খাল খননের জনপ্রিয় পাঠ ও পানির ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংকট 

চারু হক
২১ মার্চ ২০২৬, ১৯:০০ আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৬, ১৩:৪৭

নতুন সরকার ঘোষিত খাল খনন কর্মসূচি কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। লক্ষ্য স্পষ্ট— বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে সেচ নিশ্চিত করা এবং জলাবদ্ধতা কমানো। এ লক্ষ্যে গত ১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুরের সাহাপাড়া খাল খননের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। একইসঙ্গে তিনি ভার্চুয়ালি দেশের ৫৪টি জেলায় চলমান খনন ও পুনঃখনন কাজেরও সূচনা করেন। সংসদের বিরোধী জোট থেকে শুরু করে দেশের সুশীল সমাজ, উন্নয়ন গবেষক, রাজনৈতিক সমালোচক— সবাই কমবেশি এ প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে, সরেজমিন বাস্তবতার নিরিখে সরকারের এই উদ্যোগ উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ঠিক কতটা ফলপ্রসু হবে, এটা নিয়েই প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে।

খাল খনন বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনও বিষয় নয়। ১৯৭০ দশকের শেষভাগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এই কর্মসূচি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। তবে তখনকার হাইড্রোলজিক্যাল বাস্তবতা ছিল বর্তমানের চেয়ে ভিন্ন। তখন নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ তুলনামূলক সক্রিয় ছিল, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর সেচের নির্ভরতা ছিল যৎসামান্য এবং আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে রাজনৈতিক সংকটও আজকের মতো এতটা জটিল হয়ে ওঠেনি। ফলে পাঁচ দশক আগের সেই মডেলকে বর্তমানের পরিবর্তিত জলবায়ু ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরাসরি প্রতিস্থাপন করলে কৌশলগত বিশ্লেষণে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ঘটমান বাস্তবে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে দেশের নদনদীর প্রাকৃতিক প্রবাহের অভাব। দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর উজানে প্রতিবেশি দেশের তৈরি একের পর এক বাঁধ, ব্যারেজ এবং পানি প্রত্যাহার প্রকল্প নদীর স্বাভাবিক গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে, আর বর্ষায় আকস্মিক অতিরিক্ত প্রবাহে তৈরি হয় বন্যা পরিস্থিতি। প্রবাহের এমন অস্বাভাবিক বাস্তবতায় কেবল খাল খনন করে পানি ধরে রাখার ধারণাটি সীমিত কার্যকারিতা রাখে। কারণ, খালের পানির মূল উৎস যেখানে নদী, সেই নদীই যখন সংকটাপন্ন, তখন খালে পানি আসবে কোথা থেকে— সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নদীর উজানে পানি নিয়ন্ত্রণ এখন একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু, যেখানে অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পানি বর্তমানে যতটা না প্রাকৃতিক সম্পদ, তার চেয়ে বেশি আঞ্চলিক ক্ষমতার অন্যতম রাজনৈতিক উপাদান। এই রূঢ় বাস্তবতা এড়িয়ে কেবল অভ্যন্তরীণ খাল খননের মাধ্যমে পানি সংকট সমাধানের চেষ্টা করলে তা আদতে একটি আংশিক উদ্যোগ হিসেবেই গণ্য হবে এবং তা সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধানে ব্যর্থ হতে পারে।

অপরদিকে, দেশের ভেতরেও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা রয়েছে। নদী দখল, খাল ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ পরিস্থিতিকে দিনে দিনে জটিলতর করেছে। দেশের ৬৪ জেলায় প্রায় ৬৪ হাজার নদী দখলদারের যে তথ্য পাওয়া যায়, তা এই সংকটের গভীরতাকেই স্পষ্ট করে। ফলে নতুন করে খাল খনন করা হলেও যদি দখল ও দূষণ বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা রাখে।

ঘোষিত খাল খনন কর্মসূচির অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত পরিকল্পনার অভাব। পানির উৎস নিশ্চিত করা, ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, সেচ প্রক্রিয়ায় তার কার্যকর ব্যবহার এবং নিষ্কাশন পথ— এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কারিগরি সমাধান ছাড়া পুরো উদ্যোগটি নিছক রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এ ছাড়া পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে, অনেক ক্ষেত্রেই খননকৃত মাটি পুনরায় খালে গিয়ে পড়ে ভরাট হয়ে যায়, অথবা ভুল মৌসুমে কাজ শুরু করায় পুরো শ্রম ও অর্থই পণ্ড হয়। আর এ ধরনের অদূরদর্শী পরিকল্পনা কেবল অর্থনৈতিক অপচয়ই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট করে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প মানেই স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি। ইতোমধ্যে এমন উদাহরণ পাওয়া গেছে, যেখানে তিন বছর আগে খনন করা খাল পুনরায় খননের নামে ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রকল্পের উদ্দেশ্যের চেয়ে আর্থিক স্বার্থই বড় হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নিছক একটি রাজনৈতিক প্রয়াস হয়ে পড়ে।

পানি সংকটের আরেকটি মৌলিক দিক হলো— ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা। উত্তরাঞ্চলে ইতোমধ্যে মরুকরণের প্রাথমিক লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে সেচ ও গৃহস্থালি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে ভূ-স্তরের পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। এতে কেবল পানির প্রাপ্যতা কমছে না, বরং আর্সেনিকসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর খনিজ উপাদানের উপস্থিতি বেড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। এই কঠিন বাস্তবতায় খাল খনন করে ভূ-উপরিস্থ পানি ধরে রাখার পরিকল্পনা তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা বর্তমানের এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে ভূগর্ভস্থ পানির কার্যকর বিকল্প হতে পারবে কিনা— তা নিয়ে যথেষ্ট কারিগরি সংশয় রয়েছে।

এখানেই একটি বড় নীতিগত ও কৌশলগত প্রশ্ন সামনে চলে আসে। নদীপ্রবাহের প্রধান উৎসগুলো যখন ভারতের একতরফা নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক পানি রাজনীতির মারপ্যাঁচে অনিশ্চিত, তখন এই বিশাল খাল খনন কর্মসূচি কি আদতে কোনও টেকসই বিকল্প সমাধান, নাকি এটি মূল সংকটকে আড়াল করার একটি প্রতিস্থাপনমূলক কৌশল? অন্যভাবে বললে, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের মতো কঠিন ও অপরিহার্য কূটনৈতিক লড়াই থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তার রাজনীতিতে নিমগ্ন হওয়া কি দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী নয়? বাস্তব সমস্যার মূলে আঘাত না করে কেবল তার উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকা শেষপর্যন্ত জাতীয় পানিনিরাপত্তাকেই চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।

বিগত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকার দল উভয়েই বিভিন্ন সময়ে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিটিও বারবার উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সমাধানে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি এখনও সীমাবদ্ধ। এমনকি যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠকগুলোও বছরের পর বছর ধরে কোনও কার্যকর ফলাফল বয়ে আনতে পারছে না। এমন এক বন্ধ্যা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে অভ্যন্তরীণ খাল খনন কর্মসূচির ওপর অতি-নির্ভরতা এক ধরনের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ কিনা, সেই প্রশ্ন তোলা অমূলক নয়।

এটি একটি পরিচিত প্রবণতা। রাষ্ট্র যখন দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংকট বা জটিল আন্তর্জাতিক সমস্যার টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তখন সে তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান, স্বল্পমেয়াদী ও জনপ্রিয় উদ্যোগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে তাৎক্ষণিক জনসমর্থন ও এক ধরনের দৃশ্যমান উন্নয়নের আবহ তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে মূল সংকটের মূল আঘাতের বাইরে থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ব্যাপকভিত্তিক খাল খনন কর্মসূচিও কি সেই একই ধরনের ‘পপুলিস্ট’ ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—  যা দিয়ে নদীর ন্যায্য হিস্যা ও পানিনিরাপত্তার মতো মৌলিক ব্যর্থতাগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে?

তবে এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, সঠিক কারিগরি পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক নকশা এবং আঞ্চলিক পানি রাজনীতির সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে এই উদ্যোগটিকে একটি কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার মডেলে রূপান্তর করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে, যেখানে নদী খনন, জলাধার নির্মাণ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় ভাবা হয়েছে। পানির উৎস থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষকের খেত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের বৈজ্ঞানিক সংযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া— এই বিশাল খাল খনন কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত একটি বিচ্ছিন্ন ও অসংলগ্ন প্রকল্প হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রাখে।

প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি পানি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পরিবেশ প্রতিবেশ এবং নাগরিকের জীবনের প্রশ্ন। বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচি সেই অস্তিত্ব রক্ষার একটি আংশিক উত্তর হতে পারে, কিন্তু কখনোই তা একমাত্র সমাধান নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত পানির মূল উৎস অর্থাৎ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর স্বাভাবিক ও ন্যায্য প্রবাহ নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ অভ্যন্তরীণ এই খননকাজ শুধু সাময়িক স্বস্তিই দেবে। সঠিক কূটনৈতিক ও কারিগরি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খালগুলো অচিরেই পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাবে এবং আমরা আবারও সেই একই সংকটের মুখে এসে দাঁড়াবো। তখন হয়তো জনতুষ্টির খাতিরে নতুন কোনও প্রকল্পের ঘোষণা আসবে এবং আমরা আবারও একইরকম অর্থহীন এক দুষ্টচক্রেই ঘুরপাক খেতে থাকবো। খাল খননের এই প্রচেষ্টাকে তাই টেকসই করতে হলে একে অবশ্যই নদী রক্ষা ও পানিনীতির আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে একীভূত করতে হবে। অন্যথায়, নদীমাতা দেশে খাল খননের এই মহাযজ্ঞ শেষপর্যন্ত একটি মৃতপ্রায় পানিতন্ত্রের করুণ উদাহরণ হয়ে টিকে থাকবে।

লেখক: চারু হক, গবেষক ও অনুবাদক

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
একদিনে হামের উপসর্গে আরও পাঁচজনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১২১০
একদিনে হামের উপসর্গে আরও পাঁচজনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১২১০
আইএসইউ স্পোর্টস ক্লাবের দায়িত্বে নতুন নেতৃত্ব
আইএসইউ স্পোর্টস ক্লাবের দায়িত্বে নতুন নেতৃত্ব
মাছ চুরির সন্দেহে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা
মাছ চুরির সন্দেহে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা
ইমরান খানের আলোচিত ওসিআই কার্ড কী? ভারতে যাতায়াত-বসবাসে কী সুবিধা মেলে?
ইমরান খানের আলোচিত ওসিআই কার্ড কী? ভারতে যাতায়াত-বসবাসে কী সুবিধা মেলে?
সর্বশেষ সর্বাধিক