X
বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
১৯ মাঘ ১৪২৯

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে কবে?

ড. প্রণব কুমার পান্ডে
২৯ নভেম্বর ২০২২, ২০:৩২আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২২, ২০:৩২

অতি সম্প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম সমাবর্তনে বক্তব্য প্রদানের সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু উপাচার্য এবং শিক্ষকদের এক অংশের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একইসঙ্গে তাদের অনেকের অনৈতিক কার্যক্রমের সমালোচনা করেছেন। যেহেতু মহামান্য রাষ্ট্রপতি বেশিরভাগ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, তাঁর এই বিষয়গুলোর অবতারণা করার অর্থ হচ্ছে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন।

তাঁর বক্তব্যের বিষয়গুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজমান তা যুগের প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারছে কিনা তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।

আমরা ইতোমধ্যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা সক্ষম- সেই বিষয়টিও বিভিন্নভাবে আলোচনায় রয়েছে অনেক দিন ধরে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করুণ পরিণতি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে এবং এই সমালোচনার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণ।

কোনও কোনও উপাচার্য আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং নিয়ে উপহাস করেছেন, আবার তাদেরই কেউ কেউ র‍্যাংকিংয়ের পদ্ধতিকে উপহাস করেছে। ফলে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড– এ কথাটি অনাদিকাল থেকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারণ, একটি জাতিকে শিক্ষিত করতে হলে সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি উন্নত না হয় তাহলে সেই জাতি কখনোই সুশিক্ষিত জাতি হিসেবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে না। সেই বিষয়টি বিবেচনা করেই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

জাতির পিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতির বিবেক হিসেবে বিবেচনা করে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিলেন। কিন্তু জাতির জনকের সেই স্বায়ত্তশাসন আজকের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা অনেকেই সেই স্বায়ত্তশাসনকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছি, ঠিক তেমনি নিজেদের হাসির পাত্রে পরিণত করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক। ফলে,  বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারের তরফে আরেকটু সচেতন হওয়া প্রয়োজন আছে বলে অনেকেই মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল কাজ হচ্ছে শিক্ষাদান এবং নিজেদের গবেষণার মধ্যে ব্যস্ত রাখা। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দুটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণায় একটি পরিবর্তন আমরা লক্ষ করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ শিক্ষকতা এবং গবেষণার চেয়ে রাজনীতিকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন পদ পদবির আশায় সেদিকেই বেশি মনোনিবেশ করছেন।

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মূল পরিচয় হলো তিনি গবেষক হিসেবে নিজেকে কতটা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন? তার গবেষণার ফলাফলগুলো কোথায় প্রকাশিত হয়েছে- সেটিই মূল বিবেচ্য বিষয়। এটি ঠিক যে একজন খুব ভালো গবেষক ভালো প্রশাসক হবেন– এই বিষয়ে যেমন কোনও গ্যারান্টি দেওয়া যায় না, ঠিক তেমনি একজন ভালো গবেষক ভালো প্রশাসক হতে পারবেন না– সেটিও হলফ করে বলা যাবে না। কিন্তু এ কথা সঠিকভাবে বলা যায় যে একজন ভালো গবেষক যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতৃত্ব দেন তাহলে তাঁর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার শীর্ষে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হবে সেই শিক্ষকের তুলনায় যিনি গবেষণায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি।

একজন ভালো গবেষক নীতি ও নৈতিকতার দিক থেকেও অনেক শক্তিশালী হন এটিও ধারণা করা যেতে পারে।  

গবেষণার পাশাপাশি একজন শিক্ষকের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও কতটা পরিচিতি রয়েছে এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তার কেমন যোগাযোগ রয়েছে সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে।

আমাদের মনে রাখতে হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে  শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহ করা সহজ হবে। আমরা সবাই জানি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গবেষণা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট তহবিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রদান করতে পারে না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব উৎস থেকে পর্যাপ্ত সম্পদ আয় করতে পারে না। ফলে, তাদের সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই অবস্থার বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করা একজন ব্যক্তির যদি সেই সক্ষমতা না থাকে তাহলে তার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতৃত্ব দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যায়।

তবে এটা সাধারণীকরণ করা যাবে না যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো গবেষক নেই। দেশে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষক রয়েছেন যারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে গবেষণার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে। বিভিন্ন সময়ে তারা তাদের কাজের জন্য স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। কিন্তু একথা সত্য, সেই শিক্ষকদের সংখ্যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক কম এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংখ্যা আরও কমে যাচ্ছে। এই অবস্থার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চর্চা দায়ী। রাজনীতির কারণে শিক্ষকগণ গবেষণার পরিবর্তে রাজনীতিতে বেশি সময় ব্যয় করেন। তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে রাজনীতিতে নিজেদের সক্রিয় প্রমাণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা। তাই, একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরপরই বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার সন্ধান করতে থাকেন। সেই ক্ষেত্রে পঠন-পাঠন এবং গবেষণায় তার মনোযোগ আস্তে আস্তে কমতে থাকে। তবে, এই বিষয়টিও সাধারণীকরণ করা যাবে না। কারণ অনেকেই রয়েছেন যারা এই সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের জড়াতে চান না।

ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিবর্গকে বাছাই করার ক্ষেত্রে গবেষণায় তাদের কী ধরনের দখল রয়েছে সেই বিষয়টিই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। কোনও শিক্ষক যদি নিজে গবেষণায় ভালো না হন তাহলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে না– এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকারকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। শক্তিশালী রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকা কোনও ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে আসীন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় খুব একটা লাভবান হয় বলে আমি মনে করি না। বরং যারা তাকে এই পদে বসাবেন তারাই লাভবান হবেন।

এখন সময় এসেছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আরও বেশি চিন্তা-ভাবনা করার। আমরা যখন প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তুলনা করি তখন অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের অনেক ছোট মনে হয়। কারণ, সব ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে রয়েছি তাদের তুলনায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-কানুনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারের তরফ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদের জন্য  ব্যক্তি মনোনয়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি চিন্তা-ভাবনা করার অবকাশ রয়েছে। আমরা কিছু দিন আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এসব পদে শিক্ষকদের নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠনের কথা শুনেছিলাম।

প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে সার্চ কমিট গঠন করলে সেটি হবে একটি ভালো উদ্যোগ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং একুশ শতকের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর এখনই সময়। কারণ, আমরা এখনই যদি বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ না করি তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের গ্র্যাজুয়েটবৃন্দ এবং তাদের সনদ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা- সেই বিষয়েও প্রশ্ন রয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিদের সম্পর্কে যেসব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় তা অত্যন্ত লজ্জার। আর এই বিষয়টি অনুধাবন করেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বিষয়গুলোর অবতারণা করেছেন বলেই আমার বিশ্বাস।

আমরা আশা করবো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত তারা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। এই প্রক্রিয়ায় যেন যোগ্য শিক্ষকদের বেছে নেওয়া হয় সেই বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটা সত্য যে এসব পদে সরকারি দলের সমর্থক শিক্ষকরাই নিয়োগ পাবেন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও ঠিক যে সরকারি দলের মধ্যেও অনেক যোগ্য শিক্ষক রয়েছেন, যাদের নিয়োগ প্রদান করলে করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় যেমন উপকৃত হবে, তেমনি সরকারও প্রশংসিত হবে। এখন সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার।

লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জেলা জামায়াতের আমিরসহ গ্রেফতার ২
জেলা জামায়াতের আমিরসহ গ্রেফতার ২
পাকিস্তানে মসজিদে বিস্ফোরণ: নিরাপত্তা দুর্বলতা নাকি অবহেলা?
পাকিস্তানে মসজিদে বিস্ফোরণ: নিরাপত্তা দুর্বলতা নাকি অবহেলা?
সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু
সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু
রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সকালে ক্ষেতে মিললো কৃষকের লাশ
রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সকালে ক্ষেতে মিললো কৃষকের লাশ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ