X
শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪
১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
সিনেমা সমালোচনা

সুলতানপুর: ফর্মুলায় আক্রান্ত ধারাবাহিকতাহীন ছবি

আহসান কবির
০৯ জুন ২০২৩, ১৩:৩১আপডেট : ১১ জুন ২০২৩, ১৩:১২

প্রচলিত ফর্মুলার ভিড়ে ধারাবাহিকতাহীন এক ছবির নাম ‘সুলতানপুর’। পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘গল্পই সিনেমার প্রধান চরিত্র’; কিন্তু বাস্তবে অসঙ্গতিতে ভরা মাথামুণ্ডুহীন এক গল্পের ছবি ‘সুলতানপুর’। শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে জাতীয় পুরস্কার (২০১৪-দেশা দ্য লিডার) পাওয়া পরিচালক সৈকত নাসিরকে খুঁজে না পাওয়ার এক ছবি ‘সুলতানপুর’। এক দৃশ্যের সাথে অন্য দৃশ্যের মিল না থাকা এক ছবির নাম ‌‘সুলতানপুর’। বাংলাদেশে পাঁচটা ‘সুলতানপুর ইউনিয়ন’ থাকলেও (সিলেট জকিগঞ্জ-এর সুলতানপুর, কুমিল্লা দেবীদ্বারের সুলতানপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সুলতানপুর, চট্টগ্রাম রাউজানের সুলতানপুর এবং রাজবাড়ি জেলার সুলতানপুর ইউনিয়ন) এটা কোন সুলতানপুরের গল্প সেটা বুঝতে না পারা এক ছবির নাম ‘সুলতানপুর’। গান, আইটেম গান, অভিনয় আর মারামারির মধ্যে ‘সিনেমা’ না খুঁজে পাওয়া এক ছবি ‘সুলতানপুর’।

ছবির গল্প এক সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে। চোরাচালানই নাকি সুলতানপুরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সম্ভবত ছবির শুটিং হয়েছে যশোরের সীমান্তবর্তী অঞ্চল চৌগাছা, বেনাপোল এবং ঢাকার ধামরাইয়ের কিছু এলাকায়। সুলতানপুরের সুলতান নজরউদ্দীন খিলজিকে এলাকার সবাই পীরবাবা হিসেবে সম্মান করে। মুখোশের আড়ালে তিনি ঐ এলাকার অপরাধ আর চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশ, প্রশাসন, মন্ত্রী সব তার পকেটের লোক। এলাকার পুলিশের ভেতরেও তার এত প্রভাব যে, তাকে বাঁচানোর জন্য ক্রসফায়ারের গল্প সাজানো হয়। চোরাচালানিদের হাতে পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টর নিহত হলে তার জায়গায় পাঠানো হয় এডিসি নাজির রায়হানকে। তিনি স্ত্রীসহ সুলতানপুরে আসেন, তখন জানা যায় তার স্ত্রী আইনজীবী।

সুলতানপুরের থানায় কোনও মামলা হয় না, আদালতপাড়া বন্ধ থাকে মামলার অভাবে! অথচ এক ভদ্রমহিলা দুই বছর ধরে থানা ও আদালত পাড়ায় ঘোরেন, মামলা বা বিচার হয় না। নতুন এডিসি রায়হান থানায় মামলা নিতে আদেশ দেন, স্ত্রী এই মামলা লড়তে যান আদালতে। এরপর এডিসি সাহেব ভিড়ে যান থানার আরেক সাব ইন্সপেক্টর আলমের সাথে এবং নিয়মিত পীর বাবার কাছ থেকে মাসোহারা নিতে থাকেন। পুলিশ স্বামী আবার বউয়ের মামলার সব খবর রাখেন না। তিনি যে সৎ পুলিশ এটা প্রমাণের জন্য পরে তিনি জানান- মাসোহারা হিসেবে নেয়া সব টাকা তিনি সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছেন!

এদিকে পীরবাবার ছেলে সুলতান হায়দার খিলজি পীর হয়ে নেতৃত্ব হাতে নিতে চায়। তার মাথা গরম। পীর বাবা বেশির ভাগ সময় ছেলে হায়দারের কথা রাখেন না। সে আবার এক রাজনৈতিক নেতার মেয়ে সামিয়ার প্রেমে পড়ে। ছবির গৎ অনুসারে আইটেম বা রোমান্টিক গান দেখানো হয় কিন্তু পীর বাবার ছেলে হায়দার নায়ক না ভিলেন হতে যাচ্ছে সেটা নির্ণীত হয় না! নায়িকার সাথে তাকে রোমান্টিক গানেও দেখা যায়!

যাই হোক এক সময় দুম করে এডিসি সাহেবের স্ত্রী দেখে বাসার আলমিরায় টাকার স্তূপ। কিসের টাকা স্ত্রী এই প্রশ্ন করলে এডিসি সাহেব উত্তর দেন না, আবার স্ত্রী যে মামলা লড়তে গেছে একঘরে থেকেও সেটা এডিসি সাহেব জানেন না। শেষমেশ রায় ঘোষণার আগে নিজ অফিসে খুন হন এডিসি রায়হানের আইনজীবী স্ত্রী। এরপর আরও তিন খুনের সূত্র ধরে মারপিট এবং ছবির শেষ ঘণ্টা বাজে।

আহসান কবির এই ছবির আরেক চরিত্র পীর বাবার বোকাসোকা অন্য ছেলে রাশেদ মামুন অপু। সহজ সরল এই ছেলেটাই শেষমেশ পীরের উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়ায়! পীর সাহেবকে পুলিশ বা প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ মারতে পারে না। প্রথমবার হত্যা করে ছেলে সুলতান হায়দার খিলজি আর পরের বার তার অন্য ছেলে অপু ও পীরের আরেক স্ত্রী! কারণ প্রথমবার ছেলের হাতে পীর বাবা নিহত হয়েছেন কি না তা পুলিশি পরীক্ষায় আসলেও আরেক ছেলে ও স্ত্রীর খুনের সাথে সংযুক্তি ধোঁয়াশা করে রাখা হয়! পীর বাবা ছাড়া এই ছবিতে কারও চরিত্র বিকশিত হয়নি। পীরবাবা কখনও শুদ্ধ, কখনও লোকাল, কখনও বা উর্দুতে কথা বলেছেন! পীর বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বনামে খ্যাত আশীষ খন্দকার।

পুলিশের এডিসি নাজির রায়হান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুমন ফারুক। পুরোটা সময় তার রোবোটিক উপস্থিতি চোখে বিঁধেছে। এমন কী স্ত্রীর মৃত্যু বা মারপিটের দৃশ্যেও তার কোনও অভিব্যক্তি ছিল না। নাজির রায়হানের আইনজীবী স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মৌমিতা মৌ। পীরবাবার মাথা গরম ছেলে হায়দারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সাঞ্জ জন। যিনি অভিনয়ে অমনোযোগী ছিলেন এবং কয়েক জায়গায় অতি অভিনয়ের কারণে চরিত্রটা বিকশিত হয়নি। রাজনীতিবিদের মেয়ে সামিয়া চরিত্রে ভালোই অভিনয় করেছেন অধরা খান। সাব ইন্সপেক্টর আলমের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহিন মৃধা, তোফাজ্জল চরিত্রে নাট্যপরিচালক রুমান রুনি এবং হাসেম আলি চরিত্রে বিলাস খান অভিনয় করেছেন।

২০২২-এ যখন সেন্সর বোর্ডে ছবিটা দেয়া হয় তখন নাম ছিল ‘বর্ডার’। সেন্সর বোর্ডের আপত্তির কারণে নাম এবং কিছু দৃশ্য বদলের পর মুক্তি পাওয়া ছবির নাম রাখা হয় ‘সুলতানপুর’। ছবির ‘জানরে’ শিরোনামের গানটি গেয়েছেন ভারতের স্নিগ্ধজিৎ এবং ‘বোকা মন’  গানটি লিখেছেন প্রসেনজিৎ মণ্ডল এবং সুর ও সংগীত আয়োজনের সাথে কণ্ঠ দিয়েছেন শাহরিয়ার মার্সেল। এছাড়া আইটেম গান ‘ফুলকুমারি’ এবং ‘বাবা তোর দরবারে সব পাগলের মেলা’ও ব্যবহৃত হয়েছে ছবিতে।

জয় হোক বাংলা ছবির। সৈকত নাসির

সুলতানপুর: রেটিং ৪/১০

নির্মাতা: সৈকত নাসির

চিত্রনাট্য ও সংলাপ: আসাদ জামান

প্রযোজনা: ম্যাক্সিমাম এন্টারটেইনমেন্ট

ঘরানা: পলিটিকাল অ্যাকশন থ্রিলার

মুক্তি: ২ জুন ২০২৩

সমালোচক: রম্যলেখক, সাংবাদিক ও কবি

আরও সমালোচনা:

আদিম: ‘বস্তি ঘনিষ্ঠ’ এক অপরূপ ছবি!

পাপ: শেষ না হওয়া এক থ্রিলার গল্পের ছবি

কিল হিম: বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন অনন্ত, কিন্তু সেটা নড়ে না!

লিডার: স্বস্তি আর অস্বস্তির পাঁচ-ছয়

লোকাল: রাজনীতির ব্যানারে প্রেম ও প্রতিশোধের ছবি!

জ্বীন: ‘জিন ছাড়ানো’র কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছবি!

/এমএম/
সম্পর্কিত
বঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে অধরার মধুর সন্ধ্যা
বঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে অধরার মধুর সন্ধ্যা
অপেক্ষা আর অপূর্ণতার গল্প শোনালেন অধরা
অপেক্ষা আর অপূর্ণতার গল্প শোনালেন অধরা
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
২৪-এ হচ্ছে না বনি-কৌশানির বিয়ে
২৪-এ হচ্ছে না বনি-কৌশানির বিয়ে
আমি পুরোপুরি সিঙ্গেল: শ্রুতি হাসান
আমি পুরোপুরি সিঙ্গেল: শ্রুতি হাসান
ইতিহাসের পাতায় পায়েল কাপাডিয়া
কান উৎসব ২০২৪ইতিহাসের পাতায় পায়েল কাপাডিয়া
ফারিণের অভিষেক, নিরব-স্পর্শিয়ার অভিমান!
এ সপ্তাহের ছবিফারিণের অভিষেক, নিরব-স্পর্শিয়ার অভিমান!
শিক্ষার্থী নির্মাতাদের বিভাগে ভারতীয় তরুণ-তরুণীর জয়
কান উৎসব ২০২৪শিক্ষার্থী নির্মাতাদের বিভাগে ভারতীয় তরুণ-তরুণীর জয়