ, পর্দা বা বইয়ের মতো ‘ছিঁচকে চুরির’ বিচার কি অন্তত ‘রাজনৈতিক বিবেচনাতেও মুখ রক্ষা’ করতে হবে?    

(৯) টাকা-পয়সা চুরির বিষয় তো বুঝলাম, ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাতে যে ভয়ঙ্কর ভোট ডাকাতি হলো, তার কী হবে? মনে প্রশ্ন জাগে, সেই মহাচুরির অংশীজনদের কি আর কোনও চুরির বিচারের কোনও প্রকার কোনও নৈতিক অধিকার থাকে কি?  

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

 

 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ