X
শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪
২৯ চৈত্র ১৪৩০

২৮ অক্টোবরের পরে…

আমীন আল রশীদ
২৭ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৫১আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৫১

বরিশাল অঞ্চলে একটি প্রবাদ আছে এরকম: ‘তারিখ দিয়া মারামারি হয় না’। অর্থাৎ বড় কোনও ঘটনা পূর্বনির্ধারিত সময়ে নাও হতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি বা কোনও দাবি আদায়ের সময়সীমা অনেক সময় রাজপথেই মারা যায়। যেমন, ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের ৩০ এপ্রিলের ডেটলাইন নিয়েও রাজনীতিতে অনেক জল ঘোলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই তারিখে বড় কোনও ঘটনা না ঘটায় আওয়ামী লীগের বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ ৩০ এপ্রিলকে ‘এপ্রিল ফুলের’ সঙ্গে তুলনা করেছিল।

গত বছরের শেষ দিকে মাঠের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির তরফেও ১০ ডিসেম্বরের একটি ডেটলাইন দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে বিএনপির তৃণমূলে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল এবং অনেকেই এটি বিশ্বাস করেছিলেন যে, ১০ ডিসেম্বর হয়তো সরকারের পতন হয়ে যাবে। কিন্তু দেখা গেলো এটিও ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’ প্রবাদে পরিণত হয়েছে। এবার তারা সরকার পতনের এক দফা দাবি আদায়ের জন্য তাদের নতুন ডেটলাইন ২৮ অক্টোবর।

গত ১৮ অক্টোবর বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আগামী ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে। ওই সমাবেশ থেকেই তাদের ‘মহাযাত্রা’ শুরু হবে এবং সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত তারা আর থামবেন না। তবে প্রায় একই সময়ে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশ থেকে বিএনপির কর্মসূচি সফল হতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘মহাযাত্রা নয়, এটি হবে বিএনপির পতনযাত্রা’।

২৮ তারিখ কী হতে পারে সেটি নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, মাঠের রাজনীতিতে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী এবং সর্বোপরি বিদেশিরা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী—তার ওপর। কেননা আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতটা সক্রিয়, বিগত দুটি নির্বাচনে সেটি দেখা যায়নি। এবার যুক্তরাষ্ট্র কেন এত বেশি আগ্রহী কিংবা উৎসাহী—সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই জানা। ফলে সম্প্রতি ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনকে যে প্রশ্ন করেছেন সেটিও খুব ‘সিগনিফিক্যান্ট’।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, গত ২২ অক্টোবর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। বৈঠকের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রদূত তার কাছে জানতে চেয়েছেন আগামী ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে বিএনপির কর্মসূচির কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়া হবে কি না?

পিটার হাস যে ভাষায় কিংবা যে টোনে প্রশ্নটি করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, সেটি বাংলাদেশ সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের জন্য মোটেও সম্মানজনক নয়। প্রশ্ন হলো, একজন বিদেশিকে এই প্রশ্ন করতে হলো কেন? কেন তাকে এই ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলো বা তিনি কেন এমন একটি প্রশ্ন করতে পারলেন?

কেন এই ধরনের প্রশ্ন করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলো? এর জন্য দায়ী কে বা কারা?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলকে স্পেস না দেওয়া এমনকি তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাওয়ার প্রবণতা বেশ পুরোনো। বলা যায় এই প্রবণতাটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মসঙ্গী। যখনই যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, তারা বিরোধী দলের কর্মসূচি ভণ্ডুল করে দেওয়া তো বটেই, তাদেরকে পুরোপুরি প্রান্তিক করে দেওয়া এমনকি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টাও করেছে। যে কারণে বাংলাদেশে একটি সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এখনও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে এখন যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা বিদেশিদের চাপে কি সহনশীল রাজনীতির সূচনা হবে?

কেননা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ওই প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ঢাকায় সবারই প্রয়োজন, রোগীর ঢাকা আসা প্রয়োজন, বিদেশে যেতে হলে ঢাকায় আসা প্রয়োজন—সব কিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। কাজেই আসা-যাওয়া বন্ধ করার কোনও প্রশ্নই আসে না। সমাবেশ উপলক্ষে বিএনপির নেতা-কর্মীরা আসবেন, যাবেন, সেখানে সরকার কোনও বাধা দেবে না এবং বাধা দেওয়ার কোনও চিন্তাও করছে না।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২২ অক্টোব ২০২৩)।

তবে ২৮ অক্টোবর বিএনপি যাতে ঢাকায় বসে পড়তে না পারে বা অবরোধ করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের দুই সিনিয়র নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং বাহাউদ্দিন নাছিম ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিএনপিকে কোনোভাবেই দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না—এমন মনোভাব নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজপথে নামতে হবে। (প্রথম আলো ২৩ অক্টোবর ২০২৩)।

আর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবর ঢাকা অবরোধ কিংবা ঢাকায় অবস্থানের কোনও পরিকল্পনা তাদের নেই। বলেছন, ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির ‘মহাসমাবেশ’ থেকে ‘সড়কে বসে পড়ার’ মতো কোনও কর্মসূচি আসছে না। বরং শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ হবে। এরপর যার যার মতো করে চলে যাবেন। সেদিন ‘বড়’ কোনও কর্মসূচিও আসছে না। তা ঘোষণা হবে পরে। তিনি বলেন, ’২৮ তারিখ আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের নিশ্চয়তা দিচ্ছি’।

সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত যা পরিস্থিতি তাতে মনে হচ্ছে ২৮ অক্টোবর হয়তো ঢাকায় বড় কোনও ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু ২৮ তারিখের পরে কী হবে? দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুটি দাবিতে প্রধান দুই দল যেভাবে অনড় বা পয়েন্ট অব নো রিটার্নে আছে; অর্থাৎ বিএনপির মূল দাবি সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আর আওয়ামী লীগের বক্তব্য স্পষ্ট যে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন—এই দুটি বিপরীতমুখী দাবি ও অবস্থানের মধ্যবর্তী কোনও সমাধানে পৌঁছানোর জন্য কোনও সংলাপ বা সমঝোতার লক্ষণ নেই।

এরকম বাস্তবতায় ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ থেকে সরকার পতনের লক্ষ্যে ঢাকাকেন্দ্রিক লাগাতার কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপি। আর গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা বলেছেন, সরকার পদত্যাগ না করলে ২৮ অক্টোবরের পর ‘সরকারকে গলায় গামছা বেঁধে নামানো হবে’।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একটি মহল বাংলাদেশে অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে চায়। এজন্য তারা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র চলছে।’

বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ যেটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলছে বিএনপি ও তার শরিকদের কাছে সেটি কৌশল বা স্বপ্ন বাস্তবায়নের সিঁড়ি। কেননা এখন পর্যন্ত নির্বাচনের যে হাওয়া এবং প্রধান দুই দলের মধ্যে কোনও ধরনের সংলাপ বা সমঝোতার ইঙ্গিত যেহেতু অনুপস্থিত, তাতে জানুয়ারিতে বিএনপিকে ছাড়াই যে সরকার নির্বাচন করে ফেলতে চায়—সেটি স্পষ্ট। আর সরকার বা আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচন করে ফেলতে পারে, তাহলে এ পরে কী কী হবে—তা নিয়ে অনেক গবেষণা হতেই পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়ে যাওয়া তথা নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরে বিএনপি আন্দোলন করে ওই সরকারকে নামাতে পারবে না। হয়তো কিছু বৈদেশিক চাপ আসবে। অর্থনৈতিক অবরোধও আসতে পারে। কিন্তু সরকার যদি সেসবকে পাত্তা না দিয়ে নতুন কোনও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং দেশকে যদি বড় ধরনের সংকটে পড়তে না দেয়, তাহলে বিএনপিকে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য।

এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ যে ধরনের নির্বাচনি কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে তাতে শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনে দলের অনেক শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। বিএনপি তাদেরকে ছাড়া নির্বাচনে যেতে চাইবে কি না এবং শেখ হাসিনা যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, সেই সরকারের অধীনে তারা নির্বাচনে যে যাবে না, সেটিও এরইমধ্যে পরিষ্কার। এসব কারণে বিএনপির সামনে উত্তম বিকল্প হচ্ছে নির্বাচন না হওয়া। অর্থাৎ নির্বাচন হবে না আবার আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় থাকবে না। সেটি কী করে সম্ভব? সেটি সম্ভব যদি তৃতীয় কোনও পক্ষ ক্ষমতা গ্রহণ করে।

বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে সেটি অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু রাজনীতিতে শেষ কথা বলে যেহেতু কিছু নেই, তাই ২৮ অক্টোবরের পরে কী হবে কিংবা বিএনপি কী করতে পারবে তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। যদিও বল সম্ভবত এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের কোর্টে। বাংলাদেশের নির্বাচন, রাজনীতি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ যদি কোনও বিদেশি শক্তির কোর্টে চলে যায়, সেটি শুধু আওয়ামী লীগ বিএনপিই নয়, সকল রাজনৈতিক দল এবং সামগ্রিকভাবে দেশের জন্যই ক্ষতিকর, লজ্জার।

এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? কেন আলোচনা ও সংলাপের মধ্য দিয়ে কোনও রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয় না? কেন দাবি আদায়ে রাজপথে রক্ত ঝরাতে হয়? কেন বিদেশিদের নাক গলাতে হয় বা তারা কেন নাক গলানোর সুযোগ পায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে রাজনীতিবিদদেরই। তাদের খামখেয়ালির খেসারত কেন দেশ ও দেশের মানুষকে দিতে হবে—এই প্রশ্ন এখন নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চায়ের দোকানে আ.লীগ ও যুবলীগের দুই নেতাকে গুলি
চায়ের দোকানে আ.লীগ ও যুবলীগের দুই নেতাকে গুলি
সৈকতে জনসমুদ্র!
সৈকতে জনসমুদ্র!
তলানিতে থাকা দিল্লির কাছে থামলো লখনউর জয়যাত্রা
তলানিতে থাকা দিল্লির কাছে থামলো লখনউর জয়যাত্রা
নি‌ষেধাজ্ঞা স্থ‌গিত, বান্দরবা‌নের রুমায় ঘুরতে যেতে বাধা নেই
নি‌ষেধাজ্ঞা স্থ‌গিত, বান্দরবা‌নের রুমায় ঘুরতে যেতে বাধা নেই
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ