ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েল সব লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলেও, দেশটি আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছেছে। ‘চিরশত্রু’ ইরানকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য এখন ইসরায়েলের অনুকূলে। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি পূর্ণাঙ্গ বিজয় আর চরম পরাজয়ের মাঝামাঝি একটি অবস্থান তৈরি করেছে, যা পরাজয়ের চেয়ে বিজয়ের পাল্লাকেই ভারী করছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট-এর এক বিশ্লেষণে এমনটি দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের জন্য মূল কথা হলো, ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’-এর আগে দেশটি যতটা ঝুঁকির মুখে ছিল, বর্তমানে সেই হুমকির মাত্রা অনেক কম। অন্যদিকে ইরান আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে ইরানের পাহাড়ের নিচে সমাহিত প্রায় ৪৬০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। তবে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ছিল, তা অর্জিত হয়েছে। ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ছয় সপ্তাহের লড়াইকে আলাদা কোনও যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া দীর্ঘ যুদ্ধেরই সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় লড়াই।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই যুদ্ধেও ইসরায়েল তার সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। যেমন- জেরুজালেমের পুরনো শহর তখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একইভাবে বর্তমান যুদ্ধও ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন বা সব ইউরেনিয়াম অপসারণ করতে পারেনি। কিন্তু এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে।
৭ অক্টোবরের আগে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েলকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছিল। লেবাননে হিজবুল্লাহর হাতে ছিল দেড় লাখ রকেট, আর গাজায় হামাস গড়ে তুলেছিল সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধা ও শক্তিশালী বাহিনী। ইরান মূলত একটি অক্টোপাসের মতো তার শুঁড় দিয়ে ইসরায়েলের টুঁটি চেপে ধরেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সেই অক্টোপাসের শুঁড়গুলো কেটে ফেলা হয়েছে। যদিও তা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, তবে অক্টোপাসের ‘মাথা’ ইরান এখন বিধ্বস্ত ও দিশেহারা।
অনেকে মনে করেন, ইরানি নেতৃত্ব টিকে থাকা মানেই যুদ্ধ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫৬ বছর বয়সী বর্তমান খামেনি তার বাবার মতো অবিসংবাদিত নেতা নন। ওপরের সারির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যার ফলে শাসনের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য এখন নড়বড়ে। গত জুনে ১২ দিনের লড়াইয়ের পর ইরানিরা রাজপথে নেমেছিল। এবারের ধ্বংসযজ্ঞের পর জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার আরও ব্যর্থ হবে, যা অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এখন শুরু হয়েছে আখ্যানের লড়াই। ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের ভেতরেও বিরোধী দলগুলো একে কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইয়ার লাপিদ বা নাফতালি বেনেটরা চান না নির্বাচনের সাত মাস আগে নেতানিয়াহু বিজয়ের কৃতিত্ব নিয়ে মাঠ গরম করেন।







