অসত্য ও অর্ধ-সত্য: নির্বাচনে প্রযুক্তিগত হুমকি

আশফাক সফল
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:১০আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৫৯

সত্য ও মিথ্যার লড়াই নতুন নয়। ইতিহাসজুড়েই ক্ষমতা কখনও সত্য গোপন করেছে, কখনও মিথ্যা ছড়িয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রটি সব সময় ছিল এই দুইয়ের মাঝখানের ধূসর জায়গা—অর্ধ-সত্য। অর্ধ-সত্য পুরোপুরি মিথ্যা নয়, আবার সম্পূর্ণ সত্যও নয়। তাই এটি সহজে প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, সহজে প্রত্যাখ্যাতও হয় না। বরং এটি ধীরে ধীরে বিশ্বাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আধুনিক প্রযুক্তি সেই অর্ধ-সত্যকে শুধু দ্রুত ছড়ানোর সুযোগই দেয়নি, একে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার দক্ষতাও এনে দিয়েছে। যে কোনও নির্বাচন এই অর্ধ-সত্যের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র—কারণ নির্বাচন মানেই অনিশ্চয়তা, সিদ্ধান্তের চাপ এবং আবেগের সংঘর্ষ।

অসত্য বনাম অর্ধ-সত্য: প্রযুক্তির ভূমিকা

এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো ভাইরাল করে দেওয়া। যা দ্রুত ছড়ায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা আমাদের ডিজিটাল বাস্তবতায় গেঁথে গেছে। অর্ধ-সত্য এখানে সবচেয়ে সফল, কারণ এতে চমক আছে, ভয় আছে, আবার আংশিক বাস্তবতার ছোঁয়াও আছে। মানুষ দেখে, শুনে, শেয়ার করে—যাচাই করার আগেই। ভাইরাল কনটেন্টের পরের ধাপ হলো এনগেজমেন্ট। লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের সংখ্যা যেন সত্যতার বিকল্প মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বক্তব্য যত বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, সেটিই তত বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।

ভাইরাল কনটেন্টের প্রধান শক্তি হচ্ছে এনগেজমেন্ট। লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের সংখ্যা যেন সত্যতার বিকল্প মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বক্তব্য যত বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, সেটিই তত বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। এখানে কাজ শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর নিজস্ব প্রোগ্রাম, অ্যালগরিদম আর লজিক। যেসব পোস্ট মানুষ বেশি দেখে, বেশি শেয়ার করে বা বেশি প্রতিক্রিয়া জানায়, সেগুলোই আবার আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে একটি সহজ নিয়ম তৈরি হয়—যা মনোযোগ কাড়ে, সেটিই ছড়ায়। অর্ধ-সত্য এই নিয়মে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। কারণ এতে পুরো মিথ্যার ঝুঁকি নেই, আবার পুরো সত্যের ধীরতাও নেই। ফলাফল হিসেবে একই ধরনের বিভ্রান্তিকর বার্তা বারবার চোখে পড়ে, শুনতে শুনতে পরিচিত হয়ে যায়, আর ধীরে ধীরে সেটিই ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হতে শুরু করে। সত্য তখন হঠাৎ করেই দুর্বল হয়ে পড়ে—কারণ সত্য সব সময় চমক দেয় না, উত্তেজনা তৈরি করে না, আর তাই সে একই গতিতে ছড়াতেও পারে না।

কেন নির্বাচন

নির্বাচনের সময় মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে চায় দ্রুত। এই দ্রুততার সুযোগেই অর্ধ-সত্য সবচেয়ে বেশি কাজ করে। যেমন, মার্কিন নির্বাচনে প্রযুক্তিগত হুমকি ও প্রভাব নিয়ে অলাভজনক গবেষণা সংস্থা RAND Corporation ২০১৬ ও পরবর্তী সময়ের নির্বাচনি তথ্যপরিবেশ বিশ্লেষণ করে। গবেষণা প্রকল্পের প্রতিবেদনে উঠে আসে,  অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তথ্যপ্রবাহবে কেবল “ভুল খবর” দিয়ে প্রভাবিত করা হয়নি; বরং বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট, ভিন্ন ভিন্ন উৎস ও পরস্পরবিরোধী ন্যারেটিভ একসঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা হয়েছে। RAND-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও মিথ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য করার লক্ষ্য শুধুমাত্র ছিল না, বরং তথ্যের অতিরিক্ত চাপে মানুষের সত্য যাচাইয়ের সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়ার প্রয়াস ছিল, যার মাধ্যমে একজন ভোটারকে দ্বিধান্বিত করা সম্ভব। সম্পূর্ণ কৌশলটিকে বৃহৎ তথ্য পরিসরে একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তিগত হুমকি মানে শুধু হ্যাকিং বা সিস্টেম ভাঙচুর নয়। এর চেয়েও বড় হুমকি হলো বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা ভেঙে দেওয়া। যখন ভোটার নিশ্চিত হতে পারে না সে যা দেখছে বা শুনছে তা কতটা সত্য, তখন সিদ্ধান্ত আর স্বাধীন থাকে না।

নির্বাচন ও ডিজিটাল বাস্তবতা

বাংলাদেশের নির্বাচনি বাস্তবতায় একটি বিষয় এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—ডিজিটাল পরিসরই আজকের দিনে জনমত গঠনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। এই পরিসরে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে দৃশ্যমানতা। ভিডিও, অডিও কিংবা স্ক্রিনশট—এসব দেখলেই অনেকের কাছে সেটিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তি, প্রেক্ষাপট বা যাচাই সেখানে গৌণ। এই প্রবণতা হঠাৎ তৈরি হয়নি; এটি সামাজিক অভ্যাস, শিক্ষাব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের তথ্যচর্চার ফল।

“চিল নিয়েছে কাকে”-এর দেশে সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা দুর্বল, ডিজিটাল স্বাক্ষরতা অসম—এই দুইয়ের যোগফলে “যা দেখা যায়, তাই সত্য” ধারণাটি সহজেই প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিবার, পরিচিত মানুষ বা ঘনিষ্ঠ অনলাইন গোষ্ঠী থেকে আসা তথ্যকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসযোগ্য ধরে নেয়। ফলে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে অর্ধ-সত্যের জন্য একটি ঊর্বর ক্ষেত্র তৈরি হয়—যেখানে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি নেই, কিন্তু শেয়ার করার তাড়া আছে।

এখানেই অর্ধ-সত্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ এটি পুরো মিথ্যার মতো সহজে ধরা পড়ে না। কিছু বাস্তব তথ্য, কিছু পুরনো ঘটনা বা কিছু সত্য বাক্য জুড়ে দিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর বার্তা তৈরি করা হয়। মানুষ সেটিকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারে না, আবার পুরোপুরি যাচাইও করে না। ফলে সত্য ও মিথ্যার মাঝের ধূসর জায়গাটি দখল করে নেয় অর্ধ-সত্য—আর নির্বাচন সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এখানে প্রযুক্তিকে দায়ী করা সবচেয়ে সহজ পথ। কিন্তু সেটিই সবচেয়ে অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা। প্রযুক্তি নিজে সিদ্ধান্ত নেয় না—রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি নেয়। ব্যর্থতা তৈরি হয় তখনই, যখন নির্বাচন ব্যবস্থায় আগাম প্রস্তুতি থাকে না, তথ্যপরিবেশকে একটি নীতিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয় না, এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো প্রতিক্রিয়াশীল থাকে, প্রোঅ্যাকটিভ নয়। প্রযুক্তি তখন আয়না হয়ে দাঁড়ায়—ভেতরের দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয়।

বিশ্বাসের সংকট

নির্বাচনের প্রকৃত সংকট আজ আর ব্যালট বাক্সে নয়; এটি তথ্যের স্তরে। ভোটের দিন যত শৃঙ্খলাবদ্ধই হোক, যদি নাগরিক আগেই সত্য ও মিথ্যার ভেদরেখা হারিয়ে ফেলেন, তবে নির্বাচন ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্ধ-সত্য এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এটি পুরো মিথ্যার মতো ধরা পড়ে না, আবার সত্যের মতো বিশ্বাসযোগ্যও হয়ে ওঠে। এই ধূসর জায়গাতেই আস্থার ফাটল তৈরি হয়।

এই বাস্তবতায় প্রযুক্তিকে দোষ দেওয়া সহজ, কিন্তু অসম্পূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়া নিজে রাজনীতি করে না—রাজনীতি হয় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি, নীতি ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন যদি তথ্যপ্রবাহকে গুরুত্ব না দেয়, যদি আগাম পরিকল্পনা না থাকে, তবে প্রযুক্তি সেই ব্যর্থতাকে কেবল উন্মোচিত করে। অর্ধ-সত্য তখন আর প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফল।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—এই ব্যর্থতার দায় খুব কমই স্বীকার করা হয়। প্ল্যাটফর্ম বা ‘গুজব’-এর কথা বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া হয়, অথচ নির্বাচন মানে শুধু ভোট নয়, বিশ্বাস রক্ষার প্রক্রিয়া। তথ্যের প্রশ্নে দুর্বল হলে সেই বিশ্বাস টেকে না।

এখানে নাগরিকও নির্দোষ নন। ডিজিটাল যুগে একটি শেয়ার, একটি ফরোয়ার্ডও রাজনৈতিক কাজ। যাচাই না করে বিশ্বাস করা, আবেগে ভেসে প্রতিক্রিয়া জানানো—এসবই অর্ধ-সত্যকে শক্তিশালী করে। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে নাগরিককে প্রশ্ন করতে হবে, সন্দেহ করতে হবে, থামতে শিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—আমরা কি এমন নির্বাচন চাই, যেখানে সত্য নিজে লড়াই করে টিকে থাকবে? নাকি এমন এক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি, যেখানে অর্ধ-সত্যই সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র? এই প্রশ্নগুলো প্রযুক্তির নয়, ক্ষমতার।

লেখক: ব্লগার ও তথ্য-প্রযুক্তিবিদ; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস ফোরাম

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
কট্টরপন্থি ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
কট্টরপন্থি ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
সর্বশেষসর্বাধিক