বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত দুই দশকে প্রশংসনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে ৬-৮ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয় ও অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে। তবে, এই অগ্রগতির আড়ালে যে গভীর প্রশাসনিক ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে, তা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। এবং দীর্ঘ মেয়াদে শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা উপেক্ষিত থাকলে তা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এটি মনে রাখতে হবে, সাময়িক প্রবৃদ্ধি আর প্রকৃত উন্নয়ন সমার্থক নয়। দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন শাসনব্যবস্থা সুশাসনের মানদণ্ডে উন্নত হবে।
এখন দেখা যাক শাসন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কীভাবে সম্পর্কিত। সুশাসন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সুশাসন মানে হলো কার্যকর প্রশাসন, দুর্নীতির দমন, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা যা একটি দেশের আর্থিক পরিবেশকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলে। যখন সরকার সুশাসন নিশ্চিত করে, তখন নাগরিকদের আস্থা বৃদ্ধি পায়, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ে, এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু ত্বরান্বিত হয় না, বরং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলকও হয়। অপরদিকে, দুর্বল শাসন ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে প্রবৃদ্ধি অসমতা সৃষ্টি করে এবং স্থায়িত্বহীন হয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি হয় বাহ্যিক গতি, তবে শাসন ব্যবস্থা হলো সেই কাঠামো যা এই গতি সঠিক পথে ধরে রাখে। দুর্বল শাসন কাঠামো হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সংহত হয় না; বরং তা সংকুচিত হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, যদি সরকারি প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হয়, তবে বাস্তবায়নের মান খারাপ হয় এবং কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয় না। এর ফলে শুধু সম্পদের অপচয়ই ঘটে না, সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল জনসাধারণের মধ্যে পৌঁছায় না।
এখন আলোচনা করা যাক আমাদের বাস্তব অবস্থা নিয়ে। বাংলাদেশে শাসন ব্যবস্থায় বড় কয়েকটি সমস্যা বিদ্যমান। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্নীতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। এটি প্রমাণিত যে দুর্নীতি বিদেশি বিনিয়োগ কমায়, অভ্যন্তরীণ ব্যবসার খরচ বাড়ায় এবং দারিদ্র্য হ্রাসের প্রচেষ্টা ব্যাহত করে। সেই সাথে, পর্যাপ্ত জবাবদিহির অভাব বিদ্যমান। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকার ফলে অনেক ভুল সিদ্ধান্তের জন্য অধিকাংশ সময়ই কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। এর ফলে অপেশাদারত্ব এবং দলীয়করণ বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি আইনের শাসনের দুর্বলতা সুশাসন এর ভিত্তিকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করছে। বিচারব্যবস্থার ধীরগতি ও পক্ষপাতদুষ্টতা মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা এবং সাধারণ নাগরিকদের অধিকার রক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উদাহরণগুলো লক্ষণীয়। নাইজেরিয়া আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হলেও দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল প্রশাসনের কারণে দেশের অধিকাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে। প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তেল খাতের আয় সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে না। পাশাপাশি, শ্রীলঙ্কা একটি সময় দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির মডেল ছিল, কিন্তু শাসনের অবনতির কারণে ২০২২ সালে দেশটি দেউলিয়া হলো। রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অভাব ও দুর্বল প্রশাসনিক পরিকল্পনা ছিল এর মূল কারণ।
এছাড়া, কেনিয়ার অভিজ্ঞতা বলে দেয়, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে বাস্তবায়নের মান এবং নাগরিক সেবার গুণমান চূড়ান্তভাবে ব্যাহত হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে। অপর পক্ষে, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশের মতোই পোশাকশিল্পনির্ভর দেশ হলেও সেখানে শাসনব্যবস্থা তুলনামূলক বেশি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক। এর ফলে তারা অনেক বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে, এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো উচ্চমানের প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে চীন, যদিও দীর্ঘদিন ধরে একদলীয় শাসনে থেকেছে, তারা প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতির বাস্তবায়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করেছে।
এখন দেখা যাক কেন সুশাসন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি? তথ্য ও উপাত্ত নির্দেশ করে যে সুশাসন দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অন্যতম ভিত্তি। কোনও দেশের উন্নয়ন যদি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে চায়, তবে তার ভিত্তি হতে হবে শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা। প্রবৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে গতি আনতে পারে, কিন্তু সুশাসন স্থায়িত্ব আনে। সেই সাথে, টেকসই উন্নয়নের জন্য সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক সময় একটি বিশেষ শ্রেণিকে বেশি উপকৃত করে। কিন্তু শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা থাকলে নীতিনির্ধারণে সবাই অংশ নিতে পারে এবং সুবিধা বিভাজন ন্যায়সঙ্গত হয়। পাশাপাশি, ভালো শাসন কাঠামো ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করে, আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, এবং প্রতিযোগিতাকে উৎসাহ দেয় যা প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করে।
সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য কি করা প্রয়োজন তা সবাই কম-বেশি জ্ঞাত আছেন তবুও আবারও মনে করিয়ে দেওয়া বাহুল্য নয় যে, আমাদের কার্যকর ভাবে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। সেই সাথে, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ও সিভিল সার্ভিসকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার কোনও বিকল্প নেই।
সর্বোপরি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
বাংলাদেশ যদি শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে উন্নয়নের সূচক দেখেই আত্মতুষ্ট হয়, তবে তা হবে একটি ভ্রান্ত ধারণা। প্রবৃদ্ধির বাইরেও এমন বহু কাঠামোগত দুর্বলতা আছে যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাইরে এসে এখন সময় হয়েছে শাসনব্যবস্থাকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়নের নীতি প্রণয়ন করার। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হলে উন্নয়নের সব অর্জন একসময় ভেঙে পড়বে। সুতরাং, বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘শাসন সংস্কার’। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়, এটি জাতীয় উন্নয়নের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
লেখক: লোকপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক




