X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

বন্ধুরে তুই কেমন আছিস?

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:৪০

রেজানুর রহমান ‘বন্ধু তোরা কোথায় আছিস, যান্ত্রিক আমার এই শহরে? বন্ধু তোরা কীভাবে বাঁচিস? আজকাল মনে দারুণ জ্বর, তোদের ছাড়া একা আমি... জীবনের পথে হঠাৎ থামি, বন্ধু তোদের খুনসুটি এখন আর হয় না। বন্ধু তোদের খামখোয়ালি, আনন্দ আর জমে না...’– বন্ধুত্ব নিয়ে এই গানটির লাইন হঠাৎ মনে পড়ে গেলো। যারা লেখাটি পড়ছেন তারা একবার ভাবুন তো প্রিয় বন্ধু কথা। মনের আয়নায় একবার বন্ধুর মুখকে দেখার চেষ্টা করবেন? নিশ্চয় আয়নায় ভেসে উঠছে সেই স্কুল জীবন অথবা ছোট বেলার কথা। হাফ প্যান্ট পরা বন্ধু অথবা ফ্রক পরা বন্ধু। ছোটবেলার খেলার সাথী। দু’দিন চোখের আড়াল হলেই হয়তো ছটফট করতেন। ফুটবল মাঠের বন্ধু, হাডুডু, দাড়িয়া বান্ধা, ছিবুড়ি খেলার বন্ধু। ক্লাসের বন্ধু, পাশের বাড়ির বন্ধু। মনে পড়ে কি তাদের কথা?

আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ছে। ওর বাবা বদলী হয়ে যাবে অন্য শহরে। ট্রাকে বাসার মালপত্র উঠানো হচ্ছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি কার। ট্রাকে মালপত্র ভবানো হলেই কারে চড়ে পরিবারের সবাই চলে যাবেন অন্য শহরে। কিন্তু আমার সেই ছোট্ট বন্ধু আমাকে ছেড়ে অন্য শহরে যেতে নারাজ। হাউ মাউ করে কাঁদছিলো। বড়রা তাকে অনেক বুঝিয়ে কারে বসিয়ে নিলেন। ট্রাকের পিছু পিছু কার চলে গেলো। তারপর অবশ্য ওই বন্ধুর সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না। বড় বেলায় তাকে আর খুঁজে পাইনি। এজন্য দায়টা কার? আমি তো তখন ছোট। চিঠি লেখার সুযোগ ছিল না। দৌড়ে গিয়ে দেখা করে আসব সে সুযোগও ছিল না। ফলে যোগাযোগ না থাকায় বন্ধুত্ব মরে গেছে।

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করবেন ‘বন্ধুত্ব’ কি কোনও প্রাণী যে মরে যাবে? বন্ধুত্ব মানে একটি সম্পর্ক। ভেবে দেখুন সম্পর্কই প্রাণকে শক্তি জোগায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বাবা-মায়ের সম্পর্ক, বাবা-মায়ের সঙ্গে ছেলে-মেয়েদের সম্পর্ক, বাবা-মায়ের সাথে ছেলে-মেয়েদের সম্পর্ক, ভাই-বোনের সম্পর্কই তো প্রাণের স্পন্দন বাড়ায়। এই সম্পর্কগুলো যদি মধুর না হয় তাহলে প্রাণ সচল থাকে না। আর বন্ধুত্ব হলো প্রাণকে সচল রাখার অন্যতম প্রেরণা। ভালোবাসার অপর নাম বন্ধুত্ব। ‘ভালোবাসি তোমায়’ এই একটি ছোট্ট বাক্যই জীবনকে অনেক গতিশীল করে। আর তাই আমি মনে করি বন্ধুত্বেরও প্রাণ আছে।

প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে এলেই আমরা যেন বন্ধুত্বের মহিমা নিয়ে সোচ্চার হই। বন্ধুত্ব কি তাহলে একদিনের? মোটেই না। বন্ধুত্ব হলো সারা বছরের। হ্যাঁ, আমরা যেমন জন্মদিন পালন করি তেমনই বন্ধুত্ব উদযাপনের বিষয়ও হতে পারে। উদযাপনের মধ্যেই সম্পর্ককে ঝালিয়ে নেওয়া।

সরল মনে অতীতটাকে ভাবনায় নিয়ে আসুন তো দেখি। সেই ছোটবেলা থেকে বড় বেলায় এসে যে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের ক’জনের সাথে আপনার যোগাযোগ আছে? আজকাল তো আবার ফেসবুক বন্ধুর অভাব নেই। ফেসবুকের সকল বন্ধুই কি বন্ধু? হয়তো এতে বন্ধুর সংখ্যা বাড়ছে আপনার। কিন্তু যার সাথে একদিনও সামনা সামনি দেখা হলো না, চায়ের আড্ডা হলো না, বলা হলো না গোপন কথা সে আবার কিসের বন্ধু?

মৌসুমী ভৌমিকের গাওয়া সেই গানটির কথা ভাবুন তো একবার। ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো... আমি শুনেছি সেদিন তুমি লোনাবালি তীর ধরে বহুদুর বহুদুর হেঁটে এসেছো... আমি কখনও যাইনি জলে কখনও ভাসিনি নীলে। কখনও রাখিনি চোখ ডানা মেলা গাংচিলে, আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে আমাকেও সাথে নিও, নেবে তো আমায়? বলো নেবে তো আমায়?

গানের ভাষায় বন্ধুকে কাছে পাবার এই যে আকুতি-বলো নেবে তো আমায়...? এটাই বন্ধুত্বের প্রাণ শক্তি!

বন্ধুত্ব টিকে থাকে কিসে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। উত্তরটা অনেক সহজ। প্রথম কথা হলো– বন্ধুত্বে বিশ্বাস শব্দটা খুবই জরুরি। কারণ বন্ধুত্ব টিকে থাকে মূলত বিশ্বাসের ওপর। ভেবে দেখুন জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আমরা বাবা-মা, ভাই-বোনকে বলার সাহস না পেলেও বন্ধুকে অবলীলায় বলে ফেলি। কাজেই বন্ধুত্ব টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর।

তবে কাউকে বিশ্বাস করার আগে একটু ভাববেন। কারণ কখনও কখনও নিজের দাঁতই নিজের জিভকে কামড় দেয়। হ্যাঁ, এটাই সত্যি! যদি কারও সাথে কখনও বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায় তবে তার গোপন কথাগুলো গোপনই রাখবেন।

সব থেকে ধনী অর্থাৎ বড় সম্পদ হলো জ্ঞান। সব থেকে শক্তিশালী হলো ধৈর্য্য, শ্রেষ্ঠ নিরাপত্তা হলো বিশ্বাস। সব থেকে কার্যকর সুখ হলো মুখের হাসি। জ্ঞান, ধৈর্য্য, নিরাপত্তা ও মুখের হাসি সব কিছুই পেতে পারেন বিনে পয়সায়। বন্ধুত্ব টিকে থাকার ক্ষেত্রে বিনে পয়সার এই অস্ত্র গুলোই জরুরি।

মনে রাখবেন খাবারে বিষ ঢেলে দিলে চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু কানে বিষ ঢেলে দিলে সেটার চিকিৎসা সম্ভব নয়। কান কথায় বিশ্বাস করবেন না। করলেই বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।

রাত ১২ টায় তারিখ বদলায় আর মানুষ বদলায় সুযোগ বুঝে। এ ধরনের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব না করাই ভালো।

সুখের দিনগুলোতে একমাত্র তাদেরকেই পাশে রাখবেন যারা দুঃখের দিনে হাতে হাত রেখে আপনার পাশে ছিল। এতে প্রকৃত বন্ধুত্বকে সম্মান জানানো যায়।

কষ্ট সারা জীবন থাকে না। তবে কষ্টের সময় কিছু কিছু মানুষের ব্যবহার সারা জীবন মনে থাকে। বন্ধুত্ব করার সময় বিষয়টি মনে রাখবেন। আর হ্যাঁ, পেছনে বদনাম করে সামনে এসে আন্তরিকতা দেখায় এমন মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করবেন না। কারণ এরা শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর।

বন্ধুত্ব করার জন্য আমরা সুন্দর মানুষ খুঁজি। কিন্তু সুন্দর মানুষ খুঁজতে গিয়ে সুন্দর জীবন নষ্ট করবেন না। কারণ পৃথিবীতে সুন্দর মানুষের অভাব নাই। শুধু অভাব সুন্দর মনের।

পানিতে না নামলে যেমন সাতার শেখা যায় না, তেমনই জীবনে খারাপ সময় না এলে মানুষ চেনা যায় না। বন্ধুত্ব রক্ষায় এই বিষয়টিকে মাথায় রাখবেন।

শেষে মাদার তেরেসার কয়েকটি উক্তি মনে করিয়ে দিতে চাই।  জীবন একটা সুযোগ। কাজেই এই সুযোগকে কাজে লাগান।

জীবন সুন্দর, জীবনকে ভালোবাসুন।
জীবন একটি স্বপ্ন একে বাস্তবে রুপান্তর করুন।
জীবন একটি কর্তব্য, তা সম্পাদন করুন।
জীবন একটি খেলা, এতে নৈপুন্য দেখান।
জীবন একটি প্রতিশ্রুতি, একে পূরণ করুন।
জীবন একটি গান, এতে সুর দিন।
জীবন একটি সংগ্রাম, এতে ঝাপিয়ে পড়ুন।
জীবন একটি ট্র্যাজেডি, এর মুখোমুখি হন।
জীবন মূল্যবান, ধ্বংস করবেন না।

জীবন, জীবনই এর জন্য অবিরত যুদ্ধ করুন। এবং এই যুদ্ধে আপনার অন্যতম প্রেরণা ও প্রাণ শক্তি জোগাতে পারে আপনার একজন ভালো বন্ধু।

শেষে একটা কথা বলি।

মানুষ ঘর বদলায়, সম্পর্ক বদলায়। বন্ধু বদলায়। তবুও সমস্যার শেষ হয় না। কেন শেষ হয় না জানেন কী? কারণ মানুষ নিজেকে বদলায় না। বদলাতে চায় না। বন্ধুত্বে নিজেকে বদলানোটাও অনেক জরুরি। শুধুই নিলাম, দাও আরও দাও... এতে বন্ধুত্ব টিকে না। আপনাকেও দিতে শিখতে হবে, নিঃস্বার্থ ভাবে, তবেই না বন্ধুত্ব টিকবে।

বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার জয় হোক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।  

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
অন্তর্জালে এলো ‘মন খারাপের দিন’
অন্তর্জালে এলো ‘মন খারাপের দিন’
মোটরসাইকেল পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে গিয়ে যুবক আটক
মোটরসাইকেল পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে গিয়ে যুবক আটক
রায়ের বাজারে সন্ত্রাসী হামলায় আহত যুবকের হাসপাতালে মৃত্যু
রায়ের বাজারে সন্ত্রাসী হামলায় আহত যুবকের হাসপাতালে মৃত্যু
কাজের ফাঁকে ছিনতাই করতো তারা
কাজের ফাঁকে ছিনতাই করতো তারা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ