X
রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৪ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

ভারতকে হারানো জিডিপি: অহম নাকি আশঙ্কা করবো?

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ১৯:২৩

আরিফ জেবতিক এ সপ্তাহে আইএমএফ-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক রিপোর্ট’ প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতজুড়ে হইচই পড়ে গেছে। রিপোর্টে ধারণা করা হয়েছে যে বাংলাদেশ এ বছর ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে পেছনে ফেলে দেবে। বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১৮৮৭.৯৭ ডলার, যা ভারতের ১৮৭৬.৫৩ থেকে বেশি! এই তথ্যটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ গত ৫ বছর ধরে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশ থেকে গড়ে ২৪% বেশি ছিল!
বাংলাদেশে এ নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও ভারতে বিষয়টি তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় সব মিডিয়ায় এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক। রাহুল গান্ধী টুইট করে বিজেপির কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এটাই বিজেপির হিংসাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অর্জন।’  বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান ইকোনমিস্ট অধ্যাপক কৌশিক বসু এই অবস্থায় ভারতকে ‘শক্তিশালী অর্থনৈতিক নীতি’ চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারতের মিডিয়াগুলোয় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা, বিশ্লেষণ দেখে বুঝা যাচ্ছে যে রিপোর্টটি ভারতীয়দের অহমে আঘাত করেছে। বাংলাদেশ তাদেরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বিষয়টি তারা মেনে নিতে পারছেন না। ভারতীয় জিডিপি সূচকের এই ‘ধপাস করে আছাড় খেয়ে’ পড়ার জন্য প্রধানত কোভিডকে দায়ী করা হচ্ছে। এ দাবির মাঝে কিছু সত্যও আছে বটে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে যখন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, তখন ৮ গুণ বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারতে সেই মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় কুড়ি গুণ বেশি। এর চেয়েও বড় বিষয়, কোভিড নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি লকডাউনের নামে অর্থনৈতিক কার্যক্রম এমন মুখ থুবড়ে পড়েছে, যে ক্ষতি আগামী কয়েক বছরে কাটিয়ে ওঠা মুশকিল হবে ভারতের। যদিও আইএমএফ বলছে, আগামী বছর ভারত হয়তো বাংলাদেশকে মাথাপিছু জিডিপিতে পিছু ফেলে সামান্য এগিয়ে যেতে পারবে, কিন্তু আগামী কয়েক বছর একেবারে পাশাপাশি গ্রোথ হবে দুটি দেশেরই, এবং ৫ বছর পরে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ভারতের থেকে এগিয়েই থাকবে।
আমাদের এই লেখার মূল বিষয় ভারতকে পিছু ফেলার অহম প্রকাশ নয়, বরং অহমে অন্ধ হয়ে যাতে আমরা বসে না থাকি, সেই সতর্কতা পৌঁছে দেওয়াই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

এ কথা ঠিক, বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে ভালো করছে। গত ১৬ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যখন ‘গ্লোবাল হাঙার ইনডেক্স’ প্রকাশ করা হয়, সেই আন্তর্জাতিক সেমিনারেও আমি যোগ দিয়েছিলাম। সেই রিপোর্টেও দেখা গেছে যে বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দ্রুত উন্নতি করছে। কোভিড পরিস্থিতিতেও আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো, দেশীয় পর্যায়ে খাদ্য ও পুষ্টি বিতরণেও স্থিতিশীল অগ্রগতি আছে।
কিন্তু এই অর্জন কতটা পরিকল্পিত এবং কতটা কাকতাল, সেটা নিয়ে বাংলাদেশে তেমন আলাপ আলোচনা নেই। সরকারি মন্ত্রী ও আমলাদের আত্মতুষ্ট বয়ানের বাইরে অর্থনীতি নিয়ে সত্যিকারের আলোচনা তেমন একটা এদেশে চোখে পড়ে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই যে ভারতকে পিছু ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলো, এ নিয়ে ভারতের টিভি ও সংবাদপত্র আলোচনা, কলাম, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে একেবারে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এ ব্যাপারে একেবারেই নীরব।
এর মানে হচ্ছে অর্থনীতি বিষয়টা আমরা তেমন করে বুঝতে চেষ্টা করছি না।

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই ধারায় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেশি হওয়ার একটা সরাসরি প্রভাব রয়েছে। এই মুহূর্তে জনসংখ্যার বেশিরভাগের বয়সই কর্মক্ষম। তারা নানাভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

আমাদের দ্বিতীয় বড় শক্তি হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও শ্রমঘন খাতের বিস্তার। ভারত যেখানে আইটি, কম্পিউটার সফটওয়্যারের মতো মেধাভিত্তিক খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে, সে তুলনায় আমরা গার্মেন্টসের মতো শ্রমঘন শিল্পকে জোর দিয়েছি। এতে বাংলাদেশের সুবিধা হচ্ছে যে, আমরা বেশি মানুষকে কাজ দিতে পারছি।

ভারত হয়তো দুইজন ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে ২ লাখ টাকা আয় করছে, অন্যদিকে আমাদের ৮ হাজার টাকা বেতনের ২৫ জন গার্মেন্ট শ্রমিককে কাজ দিয়ে সেই ২ লাখ টাকা আয় করতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা বেশি মানুষকে কাজ দিতে পারছি এবং তাদেরকে টিকে থাকতে সাহায্য করছি।
গত কয়েক বছর ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার প্রচুর ব্যয় করেছে। বিদ্যুৎ খাত, রাস্তাঘাট-ফ্লাইওভার নির্মাণ হয়েছে। এতে দ্রুত এক ধরনের টাকার প্রবাহ তৈরি হয়েছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সুফল আমরা অর্থনীতিতে পাবো। এক পদ্মা সেতু চালু হলেই পদ্মার ওপারে জিডিপি ২ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি খাতে ভর্তুকির একটি বড় সুফল আমাদের অর্থনীতিতে পড়ছে।

কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এসব খাত যেভাবে অর্থনীতিতে গতি সৃষ্টি করেছে, তার কতটুকু পরিকল্পিত, সেই প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। অর্থনীতির পালে যে জোরালো হাওয়া লেগেছে, শক্ত হাতে হাল না ধরলে এই দুরন্ত নৌকাকে তীরে ভেড়ানো যাবে না।

আমরা আমাদের সম্ভাবনাটুকু কাজে লাগানোর কোনও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিচ্ছি না। এই যে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে তাদেরকে প্রশিক্ষিত করার কোনও পরিকল্পনা নেই। শিক্ষাব্যবস্থা এখনও ‘কেরানি’ আর ‘মোল্লা’ তৈরিতেই বেশি ব্যস্ত। মধ্যমস্তরের প্রকৌশলী তৈরির বিস্তৃত পদক্ষেপ নেই। আমাদের সামনে চীনের মডেল রয়েছে, সেখানে তারা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ছোট ছোট কারখানা তৈরি করে বিশ্বের প্রোডাকশন হাবে পরিণত হয়েছে। আমরা এখনও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বলতে কাপড়ে বাটিক প্রিন্ট আর বাঁশবেতের মোড়া তৈরিতে ব্যস্ত আছি। আন্তর্জাতিক সোর্সিংয়ে চীন যেখানে আলীবাবা’র মতো সহজ ওয়েবসাইট করে দুনিয়ার মাঝে তাদের প্রোডাক্ট বিক্রি করছে, সেখানে আমার দেশের একজন তরুণ উদ্যোক্তা, যিনি হাজারীবাগ ট্যানারির পাশে চামড়ার ব্যাগ তৈরি করেন, তিনি জানেন না কীভাবে তার প্রোডাক্ট অন্যদেশে পাঠানো যায়। সেই পাঠানোর প্রক্রিয়া এতই জটিল যে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। চীন থেকে আপনি আলী এক্সপ্রেস অ্যাপসের মাধ্যমে প্রয়োজনে একটা ব্যাগ কিংবা একজোড়া জুতা কিনতে পারবেন, সরাসরি কারখানা থেকে আপনি দুনিয়ার যে দেশেই থাকুন না কেন, সেই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে সেরকম কিছু তৈরি হয়নি। আমাদের স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের রফতানির সুযোগ আছে কী নেই সেটা নিয়ে কোথাও কোনও তথ্য পাওয়ার সুযোগ নেই।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রোডাকশন বেজড করতে হবে, গবেষণা নির্ভর করতে হবে। আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য আমাদেরকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের একমাত্র শক্তি হচ্ছে এখানে শ্রমঘন খাতে কর্মসংস্থান বেশি, যা সামাজিক টেকসই অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ।

কিন্তু আমরা যদি এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো না নেই, তাহলে অর্থনীতির এই গতি টেকসই হবে না। ব্যাংক লুট, দুর্নীতি আমাদের এখানে পর্বত প্রমাণ। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অদক্ষতা, দূরদর্শিতার অভাব। এই দেশে আইটি মন্ত্রণালয়ের একমাত্র কাজ হচ্ছে পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কাজ করা। এর বাইরে দুনিয়ায় যে হাজারটা সম্ভাবনা রয়ে গেছে, সেটি তারা জানে বলে মনে হয় না। বিদেশে দূতাবাসগুলো আমাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণে কী লবিং করে, কী মেলা-প্রদর্শনী-বিজনেস মিট এর আয়োজন করে বা আদৌ করে কিনা সেটা আমরা জানি না। অন্তত এর কোনও ফল আমরা দেখি না।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কোনও সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে বলে নজরে পড়ে না, বরং রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিদেশের মাটিতে পদে পদে হয়রানির শিকার হতেই দেখেছি আমরা।
এই সবকিছুকেই দ্রুত শুধরাতে হবে আমাদের। অর্থনীতিকে আমরা আগামী ১০ বছর, কুড়ি বছর পর কোথায় দেখতে চাই সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেভাবেই আমাদের কর্মপন্থা সাজাতে হবে। শুধু এই হবো, সেই হবো বলে স্লোগান দিলেই চলবে না।
ভারতকে পিছে ফেলে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে যাওয়া সাময়িক আত্মতৃপ্তি দেয় বটে, কিন্তু এখনই সতর্ক না হলে সাফল্যের গতি খুব বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না।

লেখক: ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট



/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

মেসির জোড়া গোলে বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন

মেসির জোড়া গোলে বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন

কান ধরে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাই, বললেন অ্যাপেক্স এমডি

কান ধরে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাই, বললেন অ্যাপেক্স এমডি

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নিভে গেল চলচ্চিত্রের দুই নক্ষত্র

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নিভে গেল চলচ্চিত্রের দুই নক্ষত্র

ম্যান সিটিকে হারিয়ে চেলসি ফাইনালে

ম্যান সিটিকে হারিয়ে চেলসি ফাইনালে

দেড় শতাধিক ছবির নায়ক ওয়াসিম আর নেই

দেড় শতাধিক ছবির নায়ক ওয়াসিম আর নেই

আলহামদুলিল্লাহ সব ঠিকঠাক আছে: খালেদা জিয়ার চিকিৎসক এফ এম সিদ্দিকী

আলহামদুলিল্লাহ সব ঠিকঠাক আছে: খালেদা জিয়ার চিকিৎসক এফ এম সিদ্দিকী

‘খালেদা জিয়া বলেছেন সবার প্রপারলি মাস্ক পরা উচিত’

‘খালেদা জিয়া বলেছেন সবার প্রপারলি মাস্ক পরা উচিত’

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুর গ্রেফতার

পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুর গ্রেফতার

মেনে নেওয়া হবে শ্রমিকদের দাবি

বাঁশখালী হত্যাকাণ্ডমেনে নেওয়া হবে শ্রমিকদের দাবি

মেক্সিকো থেকে কাদের মির্জার ছেলেকে হত্যার হুমকি!

মেক্সিকো থেকে কাদের মির্জার ছেলেকে হত্যার হুমকি!

রোহিতের ৪ হাজার, মুম্বাইয়ের সঙ্গেও পারলো না হায়দরাবাদ

রোহিতের ৪ হাজার, মুম্বাইয়ের সঙ্গেও পারলো না হায়দরাবাদ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune