সেকশনস

বাংলাদেশে ট্যারান্টের ‘গুরুরা’

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৯, ২২:৪১

মোস্তফা হোসেইন সৃজনশীল মানুষের হাতেও জঙ্গি তৈরি হয়, ধর্মীয় উন্মাদনাও জঙ্গি তৈরি করে। সৃষ্টিশীল মানুষ যখন তার শিল্প-সাহিত্যকে উগ্র মতবাদের আখড়া বানান, তখন বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে সেখানে জঙ্গিদের জন্ম হয়। অন্তত নিউ জিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদসহ দুটি জঙ্গি হামলার পর এটা মানতে দ্বিধা থাকার কথা নয়।
এটা তো প্রমাণিত, সমকামী, লেখক-শিল্প সমালোচক ও বাচিকশিল্পী জঁ রেঁনো ক্যামু’র তত্ত্ব– ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’, সেই তত্ত্বটিই ঘাতক অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট গ্রহণ করেছে। যদিও জঁ রেঁনো ক্যামু শনিবার সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছেন, তার তত্ত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে মসজিদে হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্ট। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি সম্পূর্ণ অহিংস।
প্রশ্নটা এখানেই। যে তত্ত্ব বা মতবাদ মানুষকে নিরীহ মানুষকে খুন করতে প্রভাবিত করে তখন সেই তত্ত্বটিকে আর অহিংস স্রষ্টার সৃষ্টি বলে মনে করা যায় না। দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট-এর ক্ষেত্রে তা অবশ্যই প্রযোজ্য। দ্য রিপ্লেসমেন্ট বিষয়ে পত্রপত্রিকায় যে তথ্য পাওয়া যায়, তাকে কোনোভাবেই সহিংসতাবিরোধী মনে করার কারণ নেই।
গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট তত্ত্ব দিয়ে জঁ রেঁনো ক্যামু ‘মুসলিমরা সবাই দুর্বৃত্ত ও সশস্ত্র, এরা সহসাই ফ্রান্স দখল করে নেবে’ মন্তব্য করলেন। আদালত তাকে ৪ হাজার ইউরো জরিমানা করলেও তিনি হাসি দিয়েই উড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই জরিমানাটাকে। অভিবাসীদের নিয়ে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তার মূলে তো জঁ রেঁনো ক্যামুর মতো বিজ্ঞজনদের মন্তব্য-বক্তব্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজ করছে। শনিবার এই জঁ রেনো ক্যামু যখন বলেন, তিনি অহিংস, তারপরও কি তিনি উসকানিদাতা নন এমন বলার সুযোগ থাকে? তিনি বলেছেন, নিউ জিল্যান্ডের ওই খুনি দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট চুরি করেছে। তারপরও কি তিনি দায়মুক্ত হতে পারেন?
বর্ণবাদের ঘোরতর প্রচারকই যে এমন জঙ্গিপনার জন্য এককভাবে দায়ী কিংবা জঙ্গি তৈরির জন্য দায়ী তা বলা ঠিক হবে না। ধর্মান্ধ কিংবা বর্ণবাদের কারণে জঙ্গি হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থবাদও কার্যকর। সেই বিবেচনায় ব্রেন্টন ট্যারান্টের গুরু জঁ রেঁনো ক্যামু যেমন জঙ্গি সৃষ্টি করে, তেমনি রাজনৈতিক নেতা ও দলও জঙ্গি সৃষ্টি করতে পারে। লক্ষণীয়, তিনি সেই পথেও হেঁটেছেন। parti de l'In- Nocence ev No Nuisance নামের যে রাজনৈতিক দল তিনি গঠন করেছেন, সেটা তো স্পষ্টত বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবাদে ভরপুর। তাতে প্রমাণ হয় রাজনৈতিক কারণও জঙ্গিপনাকে উসকে দিতে পারে।
উসকে দেওয়ার উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানি জঙ্গিদের বিষয়ে ভারতীয় রাজনীতিকে উল্লেখ করা যায়। পাকিস্তানি জঙ্গিদের জঙ্গিপনাকে ইসলামি জঙ্গিপনা বলে প্রচারে বেশি উৎসাহী তারা। এর পেছনে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থটাই বেশি। একদিকে তাদের শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানকে এক হাত নিতে পারছে, অন্যদিকে ইসলামকে ব্যবহার করে মুসলিম বিদ্বেষীদের সমর্থন লাভের আকাঙ্ক্ষাও কাজ করে। তাদের দেশের অভ্যন্তরে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবকেও ব্যবহারের সুবিধা তারা পায়। তাদের এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জঙ্গিপনাকে কর্তব্য মনে করছে কিছু মানুষ। প্রতিহিংসাপরায়ণতাকে যখন উসকে দেওয়া হয় তখন সেই রাজনীতিকেও জঙ্গিবাদের অনুপ্রেরণাদানকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অন্তত পাকিস্তানের জঘন্য খুনি ও জঙ্গিদের পাকিস্তানি পরিচয় দেওয়ার চেয়ে যখন মুসলিম পরিচয় দেওয়া হয়, তখন তো সেটাই মনে হয়।
ভারতের এই জঙ্গি উসকানিদাতা রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি অনেক শক্ত। কখনও তাদের রাষ্ট্রশক্তিও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অধিকতর ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এই দোষ থেকে মুক্ত? নিশ্চয়ই না। সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, এই দেশে কোনও সাম্প্রদায়িকতাবাদের আদর্শ ধারণ করে, এমন কোনও সংগঠন করা যাবে না। কিন্তু অনেক রাজনৈতিক দল সেই আদর্শকেই ধারণ করে। তাদের অনেকেই আবার বড় রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নির্বাচনেও অংশ নিয়ে থাকে। যদিও চরম সাম্প্রদায়িক দল জামায়াত প্রসঙ্গটিই বেশি আসে। সেটাও মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের জনবিরোধী ও মানবতাবিরোধী ভূমিকার কারণে।
জামায়াত এখনও আইনগতভাবে সক্রিয় একটি সংগঠন। তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিছু প্রকাশ্যে, কিছু অপ্রকাশ্যে এখনও তারা কাজ করছে। সীমিত বলে এদের কর্মকাণ্ডকে খাটো করে দেখার কোনও সুযোগ নেই। এরা যে কতটা ক্ষত বাঙালি জাতির বুকে তৈরি করেছে, মাঝে মাঝে সেটাও ভুলে যায় মানুষ। কিন্তু জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক এই দলটি এখনও বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে আছে।
নিউ জিল্যান্ডের এই ঘটনাই যে তত্ত্বকেন্দ্রিক তা-ই নয়, আমাদের এখানেও যেসব জঙ্গিপনার ঘটনা ঘটে সেখানেও এমন লেখা কিংবা ভাষণ-বক্তৃতা জঙ্গিবাদকে উসকে দেয়। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউব বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশেষ করে ধর্মীয় বক্তব্য হিসেবে গণ্য ওয়াজ মাহফিলের প্রসঙ্গ প্রথমেই আসে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন জঙ্গি সন্দেহে কাউকে গ্রেফতার করেন তখন ভিডিও ছাড়াও জঙ্গি বই-পুস্তকের তালিকা থাকেই। এসবই জঙ্গি কাজে উদ্বুদ্ধকরণে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এটা নিশ্চিত। হালে বই-পুস্তকের অবাধ বিতরণ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও কিছু কিছু ওয়াজে স্পষ্ট হয় ধর্মের নামে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। তবে এও উল্লেখ করা জরুরি যে, অনেক ওয়াজে ইসলামের শান্তির বার্তার কথাও বলা হয়। ধর্মে ধর্মে সহিষ্ণুতার কথাও বলা হয়। বলা হয় মানুষকে ভালোবাসার কথা। যারা ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ায় এদের সংখ্যা খুবই কম।
আর এটা তো সবার জানা, স্বাধীনতাবিরোধী কিছু ওয়াজকারী মানুষকে উসকে দিয়ে মাহফিল শেষ করেই ক্ষান্ত হয় না, তারা আবার সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছেড়ে দেয়।
এসব ওয়াজের পর যেসব মন্তব্য আসে তাতেই বোঝা যায় সেগুলো কীভাবে একটি শ্রেণিকে অস্বাভাবিক পথে যেতে সাহায্য করছে। সেটা সরকার, সংবিধান ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও কখনও কখনও স্পষ্ট আক্রমণের কারণ হয়। লক্ষণীয়, এমন ওয়াজকারীর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না। এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইন্ধনগুলো বৃহত্তর হুমকির জন্ম দেয়। আর এগুলো যদি বাড়তে থাকে, অচিরেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে বড় রকমের বাধার মুখে পড়তে হবে। হয়তো সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
সবশেষে একটি বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করা জরুরি মনে করি। আমরা ভুলে যাইনি লেখক ও শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টার কথা। হত্যার প্রচেষ্টাকারী স্পষ্টত জানিয়েছে, সে ভিডিওতে ওয়াজ শুনে শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছে।
সুতরাং নিউ জিল্যান্ডের হত্যাকারী যেমন একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির তত্ত্বকে গ্রহণ করে প্রায় অর্ধশত মানুষকে খুন করতে পেরেছে। আজকে গ্রামগঞ্জে যারা ওয়াজ করছেন তাদের মধ্যে যারা উসকানি দেন- তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে দেশের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াতে পারে। এখনই তাদের দিকে নজর দিতে হবে। তবে শুধু ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে ওয়াজ মাহফিল এই অভিধায় যুক্ত নয়, এটাও মনে রাখতে হবে। যারা ধর্মের সঠিক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা যেন কোনোভাবে বিরক্ত না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

বিদায় মিজানুর রহমান খান: এই হাসি অম্লান থাকুক

বিদায় মিজানুর রহমান খান: এই হাসি অম্লান থাকুক

এমন ‘ফেসবুকীয় সাংবাদিকতা’ কতটা অপরিহার্য

এমন ‘ফেসবুকীয় সাংবাদিকতা’ কতটা অপরিহার্য

ফেসবুক নাকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান–কোন পথে রাজনীতি

ফেসবুক নাকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান–কোন পথে রাজনীতি

বুলেটিন বন্ধের পেছনের কথা

বুলেটিন বন্ধের পেছনের কথা

হজযাত্রীদের উদ্বেগ কি কাটবে?

হজযাত্রীদের উদ্বেগ কি কাটবে?

মৃত্যুর ভয়ও হার মানে আবেগের কাছে

মৃত্যুর ভয়ও হার মানে আবেগের কাছে

খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন কোন পথে

খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন কোন পথে

সর্বশেষ

কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি প্রার্থীদের

কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি প্রার্থীদের

শীত উপেক্ষা করে কেন্দ্রে আসছেন ভোটাররা

শীত উপেক্ষা করে কেন্দ্রে আসছেন ভোটাররা

দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান সূর্য আমরা

একনজরে অর্থনীতির ৫০দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান সূর্য আমরা

শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে তারাবো পৌরসভা নির্বাচনে 

শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে তারাবো পৌরসভা নির্বাচনে 

বাইডেনের অভিষেকের আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন ট্রাম্প

বাইডেনের অভিষেকের আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন ট্রাম্প

চান্দিনায় ইভিএমে ভোগান্তি

চান্দিনায় ইভিএমে ভোগান্তি

হাসপাতালের স্টাফদের অবহেলায় সিঁড়িতেই সন্তান প্রসব

হাসপাতালের স্টাফদের অবহেলায় সিঁড়িতেই সন্তান প্রসব

বিএনপি সমর্থিত মেয়র-কাউন্সিলরদের ভোট বর্জন

বিএনপি সমর্থিত মেয়র-কাউন্সিলরদের ভোট বর্জন

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.