আব্দুল আজিজ ও বাজেটে উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১৩:৩৯, জুন ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫২, জুন ১৩, ২০২০

মামুন রশীদনা,  না,  আমি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আব্দুল আজিজের কথা বলছি না। বলছি, আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের কেয়ারটেকার নোয়াখালীর আব্দুল আজিজের কথা। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বাসায় ঢোকার আগ মুহূর্তে আমার জুতা ডিসইনফেকশনের সময় কেয়ারটেকার আব্দুল আজিজ নিজ থেকেই বলে বসলেন—স্যার দেখলেন না মোবাইলে কথা বলার খরচ বেড়ে গেছে,  স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দও তেমন বাড়েনি।’
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার বন্ধুরা আব্দুল আজিজের মতো স্বল্পশিক্ষিত কারও কাছ থেকে এমন জ্ঞানগর্ভ কথা শুনলে নির্ঘাত বলতো—‘ডরাইছি’।
এদেশে অনেক বাংলা সাহিত্য আর ইতিহাসের ভাইবন্ধুরা যখন টেলিভিশন বাক্সে ঢুকে বাজেট নিয়ে এতো সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, তখন আমি মোটেও আশ্চর্য হই না। আমার বাড়ি আব্দুল আজিজের বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। আমাদের দেশটাও তো অনেক ছোট। শুধু ভাবি, বাজেট যদি এতই সোজা হতো তাহলে কি প্রয়োজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট মন্ত্রী,  এমবিএ আর পাবলিক ফাইন্যান্সে মাস্টার্স আর পিএইচডি অর্থসচিব আর এনবিআর চেয়ারম্যান দিয়ে। সবার দেখছি পরীক্ষায় সব প্রশ্ন ‘কমন’ আর উত্তরও ‘কমন’। মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেনের যুগে আমরা সবাই জেনে গেছি—বাজেটে আয়-ব্যয়ের খতিয়ান, আয়ে ঘাটতির কারণ, আয়-ব্যয়ে দায়বদ্ধতা আর গুণগত মান বজায় রাখার সমস্যা। তাই হয়তো বিজ্ঞজনেরা বলছেন—বাজেটে অভিনবত্ব নেই, উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন ঘটেনি।  মন্ত্রী বাহাদুররা জানা কারণেই বলেন, হয়েছে, আর সচিব মহোদয়রা বলেন, আর কী আশা করেছিলেন? রান্নার রেসিপি অনুসারে সবইতো দিয়েছি। আর নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মতো কেউ কেউ হেসে বলেন, ‘হুজুর ময়দা আর ছানার গুণাগুণ এবং মিশ্রণের ওপরেই তো  ময়ানের বা জিলাপির গুণাগুণ’।                                

অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার সংসদে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয়, ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার আয়, ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ও ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতির এবং সেই ঘাটতি মোকাবিলার পরিকল্পনাসহ বাজেট পেশ করেছেন।  বাজেটে করোনা অভিঘাত বিবেচনায়  ২০২০ সালের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি সশোধন করে ধরা হয়েছে ৫.২ শতাংশ, আর ২০২১ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলিত হয়েছে  ৮.২ শতাংশ।

অনেকেই বুঝে হোক,  না বুঝে হোক বলছেন হয়নি, ‘আরও অনেক কথা বাকি ছিল’ বা ‘বাকি রয়ে গেলো’। এই বাজেটীয় দাওয়াইতে করোনার দাগ মুছবে না। ভাগ্যিস, অর্থমন্ত্রী ‘মা কালি’র রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বলেননি—‘বাংলার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা’, কেন এত সমালোচনা?  কেন এই বিরোধিতা? কেন গো এত অভিমান?      

এবার করোনার কারণে যদিও সংশ্লিষ্টজনদের সঙ্গে মার্চের মাঝামাঝির পর অনলাইনে সীমিত বার্তা লেনদেন ছাড়া প্রত্যক্ষ কোনও আলোচনা হয়নি তবে গত কয়েক বছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমরা রাজস্ব ভিত্তি বাড়ানো, সামাজিক খাতে অধিক বরাদ্দ, প্রবৃদ্ধি চাঙ্গাকারী প্রকল্প নির্বাচন ও যথাসময়ে তা বাস্তবায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, বিতর্কের ঊর্ধ্বে ক্রয় প্রক্রিয়া, বাজেট প্রণয়ন ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং বাজেটারি বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ বাড়ানোসহ প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলে আসছি। সেই সঙ্গে কিছু কিছু আলাপচারিতা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের জন্য জাতীয় অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন, জেলা বাজেট সম্প্রসারণ, গ্রামাঞ্চলে হেলথ কার্ড প্রবর্তন,  কৃষি ফসলের ইন্স্যুরেন্স এবং জাতীয় পেনশন ফান্ড চালুর বিষয়েও। বিপরীতে, অন্য দেশ কী করছে বা প্রত্যাশিত সুফল অর্জনে কার্যকর বাজেট বরাদ্দ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া নিশ্চিতে কী করা যায়, তাতে কমই মনোযোগ দেওয়া গেছে। খুবই কম আলোচনা হয়েছে সত্যিকারের রাজস্ব সংস্কার নিয়েও। 

এবারের বাজেট সঙ্গত কারণেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রান্তিক, অবহেলিত ও সাময়িক কর্মহীন জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, আকাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ এবং কালো টাকা সাদা করার উদ্যোগের নৈতিক গ্লানি ও চূড়ান্ত সাফল্য সম্ভাবনায় সন্দেহ নিয়ে। 

করোনার আগেই আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির বেশকিছু খাতে আমরা কিছুটা ঋণাত্বক বা স্বল্প প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করছিলাম। করোনাকালে বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায় বহির্বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ও বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আমাদের আমদানি ও রফতানি বেশ কমে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ও দৈনিক শ্রমজীবীরা।  সেইসঙ্গে কিছু জেলায় সাইক্লোন আম্পানও বেশ ক্ষতি করে। করোনাজনিত ক্ষতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনায় বাজেটের দর্শন নির্বাচন তাই সঠিক বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে।  জিডিপির প্রবৃদ্ধি এমনকি ২.৫ কিংবা ৩ শতাংশ হলেও আগামী অর্থবছরে করোনা, সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দা  এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও জাতীয় পুঁজি সংবর্ধন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ন্যূনতম কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে  ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন খুব কঠিন নয়। তবে প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা উন্নত না করতে পারলে তা আবার খুব চ্যালেঞ্জিংও হয়ে যেতে পারে। কিছু কিছু মহলে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কারের কথাও বিরাটভাবে আলোচিত। সেই সঙ্গে রয়েছে রাজস্ব আদায় কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং কর ফাঁকি রোধ  ও করখাত সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ মনোযোগের বিষয়গুলোও।                           

বাংলাদেশের বাজেটের আকার বাড়ছে। ফলে আলোচ্য বাজেট সামলানো ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের অবশ্যই বাজেট বরাদ্দে দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, বাজেট বাস্তবায়নে যথাযথ পরিবীক্ষণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যোগাযোগ ও লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সমঝোতা বৃদ্ধি, ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, অন্যদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ ও ব্যক্তিখাত, এনজিও, পেশাজীবী এমনকি উন্নয়ন সহযোগী—সকলে একজোট হয়ে কাজ করতে পারলে করোনাকালেও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বৈকি। 

তবে দেশকে দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে ‘উল্লম্ফনে’ নিয়ে যেতে হলে, আমাদের আর্থিক পরিকল্পনায় অভিনবত্ব ও উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতেই হবে। আমার সুযোগ হয়েছে ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় সকল অর্থসচিব ও অর্থমন্ত্রীদের খুব কাছ থেকে দেখার এমনকি কাজ করারও। মরহুম তাজউদ্দীনকে নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের বই আর মতিউল ইসলাম ও প্রয়াত কফিলউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে কথোপকথনেও অনেক জেনেছি। মরহুম সাইফুর রহমান, মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, এএমএ মুহিত, আকবর আলি খান, মোহাম্মদ তারেকের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি, এমনকি সাহস করে তর্কও করেছি। সেই অভিজ্ঞতায়, একান্তই আমার মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে সফলকাম অর্থমন্ত্রী বা উপদেষ্টা ছিলেন মরহুম সাইফুর রহমান আর মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

প্রিয় পাঠকদের সবাই না হলেও অনেকেই জানবেন তাদের কাজের ধরন কী ছিল,  তাদের সময় অর্থসচিব কারা ছিলেন,  বাজেট বা ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের দায়িত্বে কারা ছিলেন আর সবচেয়ে বড় কথা সরকার প্রধানরা তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে কতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছেন। এটা না করা গেলে আমাদের বাজেট একটি  ‘বেস্ট ব্যুরোক্রেটিক এক্সারসাইজ’ বা ‘সরল অঙ্ক’ই  থেকে যাবে। কিংবা বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের অনেকটা ‘কমন রেসিপি’। অনেক সময় তাড়াহুড়ায়  প্রমাণ মিলবে ‘গোঁজামিলেরও’। 

কবি যে কেন লিখলেন ‘ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে?’  কেন যে ‘তালা ভাঙ্গার’ কথা লিখলেন না। আমি ভাবি, শুধুই ভাবি। আপনি কিন্তু আবার ভেবে অস্থির হবেন না। চলুক না, এভাবেই আরও অনেকদিন। বেশতো আছি। আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা, পূর্ব-ইউরোপ দীক্ষিত  অর্থনীতিবিদরা, বাংলা- ইতিহাস পাঠসমাপ্ত  নতুন অর্থনীতিবিদরা ভালোইতো আছেন। অনেক কিছু করেও খাচ্ছেন, আমাদেরও খাওয়াচ্ছেন।                                 

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ