X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

সাধে কি কেউ নিজের ঘরে আগুন দেয়?

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:১৩

রেজানুর রহমান দুটি ঘটনা। প্রথমটি ভাড়ায় চালায় এমন একজন মোটরসাইকেল চালককে ঘিরে। দ্বিতীয়টি দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ জন ছাত্রকে ঘিরে। প্রথম ঘটনায় ক্ষুব্ধ চালক নিজেই প্রকাশ্যে তার মোটরসাইকেলে আগুন দিয়েছেন। দ্বিতীয় ঘটনায় কোনও কারণ ছাড়াই একজন শিক্ষিকা কর্তৃক মাথার লম্বা চুল কেটে ফেলায় অপমান সইতে না পেরে শাহজাদপুর রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। দুটিই বেশ আবেগ তাড়িত এবং অবশ্যই প্রতিবাদের ঘটনা। কিন্তু ঘটনা দুটির ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক কোনও পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি।

চালক কর্তৃক নিজের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা মোটামুটি সবাই জানেন। তবু ঘটনাটা একটু বলি। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেছিলেন রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম পাঠাওয়ের চালক শওকত আলী। ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ১০টার দিকে বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় একজন ট্রাফিক পুলিশ তার মোটরসাইকেল থামিয়ে মামলা দিতে গেলে ক্ষুব্ধ হন শওকত আলী এবং প্রকাশ্যে নিজের মোটরসাইকেলে নিজেই আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় আশপাশের মানুষ তার মোটরসাইকেলের আগুন নেভাতে এগিয়ে এলেও শওকত আলী তাদের সহায়তা নেননি। বরং ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সবাইকে বলেছেন, আমি আমার বাইক পোড়াইতেছি। আপনাদের দরদের প্রয়োজন নেই।

শওকত আলী কেন তার বাইক পোড়ালেন? এর ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছেন তিনি। ‘আমি কেরানীগঞ্জে ব্যবসা করতাম। করোনার কারণে ব্যবসা বন্ধ। দেড় মাস ধরে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাই। কিন্তু এই স্বাধীন পেশারও দেখি অনেক যন্ত্রণা। পুলিশ যখন তখন মামলা দেয়। গত সপ্তাহেও আমাকে একটা মামলা দেওয়া হয়েছিল। অনেক কষ্টে মামলার টাকা জমা দিয়েছি। সপ্তাহ যেতে না যেতে আবারও মামলা। তার মানে আবারও জরিমানা। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। তাই নিজের বাইকে নিজে আগুন দিছি। বলতে পারেন এটা আমার এক ধরনের প্রতিবাদ।

শওকত আলীর এই প্রতিবাদ কী যুক্তিযুক্ত? রাস্তায় আইন অমান্য করলে ট্রাফিক পুলিশ গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়। শওকত আলী নিশ্চয়ই অপরাধ করেছিলেন। আর তাই তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিতে গিয়েছিল। এখন কথা হলো, কোন পরিস্থিতিতে একজন চালক তার নিজের মোটরসাইকেলে আগুন দিতে পরে? উপরন্তু এটি যদি হয় তার রুটি রুজির প্রধান অবলম্বন, তাহলে কী কারণ ছাড়াই সে তার মোটরসাইকেলে আগুন দেবে?

আমাদের দেশে সড়ক আইন মানে ক’জন? এমনও দেখা যায়, হাইওয়েতে ট্রাফিক পুলিশ হাত তোলার পরও বাস, ট্রাকসহ ভারী যানবাহন অবজ্ঞা করে চলে যায়। কেন যায়? এর পেছনে অনেক কারণ আছে। এমনও শোনা যায়, পরিবহন খাতে ‘ঘাটে ঘাটে’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নাকি চাঁদা দিতে হয়। হাত তুললেই চাঁদা দাও। না হলে কেস খাও। ফলে দেশের পরিবহন সংস্কৃতি এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এমন কথাও শোনা যায়, রাস্তায় দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য নাকি একটা নির্ধারিত রেট বেঁধে দেওয়া থাকে। আর তাই নির্ধারিত টার্গেট ‘এচিভ’ করার জন্যও নাকি বিভিন্ন যানবাহন চালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। শোনা কথায় গুরুত্ব দিতে চাই না আমরা। তবে শওকত আলীর ঘটনাটা আমলে নেওয়া জরুরি।

শওকত আলী নিজের বাইকে আগুন দিয়ে খুব যে একটা মহৎ প্রতিবাদ করেছেন তাও বলা যাবে না। তবে তার প্রতিবাদ গুরুত্বেরও দাবি রাখে।

এবার আসি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনা প্রসঙ্গে। মাথার চুল লম্বা হওয়ায় একজন শিক্ষিকা নাকি প্রকাশ্যে ১৪ জন ছাত্রের চুল কেটে দিয়েছেন। এই লজ্জাজনক ঘটনা সহ্য করতে না পেরে একজন ছাত্র নাকি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখন কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এমন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কেটে দেওয়ার যুক্তি কী? যে ১৪ জন ছাত্রের মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়েছে তারা রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ' অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী। বিভাগীয় চেয়ারম্যান নাকি তাদের মাথার চুল কেটে দিয়েছেন।

আবারও বলি, দুটি ঘটনাই একটি বিশেষ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আমরা কথায় কথায় বলি সহ্যেরও একটা সীমা আছে। দুটি ঘটনাতেই সহ্যের সীমার বিষয়টি উঠে এসেছে। নিজের বাইক পুড়িয়ে দিয়ে শওকত আলী বুঝিয়ে দিয়েছেন সে কথা। আবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রটিও একই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তথ্যপ্রযুক্তির এই বিস্ময়কর যুগে আমরা গাড়িচালকের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাকবো নাকি রাস্তার আইন সঠিকভাবে কার্যকর করবো- এটাই বোধ করি জরুরি প্রসঙ্গ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠন-পাঠন ব্যবস্থার প্রতি জোর না দিয়ে শিক্ষার্থীর মাথার চুল নিয়ে গবেষণায় রত থাকবো কিনা সেটাও জরুরি প্রসঙ্গ।

লেখাটি শেষ করি। তার আগে আবারও বলি, সাধে কি কেউ নিজের ঘরে আগুন দেয়? শওকত আলীর বাইক তো তার নিজের ঘরের মতো। শওকত আলী নিশ্চয়ই এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, যা সে আশা করেনি। আর তাই সাধের বাইকে আগুন দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রটির কথা ভাবুন তো একবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে একজন ছাত্র। মাথায় লম্বা চুল রাখা কি তার অপরাধ হতে পারে? আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল সে। যদি সে মারা যেত তাহলে এর দায় কেউ কি নিতো? জবাব কার কাছে চাইবো?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বৃষ্টিতে ভিজতে চান লুৎফর হাসান-রূপা!
বৃষ্টিতে ভিজতে চান লুৎফর হাসান-রূপা!
গতবারের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ
গতবারের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ