টেকসই উন্নয়নে স্থানীয় সরকারই পারে পথ দেখাতে

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০

২০১৫ সালে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি গ্রহণ করেছিল, যার মূল দর্শন হলো “কাউকে পেছনে ফেলে রাখা নয়।” এই অঙ্গীকার পূরণের পথে বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ২০৩০ সালের চূড়ান্ত লক্ষ্য পূরণ এখনও বহু দূরের পথ। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের একার পক্ষে এই বিশাল কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এখানেই স্থানীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা— ইউনিয়ন পরিষদ থেকে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন—এসডিজি অর্জনের পথে কেন্দ্রীয় সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদার হতে পারে, যদি সেই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়।

স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নৈকট্য। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন— এই প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানেন—তার এলাকার কোন পরিবার দরিদ্র, কোন শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না, কোথায় বিশুদ্ধ পানির অভাব। একইভাবে একজন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জানেন তার উপজেলার কোন ইউনিয়ন পিছিয়ে আছে, কোন খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে জরুরি। কেন্দ্র থেকে তৈরি হওয়া কোনও নীতি এই স্থানীয় বাস্তবতা কখনও পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। এসডিজির প্রথম লক্ষ্যমাত্রা— দারিদ্র্য বিমোচন  থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্থানীয় জ্ঞান ও স্থানীয় উদ্যোগ অপরিহার্য। মাঠ পর্যায়ে সরকারি-সেবা পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই।

স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগিয়ে এসডিজি অর্জনের সম্ভাবনার তিনটি স্তম্ভ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, স্থানীয় সরকার রাজস্ব সংগ্রহ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নয়নে অর্থায়ন করতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে স্থানীয় কর, ফি এবং রাজস্ব আয় দিয়ে সড়ক, বাজার, হাসপাতাল নির্মাণ হয়। বাংলাদেশে এই সম্ভাবনা এখনও মূলত অব্যবহৃত। উপজেলা পরিষদ তার নিজস্ব ভূমি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় রাজস্ব তৈরি করতে পারে, যা এসডিজি-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বিনিয়োগ করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার জবাবদিহির একটি কার্যকর মঞ্চ। একজন জনপ্রতিনিধিকে তার নিজের মহল্লা বা ইউনিয়নের মানুষের কাছেই হিসাব দিতে হয়। এই সামাজিক চাপ অনেক সময় কেন্দ্রীয় আমলাতান্ত্রিক নজরদারির চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। উপজেলা পরিষদ বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সমন্বয় করে মধ্যবর্তী স্তরে এই জবাবদিহির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করতে পারে। তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার বেসরকারি সংস্থা, সমাজ ও সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে পারে। বাংলাদেশে হাজারো এনজিও তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছে। উপজেলা পরিষদ এই এনজিও কার্যক্রম, সামাজিক উদ্যোগ এবং কমিউনিটি ম্যানেজমেন্টকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করার আদর্শ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সম্পদ চিহ্নিত করতে এবং সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে এই অংশীদারিত্বকে আরও নিবিড় করতে পারে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে স্থানীয় সরকারকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করার। এই সুযোগ কাজে লাগাতে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত: বাংলাদেশে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয় বছরের পর বছর ধরে, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা রয়ে যায় ঢাকায়। নতুন সরকারকে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদকে সত্যিকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিতে হবে। বিশেষত উপজেলা পরিষদকে কেবল একটি আলংকারিক প্রতিষ্ঠান না রেখে তাকে উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। দ্বিতীয়ত,  স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অর্থের জন্য সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা থাকে না। সরকারকে স্থানীয় কর ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে এবং জাতীয় রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। এই বরাদ্দ যেন এসডিজি-সংশ্লিষ্ট খাতে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, পয়োনিষ্কাশন  ব্যয় হয় তার শর্তযুক্ত কাঠামো তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, অনেক ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে দক্ষ জনবল নেই, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। এসডিজির লক্ষ্যগুলোকে স্থানীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে, তথ্য সংগ্রহ করতে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যে কারিগরি দক্ষতা দরকার, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার—ই-গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল সেবা প্রদান, উপাত্ত ব্যবস্থাপন স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে পারে। উপজেলা পরিষদ এই ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জন্য একটি প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করতে পারে।

চতুর্থত, ক্ষমতার সাথে দায়িত্ব আসতে হবে। স্থানীয় বাজেট, ব্যয় ও প্রকল্পের তথ্য সর্বজনীন করতে হবে। নাগরিক সনদ, সামাজিক অডিট এবং উন্মুক্ত তথ্য ব্যবস্থা চালু করতে হবে। উপজেলা পরিষদ পর্যায়ে বার্ষিক জনশুনানি বাধ্যতামূলক করা উচিত, যেখানে জনগণ সরাসরি তাদের জনপ্রতিনিধিকে প্রশ্ন করতে পারবেন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে পারবেন।

পঞ্চমত, স্থানীয় সরকারে নারী আসন সংরক্ষিত থাকলেও বাস্তবে নারী প্রতিনিধিরা অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক ভূমিকায় থেকে যান। এসডিজির লিঙ্গ সমতার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত নারী নেতৃত্বকে কেবল প্রতীকী নয়, সত্যিকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে আনতে হবে এবং তাদের জন্য বিশেষ নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

এসডিজি কোনও একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন— এই বিষয়গুলো পরস্পর নিবিড়ভাবে জড়িত এবং এগুলোর সমাধান করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত পদ্ধতি দরকার। উপজেলা পরিষদ ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি দফতর ও এনজিওর মধ্যে এই সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। আর ইউনিয়ন পরিষদ হবে সেই সেতু যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অঙ্গীকারকে সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে জুড়ে দেবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে সঠিক সুযোগ পেলে তারা পরিবর্তনের শক্তিশালী বাহন হতে পারে। করোনা মহামারির সময় স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ, বন্যায় ত্রাণ বিতরণে তাদের তৎপরতা, প্রতিদিনের ছোট ছোট সেবা প্রদানে নিরলস প্রচেষ্টা—এসব কিছু সম্ভাবনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনের পথে আর বেশি সময় নেই। কিন্তু বাংলাদেশের ৬৮ হাজারের বেশি গ্রাম, সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, পাঁচ শতাধিক উপজেলা পরিষদ, ৬৪টি জেলা পরিষদ এবং কয়েকশত পৌরসভা ও কয়েকটি সিটি করপোরেশনের সম্মিলিত শক্তিকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাহসী সংস্কার এবং সত্যিকারের বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি। নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই মুহূর্তে সেই সংস্কারের পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ এখনও আছে এবং এই সুযোগ হাতছাড়া করা হলে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গৌরীই কি তবে আমির খানের জীবনের বনলতা সেন?
গৌরীই কি তবে আমির খানের জীবনের বনলতা সেন?
নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল-লেবানন: হিজবুল্লাহমুক্ত জোন গঠনের সিদ্ধান্ত
নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল-লেবানন: হিজবুল্লাহমুক্ত জোন গঠনের সিদ্ধান্ত
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
সর্বশেষসর্বাধিক