X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

‘জোছনায় তবু সে দেখিলো কোন ভূত?’

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৯:৪০

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে এসে একজন একাকী বাস করা মানুষের আত্মহত্যার ঘটনায় সবাই আলোড়িত হয়েছেন। নানা বিশ্লেষণ আর মন্তব্যে মূলধারার গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম। নিঃসঙ্গতা আর নানাবিধ অন্যায্যতার মুখোমুখি হওয়াটাই আত্মহত্যার ‘মূল’ কারণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম তার আত্মহত্যার তত্ত্বে (১৮৯৭) সমাজ বিচ্ছিন্নতাকে  (এনোমিক) সুইসাইডের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

কিন্তু এর পাশাপাশি তিনি আরও বলেন–  যারা নিজেকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন, আত্মশ্লাঘায় (ইগোইস্টিক) ভোগেন, যাদের সামাজিক সম্পৃক্ততা বা পরার্থপরতা বেশি (অলট্রইস্টিক) কিংবা যারা অদৃষ্টের ওপর ভরসা করে সামাজিক চাপে থাকেন (ফ্যাটালিস্টিক), তাদের মাঝেও আত্মহত্যার হার বেশি! তার মানে কেবল নিঃসঙ্গ ব্যক্তিই নয়, সামাজিকভাবে পরিপূর্ণ ব্যক্তিও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকেন।

‘বধূ শুয়ে ছিল পাশে-শিশুটিও ছিল; /প্রেম ছিল, আশা ছিল জোছনায় তবু সে দেখিলো/ কোন্ ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?’

সব পরিপূর্ণতা নিয়েও কেন লাশকাটা ঘরে যেতে হয়েছিল? কোথাও একটা অপূর্ণতা ছিল। এই অপূর্ণতাই মানসিক স্বাস্থ্য সংকট।  শুধু একাকী থাকা মানেই কিন্তু নিঃসঙ্গতা নয়, অনেকের মাঝে বসবাস করেও একজন মানুষ অপূর্ণবোধ করতে পারেন, আবার কারও কাছে একাকিত্বও কখনও কাঙ্ক্ষিত হতে পারে। একা বসবাস করেও কিন্তু সামাজিকভাবে দক্ষ হওয়া যায়।  সমাজের সঙ্গে সংযোগ রাখা, নিজেকে সমাজের একজন মনে করা এবং নিজেকে সমাজের একজন, বিশ্বাস করে এবং সমাজকে ভালোবেসে একজন মানুষ একাকী থাকতে পারেন। একজন মানুষ একা বসবাস করছেন মানেই তিনি নিঃসঙ্গ, এটা একটা ভুল ধারণা। কেউ নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্যুত মনে করছেন কিনা, সেটাই হচ্ছে তার প্রকৃত নিঃসঙ্গতা। একা থাকা কোনও অপরাধ নয়, নয় কোনও মানসিক রোগ। কিন্তু যাদের মানসিক সংকট রয়েছে বা বিষণ্নতা রয়েছে, তার জন্য একাকিত্ব সংকটকে বাড়িয়ে তোলে, বিষণ্ন তাকে বাড়ায়। বিষয়টা অনেকটা  এরকম যে  মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয় না কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীর জন্য মিষ্টি ক্ষতিকর। তেমনি যার বিষণ্নতা বা অন্য কোনও মানসিক সংকট রয়েছে, তার জন্য একাকী থাকা নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হতে পারে।

ইদানীং সঙ্গত কারণে অনেক সময় মানুষকে একা বসবাস করতে হয়। বিশেষ করে বয়সকালে, সন্তানরা কাজের তাগিদে দূরে থাকেন, আবার ব্যক্তি নিজেও অবসর গ্রহণ করেন।  স্বাভাবিকভাবেই খানিকটা একা হয়ে যান তারা। এই সময়টিতে যিনি একাকী থাকছেন তাকে সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। হ্যাঁ, দায়িত্ব রয়েছে তার পরিবার আর কাছের স্বজন প্রতিবেশীদেরও। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত হতে হবে ব্যক্তি নিজেকেই। কারণ, সামাজিক বাস্তবতাই কিন্তু বয়সী মানুষদের ইদানীং একাকী করে দিচ্ছে– এই বাস্তবতাকে অস্বীকার যেমনি করা যাবে না তেমনি সমাজের এই পরিবর্তনের ধারাকে উল্টোপথেও চালানো যাবে না। বরং এই পরিবর্তনকে মান্য করে সামাজিক দক্ষতা বা সোশাল স্কিল বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে তার অন্তর্নিহিত কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ৮০-৯৫% আত্মহত্যার কারণ হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট -বিশেষ করে বিষণ্নতা, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, মুড ডিসঅর্ডার ইত্যাদি। তাই সমাজ কাঠামো পরিবর্তনের দুরূহ তত্ত্ব বাস্তবায়নের লম্বা লম্বা অকেজো বক্তব্য না দিয়ে আমাদের মনের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হবে– মানসিক রোগের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। একাকী বসবাস করা কিংবা অনেকের মধ্যে বসবাস করা যে কেউ পূর্ণ জোছনায় ‘ভূত’ দেখতে পারেন। এই ভূতই হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যার ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই – তিনি পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করেছেন। যেটিকে আমরা ‘ডিসিসিভ’ আত্মহত্যা বলে থাকি। আরেক ধরনের আত্মহত্যা হচ্ছে ‘ইমপালসিভ’ বা হঠাৎ পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা। সাধারণত গুরুতর বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তিরাই ডিসিসিভ সুইসাইড করে থাকেন। জনাব মোহসিন তার মৃত্যু ঘটলে বাড়িতে অপরের অভিগম্যতার জন্য আগে থেকেই দরজায় নোটিশ লাগিয়ে রেখেছিলেন, সুইসাইড নোট তৈরি করেছিলেন, ১৫ মিনিটের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন অপ্রাপ্যতা আর বঞ্চনার কথা বলছিলেন, কান্নাকাটি করছিলেন (ক্রাইং স্পেল), তদুপরি তিনি ক্যানসারে ভুগছিলেন। নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এসব পরম্পরা নির্দেশ করে যে তিনি সম্ভবত গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। এই বিষণ্নতার কারণেই  তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই জনাব মোহসিনের আত্মহত্যার জন্য একাকিত্ব বা আর্থিক অন্যায্যতাকেই দায়ী করছেন। হয়তো এগুলো অনুঘটকের কাজ করেছে কিন্তু প্রকৃত কারণ হচ্ছে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।

সারা পৃথিবীতে জনাব মোহসিনের মতো প্রায় ৬০ হাজার মানুষ প্রতিদিন নানাভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকেন। তাঁদের মধ্যে ৩০০০ জন আত্মহত্যা করেই ফেলেন। এই হিসাবে বিশ্বে বছরে ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করেন। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন! বাংলাদেশে বড়মাপের গবেষণা না হলেও বিভিন্ন গবেষণা আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে বছরে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন।

করোনাকালে ১০ মাসে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে বাংলাদেশে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০২১ সালে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীই আত্মহত্যা করেছেন ১০১ জন! পশ্চিমা বিশ্বে পুরুষদের আত্মহত্যার হার বেশি আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে নারীদের হার বেশি।

আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। একটু মনোযোগ দিলেই আত্মহত্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে তাঁদের জীবন বাঁচানো যায়।

আত্মহত্যার জন্য যারা ঝুঁকিপূর্ণ তারা প্রায়ই মৃত্যুর কথা বলেন, মৃত্যুচিন্তা করেন, কখনও সরাসরি বা ঘুরিয়ে আত্মহত্যা বা মৃত্যুর কথা বলেন, আগে একা থাকতেন না কিন্তু এখন একা থাকেন, কারও সঙ্গে মেশেন না, সব বিষয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন, অকারণে কান্নাকাটি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, প্রায়ই আত্মহত্যা বিষয়ক ওয়েবপেজ ঘাঁটাঘাঁটি করেন, আত্মহত্যার উপকরণ সংগ্রহ করেন। কারও মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দেখা গেলে তাকে উপহাস করা যাবে না। সবসময় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ‘আরে এগুলা কিছু না’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তার মনের কথা এমপ্যাথি দিয়ে শুনতে হবে। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মানসিক সমস্যা থাকলে লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয়জনের  এ ধরনের পোস্ট দেখা গেলে তৎক্ষণাৎ তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে হবে বা ফোনে কথা বলতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং যতদিন আর কোনও হটলাইন না হচ্ছে ততদিন ৯৯৯-এ ফোন করে সাহায্য নিতে হবে।

আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ যে মূলধারার গণমাধ্যমকে কেবল কোনও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে রিঅ্যাকটিভলি কয়েকদিন প্রতিবেদন, কলাম আর টকশো না করে আত্মহত্যা বিষয়ক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রোঅ্যাকটিভ হতে হবে, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার কথা বলতে হবে, আত্মহত্যা প্রতিরোধের কথা বলতে হবে।

মানতে হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার “প্রিভেন্টিং সুইসাইড: আ রিসোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস” গাইডলাইনটি। জনাব মোহসিনের আত্মহত্যা নিয়ে কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই গাইডলাইনটির ব্যত্যয় ঘটেছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে আবারও ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করাকে প্রণোদিত করতে পারে! পাশাপাশি দায়িত্ববান হতে হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নেটিজেনদের। এমন কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে, যাতে আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির শোকাতুর স্বজন বন্ধুদের মনে আরও কষ্ট সৃষ্টি না হয়।

আর শেষ যে কথাটি না বললেই না, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ৩০৯ অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা ২০২২ সালেও একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত ! সভ্য জাতি হিসেবে এটি আমাদের লজ্জা। মনে রাখতে হবে আত্মহত্যা মোটেই একটি ক্রিমিনাল ইস্যু না,  এটি সর্বতোভাবে একটি স্বাস্থ্য ইস্যু, মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যু। তাই অবিলম্বে  আত্মহত্যার চেষ্টাকে ডিক্রিমিনালাইজড করার জন্য জনমত তৈরি করতে হবে। সংশোধন করতে হবে আইন।

সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। মনের যত্ন নিন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, চাইল্ড এডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ