পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে কোর্স চালু ও বাস্তবতা

Send
ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত : ১৬:৫৫, জুন ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৩, জুন ২৭, ২০২০

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমপ্রাণঘাতী করোনার মহামারি বিশ্বের মানবজাতিকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিয়ে প্রকৃতিকে দিয়েছে নৈসর্গিক সৌন্দর্য প্রকাশের সুবর্ণ সুযোগ। প্রকৃতি তার অপরূপ সৌন্দর্য আপন মহিমায় অবিরত প্রকাশ করে যাচ্ছে। যদিও মহামারির প্রাদুর্ভাবে প্রকৃতির সৌন্দর্যের স্বাদ মানবজাতি প্রয়োজন অনুযায়ী ততটা গ্রহণ করতে পারছে না। কিন্তু প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত ভারসাম্য ফিরে এসেছে। উৎপাদক থেকে খাদক পর্যন্ত জৈববৈচিত্র্যের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও টেকসই ইকোসিস্টেম সার্ভিস পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য ও জৈববৈচিত্র্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক বেশি দৃশ্যমান। যদিও প্রাণঘাতী করোনার মহামারির প্রাদুর্ভাবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সীমিত আকারে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক মহামারির সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যদিও সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অনলাইনে একাডেমিক কার্যক্রম চালানো অনেকটা কষ্টকর। করোনা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যায়গুলোতে কিছুসংখ্যক কোর্স অনলাইনভিত্তিক থাকা উচিত ছিল।
যাই হোক, কোভিড-১৯ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মহামারির মধ্যেও জাতির মেরুদণ্ড টিকিয়ে রাখার জন্য অনলাইনে একাডেমিক কার্যক্রম চালানোর তাগিদ দিয়েছে। এমতাবস্থায় আলোচনার পূর্বেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়া উচিত। প্রথমে ‘কেলেভ ফিলিপ’ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘বোস্টন গেজেট’ সংবাদপত্রের মাধ্যমে ১৭২৮ সালে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করেন। ১৮৩২ সালে চার্লস  ব্যাবেজ আধুনিক ‘এলাইটিক ইঞ্জিন’ সমৃদ্ধ কম্পিউটার আবিষ্কার করেন। ১৮৫৮ সালে ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’ বিশ্বে প্রথম দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পূর্ণ ডিগ্রি অফার করেন। ১৮৭৩ সালে আমেরিকার বোস্টন ও ম্যাসাচুসেটস-এ প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষার স্কুল চালু হয়। অন্যদিকে ১৮৯২ সালের গোড়ার দিকে ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো’ এবং ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব উইচকনসিন’ ও দূরশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতি চালু করেন। ১৯০৬ সালে ‘দ্য কালভার্ট স্কুল অব বাল্টিমোর’ আমেরিকার প্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয় দূরশিক্ষণ শিক্ষাদান পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করেন। দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, পেনসেলভিনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ও দ্য ইউনিভার্সিটি অব আওয়া দূরশিক্ষণ শিক্ষা কর্মসূচি যথাক্রমে ১৯১১, ১৯২২ ও ১৯২৫ সালে চালু করে। উনিশ শতকের সময় ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা ও হাস্টন সহ বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রেডিও টেলিভিশনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হয়। ১৯৮৩ সালে আধুনিক ইন্টারনেটের টিসিপি প্রটোকলের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে ‘নোভা সাউথইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’ অনলাইন গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম চালু করে। নব্বই-এর দশকে ওয়েবসাইট ভিত্তিক ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হওয়ায় বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। বিশ শতকে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক উন্নয়ন ঘটেছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রায় ৯৮ শতক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন কোর্স চালু হয়েছে। সম্প্রতি ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভিনিয়া’ অনলাইন ব্যাচেলর ডিগ্রি চালু করেছে।

বর্তমানে প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার ওপর করোনার প্রভাব কম। মহামারি ছাড়াও সাধারণত আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাসরুম শিক্ষার পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তিনটি সেমিস্টারে—স্প্রিং (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল), সামার (মে থেকে জুলাই) ও ফল (আগস্ট থেকে ডিসেম্বর) একটি বছর সম্পন্ন হয়। ছাত্র ভর্তি, কোর্স অফার, কোর্স এনরোলমেন্ট, ছাত্রদের ডরমেটরি বরাদ্দ ও লাইব্রেরি হতে বই সংগ্রহসহ সমস্ত কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে সম্পাদিত হয়। যদি কোনও শিক্ষক অফ ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের জন্য গবেষণার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করেন, তাহলে ওই শিক্ষক অনলাইনে কোর্স অফার করে থাকেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা কোর্সটি এনরোলমেন্ট করবে, তারা অন ক্যাম্পাসে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার্চুয়াল ক্লাসরুম ও ওয়েবসাইটের  মাধ্যমে আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ওই কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পারবে। অপরদিকে অনেক গ্র্যাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রী মেজর প্রফেসরের নির্দেশে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা স্টেশনে দীর্ঘদিন অবস্থান করে। ওই গ্র্যাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রীরা গবেষণা স্টেশনের ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের মাধ্যমে অনলাইনে কোর্স সম্পন্ন করে থাকে। এই সিস্টেমে দেখা যাচ্ছে—অন ক্যাম্পাস ও অফ ক্যাম্পাস উভয় জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সংযোগসহ অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। ফলে উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মহামারির প্রাদুর্ভাবে অনলাইনে শিক্ষাব্যবস্থা বিঘ্ন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। উল্লেখ্য, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স ক্রেডিট ঘণ্টা চালু রয়েছে। মোটা দাগে যদি বলা যায় তা হলো—ফ্লেক্সিবল কোর্স ক্রেডিট ঘণ্টা পদ্ধতিতে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চার বছরের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে সর্বনিম্ন ১২০ ক্রেডিট ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের সম্পন্ন করতে হয়। তাদের দুই সেমিস্টারে মোট ৩০ ক্রেডিট ঘণ্টা এনরোলমেন্ট করতে হয়। প্রতিটি কোর্স রেঞ্জ ১-৫ ক্রেডিট ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহারিক সহ থাকতে পারে। প্রতি সপ্তাহে ১-৩ ক্রেডিট ঘণ্টা একটি কোর্সের কমপক্ষে ১-৩ ঘণ্টার ক্লাস থাকতে হবে। আবার ৩-৪ ক্রেডিট ঘণ্টার একটি কোর্সের ক্লাসের বাইরে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ৬-১২ ঘণ্টা বিষয়ভিত্তিক অতিরিক্ত কাজ থাকতে পারে। উল্লেখ্য, ৩ ক্রেডিট ঘণ্টার একটি কোর্সের প্রতি সেমিস্টারে প্রায় ৪০টি ১ ঘণ্টার ক্লাস সম্পন্ন হতে হবে। ওই সেমিস্টারের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণসহ মূল্যায়ন সম্পন্ন করে শিক্ষককে গ্রেড রিপোর্ট জমা দিতে হবে। আবার গ্রেড রিপোর্ট অনলাইনের ট্রান্সক্রিপ্টে দৃশ্যমান হয় না যদি ছাত্র-ছাত্রী কর্তৃক শিক্ষকদের কোর্স মূল্যায়নের রিপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা না হয়।

কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে একাডেমিক কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও আধুনিক ইন্টারনেটের যুগে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি উন্নত দেশের তুলনায় প্রায় ৩০ বছরের বেশি পুরনো। দেরিতে হলেও সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া উচিত। বিষয়গুলো হলো—অনলাইনে ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি কার্যক্রম, ছাত্র-ছাত্রীদের নির্দিষ্ট আইডি ও পাসওয়ার্ড, অনলাইনে কোর্স অফার, পরীক্ষাগ্রহণ ও মূল্যায়ন, অনলাইনে গ্রেড রিপোর্ট জমাসহ ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও ক্লাস মূল্যায়নের রিপোর্টটিও অনলাইনে জমা দিতে হবে। এই বিষয়গুলো সুনিশ্চিত করার জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগ, উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট, সার্ভার সিকিউরিটি ও ভার্চুয়াল ক্লাসরুম। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ক্যাম্পাসটি হতে হবে শতভাগ আবাসিক। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি কোর্স অফারিং প্ল্যানটি হতে হবে ফ্লেক্সিবল মোডে। এখানে মোটা দাগে বলা যেতে পারে, কোর্স সংখ্যা যাই অফার হোক না কেন, ছাত্র-ছাত্রীরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মধ্যে থেকে আবশ্যক ও অনাবশ্যক কোর্সগুলো এনরোল করে প্রতি সেমিস্টারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্রেডিট ঘণ্টা সম্পন্ন করতে পারবে।

বর্তমানে আধুনিক ইন্টারনেটের যুগে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট রয়েছে। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি মেম্বারদেরও রয়েছে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট। আবার বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংখ্যাও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে শিক্ষা সহায়ক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এগুলো প্রাইভেসির জন্য হুমকি। অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার সকল শিক্ষা উপকরণ একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে ডকুমেন্ট আকারে থাকতে হবে। ওই ডকুমেন্টগুলো কেবলমাত্র ফ্যাকাল্টি মেম্বার ও ছাত্র-ছাত্রীরাই  আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।

ইতিমধ্যে প্রাণঘাতী করোনার মহামারি শিক্ষা খাতের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলা শুরু করেছে। বর্তমানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে বিশ্বের উন্নত দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো ও বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ফ্রন্টলাইনে আসতে হবে। এক্ষেত্রে কোভিড-১৯ মহামারি শেষ হয়ে গেলেও কমপক্ষে ২০% কোর্স বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে অফার হওয়া উচিত। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক নির্ভর কোলাবোরেটিভ গবেষণা, শিক্ষক নিয়োগ ও গবেষণার জন্য উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা কমিশন গঠনসহ প্রতিটি শিক্ষকের বছরভিত্তিক গবেষণার কমিটমেন্ট থাকতে হবে। এই বিষয়গুলোর সঠিক বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের প্রণোদনাসহ গবেষণা ও শিক্ষা সহায়ক ফান্ড দরকার। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও  শিক্ষকদের প্রমোশনের ক্ষেত্রেও দরকার স্বচ্ছতা। কোভিড-১৯ যতই অভিশাপ হোক না কেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও উচ্চশিক্ষায় ফ্রন্টলাইনে আসতে হবে।  

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ