আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহি: উদ্ভাবনী পদ্ধতি কেন জরুরি?  

ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ২১:২৪আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ২২:১৬

কার্যকর শাসনব্যবস্থার জন্য আমলাতন্ত্রে একটি শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা অপরিহার্য, যা সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক সেবাপ্রদান নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রকে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর ও স্বচ্ছতার অভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা যে সমস্যাগুলোর সমাধানে যথেষ্ট নয়, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, যার ফলে জনগণের অসন্তোষ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতা বাড়ছে। তাই জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং সেবার মানোন্নয়নের জন্য প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে একটি নতুন চিন্তাধারা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (APA), অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (GRS) এবং জাতীয় সততা কৌশল (NIS)-এর মতো উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়।

সিস্টেমের ভেতরের প্রতিরোধ নতুন জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনেক সময়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া ও সংস্থাগত সংস্কৃতির গভীর শেকড় নতুন পদ্ধতি গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে অভ্যস্ত কর্মকর্তারা নতুন উদ্যোগকে স্বাধীনতা বা চাকরির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। এছাড়া জবাবদিহির নতুন পদ্ধতি যেন ন্যায্যতা ও সাম্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক বোদ্ধা মনে করেন যে অটোমেটেড সিস্টেম ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাতদুষ্টতা দেখা দিতে পারে, যা সঠিকভাবে পরিচালনা না করলে বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও প্রকট করতে পারে।

সেই সাথে ফলাফলভিত্তিক কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন করাও একটি জটিল কাজ, বিশেষ করে যেখানে ফলাফল হচ্ছে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি বা কর্মকর্তা-কর্মচারীর মনোবল উন্নয়ন। তাছাড়া, প্রচলিত আইন ও নীতিমালার সাথে নতুন পদ্ধতির অনেক ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য না থাকায় জবাবদিহির নতুন উদ্যোগে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিশাল পরিমাণ ডেটা ব্যবস্থাপনা করাও চ্যালেঞ্জিং। অনেক সরকারি দফতরে এখন অপর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও আইটি সক্ষমতার অভাব বিরাজ করছে, যা নতুন পদ্ধতির কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

কার্যকর কৌশল প্রণয়নের জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশে সরকারি কর্মসম্পাদন নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফলের সাথে যুক্ত করে পরিচালিত হয়। যুক্তরাজ্যের ‘পারফরম্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক’-এ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য ও সূচক নির্ধারণ করা থাকে এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে দফতরসমূহের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়।

নাগরিক প্রতিক্রিয়া অন্তর্ভুক্তকরণ অনেক উন্নত দেশে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। নেদারল্যান্ডের ‘MijnOverheid’ প্ল্যাটফর্ম নাগরিকদের মতামত গ্রহণ করে সেবার মান উন্নয়নে ব্যবহার করে। এর পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া ওপেন ডেটা ও ডিজিটাল স্বচ্ছতার মাধ্যমে জবাবদিহির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

স্বাধীন নিরীক্ষা সংস্থার কার্যকর ভূমিকা সুইজারল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডে দেখা যায়, যেখানে নিরীক্ষা দফতর নিয়মিত সরকারি কর্মসম্পাদন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন করে থাকে। এছাড়া, হুইসলব্লোয়ারদের সুরক্ষাও জরুরি, যেমন জার্মানির ফেডারেল হুইসলব্লোয়ার অ্যাক্ট এবং নিউজিল্যান্ডের প্রটেক্টেড ডিসক্লোজার অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে হুইসেল ব্লোয়ারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

বৈশ্বিক শিক্ষা এবং বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যেখানে বিভিন্ন দফতরের ডেটা একত্রিত থাকবে। পাশাপাশি, ওপেন ডেটা পোর্টাল চালুর মাধ্যমে নাগরিকদের সেবা খাত সম্পর্কিত তথ্য উন্মুক্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। এক্ষেত্রে, পারফরম্যান্স ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে দফতরের কর্মদক্ষতা ভিজ্যুয়ালভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

এছাড়া, এআই-চালিত পারফরম্যান্স অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে অদক্ষতা ও অনিয়ম চিহ্নিত করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত, চুক্তি ও লেনদেনের অপরিবর্তনীয় রেকর্ড সংরক্ষণ করে দুর্নীতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। নাগরিক প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য ইন্টারঅ্যাকটিভ ফিডব্যাক মেকানিজম থাকা জরুরি, যাতে নাগরিকরা তাদের অভিযোগ জানাতে এবং তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

সেই সাথে, জনসম্পৃক্ত শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করে নাগরিকদের নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ:

১. নীতিমালা ও সেবাদানে মতামত প্রদানের জন্য নাগরিক উপদেষ্টা প্যানেল গঠন;

২. সেবাগ্রহণ পরবর্তী তাৎক্ষণিক মতামত প্রদানের প্ল্যাটফর্ম তৈরি;

৩. আমলাদের নিয়মিত পারফরম্যান্স রিপোর্ট ও মতবিনিময়ের জন্য পাবলিক ফোরাম আয়োজন;

৪. পারস্পরিক মূল্যায়নের মাধ্যমে আমলাদের মধ্যে সমন্বিত জবাবদিহি ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ।

এছাড়া, একটি সমন্বিত নিরীক্ষা ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক, যাতে অভ্যন্তরীণ ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরীক্ষা এবং তাৎক্ষণিক তদারকি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ ক্ষেত্রে এআই-চালিত নিরীক্ষা টুল ব্যবহার করা যায়, সেই সাথে সিভিল সোসাইটি ও অ্যাকাডেমিয়ার প্রতিনিধিত্বসহ স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি গঠন করা যেতে পারে, পাশাপাশি রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করাও আবশ্যক।

একই সাথে, শক্তিশালী হুইসলব্লোয়ার সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রণোদনার মাধ্যমে অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য জানাতে উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। সর্বোপরি, কর্মসম্পাদনভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে সিনিয়র কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্সকে তাদের প্রণোদনার সাথে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে তারা জনগণের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগী হন।

এসব উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব। প্রযুক্তির ব্যবহার, নাগরিক সম্পৃক্ততা এবং শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিশ্রুতি, সহযোগিতা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন অপরিহার্য, তবে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে ফলাফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

লেখক: জনপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আগস্টেও অপরিবর্তিত থাকছে জ্বালানি তেলের দাম
আগস্টেও অপরিবর্তিত থাকছে জ্বালানি তেলের দাম
রিহ্যাব নিয়ে শুনানি, এজিএম ৩০ দিনের জন্য স্থগিত
রিহ্যাব নিয়ে শুনানি, এজিএম ৩০ দিনের জন্য স্থগিত
প্রথম পরীক্ষাতেই সফল চীনের নতুন উড়োজাহাজ, নজর এবার পাহাড়ি রুটে
প্রথম পরীক্ষাতেই সফল চীনের নতুন উড়োজাহাজ, নজর এবার পাহাড়ি রুটে
অনলাইনে অভিযোগ জানাতে পারবেন প্রতারণার শিকার অভিবাসী ও স্বজনরা, মডিউল উদ্বোধন
অনলাইনে অভিযোগ জানাতে পারবেন প্রতারণার শিকার অভিবাসী ও স্বজনরা, মডিউল উদ্বোধন
সর্বশেষসর্বাধিক