রাস্তার পাশে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের সারি, বাস চালকের ক্লান্ত মুখ, পণ্যবাহী ট্রাকের চালকের দীর্ঘশ্বাস— এই চিত্র এখন সারা বাংলাদেশের। জ্বালানি তেলের সংকট কেবল পেট্রোল পাম্পের সামনে লাইন নয়, এটি একটি গভীর জাতীয় সমস্যা, যা প্রতিদিন হাজার-হাজার মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। একদিকে সরকারের দৃঢ় আশ্বাস— সরবরাহে কোনও ঘাটতি নেই, অপরদিকে পাম্পমালিকদের দাবি — তেল নেই, পাম্প বন্ধ। এই দুই বাস্তবতার মাঝে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
দেশের বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে তালা ঝুলছে। কোনোটায় লেখা ‘তেল নেই’, কোনোটায় সাইনবোর্ড টাঙানো ‘বন্ধ’। যে কয়েকটি পাম্প খোলা থাকছে, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কৃষক তার সেচপাম্প চালাতে পারছেন না, পরিবহন শ্রমিক জীবিকা হারাচ্ছেন, ব্যবসায়ীরা মালামাল পৌঁছাতে পারছেন না সময়মতো। এই সংকটের প্রভাব কেবল পাম্পে থামছে না — ছড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো — যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তারা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষ। একজন মোটরসাইকেলচালক যিনি রাইড শেয়ারিং করে সংসার চালান, তার কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো মানে শুধু সময় নষ্ট নয়— মানে সেদিনের আয় নেই, পরিবারে খাবার নেই। একজন বাস চালকের কাছে তেল সংকট মানে ভাড়া বাড়ানোর বাধ্যবাধকতা, যা ঘুরে ঘুরে যাত্রীর পকেটে চাপ তৈরি করে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে যখন সেচের মৌসুমে ডিজেলের অভাব দেখা দেয়, তখন ফসল নষ্টের আশঙ্কায় কৃষকের রাতের ঘুম উড়ে যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) জানাচ্ছে, গুদামে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাহলে পাম্পগুলো বন্ধ কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাজারের ভেতরের সংকটটি বুঝতে হবে। পাম্পমালিকেরা বলছেন, সরবরাহ কম আসছে এবং যা আসছে তাতে লাভের অঙ্ক নেই। কেউ কেউ বলছেন, পাইকারী পর্যায়ে মজুতদারি হচ্ছে। কেউ বলছেন, পরিবহন সংকটে তেল পাম্পে পৌঁছাচ্ছে না সময়মতো। এই পরস্পরবিরোধী বয়ানের মাঝে সত্যটা হারিয়ে যাচ্ছে, আর ভোগান্তি পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এখানে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতির উত্থান দেখা যাচ্ছে— কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লোটার প্রবণতা। বাজারে যখনই কোনও পণ্যের সংকটের গুজব ছড়ায়, একটি মহল সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। তেলের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট যদি কৌশলে পাম্প বন্ধ রেখে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দাম বাড়ানোর পথ করে নেয়, তাহলে সেটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। সরকারের কঠোর হাতে এই প্রবণতা দমন করতে হবে।
বাজার তদারকির প্রশ্নটি তাই এখন কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে। শুধু মৌখিক আশ্বাস দিয়ে বা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে এই সংকট সামলানো যাবে না। প্রতিটি পাম্পে আগত ও বিতরণ করা জ্বালানির পরিমাণ রিয়েল-টাইম মনিটরিং করতে হবে। যেসব পাম্প বিনা কারণে বন্ধ রাখছে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিপো পর্যায়ে মজুতদারির তদন্ত করতে হবে। বিপিসি থেকে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ করতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি জেলার পাম্পের অবস্থা জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখা সম্ভব। মোবাইল অ্যাপ বা এসএমএস সেবার মাধ্যমে মানুষ জানতে পারবেন কোন পাম্পে তেল আছে। এতে মানুষের ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনই কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগও কমে আসবে। উন্নত দেশে জ্বালানি বিতরণে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি রয়েছে, বাংলাদেশেও সেই পথে হাঁটতে হবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামতে হবে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ শুধু ফাইলে থাকলে চলবে না— জেলায় জেলায়, উপজেলায় উপজেলায় তদারকি টিম পাঠাতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না হলে এই প্রবণতা বারবার মাথা চাড়া দেবে।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার দিকে যেতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির বিস্তার, আমদানি নির্ভরতা কমানো, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি— এগুলো এখন আর স্বপ্নের কথা নয়, এগুলো জরুরি বাস্তবতা। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মজুত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেশের ভেতরে সংকট তৈরি করতে না পারে। এককথায়, জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো— মানুষের কষ্টকে স্বীকার করা। যখন একজন কৃষক সেচের অভাবে ফসল হারান, যখন একজন শ্রমিক কাজে যেতে পারেন না কারণ পরিবহন বন্ধ, যখন একটি পরিবার হাসপাতালে যেতে অ্যাম্বুলেন্স পায় না — তখন সেটা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, সেটা মানবিক বিপর্যয়। সরকারের দায়িত্ব শুধু পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা নয়, মানুষের জীবনমান নিশ্চিত করা।
এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্বীকার করা দরকার — বর্তমান সরকার দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অপেক্ষাকৃত নতুন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে একটি সরকারকে একইসঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামো গোছানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর ওপর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে এবং আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের মতো দেশগুলো সরাসরি এই ধাক্কা অনুভব করছে। সুতরাং, এই সংকটের পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ দুর্ব্যবস্থা নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনও দায়ী।
তবে এই কথা বলার অর্থ এই নয় যে, সরকার দায়মুক্ত — বরং পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনায় নিয়েই সরকারকে আরও দক্ষতার সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা করতে হবে, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে এবং জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে আস্থায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকেও এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরতে হবে এবং সরকারের পাশে দাঁড়াতে হবে। সংকট উত্তরণে জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা— অপচয় রোধ, গুজব না ছড়ানো এবং প্যানিক-বায়িং থেকে বিরত থাকা— সরকারের প্রচেষ্টাকে অনেকটাই সহজ করে দিতে পারে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই পারস্পরিক দায়িত্ববোধের মধ্যেই নিহিত আছে সংকট মোকাবিলার আসল শক্তি।
জ্বালানি সংকট আজ যদি সামলানো না যায়, তাহলে আগামীকাল এর মূল্য দিতে হবে আরও চড়াভাবে। বাজার তদারকি, সুশাসন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা— এই তিনটি মন্ত্র অনুসরণ করলেই কেবল এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। জনদুর্ভোগের সহনীয় পর্যায়ে আনতে এখনই সময়, আর সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক




