X
বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
৮ ফাল্গুন ১৪৩০

রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের সমাবেশ যে বার্তা দিলো

রুমিন ফারহানা
২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৮:৪৯আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৮:৪৯

কাগজে কলমে এটি নির্বাচনের আগের বছর। কাগজে কলমে বলছি এই কারণেই যে আওয়ামী লীগ যতই নির্বাচনি শোরগোলের আলাপ তুলুক না কেন মানুষের মধ্যে এই সংশয় খুব তীব্র ভাবেই আছে যে আদৌ সামনে একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে কিনা। এই সংশয়ের কারণও আছে যথেষ্ট। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বিবেচনার নিয়ে সামনের নির্বাচনটি কীভাবে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল অংশ নেবে কিনা, নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল প্রচার, প্রচারণার সমান সুযোগ পাবে কিনা, প্রশাসনের ভূমিকা কেমন থাকবে এই সব কিছুই আছে আলোচনায়।

প্রধান বিরোধীদল বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর দাবি স্পষ্ট। দলীয় সরকারের অধীনে আর কোনও নির্বাচন নয়। নির্বাচন হবে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এই দাবি আদায়ে একটির পর একটি কর্মসূচি দিচ্ছে তারা। জেলায় জেলায় সমাবেশ, বিভাগীয় সমাবেশ, গণ-মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, মৌন মিছিলসহ নানান কর্মসূচি নিয়ে মাঠে আছে বিরোধী দল। শত উসকানি সত্ত্বেও প্রতিটি কর্মসূচিই ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল, এবং নিয়মতান্ত্রিক যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে কখনও হয়েছে কিনা জানা নেই। 

অন্যদিকে সরকারি দল ভেতরে ভেতরে যাই ভাবুক না কেন তাদের আচরণে মনে হয় অন্য কোনও দল নির্বাচনে আসুক বা নাই আসুক নির্বাচন তার সময় অনুযায়ী ঠিকই হবে। ইতিমধ্যে সরকারি দল ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত রাজপথ দখলে রাখবে তারা। রাজপথ দখল বলতে সাদা চোখে যা দেখেছি তা হল, বিরোধী দলের যে কোনও কর্মসূচিতে পাল্টা কর্মসূচি ডাকা, সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের কাছ থেকে বিএনপিকে প্রতিহত করার ডাক দেওয়ার মতো উসকানি দেওয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীদের দিক থেকে বিভিন্ন সময়ে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড করা। সমাজের নানা পর্যায় থেকে সরকার এবং সরকারি দলের এমন আচরণের সমালোচনা থাকলেও বরাবরের মতই ক্ষমতাসীনরা এসব অস্বীকার করে আসছিল।

অবশেষে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির কর্মসূচিতে সংঘাতের উসকানি না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন; যেই নির্দেশই প্রমাণ করে যথেষ্ট উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। কেবল তো সরকারি দল নয়, বিএনপিকে প্রতি মুহূর্তে মোকাবিলা করতে হয়েছে পুলিশ প্রশাসনের। বিএনপির প্রতিটি সমাবেশের আগে ধর্মঘটের নামে গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া, সমাবেশের দিন ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা, বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে মামলা দেওয়া থেকে শুরু করে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া পর্যন্ত সবই ঘটেছে সমাবেশকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ বিএনপির সমাবেশে যোগ দিয়ে সর্বনিম্ন যে ঝুঁকি, সেটা হচ্ছে মামলার আসামি হওয়া আর সর্বোচ্চ মৃত্যুঝুঁকি।  

এরপরও বিএনপির সমাবেশগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হওয়া রাজনীতিতে কিছু বার্তা দেয়।

এক. এতদিন ধরে যারা অহর্নিশ বলে গেছেন বিএনপি কোনও দলই না, বিএনপি কোমর ভাঙা পার্টি ইত্যাদি তাদের জন্য এই সমাবেশগুলো স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছে। গত ১৭ বছর বিএনপির ওপর যত নিবর্তনই চলুক না কেন, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ আছে।

দুই. বিএনপি ভাঙার চেষ্টা যতই হোক না কেন, বিএনপিকে ভাঙা দূরেই থাকুক, সাংগঠনিকভাবে এতটুকুও দুর্বল করা যায়নি।

তিন. বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন মরিয়া। তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। মামলা বা অন্য কোনও ভয় দেখিয়ে তাদেরকে দমিয়ে রাখা যাবে না।

চার. বিএনপির নেতৃত্বের যে কথিত সংকটের কথা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিএনপিতে সেটা আদৌ নেই। নেতৃত্বের ন্যূনতম কোনও সংকট থাকলে এত বাধা সত্ত্বেও এত সফল সমাবেশ একটির পর একটি করতে পারতো না বিএনপি।

পাঁচ. মামলা, হামলা, গুম, হত্যা কোনও কিছু দিয়েই আর বিএনপির কর্মীদের ঠেকানো যাবে না। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্যাতন তাদের রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি পরিপক্ক করে তুলেছে।    

একদিকে যখন পুলিশ, প্রশাসন আর সরকারি দলের একটির পর একটি বাধা মোকাবিলা করে কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি, অন্যদিকে তখন কেবল রাষ্ট্রীয় খরচেই নয় বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে একটির পর একটি সভা করছে আওয়ামী লীগ। সেই সভায় দুই হাত তুলে মানুষের ওয়াদা নেওয়া হচ্ছে এই বলে যে তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে। রাষ্ট্রীয় খরচে জনসভা করার ক্ষেত্রে এবার যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা। ২৯ ডিসেম্বর রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় যাত্রী পরিবহনের জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের সাতটি বিশেষ ট্রেন ভাড়া করা হয়েছে। এসব ট্রেন মোট ৫ হাজার ৩৩৬ জন যাত্রীকে রাজশাহীতে পরিবহন করে নিয়ে যাবে। অতীতে কোনও সরকারি দল তাদের দলীয় সমাবেশ করার জন্য এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের নজির নেই।   

বিশেষ ট্রেন চালুর জন্য নানা বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে রেলওয়েকে। এই ট্রেনগুলো চলার কারণে স্বাভাবিক ট্রেন চলায় বিঘ্ন হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) অসীম কুমার তালুকদার একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিককে বলেন, রবিবার কয়েকটি ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন। শুধু মধুমতি ট্রেন একটু বিলম্ব হতে পারে। তা ছাড়া সব ট্রেন সময়মতো চলবে। বন্ধ ট্রেনগুলোর লোকোমোটিভ এই স্পেশাল ট্রেনে ব্যবহার করা হবে। এত বগির ব্যবস্থা কীভাবে করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে মহাব্যবস্থাপক বলেন, তারা ১৫ দিন আগে ফরমাশ পেয়েছেন। তখন থেকে তাদের ওয়ার্কশপে মেরামতের অপেক্ষায় থাকা বগিগুলো ঠিক করেছেন। যেখানে সাধারণ মানুষ ট্রেনের টিকিট না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েন সেখানে আলাদা সাতটি ট্রেন নেওয়া হয়েছে কেবল মাত্র সমাবেশে আওয়ামী লীগের লোক পরিবহনের জন্য।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ কেবল দলীয় কাজে ব্যবহারই নয় নির্বাচনের এক বছর আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় খরচে করা এই সব জনসভা থেকে একদিকে যেমন ভোট চাওয়া হচ্ছে অন্য দিকে তেমনি হাজার কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে মানুষকে উন্নয়নের বয়ান শোনানো এবং সেই উন্নয়ন দেখিয়ে আগামী নির্বাচনের প্রচারণা চলছে পুরোদমে।

এই যেমন আজকের রাজশাহী সফরে ১৩১৬ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। মোট ৩১টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ২৫টির কাজ শেষ হয়েছে আর ৬টির কাজ চলমান। রাজশাহী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ধারণা করছে এই সফরে আরও কিছু প্রকল্পের ঘোষণা আসতে পারে, সেই সাথে নেতাদের দিক নির্দেশনার পাশাপাশি ভোটও চাওয়া হবে জনসভা থেকে।

প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে কি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের এক বছর আগে থেকেই প্রকল্প উদ্বোধন বন্ধ রাখবেন? না, প্রকল্প উদ্বোধন বন্ধ রাখার কথা কেউ বলছে না। কিন্তু এত ঢাক ঢোল পিটিয়ে, মহা সমারোহ করে রাষ্ট্রীয় খরচে করা সফরে প্রকল্প উদ্বোধন করে নির্বাচনকে সামনে রেখে মানুষের কাছে ভোট চাওয়া আইন পরিপন্থী না হলেও নৈতিকতা পরিপন্থীতো অবশ্যই।

তবে প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশে এখন যে ধারার নির্বাচন চালু হয়েছে তাতে উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে ভোট চাওয়া বা জনসংযোগের কি বা প্রয়োজন পড়ে? উন্নয়ন প্রকল্প আদতে ভোটের জন্য প্রয়োজন না, এই ধরনের প্রকল্প সরকারের প্রয়োজন দুই কারণে। ১) প্রকল্প মানেই লুটপাটের সূবর্ণ সুযোগ এবং ২) সরকার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে চায় ভোট ছাড়া হলেও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় একই সরকার বারবার ক্ষমতায় আসা জরুরি।

এই দেশটা কীভাবে চলছে, তার নানা দিকের এক চমৎকার প্রদর্শনী হয়ে থাকলো প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহীর জনসভা। এ ধরনের পদক্ষেপগুলো নিয়ে বিএনপিসহ দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করে আসলে মানুষের ক্রোধ, ক্ষোভ, ঘৃণাই অর্জন করা যায় শুধু।

জবরদস্তিমূলকভাবে ক্ষমতার আসনে বসে থাকা ক্ষমতাসীনরা এসব টের পান না, কিংবা পেলেও পাত্তা দেন না খুব একটা। কিন্তু দু'দণ্ড সময় নিয়ে ভেবে দেখলে ক্ষমতাসীনরা বুঝতে পারতেন মানুষের ক্রোধ, ক্ষোভ, ঘৃণা অর্জন করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারলেও একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছেন তাদের দলটির ভবিষ্যৎ। 

 

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। প্রকাশক ও সম্পাদক, ইত্তেহাদ

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
উজবেকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনালেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
উজবেকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনালেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ‘নতুন অধ্যায়’: কী চায় দুই দেশ?
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ‘নতুন অধ্যায়’: কী চায় দুই দেশ?
বিশেষ দিনগুলোতে ফুল বিক্রি কমেছে
বিশেষ দিনগুলোতে ফুল বিক্রি কমেছে
সান্ত্বনার জয়ে হোয়াইটওয়াশ এড়িয়েছে আফগানিস্তান 
সান্ত্বনার জয়ে হোয়াইটওয়াশ এড়িয়েছে আফগানিস্তান 
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ