ওলগা তোকারচুকের নোবেল ভাষণ (পর্ব : তিন)

Send
অনুবাদ: দুলাল আল মনসুর
প্রকাশিত : ০৭:০০, জানুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, জানুয়ারি ১৬, ২০২০

সাহিত্যে ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ওলগা তোকারচুক গত ৭ ডিসেম্বর শনিবার সুইডিশ একাডেমিতে পোলিশ ভাষায় তার নোবেল ভাষণ প্রদান করেন।

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে

  জগৎ সম্পর্কে গল্প বলার সঙ্কটের সামগ্রিক চিত্রের চেহারা আঁকতে চাচ্ছি না। তবে বিশ্বে কী যেন নেই—এই অনুভূতিটা আমাকে প্রায়ই পীড়া দেয়। বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া আশ্চর্যজনকভাবে সহজ হলেও কাচের পর্দার মাধ্যমে এবং অ্যাপসের মাধ্যমে দেখা জগৎ যে কোনোভাবেই হোক না কেন অবাস্তব, দূরের, দ্বিমমাত্রিক এবং অদ্ভূত রকমের সৃষ্টিছাড়া মনে হয়। আজকের দিনে পরিপূর্ণ নিশ্চয়তাসহ উচ্চারিত নির্দিষ্ট ধারণার চেয়ে দুশ্চিন্তা-প্রকাশক শব্দ ‘কেউ একজন’, ‘কোনো কিছু’, ‘কোথাও’, ‘কখনও’—এগুলো অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। ‘পৃথিবী সমতল’, ‘টিকা হত্যা করছে’, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কথাটা অর্থহীন’, কিংবা ‘গণতন্ত্র পৃথিবীর কোথাও হুমকির মুখে পড়েনি’—এগুলো অতটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। ‘কোথাও’ কিছু লোক সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় ডুবে মরছে। ‘কোথাও’ ‘কিছু’ সময়ের জন্য ‘এক রকমের’ যুদ্ধ চলছে। তথ্যের মহাপ্লাবনে ব্যক্তিগত বার্তা নিজস্ব চেহারা হারাচ্ছে, আমাদের স্মৃতিতে হারাচ্ছে, অবাস্তব হচ্ছে এবং বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

     আহাম্মকি, নিষ্ঠুরতা, ঘৃণা প্রকাশক বক্তব্য এবং সহিংসতার চিত্রের বেপরোয়াভাবে ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে সব ধরনের ভালো খবরের দ্বারা। কিন্তু বেদনাদায়ক ধারণার লাগাম টানার ক্ষমতা ভালো খবরের নেই। সেটা কথায় প্রকাশ করা আমার কাছে কঠিন মনে হয়: আমাদের জগতের কোথাও সমস্যা হচ্ছে, ভুল হচ্ছে কোথাও। এই অনুভূতিটা এক সময় শুধু কবিদেরকে আবিষ্ট করে ছিল। কিন্তু এখন এর লক্ষণ ধরার নির্ণয়ে ঘাটতি পড়েছে; এটা মহামারির মতো হয়ে পড়েছে, চারপাশ থেকে উদ্বেগের ধারা চুইয়ে পড়ছে।

     সামান্য যে কয়েকটা ক্ষেত্র আমাদেরকে জগতের কঠিন বাস্তবতার খুব নিকটে রাখার চেষ্টা করে সাহিত্য সেগুলোর অন্যতম। কারণ সাহিত্য স্বভাবগতভাবেই সব সময় মনোস্তাত্ত্বিক; কারণ সাহিত্য চরিত্রের অভ্যন্তরীণ বিচার ক্ষমতা এবং অভিপ্রায়ের ওপর দৃষ্টিপাত করে, অন্য ব্যক্তির কাছে তাদের আপাত অভিজ্ঞতাও প্রকাশ করে, কিংবা তাদের আচার আচরণের মনোস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বের করার কাজে পাঠককে উৎসাহ দেয়। অন্যদের অস্তিত্বের গভীরে যাওয়ার, তাদের যুক্তি বোঝার, তাদের আবেগ অনুভব করার এবং তাদের নিয়তি অভিজ্ঞতায় নেওয়ার সুযোগ আমাদের দেয় শুধু সাহিত্যই।

     একটি গল্প সব সময় অর্থের চারপাশে বৃত্ত আঁকে। এমনকি সরাসরি অর্থ প্রকাশ না করলেও, এমনকি যখন গল্প ইচ্ছে করে অর্থ অনুসন্ধান করা থেকে বিরত থাকে এবং আঙ্গিক ও নিরীক্ষার ওপর নজর দেয়, অর্থ প্রকাশের নতুন মাধ্যম খুঁজতে যখন গল্প একটা আনুষ্ঠানিক বিপ্লব মঞ্চায়ন করে তখনই এই কাজটা করে। আমরা যখন সবচেয়ে বেশি কার্যকারণনীতি মেনে মিতব্যায়িতার সঙ্গে লেখা গল্প পড়ি তখনও ‘এটা ঘটছে?’, ‘এর মানে কী?,’‘উদ্দেশ্যটা কী?,’ ‘ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে?’ এ সব প্রশ্ন  জিজ্ঞেস না করে পারি না। খুব সম্ভব, আমাদের মন গল্পের দিকে এগিয়ে থাকে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ উদ্দীপককে অর্থ দান করার প্রক্রিয়া হিসেবে। আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি তখনও অবিরাম চলে এই প্রক্রিয়া, উদ্দীপকগুলোর আখ্যান সাজানোর কাজ চলতে থাকে। সুতরাং একটা বিশেষ সময়ের মধ্যেকার অসীম পরিমাণের তথ্যকে সাজানোর একটা পথই হলো গল্প; সাজানোর এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো অতীত, বর্তমান এবং ভষ্যিতের সঙ্গে গল্পের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। এভাবে গল্পের পৌনঃপুনিকতা প্রকাশ পায়, কার্যকারণের শ্রেণিতে গল্পকে বিন্যস্ত করা হয়। এই প্রচেষ্টায় মন এবং আবেগ উভয়ই অংশগ্রহণ করে থাকে।

    গল্পের প্রথম দিকের আবিষ্কারের একটা হলো নিয়তি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিয়তি মানুষের কাছে শুধু ভয়ঙ্কর এবং অমানবিক হিসেবেই আসেনি, বরং দৈনন্দিন বাস্তবতায় বিন্যাস এবং নিত্যতা দান করেছে।

 ৪

     ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ,

     ছবির মহিলা, মানে আমার মা যিনি আমার জন্মের আগে থেকে আমাকে মিস করেন, কয়েক বছর পরে আমাকে রূপকথার গল্প বলতে থাকেন। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ানের লেখা এ রকম একটা গল্পে একটা চায়ের পাত্র ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়। পাত্রটা নালিশ জানায়, মানুষ তার সঙ্গে কত নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। যখন পাত্রটার হাতল ভেঙে যায় মানুষ তাকে ফেলে দেয়। কিন্তু মানুষ যদি এতটা জোরালো খুঁতখুতে না হতো তাহলে তাদের কাছে পাত্রটার উপযোগিতা থাকত। অন্যান্য ছোটখাটো জিনিসও নিজ নিজ বয়ানে তাদের ছোটখাটো জীবনের সত্যিকারের মহাকাব্যিক গল্প বলে।

     ছোটবেলায় এই গল্পগুলো শুনতাম আবেগরাঙা কপোল আর অশ্রুভরা চোখে। কারণ আমার গভীর বিশ্বাস ছিল, ছোটখাটো জিনিসেরও সমস্যা থাকে, আবেগ থাকে। তাদেরর সামাজিক জীবন থাকে। আমাদের সামাজিক জীবনের সঙ্গে তুলনীয় সে জীবন। রান্নাঘরের আলমারিতে রাখা প্লেটগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা কথা বলে। ড্রয়ারের চামচ, ছুরি, কাঁটা চামচরাও এক রকম পরিবার তৈরি করে নেয়। একই রকমভাবে প্রাণিরাও রহস্যের অধিকারী, জ্ঞানী এবং আত্ম-সচেতন জীব। সেগুলোর সঙ্গে আমাদের একটা আত্মার সম্পর্ক তৈরি হতো, আমাদের সঙ্গে গভীর মিল তৈরি হতো। তবে নদী, বন, রাস্তা—এগুলোরও অস্তিত্ব ছিল। তাদেরও প্রাণ ছিল। তারা আমাদের পরিসর তৈরি করত এবং তাদের মধ্যে একরকম অধীনস্ততার বোধ বা রহস্যজনক রমগিস্ট তৈরি হতো। আমাদের চারপাশের স্থলভাগের এলাকাও জীবন্ত হতো। সে রকমই দেখেছি সূর্য, চাঁদ এবং নভোমণ্ডলের অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্রকেও; দৃশ্যমান, অদৃশ্য গোটা জগৎই প্রাণময়।

     সন্দেহ পোষণ করা শুরু করলাম কখন? একটা সুইচের টুসকিতে কখন সবকিছু ভিন্নরকম মনে হতে লাগল, আগের চেয়ে কম দ্যোতনাপূর্ণ এবং বেশি সরল মনে হতে লাগল আমার জীবনের সেই মুহূর্তটা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছি। জগতের ফিসফিসানি নীরবতায় ডুবে গেল, তার বদলে শুনলাম নগরের কোলাহল, কম্পিউটারের গুঞ্জন, মাথার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া উড়োজাহাজের গর্জন এবং ক্লান্ত করে দেওয়া তথ্য সমুদ্রের শ্বেত কোলাহল।

     আমাদের জীবনের একটা সময়ে আমরা জগৎকে খণ্ডিত অবস্থায় দেখা শুরু করি। সবকিছু আলাদা, টুকরো টুকরো। একটা থেকে আরেকটার দূরত্ব যেন ছায়াপথের দূরত্বের মতো। আমরা যে বাস্তবতায় বাস করি সেটাও জোর দিয়ে বলতে থাকে: চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা করেন বিশেষত্ব নিয়ে, তুষার-ঢাকা পথে গাড়ি চালিয়ে আমাদের অফিসে যাওয়ার সঙ্গে আয়করের কোনো সম্পর্ক নেই, বিশাল প্রাণি সম্পদের খামারের ভালো মন্দের সঙ্গে আমাদের দুপরের খাবারের কিছু যায় আসে না, কিংবা এশিয়ার কোথাও অবস্থিত চাকচিক্যহীন কারখানার সঙ্গে আমার পরনের নতুন টপের কোনো সম্পর্ক নেই। সবকিছুই অন্যকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। সবকিছুরই সম্পর্কহীন আলাদা বাস।

     এ অবস্থার সঙ্গে আমাদের মানিয়ে চলা সহজ করতে আমাদেরকে দেওয়া হয় সংখ্যা, নাম ট্যাগ, কার্ড, শক্ত প্লাস্টিক পরিচিতি; আমাদের সামগ্রিক পরিচয়কে ছোট করে ফেলা হয় শুধু এই অল্প অংশটুকু কাজে লাগানোর জন্য। আমরা এ সব আর বোঝার চেষ্টাও করি না।

     আমাদের বিশ্ব মরে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের সেটা চোখে পড়ছে না। আমরা দেখতে ব্যর্থ হচ্ছি, আমাদের বিশ্ব কতিপয় জিনিস আর ঘটনার সমষ্টিতে পরিণত হচ্ছে, প্রাণহীন তেপান্তরে পরিণত হচ্ছে যেখানে আমরা নিস্ব হয়ে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছি, অন্য কারো সিদ্ধান্তের জন্য এখানে ওখানে বারি খাচ্ছি, দুর্বোধ্য নিয়তি আমাদের আটকে রেখেছে, ইতিহাস এবং কাকতালের প্রধান শক্তির হাতের পুতুল হওয়ার বোধ আমাদের রুদ্ধ করে রেখেছে। আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তি হয় বিলীন হয়ে যাচ্ছে, নয়তো লোক দেখানো আচারসর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। কিংবা আমরা শুধু বাহ্যিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাধারণ শক্তির অনুসারী হয়ে যাচ্ছি। এই শক্তিগুলো আমাদের এমনভাবে ঘোরাচ্ছে যেন আমরা চিন্তাশূন্য মেধাহীন ব্যক্তি। এমন একটা বিশ্বে আমরা আসলেই চিন্তাশূন্য মেধাহীন মানুষ।

এ কারণেই চায়ের পাত্রের অন্য জগতের জন্য আমার মন কাঁদে।

     সারা জীবনই আমি পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রভাব দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছি। অবশ্য এই প্রভাব সম্পর্কে আমরা সাধারণত ওয়াকিফহাল থাকি না, তবে বিস্ময়কর কাকতাল কিংবা নিয়তির সঙ্গে সমকেন্দ্রী যাত্রায় হঠাৎ করেই এর দেখা পেয়ে যাই। যেমন ‘ফ্লাইট’-এ অনুসরণ করেছি সেতু, নাট-বল্টু, ঝালাই করা সংযোগস্থল এবং সংযোগ স্থাপনকারী বস্তুসব। সংশ্লিষ্ট করার ক্ষমতাসম্পন্ন বিষয় এবং বিন্যাসের সন্ধান আমাকে সব সময়ই আকৃষ্ট করেছে। আমি যেমনটা বুঝেছি, লেখকের মন হলো বিশ্লেষী মন। একটা বিশ্বজনীন পূর্ণাঙ্গ বিষয় সৃষ্টির লক্ষ্যে ছোট ছোট সব রকমের উপাদানকে এক করে রাখার চেষ্টা হিসেবে লেখকের মন একগুঁয়েমির সঙ্গে ওই উপাদানগুলো সংগ্রহ করে।

     আমরা কীভাবে লিখব? জগতের সমাবেশের মতো এই আঙ্গিককে ওপরে তোলার ক্ষমতা দানের জন্য আমাদের গল্প কীভাবে সাজাব?

     স্বাভাবিকভাবেই আমি উপলব্ধি করি, মুখে মুখে প্রচলিত পুরাণকথা, কল্পকাহিনি, কিংবদন্তী জগতের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রেখেছে; কিন্তু গল্পের সেই আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া অসম্ভব। এখনকার দিনে গল্প হতে হবে বহুমাত্রিক এবং জটিল; মোটের ওপর আমরা অবশ্যই অনেক বেশি জানি, দেখতে একদমই আলাদা বিষয়ের মধ্যে বিরাজমান অবিশ্বাস্য সংযোগ সম্পর্কে আমরা আবগত।

     চলুন আমরা বিশ্ব ইতিহাসের একটা বিশেষ মুহূর্ত নিবিড় দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি।

     ১৪৯২ সালের আগস্টের ৩ তারিখ। স্পেনের পালোস বন্দরের জাহাজঘাটা থেকে থেকে সান্টা মারিয়া নামের একটা ছোট জাহাজ ছেড়ে যাবে। জাহাজের অধিনায়ক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। সূর্য প্রখর তাপ ছড়াচ্ছে। জাহাজঘাটায় নাবিকদের এদিক ওদিক ব্যস্ত আনাগোনা চলছে। সর্বশেষ ঝুড়ি বোঝাই করে খাবারের মজুদ জাহাজের পাটাতনে তুলছে খালাসিরা বা কুলিরা। নাবিকদের পরিবার পরিজনরা এসেছে বিদায় জানাতে। প্রচণ্ড গরমে তাদের জ্ঞান হরানোর মতো অবস্থা থেকে রক্ষা করছে পশ্চিম থেকে আসা মৃদু বাতাস। গাংচিলেরা মালবোঝাই হওয়া ঢালু পথের ওপর নিচে সদর্পে পদচারণা করছে এবং মানুষজনের কাজকর্ম খেয়াল করে দেখছে।

      সময়ের ভেতর দিয়ে যে মুহূর্তটা আমরা দেখতে পাচ্ছি সেটা ছয় কোটির মধ্যে পাঁচ কোটি ষাট লক্ষ আদি আমেরিকাবাসীর মৃত্যুর কারণ হয়েছে। সে সময় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার দশ ভাগ ছিল তারা। ইউরোপীয়রা বেখেয়ালে আদি আমেরিকানদের জন্য ভয়ানক রোগবালাই এবং বাকটেরিয়ার মতো কিছু প্রাণঘাতী উপহার নিয়ে এসেছিল। ওইসব উপহার থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখার কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমেরিকানদের ছিল না। তাছাড়া তাদের ওপর চাপানো হলো অত্যাচার নিপীড়ন এবং হত্যা। বছরের পর বছর ধরে চলল নিধনযজ্ঞ। ইউরোপীয়রা বদলে দিল গোটা এলাকার মাটি পর্যন্ত। এক সময় আমেরিকানদের উন্নত আবাদের সেচে মাটিতে ফলত সিম, ভুট্টো, আলু ইত্যাদি। সে মাটিতে ফিরে এল বুনো উদ্ভিদ। সামান্য কয়েক বছরে এক কোটি পঞ্চাশ লাখ একর আবাদযোগ্য জমি জঙ্গলে পরিণত হলো।

     বাড়তে থাকা বুনো উদ্ভিদ বিপুল পরিমাণের কার্বন ডাইঅক্সাইড খেয়ে ফেলল এবং এভাবে গ্রিনহাউস ইফেক্টকে দুর্বল করে ফেলল। ফলে পৃথিবীর বৈশ্বিক তাপমাত্রা গেল কমে।

     বহুবিধ বৈজ্ঞানিক সংবেশের একটামাত্র এটা। এটা দিয়েই ক্ষুদ্র বরফ যুগের প্রারম্ভের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। এই যুগ ষোড়ষ শতকের শেষের দিকে দীর্ঘস্থায়ী ঠান্ডা অবস্থা নিয়ে আসে ইউরোপের জলবায়ুতে।

     ক্ষুদ্র বরফ যুগ ইউরোপের অর্থনীতি বদলে দেয়। পরবর্তী দশকগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী জমাট শীতকাল, অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা গ্রীষ্ম এবং প্রচণ্ড তুষারপাত প্রচলিত কৃষির উৎপাদন কমিয়ে দেয়। পশ্চিম ইউরোপে নিজেদের খাদ্য উৎপাদনের খামারের ফসলও অপর্যাপ্ত হয়ে যায়। দুর্ভিক্ষের ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সে কারণে উৎপাদনে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। ঠান্ডাতর জলবায়ুর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ইংল্যান্ড এবং হল্যান্ডের। যেহেতু তাদের অর্থনীতি আর কৃষির ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে না, সেহেতু তারা ব্যবসা বাণিজ্য এবং শিল্প গড়ে তুলতে থাকে। ঝড়ের হুমকিতে পড়ে ওলন্দাজরা তাদের নিচু জমি শুকাতে এবং জলা এলাকা অগভীর সমুদ্র-বাণিজ্য বানাতে বাধ্য হয়। দক্ষিণ দিকে কড মাছের এলাকা পর্যন্ত সীমানা বাড়ানোর পদক্ষেপ স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলের জন্য বিপর্যয়কর হলেও ইংল্যান্ড এবং হল্যান্ডের জন্য সুবিধাজনক হয়। এ সব দেশ নৌ এবং বাণিজ্যিক শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ পায়। তাৎপর্যপূর্ণ ঠান্ডা বৃদ্ধি প্রচণ্ডভাবে অনুভূত হয় বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোতে। গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। চরম শীতকাল ফসলের উৎপাদন হ্রাস করে দেয়। দুর্ভিক্ষ এবং অভাব জেঁকে বসে। সুতরাং সুইডেন দক্ষিণ দিকে লোলুপ দৃষ্টি ফেলে এবং পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। বাল্টিক সাগর জমাট হয়ে থাকায় তার ওপর দিয়ে সৈনিকদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয়। এভাবে সুইডেন ইউরোপের ত্রিশ বছরের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

     আমাদের বাস্তবতার আরো ভালো বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা আমাদের বাস্তবতাকে প্রভাবের স্বাভাবিকভাবে সংগতিপূর্ণ এবং নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত পদ্ধতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। আমরা জানি, এটা আর শুধুই বিখ্যাত বাটারফ্লাই ইফেক্ট নয় যেটা কোনো পদ্ধতির শুরুতে নামমাত্র পরিবর্তনের পন্থাকে সংশ্লিষ্ট করে থাকে এবং ভবিষ্যতে বিশাল ও অপ্রত্যাশিত ফলাফলের পথ দেখায়। কিন্তু এখানে আমাদের অসীম সংখ্যক অবিরাম গতির প্রজাপতি এবং তাদের পাখা আছে—জীবনের শক্তিশালী তরঙ্গ সময়ের ভেতর দিয়ে ভ্রমণরত।

     আমার দৃষ্টিতে আমাদের অবিচল বিশ্বাসের বলে কার্যকর হওয়ার ক্ষমতা, আমাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এবং একই নির্দেশনার দ্বারা জগতে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ববোধের সমাপ্তি চিহ্নিত করে বাটারফ্লাই ইফেক্টের আবিষ্কার। তবে এটা আমাদের নির্মাতা হওয়ার, বিজয়ী হওয়ার এবং আবিষ্কারক হওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেয় না। তবু বিশদভাবে দেখিয়ে দেয়, মানুষ এতদিন যা ভেবেছে বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। আরো দেখিয়ে দেয়, আমরা চলমান প্রক্রিয়ার একটা ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কিছু নই।

     এক দেশের ওপর আরেক দেশের নিয়ন্ত্রণের বিশ্বব্যাপী চমৎকার এবং কখনও কখনও উচ্চ পর্যায়ের বিস্ময়কর বহু প্রমাণ আছে। 

     আমরা মানুষ, উদ্ভিদ, প্রাণি, বস্তু—সবাই একটা একক মহাশূন্যে নিমজ্জিত আছি যেটা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের সকলের এই জগতৎটার নিজস্ব আকার আছে এবং এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অসীম সংখ্যক আকৃতি তৈরি করে যাচ্ছে। সেগুলোর একটার সঙ্গে আরেকটার অবিরাম এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। আমাদের কার্ডিওভাসকিউলার সিসটেম নদী অববাহিকার অবস্থার মতো; পাতার গঠন মানুষের পরিবহণ ব্যবস্থার মতো; ছায়াপথের গতি আমাদের বেসিনের পানির প্রবাহের মতো। ব্যাকটেরিয়ার কলোনি যেভাবে বেড়ে ওঠে সমাজ ব্যবস্থাও সেভাবে গড়ে ওঠে। বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র মাত্রা সাদৃশ্যের অসীম ব্যবস্থাই দেখায়। 

     আমাদের মুখের কথা, চিন্তা এবং সৃজনশীলতা বিমূর্ত কিছু নয়, জগৎ থেকে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে এমন কিছুও নয়। বরং এগুলো শুধুই জগতের রূপান্তরের অসীম ব্যবস্থার আরেক স্তরের চলমানতা। চলবে

আরও পড়ুন : ওলগা তোকারচুকের নোবেল ভাষণ (পর্ব : দুই)

//জেডএস//

লাইভ

টপ